কবি দেবারতি মিত্র (১৯৪৬-২০২৪) নশ্বর দেহ পরিত্যাগ করলেন। পড়ে রইল তাঁর কবিতা। এখন অনেক রাত্রি। শীতের ছায়ায় শহরের মানুষ দীর্ঘ নিদ্রার দিকে চলে গেছে। আমার সামনে খোলা রয়েছে অন্ধ স্কুলে ঘন্টা বাজে। দেবারতি মিত্রর প্রথম ও প্রসিদ্ধ কাব্যগ্ৰন্থ, যা তিনি বয়সকালেও পরিমার্জনা করেছিলেন। এই কাব্যগ্ৰন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশ যুদ্ধের বছর। কিন্তু এই বইয়ে যুদ্ধ নেই, রাজনৈতিক চেতনা নেই, বিপ্লব নেই – এখানে রয়েছে বছর পঁচিশের তরুণীর চিত্ত থেকে উৎসারিত নতুন এক পথের নকশা। তাই আজ এত বছর পরেও তা আমাদের বিস্ময় জাগায়।
…গভীর জঙ্গলময় শুধু এই প্রপাতের ধারে
ফিঙে পাখি নেচে ওঠে উঁচুনিচু পাথরে পাথরে
শরীরে খেলছে ওই নতুন সতেজ শিরা যেন
পাথুরে মাটির বুকে পিয়াশাল গাছের শেকড়
আমাকে জড়িয়ে ধরে তুমি স্নানে ডুবে গিয়েছিলে
তারপর, বলো তারপর?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
‘পাহাড়ি স্নানের ঘর’
বিস্ময় জাগে না কি? এই লেখা কি ১৯৭১ সালের? মনে হয় এখনকার কেউ লিখছেন, এই প্রজন্মের কেউ। অথচ প্রায় ৪২ বছর আগে শব্দের মধ্যে দিয়ে কী আগ্নেয় ছবি এঁকে দিয়ে গেছেন দেবারতি মিত্র। এই বলিষ্ঠতা, এই অসামান্য ‘ইমেজ’-এর জন্ম দেওয়া তাঁর কবিতার দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই দুটি বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতা লেখার গোড়ার দিন থেকেই রয়েছে। কবিতা নিয়ে কী ভেবেছিলেন তিনি? কী খুঁজেছিলেন কবিতায়? তিনি লিখছেন ‘কবিতা কোনও চৌকো আকৃতির রত্নভর্তি সিন্দুক নয়, দিগন্তের দিকে ঢেউ খেলানো অদৃশ্য বাতাসকেই আমি খুঁজি যদিও জানি তার দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব –’। এই যে ঢেউ খেলানো অদৃশ্য বাতাসের কথা ভেবেছেন তিনি, এই ভাবনা তাঁর সারাজীবনের কবিতার সারাৎসার। তিনি কবিতায় বক্তব্যের দিকে নয়, হেঁটে যেতে চেয়েছেন অভিজ্ঞতাপ্রসূত ইশারাময় চিত্রের দিকে। তাই তো তাঁর কবিতার ভিতর দিয়ে একটা বাতাসের স্রোত খেলা করে যায়।
প্রেমের কবিতায় যেন তিনি সবচেয়ে মুক্ত, পাখির মতো উড়ছেন—
ফুলদানি ঐ তোমার শরীর
কাল কে অত ফুল সাজিয়েছিল
আমার বুকে পাপড়ি ঝরেছিল
বুকের মধ্যে পাপড়ি উড়েছিল
কাল সারারাত কেউ দেখেনি
কেউ বোঝেনি কেউ কি ভেবেছিল
আমার শরীর জড়িয়ে ফুলের যে গাছ উঠেছিল
ঘুরে ঘুরে পাগল স্রোতের মতন অবিরাম
কালকে তোমার সঙ্গে যখন রাত্রি জেগেছিলাম।
‘রাত্রি জেগেছিলাম’
অথবা
গভীর বৃষ্টিপাতের পরে এখন জেগে উঠেছি,
অঝোর পাগল বৃষ্টিপাত,
ছাদ ভাসিয়ে জল জমেছে।
ঝুঁকে আসা কচি ত্রিচূড় শাখার মতো তুমি
আদর নিচ্ছ বৃষ্টিপাতের।
‘বৃষ্টিতে আমি ও তুমি’
সত্তরের দশকের গোড়ায় যখন পঞ্চাশের দশকের অগ্ৰজ পুরুষ কবিদের কাব্যভাষা মোটামুটি সুপ্রতিষ্ঠিত, ঠিক সেই সময়ে শরীর, নারীত্ব, প্রেম, আর্তি নিয়ে দেবারতির এত স্পষ্টতা ও বলিষ্ঠতা আমাদের আজও অবাক করে। একটি কবিতার নাম তিনি রাখছেন ‘তরুণী পিয়ানো আর কিশোর’। তার প্রথম লাইন –
ওই কিশোরকে ডেকে আমি সুর জেনে নেব
এই সব নতুন গানের।
আশ্চর্য পংক্তি। একজন তরুণী আকৃষ্ট হচ্ছেন একজন কিশোরের প্রতি। বয়সে ছোট। তবু সে টান অনুভব করে। তবুও তার পুলক জাগে –
… ছটফটে অবুঝ কিশোর
আমাকে জড়িয়ে ধরে বৃষ্টিতে ভিজবে বলে নাচে
কেন পাগলামি করে হাত ধরে টানে এত জোর!
‘তরুণী পিয়ানো আর কিশোর’
আরো পড়ুন রাজা সুরমানের উপাখ্যান
দেবারতির কবিতার একটি প্রধান সুর হল কল্পনার। তিনি কল্পনার ভিতর দিয়ে অপার মুক্তির সন্ধান করেন। তিনি লিখছেন, “কবিতা নিয়ে আমি কিছু করতে পারি না, করতে চাই না, শুধু পৌঁছতে চাই সেই সমুদ্রের কিনারায় যার একদিকে জীবন ও শিল্প অন্যদিকে শূন্যতা যেখানে কল্পনা মুহুর্মুহু অবিরাম নিজেকে সৃষ্টি করে চলে।” এই সমুদ্রের অগাধ ব্যাপ্তির দিকে চলে গেছে তাঁর মন, রবীন্দ্রনাথের সাহচর্যে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে পড়তে কখন
নিজের অজ্ঞাতসারে চলতে আরম্ভ করে দিই
জানলাবন্ধ ঘরের দেয়ালের বাইরে চলে যাই
বুঝতে পারি না।
আবিষ্ট দুপুর সন্ধ্যাবেলাকার নিস্তব্ধ হ্রদের মতো
বিশাল শান্ত নদীর ধারে আপ্লুত বাতাস
এলোমেলো বকুল শিউলি চাঁপা
বসন্তকালের গাছপালার সতেজ গন্ধ।
‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে পড়তে’
শহরে নেমেছে মধ্যরাত। ক্রমশ নীরব নিস্তব্ধ পৃথিবীতে ঝরছে কবিতার শব্দ। আমি দেবারতির অন্ধ স্কুলে ঘন্টা বাজে কাব্যগ্ৰন্থটি পড়ছি আর অনুভব করছি আজ থেকে চার দশক আগে লেখা কবিতার অদম্য প্রাণশক্তি, তার অন্তর্নিহিত আবেগ ও অপরূপ প্রকাশভঙ্গি –
সমস্ত জীবন যদি জ্যোৎস্নায় একা থাকা যায়
যেখানে কেবল সুর কোনও আলো নেই –
সোনার চুলের গোছা যেন খুলে গেল হু হু করে
বিরল জানালা দৃষ্টি ঢেকে অন্ধকার
রাশি রাশি সুরেলা যন্ত্রের সরু তার
তেমন জ্যোৎস্না নয় আমার শরীরে।
‘তোমার জ্যোৎস্না সুর’
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








