সত্যি কথা বলতে কী, তপন সিংহকে আমরা বুঝতে পারিনি। বুঝতে হয়ত চাইনিও। তিনি চিরকালই বাঙালি কেরানি এবং তলার দিকের অফিসারদের গৃহসম্পদ ছিলেন। তাঁর ছবি লোকে দল বেঁধে দেখতে যেত, পারিবারিক আনন্দ হিসাবেই তাঁর যা কিছু অবস্থান। এখন এই মুহূর্তে বাঙালির হাতে নস্ট্যালজিয়া ছাড়া আর কোনো শিল্পোদ্যোগ নেই। সুতরাং তপনবাবু ফিরে আসছেন। একুশ শতকে এসে এখন যখন বাংলা ছবি একদিকে উচ্চবিত্তের সম্পর্ক-সমস্যা বা অন্য নানারকম অতিপ্রাকৃতিক গল্প, অন্যদিকে নিম্নবিত্তের প্রান্তিকতা; একদিকে স্থাণু লিরিক, অন্যদিকে লুম্পেন রেটোরিক ধরতে চাইছে তখন অসহায়ভাবে বলতে পারি, আমাদের সামাজিক আঙিনায় যেমন মধ্যবিত্তের সাফল্য ও ব্যর্থতার জন্যে, তেমন তপনের কাজের জন্যেও আলাদা একটি পরিসর চিহ্নিত হয়েছিল।

আজ মনে হয় আমাদের চলচ্চিত্রে পঞ্চাশের দশক আশীর্বাদের সঙ্গে কিছু অভিশাপও বয়ে এনেছিল। একদিকে যেমন সিনেমায় পৃথক এক ভাষা দেখার অভ্যাস তৈরি হচ্ছিল, চলচ্চিত্রকে নেহাত বিনোদনের বাইরে ‘আর্ট’ ভাবার প্রয়াস চলছিল, অন্যদিকে তেমন জনতার সান্নিধ্য বা জনপ্রিয়তাকে সন্দেহভাজন মনে হয়েছিল। রুচির নির্মাণ ও রুচির একদেশদর্শিতা মোটেই যুগপৎ অভিপ্রেত নয়। কিন্তু আমাদের শিল্পবোধ কোনোকালেই যুক্তি ও শৃঙ্খলার বশীভূত নয়। সুতরাং আমাদের সিনেমা বিশ্ব অনাবিষ্কৃত থেকে গেল অনেকটাই। প্রতিভার ঔজ্জ্বল্য আমাদের এত অভিভূত করল যে আমরা খেয়াল করলাম না, চাঁদ আসে একলাটি, নক্ষত্রেরা দল বেঁধে আসে। সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটক মননে উপনিবেশ গড়লেন, অন্য অনেককিছুই মনে হল গৌণ বা তুচ্ছ, অকিঞ্চিৎকর ও উপেক্ষণীয়। আসলে এই ধরনের নির্বাচনে শেষপর্যন্ত যা উপহসিত হয় তা ইতিহাস। এখন স্বচ্ছন্দেই বোঝা যায় যে সত্যজিৎ, ঋত্বিকের উপস্থিতি সত্ত্বেও বাংলার সিনেমার দর্শক তপন সিংহ, অজয় কর, তরুণ মজুমদার প্রমুখ কাহিনিকারের প্রতি অন্যরকম স্বাগত ভাষণ প্রস্তুত রেখেছিল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বাংলা ছবির ঐতিহ্য বিষয়ে যথেষ্ট ধারণা না থাকায় আমরা বুঝতেই পারিনি, পথের পাঁচালী (১৯৫৫) বা অপরাজিত (১৯৫৬)-তে ছোট্ট অপুর মুখে যখন প্রায় কোনো সংলাপই দেওয়া হয় না, তখন কাবুলিওয়ালা (১৯৫৭) ও অতিথি (১৯৬৫)-তে শিশুশিল্পীরাও সংলাপে অমন আশ্চর্য দক্ষতা কোথা থেকে পায়? আসলে তপন নিউ থিয়েটার্সের সন্তান। যে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও বাঙালিকে সিনেমা চিনিয়েছিল এবং সিনেমা বলতে গল্প, বা বই, বুঝিয়েছিল। তপন নিজের পথ করে নিয়েছিলেন হলিউডের জন ফোর্ড আর উইলিয়াম ওয়াইলারের মাঝখান দিয়ে। তপন বিশ্বাস করতেন যদি সিনেমা স্বয়ংশাসিত হয়ও, তবু তাকে গল্পের উপর নির্ভরশীল থেকে যেতে হবে আর প্রতিনিয়ত সেই গল্পকে বিচিত্র পথেই যেতে হবে। যে ওয়াইলার রোমান হলিডে (১৯৫৩)-র মত পেলব গীতিকবিতা লেখেন, তিনিই বেন হুর (১৯৫৯) ছবির ব্যাপ্ত পটভূমি মেলে ধরেন। যে ফোর্ড ওয়েস্টার্ন গোত্রের মরুপ্রান্তরে পাথরের এক্সট্রিম লং শটকে অমর করে রাখেন, তিনিই মৃত্তিকার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখেন হাউ গ্রীন ওয়াজ মাই ভ্যালি (১৯৪১)-তে। সুদূর বাংলায় গল্প বলার দেশে জন্মে, অন্তহীন গল্প শুনতে শুনতে, শরৎচন্দ্রের প্রত্যক্ষ ঐতিহ্যে নিজেকে শিক্ষিত করতে করতে তপনের মনে হল তাঁর কোনো অধিকারই নেই এই ধারা থেকে বিযুক্ত হওয়ার। আলো, শব্দ, ছবি দিয়ে বলে যেতে হবে নানারকম বিচিত্র স্বাদের কাহিনিমালা। আর সেই গল্প যতই বিদেশ থেকে আমদানি হোক, সুরে ও মেজাজে বাঙালির মনন সরণি ধরেই এগোবে। ফোর্ড যেভাবে আইরিশ খনি শ্রমিকের জ্যাজ শোনেন, তপন তার দ্বারা প্রভাবিত হন। কিন্তু হাঁসুলিবাঁক এপিক শ্রমের অন্যরকম আনন্দ পায়, যা হলিউডের নয়, বীরভূমের লালমাটিরও নয়। তবু তারাশঙ্কর বাঙালি মধ্যবিত্তকে যে গ্রামীণ লোককথা শোনান, তাকে ছবি ও শব্দে সাজিয়ে যথাসাধ্য রূপ দেন তপন। তিনি পরিচালক ডেভিড লীনের অসম্ভব ভক্ত। কিন্তু মর্মে মর্মে বিশ্বাস করেন, ব্রিফ এনকাউন্টার (১৯৪৫) তাঁর নয়। তাঁর জন্য ক্ষণিকের অতিথি (১৯৫৯)।

গল্প হলেও সত্যি (১৯৬৬) তপনের নিজেরই রচনা। বাংলা ছবি আখ্যান বিষয়ে এত সাহসী খুব কমই হয়েছে। তপন এই ছবিতে সমকালীনতাকে উচ্চকণ্ঠে স্বীকার করেন না এটা যেমন সত্য, তেমনভাবে এও সত্য যে বাস্তবের অলৌকিকতা এখানে তুলনারহিতভাবে পল্লবিত হয়ে ওঠে। এ ছবি বাঙালির ঘর সংসার বিষয়ে তপনের মন্তব্য। কিন্তু তার তিক্ততা ও নিষ্ক্রিয়তা বাদে। কী করে যে আমরা এমন অসামান্য ছবিকে কেবলমাত্র হাসির ছবি বলে ভুল করতে পারলাম! এই ছবির রবি ঘোষ – তিনি তো এক বিন্দু বিবেকের মত। তিনি দৈনন্দিন পাপ-পুণ্যের পরিসরের অন্তর্ভুক্ত নন। সমগ্র আখ্যানটিকে তপন কী অনায়াসে পৌঁছে দেন সাফল্যের মোহনায়! যাঁরা মনে করেন কাহিনি চলচ্চিত্র মানেই প্রণয়োপাখ্যান, তাঁরা সবিস্ময়ে উপলব্ধি করেন কীভাবে বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করা যায়। একথা ঠিক যে তাঁর নির্মাণে রণরক্ত সফলতা ছায়া বিস্তার করে না। সে ছবিতে কোথাও ভিয়েতনাম, ছাত্র আন্দোলন বা খাদ্য আন্দোলন নেই। কিন্তু সংসারের দৈনন্দিন তুচ্ছতা প্রায় ইতিহাসের মাত্রায় জ্বলজ্বল করতে থাকে। আখ্যানকেও তিনি টেনে নিয়েছেন প্রান্তিকতার পরিসরে আর ইচ্ছাপূরণের এই সাধনা সফলও হয়েছে। গল্প হলেও সত্যি আমাদের সিনেমার ঐতিহ্যে একটি বড় অববাহিকার, যেখানে আমরা বিনা প্রস্তুতিতেই পৌঁছে যাই আর দেখতে পাই পরিহাস ছলে ঝরে পড়ছে আমাদের উত্থান পতনের মুহূর্তসমূহ। এই ছবির রাঁধুনি রবি ঘোষ, তাঁর পূর্বসুরি পরশপাথর ছবির নির্বিকল্প কেরানি তুলসী চক্রবর্তী – এঁরাই বোধহয় বাঙালির গৃহদেবতা। গল্প হলেও সত্যি গল্প নয়, সত্য তো নয়ই। ছয় দশকের মাঝামাঝি আগুনের বিস্তারের মধ্যেও যে রূপকথা লেখা যায় তার আশ্চর্য প্রমাণ।

গল্প হলেও সত্যি ছবিতে রবি ঘোষ। ছবি ইউটিউব থেকে

কী অপরিসীম স্বাচ্ছন্দ্যে তিনি জীবনের বিষণ্ণতাকে উপেক্ষা করতে পারলেন নির্জন সৈকতে (১৯৬৩) নামে চিত্রমালায়। কাহিনি ও নির্মাণ পদ্ধতি করতলধৃত আমলকির মত আয়ত্ত থাকলেই এমন একটি আখ্যানকে, এমন অপরিচয়কে অবগুণ্ঠনমুক্ত করে দেওয়া যায়। সমুদ্রের বালুরাশি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘শব ছুঁয়ে থাকে চন্দ্রমল্লি; পৃথিবীর অমর বিধবা।’ চারজন শুভ্র বিধবার ঝিনুকের আড়ালে থাকা, হিম থেকে ফুটে ওঠা অবসরের গান হয়ে থেকে যাবে আমাদের ডায়রিতে।

আমরা ভুল ভেবেছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম যে সমকালের দিনপঞ্জি শিল্পীকে রচনা করতেই হবে। অথচ তপন তাঁর নিজের সময়কে গুরুত্বই দিলেন না। আমার মনে হয় তাঁর সঙ্গে ছোটগল্পকার প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের একটা মিল আছে। উত্তর-স্বাধীনতা পর্বের মধ্যবিত্ত জীবনের যে মালিন্য ও তিক্ততা, রিরংসা ও উত্তেজনা কবচকুণ্ডলের মত স্বাভাবিক তার কোনো সাক্ষ্য মেলে না প্রভাতবাবু বা তপনবাবুর বিষয়ভঙ্গিতে। কালপর্বের ব্যবধান সত্ত্বেও তপন নিজের সময়ের সঙ্গে করমর্দন করেন ১৯৬৮ সালের আপনজন ছবিতে। কিন্তু সংঘর্ষ, প্রতিহিংসার বদলে তাঁর চোখ নির্মলতায়। ধরন দেখে মনে হয় বলিরেখাগ্রস্ত ওই বৃদ্ধার মুখ, রাজনীতির থেকে, ক্ষমতার পদশব্দের থেকেও, মনুষ্যত্বের বয়স বেশি বলে জানে। তিনি সবিনয়ে এবং সদর্থে ঘোষণা করেন, রাজনীতি তাঁর নয়। এমনকি সাগিনা মাহাতো (১৯৭০) যে রাস্তায় হাঁটে তাও দক্ষিণপন্থা নয়, কেননা রাজনীতি এই চলচ্চিত্রশিল্পীর স্বভাবে নেই, সেই পথ একা হওয়ার পথ। বাঙালি আজকাল ‘মেসেজ’ ভালবাসে। বাণী না পেলে সে কোনো রাস্তায় হাঁটবে না। তাই ‘মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি’ – এই বাক্যটি তার বুকপকেটে আধার কার্ডের মতন সঞ্চিত আছে। কিন্তু তপনবাবু আতঙ্ক (১৯৮৬) ছবিটি মোটেই সামাজিক বিচারবুদ্ধিকে প্রশস্ত করার জন্য বানাননি। জনতার মুখরিত সখ্য তাঁর চলচ্চিত্রকে কোনোদিনই জড়িয়ে ধরেনি। তিনি এমন এক মেঘমুক্ত আকাশের আয়োজন করেন যে আমরা আধুনিকতার মর্ষকামী নীতিবোধ নিয়ে হঠাৎ এক সুরভিত আশাতীত অবকাশের আবহ খুঁজে পাই। সেদিক থেকে তিনি ঋত্বিকের বিপরীত। স্বাধীনতার ফাঁকি, মধ্যবিত্তের পরিত্রাণহীন পতন, কলকাতার ক্লেদ তাঁকে বিচলিত করলেও হতোদ্যম করে না। তিনি বিশ্বাসও করেন, মরণোন্মুখ মায়ের অন্তিম আশ্রয় ফিরিয়ে দেবে সমাজবিরোধী সন্তানদের আত্মদর্শনের অধিকার। তপন অত্যন্ত সরলভাবে বিশ্বাস করেন যে আমাদের পতিতালয় আবার সন্ধ্যা, সকালকে কোনোদিন সুরেলা হিসাবে দেখবে (হারমোনিয়াম, ১৯৭৬)। ইতিহাসের পরপারে চলে যেতে তপনবাবুর কোনো দ্বিধা নেই। তাঁর বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল প্রবাসে, তাঁর মায়ের হাতে – বাঙালি মধ্যবিত্তের তখন স্বর্ণযুগ। তাই আজও তাঁর হাসিকান্না বিরহ পদ্মপাতায় জলের মত ঝলমল করে ওঠে। সেখানে বাজারশোভন বামপন্থা বা বোদলেয়ারিয় নির্বেদের উপস্থিতি আশা করাই অন্যায়।

আরো পড়ুন আটপৌরে রুক্ষতা, সচেতন যৌনতা: সুপ্রিয়া চৌধুরী

কলকাতার ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন তাঁকে এড়িয়ে চলেছে। একদা ত্রুফো, গোদার, বার্গম্যানকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত আমরা তপনের দিকে ছুড়ে দিয়েছিলাম তাচ্ছিল্যের হাসি। এই যে জতুগৃহ (১৯৬৪) ছবিটিতে সামান্য চাকুরিজীবী সুপ্রিয় (অনিল চ্যাটার্জি), শতদলের (উত্তমকুমার) অনুগ্রহের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে, তা দেখে ভাবি, সেই মধ্যবিত্তের জীবন কোথায় গেল? তার আত্মবিশ্বাস কত প্রচ্ছন্ন থাকত! ছোটবেলায় বাড়ির সবার সঙ্গে নাইট শোতে বিজলী সিনেমাগৃহে নির্জন সৈকতে দেখে ফেরার সময়ে মনে হয়েছিল বৃষ্টিভেজা ট্রামলাইনের জলে যেন চাঁদ পড়ে আছে। ক্ষণিকের অতিথিতে নির্মলকুমারের দাঁড়িয়ে থাকার উত্তরে রুমা গুহঠাকুরতার মৃদু চলে যাওয়া – সন্ধ্যাদীপের প্রতীক্ষায় যেন একখানা ক্ষীণ দীর্ঘশ্বাস।

এইখানেই মধ্যবিত্তের অব্যক্ত আবেগ: তপন সিংহের জয়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.