শ্রীযুক্ত সন্তোষ দত্তের শতবর্ষে এসে মনে হল, তাঁকে নিয়ে লেখা সত্যিই দুষ্কর, অথবা প্রায় নিষ্প্রয়োজন। তার কারণ এই নয় যে তাঁর অভিনয় সম্বন্ধে আমাদের শ্রদ্ধা নেই। কিন্তু তিনি এমন একটি বিশিষ্ট গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করেন যা আজকের বাঙালিদের মধ্যে পাওয়া যায় না। বাঙালিয়ানা বলতে আমরা অনেক ধরনের লক্ষণকে চিহ্নিত করি – মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল বা রসগোল্লা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ঝগড়া। কিন্তু যা বাঙালির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল – এক ধরনের জীবন সংরক্তি এবং সহজাত বিনয় ও কৌতুক, তা আমাদের আর নেই। সেই ঐতিহ্যের অংশীদাররাও সংরক্ষিত প্রজাতি।
রবীন্দ্রনাথের কবি রাজসভায় গিয়ে অবাক হয়েছিলেন ‘মানুষে কেন যে মানুষের প্রতি/ধরি আছে হেন যমের মুরতি’। অথচ এই পরিস্থিতি আজ দেশের সর্বত্রই। ক্ষমতা আমাদের এমন এক অবয়ব দান করেছে যাতে আমরা মনে করি, গাম্ভীর্য আমাদের কবচকুণ্ডল। কেননা মুখে হাসি না থাকাটাই সামাজিক অস্তিত্বের প্রমাণ। সন্তোষ দত্ত এমন ছিলেন না। পেশায় ক্রিমিনাল ল’ইয়ার হয়ে তিনি কী করে যে এমন সব অভিনয় করলেন তা অন্তত আমার বিস্ময়কর লাগে। তার কারণ তিনি যখনই পর্দায় দেখা দেন, তাঁর মধ্যে এক নির্মল আকাশ দেখা যায়। সেখানে শালপ্রাংশু মহাভুজ শরীর নেই, কথার মাধ্যমেও যে তিনি খুব উচ্চকিত হয়ে ওঠেন তা নয়। বরং সন্তোষ দত্ত আপাদমস্তক সাধারণ বলেই আপামর জনসাধারণের কাছে মুহূর্তে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন। ভেবে দেখলে দেখা যাবে তাঁর সংলাপ সিচুয়েশন-নির্ভর, কথার পৃষ্ঠে কথার চালাকি নয়। রবি ঘোষ যেমন দর্শকের চাহিদা পূরণ করতে পারতেন কৌতুকের মুহূর্তে, সন্তোষ দত্ত পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে এসে সংলাপ বলেন। ফেলুদার সঙ্গে জটায়ুর সমীকরণ সকলকেই মুগ্ধ করে। কী অদ্ভুত সাবলীল, শান্তিময় উপস্থিতি! বস্তুত জটায়ু এমন একজন মানুষ, যিনি অনেকটা বাল্যসখা। যেন ছোটবেলার দেব সাহিত্য কুটীরের ছোটদের জন্য শারদীয় সংখ্যা। তিনি হাসাতে পারেন, কিন্তু সেই হাসি ভাঁড়ের হাসি নয়। তার মধ্যে হিউমর নামক পদার্থের উপস্থিতি আছে এবং সেই হাসিতে কোনো কাঁটা নেই, কোনো যৌন উৎকোচ নেই। কাউকে তিনি খোঁচা দেন না, কিন্তু সহসা আমাদের মনের মেঘ কেটে যায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে জটায়ু হিসাবে যখন সন্তোষ দত্ত দেখা দিলেন, তখন বাংলা কৌতুকের জগতে কী তফাত হল? মূলত যা হল সেটা এইরকম। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বা জহর রায়ের যে শরীরী অভিব্যক্তি আমরা দেখতাম, তাতে সন্তোষ দত্ত তত পারঙ্গম ছিলেন না। কিন্তু তিনি সত্যজিতের একটি বিশেষ চাহিদা পূরণ করলেন, যে জন্য আমার মনে হয় তিনি পরিচালকের অভিনেতা। চাহিদাটি কী?
রহস্য রোমাঞ্চ গল্পে আমাদের লেখকরা তাঁদের অজ্ঞানতাজনিত বাগাড়ম্বর পরিস্ফূট করতে এমন সব ভুল তথ্য এবং বাঙালি জীবনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এমন সব মুহূর্ত আমদানি করতেন, যে সমস্ত জিনিসটাই অবিশ্বাস্য ও ভঙ্গুর হয়ে যেত। বলা বাহুল্য, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের বিমল ও কুমার থেকেই এই ঘরানা শুরু হয়েছে এবং নীহাররঞ্জন গুপ্ত হয়ে তা পরবর্তী গোয়েন্দা লেখকদের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। সত্যজিৎ এই ঘরানাটাকে নিয়েই ঠাট্টা করতে চাইছিলেন। জটায়ুর বইগুলোর নাম, যেমন সাহারায় শিহরণ, হন্ডুরাসের হাহাকার বা তাঁর জিজ্ঞাসা – উট কি কাঁটা বেছে খায়, দিয়ে সত্যজিৎ এক ধরনের reflexivity আমদানি করছিলেন। অর্থাৎ গোয়েন্দা কাহিনি লিখতে লিখতেই তিনি বাংলা গোয়েন্দা কাহিনির ঘরানাকে প্রশ্ন করছিলেন। সেই ঘরানায় সন্তোষ দত্ত এমন নিরপেক্ষ পরিসর যে তিনি চরিত্রের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারেন এবং আমরা তাঁর অমন নিষ্পাপ চরিত্র দেখে ভাবি – এমন তো হতেই পারে। আসলে এমন হতে পারে না। সন্তোষ দত্ত যখন তিন কন্যা (১৯৬১) ছবিতে মৃন্ময়ীর বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন, তখনো কিন্তু তাঁকে দেখলে মনে হয় একজন নতমুখ, সকলের প্রতি প্রসন্নতাপরায়ণ লাজুক বাঙালি। শ্রীমান পৃথ্বীরাজ (১৯৭২) ছবিতেও সবসময়েই তাঁকে মনে হয় অনুগত ভদ্রলোক। বস্তুত তিনি স্বাধীনতা-পূর্ব এমন ধরনের মধ্যবিত্ত যিনি সম্ভ্রম বজায় রেখেও আপাতভাবে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারেন।
আরো পড়ুন আয়নায় মধ্যবিত্ত: তপন সিংহ
বাঙালির এই আড়ালের উপস্থিতি সন্তোষ দত্তের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে। আমার মনে হয় সন্তোষ দত্ত আমাদের শিষ্টাচারের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে মেনে নিয়েছেন, অথচ একটু বুঝতে চেষ্টা করলেই দেখা যাবে যে প্রতিষ্ঠানের শূন্যতা এবং সন্তোষ দত্তের উপস্থিতি এক যুগল সম্মিলন। তিনি আমাদের শেষ বড় কমেডি অভিনেতা। তা ওগো বধূ সুন্দরী (১৯৮১) ছবিতে উত্তমকুমারের বিপরীতে থেকে অবাক করা খুশির ফোয়ারা ছড়িয়ে দিয়েছে। আপাতভাবে মনে হয়, তাঁর বাক্যগুলো আমাদের মাথায় আঘাত না করেই স্পর্শক হিসাবে বেরিয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে হাসতে হাসতে আমরা বুঝি যে সন্তোষ দত্ত একটা ঘরানাকে আঘাত করছেন। তিনি অনেকরকম অভিনয়ই করতে পারতেন, ঘটনাচক্রে সত্যজিতের সঙ্গে তাঁর সংযোগ বেশি। কিন্তু তরুণ মজুমদার বা অগ্রগামীর হেডমাস্টার (১৯৫৯) ছবিতেও তাঁর অভিনয় দেখলেই বোঝা যায়, তিনি নম্র জীবনযাপনের অন্য এক মুদ্রা। আরও প্রশংসনীয় হল, তাঁর অভিনয়ে অতিশয়োক্তি নেই। কিন্তু তিনি বাঙালির অতিরেককে নির্ভেজাল চেহারায় উপস্থিত করেন। কাজটা খুব সহজ নয়। উটের পিঠে বা একজন অপরাধীর মুখোমুখি দাঁড়ানোর সময়ে সন্তোষ দত্তের যে অভিব্যক্তি, যে হতবাক ভাব – তা তো কৈশোরের বিস্ময়। তা দিয়ে তিনি সত্যজিতের শেষদিকের ছবিগুলোতে নিজের হস্তাক্ষর রেখে গেছেন। ওগুলো সত্যজিতের ছবি ঠিকই, কিন্তু সন্তোষ দত্ত না থাকলে ওসব ছবি সত্যজিৎ করতে পারতেন না। যেমন তিনি কোনোদিনই পরশপাথর (১৯৫৮) করতে পারতেন না তুলসী চক্রবর্তী না থাকলে। হয়ত ছবি বিশ্বাস না থাকলেও জলসাঘর (১৯৫৮) হতে পারত, কিন্তু সন্তোষ দত্ত এমন একজন অভিনেতা যিনি খুব স্বল্পকালীন উপস্থিতিতেও সরল বাক্যের মত প্রমাণ করে দেন যে তিনি নির্বিকল্প। তা যেমন সত্যজিতের মহাপুরুষ (১৯৬৫) ছবিতে প্রফেসর ননীর বেলায় সত্যি, তেমনই তপন সিংহের হারমোনিয়াম (১৯৭৬) ছবিতে বিয়ের আয়োজন করতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া পিতার অভিনয়েও সত্যি।
এসব বাঙালির নিয়তিতে পঞ্চমীর চাঁদের মত শোভা পেত। তাঁর শতবর্ষে এটুকুই বলতে পারি।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








