যে রাতে সারা পৃথিবী রক্তিম চাঁদ দেখতে ছাদে জড়ো হচ্ছিল সেই ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, পুরুলিয়ার অনুপর্ণা রায় ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে সিংহ জয় করলেন – ওরিজন্তি (হরাইজন) বিভাগে সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি। এর আগে ২০১৪ সালে এই বিভাগে চৈতন্য তামানের কোর্ট মনোনীত হয়েছিল এবং চৈতন্য সেবছর কোনো ভারতীয়ের প্রথম ‘লায়ন অফ দ্য ফিউচার’ (সেরা প্রথম ছবি) পুরস্কার জয় করেন। ২০২১ সালে এই বিভাগেই আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্তের মায়ানগর (ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ক্যালকাটা) দেখানো হয়েছিল। সেই একই হরাইজনে অনুপর্ণা তাঁর সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ ছবির জন্য পেলেন সেরা পরিচালকের পুরস্কার।
অনুপর্ণা ভেনিসে পুরস্কার নিতে উঠে প্রাথমিক ধন্যবাদ জানানোর পর গাজার উপর ইজরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি এ-ও বলেছেন যে প্যালেস্তাইনের পক্ষ নেওয়ায় তিনি হয়ত নিজের দেশের অনেকের চক্ষুশূল হয়ে উঠবেন, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এরপর থেকে পরিচালক অনুপর্ণা নিজের রাজ্যে নানাভাবে আপ্যায়িত হয়ে চলেছেন। কেউ বলছেন পুরুলিয়ার মেয়ে এত বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে উঠেছে – বাঙালির এরকম গর্বের দিন বহুকাল আসেনি। কেউ বলেছেন অনুপর্ণার ইংরিজি তেমন চোস্ত নয় এবং সেটাই আরও মধুর করে তুলেছে তাঁর জয়কে। প্রমাণ হল, কুলটির কলেজে পড়ে আর বাঙালি অ্যাকসেন্টে ইংরিজি বলেও ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পৌঁছনো যায়। সবসময় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (এফটিআইআই) বা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডিজাইনিং (এনআইডি)-র মত কুলীন প্রতিষ্ঠানের ছাপ লাগে না। কোনো সংবাদমাধ্যম লিখেছে – অনুপর্ণা শিগগির বাংলায় ছবি করবেন এবং পুরুলিয়াকেই প্রেক্ষাপট হিসাবে বেছে নিতে চান। কোনো কোনো সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞ মনে করেছেন – পুরুলিয়ার মেয়ে তো কী হল? বানিয়েছে তো হিন্দি ছবি। তাতে বাংলা ছবির কোনো উন্নতি হবে না ইত্যাদি। কেউ কেউ এক ধাপ এগিয়ে এ-ও বলেছেন যে ভেনিস-কান-বার্লিন থেকে পাওয়া স্বীকৃতি নিয়ে মাতামাতি করা ভারতীয়দের চরম ইউরোকেন্দ্রিক মানসিকতার পরিচায়ক। ভারতের সমষ্টির চেতনে অচেতনে এখনো যে ঔপনিবেশিক প্রভাব রীতিমত প্রকট, তা বোঝা যায় অনুপর্ণা বা পায়েল কাপাডিয়াকে নিয়ে এই হইচই দেখে।
অবশ্য একথা সত্যজিৎ রায়কেও শুনতে হয়েছিল। জনপ্রিয় হিন্দি ছবির নায়িকা নার্গিস বলেছিলেন, ভারতের দারিদ্র্য রফতানি করে সত্যজিৎ আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন। একথা ঠিক যে বিচ্ছিন্নভাবে একটা-দুটো পুরস্কার বাংলা সিনেমার হাল ফেরাতে পারবে না। গত বছর পায়েলের গ্রাঁ প্রি পাওয়া ছবি হাতে গোনা কিছু হলে মুক্তি পেয়েছিল এবং কলকাতার মতো সিনে-বোদ্ধাদের শহরেও পায়েলের ছবি দেখতে হল ভর্তি হয়ে যেত – এরকম অপবাদ কেউ দিতে পারবে না। একই কথা আদিত্যবিক্রমের মায়ানগরের ক্ষেত্রেও সত্যি।
অনুপর্ণার ছবি নিশ্চয়ই হলে মুক্তি পাবে, আশা রাখব কলকাতাতেও আসবে। হলে দর্শক কত হল তা জানার জন্যেও মুখিয়ে থাকব। এখানে একটা খুব মজার বিষয় জানাতে ইচ্ছে করছে। অনুপর্ণা পুরস্কার জেতার পর থেকে যে মাতামাতি শুরু হয়েছে, আমার বিশ্বাস তার সিকিভাগও তাঁর সিনেমার জন্য নয় বা আগামীদিনে এই উচ্ছ্বাসের লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার কিছুটা প্রমাণ পেলাম ইউটিউব ঘেঁটে। বছরখানেক আগে অনুপর্ণার প্রথম ছবি রান টু দ্য রিভার নিয়ে ইউটিউব চ্যানেল ‘ট্রাইং টু নো সিনেমা’-তে তিনি একখানা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। এই প্রতিবেদন লেখার সময়েও সেই ভিডিওতে গোটা কুড়ির বেশি লাইক নেই।
তাহলে কি ধরে নেব, যেটুকু যা উন্মাদনা পুরুলিয়ার মেয়ে বলে, আর প্যালেস্তাইনের প্রতি সহৃদয়তা দেখিয়েছেন বলে? চিত্র পরিচালক অনুপর্ণার কাজ নিয়ে আহ্লাদ তো দূরে থাক, কোনো আগ্রহই নেই? নিশ্চয়ই সকলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন নয়, কিন্তু বাঙালির ভাল সিনেমা নিয়ে যে উদ্বেল আবেগ, তার অনেকটাই যে ভাঁওতা – তা এসব দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অনুপর্ণা কেন ছবিটা বাংলায় বানাননি – এই বাঙালি অভিমান নিয়ে যাঁরা তেড়ে এসেছেন, তাঁদের কাছে আমার কিছু বিনীত প্রশ্ন আছে:
১। কোন প্রযোজক অচেনা এই মেয়েটাকে (৭ সেপ্টেম্বরের আগে তো বেশিরভাগ মহামান্য অনুপর্ণার নামই জানতেন না) তাঁর মতই অচেনা দুই অভিনেত্রী নিয়ে ছবি বানানোর পয়সা দিতেন?
২। দিলেও বাংলার ছবি তৈরির পরিকাঠামোয় অনুপর্ণা কি নির্বিঘ্নে সে কাজ সম্পন্ন করতে পারতেন বলে আপনারা মনে করেন?
৩। এই প্রশ্নটা ভবিষ্যতের কাছে। ছবিটা যখন হলে মুক্তি পাবে, তখন বাঙালি কি হলে যাবে, না পাইরেটেড কপি নামানোর আশায় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকবে? দ্বিতীয়টা যাঁরা করেন তাঁরাও কিন্তু বাংলা ছবির পিঠে ছুরি মারেন।
সুধীজন বুঝবেন, এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই উত্তর আছে।
সোশাল মিডিয়ার বাতিকগ্রস্ত সাংস্কৃতিক ভাষ্যকারদের বাজে প্রশ্ন থেকে চোখ সরিয়ে যদি বাংলা ছবির বাস্তব সমস্যার দিকে তাকানো যায়, তাহলে আমার ব্যক্তিগত স্বার্থকেন্দ্রিক কিছু প্রশ্ন আছে, যা এখানে তুলে ধরতে চাইব। আমার ধারণা পক্ষপাত বর্জন করে এই প্রশ্নগুলোর দিকে তাকাতে পারলে বাংলা সিনেমার সমস্যার গোড়ায় কী আছে তার হদিস পাওয়া যেতে পারে।
১। অনুপর্ণার এই ঘটনা কি বাংলা ছবির প্রযোজক-পরিচালকদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে?
২। বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতারা কি ভেনিসে সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ-এর পুরস্কার জেতার কথা জেনে তাঁদের গোয়েন্দা-গুপ্তধনের কুয়োর বাইরে বেরিয়ে আসবেন?
৩। আরও সহজ এবং সরাসরি প্রশ্ন হল, এরকম প্রান্তিক মানুষের গল্প নিয়ে যদি কোনো অখ্যাত পরিচালক কোনো প্রযোজকের কাছে যান, তাঁকে কি পাত্তা দেওয়া হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া হয়ত একদিনে সম্ভব হবে না। সমস্যার সমাধানও হবে না এত সহজে। কিন্তু উত্তর খোঁজা শুরু করলেও অনেকটা এগোনো যায়।
সমকালীন দুই বাঙালি মহিলা পরিচালকের সঙ্গে এই নিয়ে কথাবার্তা বলছিলাম। এসভিএফ টেলিভিশনের ক্রিয়েটিভ হেড অদিতি রায়ের মতে, অনুপর্ণার এই ঘটনা অবশ্যই আমাদের মত মহিলা পরিচালকদের লড়াইকে কিছুটা এগিয়ে দেবে। দুবার জাতীয় পুরস্কার পাওয়া ফারহা খাতুন জানালেন, অনুপর্ণার সাহসকে উনি কুর্নিশ জানান। ভেনিসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন আবেগ আর উত্তেজনায় অনুপর্ণার গলা কাঁপছিল, তখন সেই কাঁপুনি ফারহা নিজের মধ্যে অনুভব করছিলেন। কারণ ফারহাও অনুপর্ণার মতই কলকাতা থেকে দূরের জেলা শহরে মানুষ হয়েছেন, যেখানে খুব বেশি সিনেমালগ্নতা সম্ভব ছিল না। কাজেই অনুপর্ণা বাঙালির সংস্কৃতির সাজানো বৈঠকখানাসম নন্দনে নয়, বরং আরও দূরে প্রভাব ফেলতে পেরেছেন। আজ শিলিগুড়ি, মুর্শিদাবাদ, কিংবা পুরুলিয়ার ছেলেমেয়েরাও তাদের অঞ্চলের গল্প সিনেমায় বলার সাহস পাবে।
আরো পড়ুন মায়ানগর: যুগান্তরের ছবি, আমাদের ছবি
ভারতীয় ছবি না হলেও, মাদার টেরেসাকে নিয়ে তিওনা মিতেভস্কা পরিচালিত ছবি মাদার এবছর ভেনিসে অনুপর্ণার ছবির সঙ্গে অরিজন্তি বিভাগে দেখানো হয়েছিল। সেই ছবির শুটিং কলকাতায় হয়েছিল এবং একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কলকাতার মেয়ে অমৃতা চট্টোপাধ্যায়। ছবিটার স্থানীয় লাইন প্রোডিউসার ছিলেন সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রোডিউসিং বিভাগের দুই প্রাক্তন ছাত্র – প্রতীক বাগি আর শৌনক সুর। শেষের দুজন এবছর ভেনিসে উপস্থিত থাকায়, অনুপর্ণার সিংহ বিজয়ের স্মৃতি স্পষ্ট। প্রতীকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ভারতীয় সিনেমাশিল্পের ইউরোপে আবিষ্ট থাকার প্রবণতা নিয়ে। প্রতীকের মত – যতদিন না অত্যুর সিনেমা নিয়ে ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র তৈরি হচ্ছে, ততদিন এই প্রবণতা থাকবে।
আমারও তাই মত। যে বা যারা বাণিজ্যিক মূলধারার বাইরে ছবি বানানোর চেষ্টা করবে, তাদের ছবিকে স্বদেশনির্ভর করতে গেলে দেশে সিনেমার বাজার ও অর্থনীতিকেও এ ধরনের ছবির অনুকূল হতে হবে। কোনো পরিচালক বা প্রযোজক স্রেফ ইচ্ছাশক্তির জোরে স্বনির্ভর হতে পারেন না। কারণ সিনেমা শিল্পের যুগপৎ দুর্ভাগ্য ও অভিনবত্ব হল – সিনেমা বানাতে টাকা লাগে। কখনো কখনো অনেক টাকা। যেহেতু সমবায় পদ্ধতিতে ছবি বানানো আর পরিবেশন (সঙ্গে সরকারি বা বেসরকারি টাকার জোগান ও আন্তর্জাতিক ফিল্মোৎসবের উপস্থিতি) করার রেওয়াজ গড়ে ওঠেনি (পুঁজিবাদী দুনিয়ায় গড়ে ওঠার কথাও নয়), সেহেতু ছবি করিয়েদের কোনো না কোনো বাজারের উপর নির্ভর করতেই হয়। অতএব স্বদেশের বাজার যদি প্রস্তুত না থাকে, তবে বিদেশের উপরেই নির্ভর করতে হবে। এতে কোনো দোষ বা ভণ্ডামি দেখি না।
প্রতীক একটা চমৎকার উপলব্ধির কথা আমায় জানাল, যা শুনে নিঃসন্দেহে আশান্বিত হলাম। ‘আমি আর সকলের মতই পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। তারপর দেখলাম আমাদের দেশে উঠতি পরিচালক আর চিত্রনাট্যকারের কোনো অভাব নেই। অভাব রয়েছে দূরদর্শী এবং অত্যুর সিনেমায় বিশ্বাস রাখা প্রযোজকের। ফিল্ম স্কুলে প্রোডিউসিং পড়তে পড়তে আমার এই ধারণা আরও দৃঢ় হয় যে প্রযোজক শুধু টাকা জোগাড় করে দেবে না, ছবিটাকে আন্তর্জাতিক বাজারে পোঁছে দেবার জন্য প্রয়োজনীয় স্ট্র্যাটেজি, মার্কেটিং, ফেস্টিভাল নির্বাচনেও সহায়তা করবে। প্রযোজককে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ধাইমার ভূমিকা নিতে হবে। এটা হলেই ভারতে এবং বাংলায় আরও কিছু অনুপর্ণা তৈরি হতে পারে।’
বলা বাহুল্য, শতাব্দীপ্রাচীন বাংলা সিনেমার দশকের পর দশক ধরে যেভাবে অবনমন ঘটেছে, তাতে একদিনে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করা সম্ভব না। কিন্তু এই ব্যাপারগুলো নিয়ে যদি ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের মানুষজন ভাবতে শুরু করেন, তাহলে এই দৈন্যদশার কারণ সম্পর্কে এক ধরনের সচেতনতা আসতে পারে। সদিচ্ছা থাকলে হয়ত হালও বদলাতে পারে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








