কলকাতা, মিছিল আর মৃণাল সেন কোথাও এক। আজ যখন এ শহরেই দাঙ্গাবাজ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ডাকা মিছিল আটকানো হয়েছে খবর পাই, বা পাই মন্ত্রীদের নির্লজ্জ স্তুতির খবর – তখন বারবার তাই মৃণাল সেনের ম্যানিফেস্টো মনে পড়ে। মানুষের সোশাল মিডিয়ার সামগ্রিক প্রতিবাদ জানান দেয়, এখনো বেঁচে আছে কলকাতা, সবাই উদাসীন হয়ে যাননি। কারণ কলকাতা মৃণাল সেনের শহর।

তবে এটা ঠিকই একটা উদাসীনতা এসেছে আজ। দু দশক আগেও নাগাড়ে লুই মালকে নিয়ে কলকাতার মিছিল দেখাতে ছুটছেন তিনি। এই শহর, রাস্তাঘাট নিয়ে কত উত্তেজিত লোকটা! রেড রোডে তাঁর শুয়ে পড়া ছবিটা, তাঁর প্রয়াণের কবছর পর তাই মনে হয়, কলকাতার আত্মা। আমরা যারা শহরে হাঁটি, হাঁটতে ভালোবাসি, পুরোনো বই খুঁজে কিনি ফুটপাথ থেকে, কাফেতে আড্ডা জমাই কফির সাথে, তাঁদের কাছে মৃণাল সেনের এই ছবিটা আজ মনে হয় সত্যি আত্মারই মত। এই শহরেই আমরা বড় হয়েছিলাম, অথচ এই প্যাশন আজ খুঁজে পাই না কেন? আমাদের চেনা এই শহরে দাঙ্গা জাতীয় শব্দের সাথে মেলাতে পারি না আজ কিছুতেই, কিছুতেই পারি না এই কর্পোরেট ও আমলার চামচা-সংস্কৃতির মাঝে নিজেকে মানাতে। কোথায় গেল সেইসব প্রগতিশীল হাওয়ারা?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আজ শতবর্ষে কেন আমার মৃণাল সেনকে প্রয়োজন? এটা তো একটা পোস্ট-সিনেমা সময়। যে আইডেনটিটির জন্য যে কোনো বড় শিল্পীর মতই মৃণাল সেনও তাঁর লোকেল খুঁজে পেয়েছিলেন কলকাতায়, সে আইডেনটিটি আজ আদ্যন্ত ক্যানসেল কালচারে পরিণত। অর্থাৎ ঐতিহ্য আর ইতিহাস বলতে আজ যা কিছু, সবই মাল কামানোর ধান্দা। সেখানেই আমার মনে হয়, সততা, দায়বদ্ধতা, এনগেজমেন্ট শব্দগুলো ঝালানোর জন্যেই আজ তাঁকে বড় প্রয়োজন আমার, আমাদের। খুব বেশিদিন তিনি প্রয়াত হননি। তাই কিছুকাল আগেও যখন চলচ্চিত্র উৎসব আর লুম্পেন রাজ আর কর্পোরেট মিথ্যাচার মিলে জুলে এ শহরকে সাররিয়াল নিউ ইয়র্ক বানিয়ে ফেলছিল, অদূরের একটা ফ্ল্যাটে বসে সেসব দেখছিলেন তিনি। তিনি জানতেন, দেউলিয়া হয়ে যাব আমরা। আমাদের সন্ততিরা হয়ত তাঁর কমরেডদের মত তাঁকেও না চিনতে পারে। চিনতে নাও পারে তাঁর ফ্রেমের বস্তির কালো ধোঁয়া ও গলিগলতা। কারণ, তাদের ভাষা-শেকড়-শহরের ফ্যাব্রিক ঘেটে দেওয়া গেছে। আজ তাঁর প্রয়াণের কবছর পর ভেবে অবাক লাগে, কলকাতা – যে শহরকে তাঁর এল ডোরাডো মনে হয়েছিল, যে রাসবিহারী মোড়ে লিটল ম্যাগ খোঁজার জন্য দুনিয়ার কোনো শহরে যেতে চাননি তিনি, আজ সে শহরে তাঁর দেহাবশেষ রাখা গেল না…

পলিটিকালি কারেক্ট হয়ে শিল্প হয় না মৃণাল সেন জানতেন। তাই তাঁর ফ্রেমে ম্যানেকুইনকে ঢিল মেরে ভেঙে দেন রাগী যুবক। উগ্র নারীবাদীরা প্রশ্ন করতে ভয় পায়, মৃণাল “মিসোজিনিস্ট” কিনা! কারণ তিনি রাজনৈতিক। কারণ তাঁর দশক আগুনের। আর তাই আগুনের থেকে ফুলকি ছিটকে এলে, প্রিভিলেজড মধ্যবিত্তের শহুরে তত্ত্বে রক্ত ঝরে পড়ে। খলবল করে ওঠে শিল্প, সত্য, ম্যাজিক। সেই ম্যাজিক আজ কি আমাদের প্রভাবিত করে আর? আমরা তো জেনেই গেছি শিল্পী মানেই তার একটা বামপন্থার মুখোশ থাকবে আর ডানপন্থার সমস্ত সুযোগ নেবে। আমরা জেনে গেছি পরিবারতন্ত্রই জিতে যাবে, সে তুমি যতই প্রতিভাবান হও। বাবা তাঁর ছেলেকেই এগিয়ে দেবেন আর মা মেয়েকে এগিয়ে দেবেন। কোন যুবক আর আজ বড় অঙ্কের টাকার টোপ বা মাফিয়া-কর্পোরেট-মন্ত্রীদের কম্বো প্যাকেজ ছেড়ে মৃণাল সেনকে খুঁজবেন আমাদের রক্ত ও ঘামমাখা ট্রামলাইনে?

Mrinal-Sen-Cinema
মৃণাল সেনের সিনেমার পোস্টার – উইকিপিডিয়া থেকে

যখন তিনি প্রয়াত হন, তখন ভাল ছিলেন না। একটি চিরকুট পাওয়া যায় তাঁর প্র‍য়াণের পর, যাতে লেখা ছিল, “আমি ভালো নেই”। ব্যাস, এটুকুই। পদ্মপুকুরের নির্জন ফ্ল্যাটে তাঁর স্মৃতি ছাড়া সঙ্গীও কমে এসেছিল। একদা যাঁর বন্ধু ছিলেন গোদার ও মার্কেজ, যাঁর ঘরবাড়ি ছিল কান ও বার্লিন, যে শহরকে ভালবেসে তার রক্তের মধ্যে মিশে গিয়ে মধ্যবিত্তের ছাল ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন তিনি, তারা তাঁকে পরিত্যাগ করে। বলা ভাল সময় বদলায়। এই নতুন কলকাতায় বেমানান ছিলেন তিনি। যে রেড রোডে তিনি অনায়াসে শুয়ে শুট করতেন, যে সত্যজিৎ-ঘটককে তিনি কালো ফ্রেমের চশমা আর সাদা পাঞ্জাবিতে দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন, যে মধ্যবিত্তের গলি-উপগলি, গড়িয়াহাট-হাজরা-কাফে ও রাতে বাড়ি না ফেরা মেয়ে, বেলতলা ও ভবানীপুরকে তিনি হাতের তালুতে ধরতেন, তারা হঠাৎ সবাই ভ্যানিশ হয়ে যায়। পড়ে থাকেন একলা তিনি। যাকে আর এই নতুন শহরের তেমন দরকার ছিল না।

এক রাত বাড়ি না ফেরা মেয়ের জন্য পরিবারের দুশ্চিন্তা নিয়ে ছবি করতেন তিনি। সে ছবি চলত না। তা-ও তাঁর নায়কের নাম হত বিজন। এই বিজনকে নিয়ে সত্তর দশকে ফিরে ফিরে লেখা হত গান – বিজনের চায়ের কেবিন বা সন্দীপনের বিজনের রক্তমাংস। সন্দীপন লেখক হলেও ফিল্মমেকার মৃণালের বাড়িতে গিয়ে হানা দিতেন সকাল সকাল। তারপর তাঁর লিটল ম্যাগে এমন সংলাপ ছাপা হত যে গুলিয়ে যেত, কে লেখক আর কে ফিল্মমেকার। আসলে সময়টাই ছিল গোলানো। আজকের মত সবকিছু চিহ্নিত করা যেত না স্বচ্ছভাবে। তাই আজকের কলকাতা বলতে যুগপ্রজম্ম বোঝে সাইন্স সিটি মোড়, মৃণালের কলকাতা ছিল ভবানীপুর। স্টেটসম্যানের পাতায় সত্যজিতের সাথে জাম্প কাট নিয়ে তাঁর বিখ্যাত মেধাবী তর্কের কথা ভেবে আজও বাঙালি আশ্রয় খোঁজে সোনালি অতীতে, যতই অবনমনে চলি আমরা।

মালা, বেলা নামের মেয়েরা, দাশ বা বসন্ত কেবিনের যে আড্ডারা, লাল ফুটফুটে বিকেলের গান শেখার স্কুলের যে পাড়া, মিছিলের মাঝে চকিতে ক্যামেরা নিয়ে ঢুকে পড়ার যে দ্রোহ, খবরের কাগজ থেকে ছবির ফ্রেম পেড়ে আনার যে মুন্সিয়ানা; বাদল সরকার, বারীন সাহা, সন্দীপন, আইপিটিএ, বামপন্থা – এই সমস্তটা ছিল তাঁর জগৎ, যুবকরা ছিল তাঁর বন্ধু। সে কখনো অঞ্জন দত্ত তো কখনো মহীনের ঘোড়ারা, বা সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, অথবা অনন্য রায়। তরুণ লেখকদের সিগারেট কাউন্টার বাড়িয়ে দিতেন তিনি, রাস্তাই ছিল তাঁর মঞ্চ। আদ্যন্ত আন্তর্জাতিক অথচ কি সাধারণ, আদ্যন্ত প্রৌঢ় অথচ কি যুবক, আদ্যন্ত সাহেব অথচ কি বাঙালি ছিলেন তিনি! হয়ত তাঁর সময়টাই ছিল তেমন।

আজও যখন ক্যামেরায় বা স্মার্টফোনে বা ফেসবুক লাইভে ধরে রাখি যা কিছু রাস্তাঘাটের জরুরি গল্প, আমার বারেবারেই মৃণাল সেনকে মনে পড়ে। তিনি এমন এক যৌথ অবচেতন, যেখানে বারেবারেই এ শহরে আমি খুঁজে পাই আজও হিরণ মিত্র, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, গৌতম ঘোষ বা সুমন মুখোপাধ্যায়দের। তারপর দেখতে পাই মৌলালি মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাদল সরকার, মধ্যরাতে ধর্মতলায় বোতল ভাঙছেন মহীনের ঘোড়ারা। বারেবারেই মনে হয়, কখনোই তিনি সেলিব্রিটি হতে চাননি, বরং সিনেমা মাধ্যমকে ব্যবহার করে ডকুমেন্ট করতে চেয়েছিলেন অগ্রজ ঋত্বিক ঘটকের মতই, তাঁর উলঙ্গ নির্লজ্জ সময়কে। রাজনৈতিক ছিলেন তিনি। এ কথাটাই বারেবারে বলতে হবে। আজকের রাজনীতি। এই ‘আজকে’ আর ‘রাজনীতি’ শব্দ দুটো বড় বেশি জরুরি ছিল তাঁর কাছে। তাই আজ তাঁর ছবিকে ইনস্টলেশন বা মিক্সড মিডিয়ার কাছাকাছি মনে হয়। স্তুতির বদলে তর্ক করতে চেয়েছিলেন জাম্প কাটে, যে তর্কে স্মার্টনেস ছিল, পুজো বা স্তুতি ছিল না। আমরা ক্রমশ সে স্মার্টনেস থেকে সরে আসছিলাম তিনি জানতেন, তাই একদিন সমর সেনের মতই তিনি নিজেই অবসর নিলেন সিনেমা থেকে। তারপর ক্রমশ জিতে গেল মধ্যমেধা, তর্ক আর যুক্তিগুলো কেমন হারিয়ে গেল স্তুতিময়তার উল্লাসে। সেলিব্রেশনের মূর্খ বোকা কার্নিভালের কোরাসের নীচে, হাওয়ায়।

মৃণাল সেন অনেক অভিমান নিয়ে ভোরের দিকে এ শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাঁকে আর আমাদের তেমন দরকার ছিল না। আজ স্বীকার করে নেওয়া ভাল। বলা ভাল, এই পলিটিকালি কারেক্ট কলকাতায় জায়গা ছিল না মৃণাল সেনের। এ শহরে আর তেমন কোনো রেড রোড নেই যেখানে চাইলেই তিনি শুয়ে পড়ে ‘কাট’ বলবেন।

আমাদের পরিচালকরা আর রাস্তা হাঁটেন না।

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: গল্প ভেঙে সিনেমার ভাষায় ছবি তৈরি করার মানুষ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.