অবিন চক্রবর্তী
এ মাসের গোড়ায় ছিল শঙ্খ ঘোষের জন্মদিন। স্বাভাবিকভাবেই অনেকে সশ্রদ্ধ স্মৃতিচারণ করেছেন। ক্রমিক অবক্ষয়ের ধূলিপথে দাঁড়িয়ে ওঁর মত একজন অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ আমাদের সংস্কৃতির জগতের একদা প্রসিদ্ধ রত্নাগারের শূন্যপ্রায় প্রকোষ্ঠগুলির দীনতা আরও বেশি প্রকট করে তুলেছে – একথা অনস্বীকার্য। মনীষা, পাণ্ডিত্য, সংবেদনশীলতা, বিনয়, নির্ভীক সত্যসাধনার এহেন সংমিশ্রণ আমাদের মধ্যে বিরল। কালের নিয়মে নানা যুগে এমন কিছু ক্রান্তদর্শী মানুষ আসেন। যাদের রেখে যান, তাদের দায় থাকে ওই অস্তমিত সূর্যের যাবতীয় ঔজ্জ্বল্য আত্মস্থ করার, সংরক্ষণ করার, সম্প্রসারণ করার। দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই ঐতিহ্যের স্বনিযুক্ত ধারক, বাহকদের অনেকের অবস্থাই সেইসব বামনের মত, যারা ভুল করে কোনো শালপ্রাংশু মহাভুজ রথীর উষ্ণীষ পরিধানের চেষ্টা করে। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ভাষায় ‘like a giant’s robe upon a dwarfish thief’। ধর্মীয় জিঘাংসা ও রাজনৈতিক দুর্নীতির কুৎসিত পঙ্কিলতার মাঝে দাঁড়িয়ে যিনি বারবার নিরাভরণ সত্যের শস্ত্রে ছিন্ন করেছেন ভণ্ডামি ও বর্বরতার সব শৃঙ্খল, তাঁর সেই অনায়াস সাহসের বিশ্লেষণেও স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয় না বর্তমান শাসককুলের একজনও অপরাধীর নাম, কোথাও উঠে আসে না দশরথপুত্রের নামে বেজে চলা ঘৃণা ও দুরভিসন্ধির দামামা। অথবা সেইসব শহিদের নাম, যাঁদের বিশ্বাসের সঙ্গে বারবার অনুরণিত হয়েছে শঙ্খ ঘোষের কবিতা বা গদ্যের নির্ভান উচ্চারণ। পরিবর্তে তাঁরা তুলে ধরেন সাতের দশকে লেখা এমন কিছু কবিতার কথা, যার প্রেক্ষাপটবিহীন ছত্রগুলি লেখককে এনে দেয় এক অরাজনৈতিক নিরপেক্ষতার মুখোশ – এমন এক মুখোশ যা বরাবর বর্জন করেছেন শঙ্খ ঘোষ নিজে। তাঁরা টেনে আনেন তিমিরবরণ সিংহের হত্যার প্রসঙ্গ ও সেই সংক্রান্ত কবিতা
ময়দান ভারি হয়ে নামে কুয়াশায়
দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ
তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই
তোমার ছিন্ন শির, তিমির।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আসলে প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় অতিক্রম করে নকশাল আন্দোলনের প্রায় নিভন্ত ইতিহাস কোনো শাসকের মনে প্রতিস্পর্ধার সামান্য আশঙ্কাও জাগায় না। তাই ওইসব ঘটনা এবং সেই প্রসঙ্গে রচিত কবিতা নিয়ে আসে বিবেকী মুখোশ ও নিরাপদ সুরক্ষিত পাণ্ডিত্যের যুগ্ম উপহার।
তাই তাঁরা উচ্চারণ করেন না নন্দীগ্রাম পরবর্তী সময়ে লিখিত ‘স – বিনয় নিবেদন’ কবিতাটি, যেখানে তৎকালীন বাম নেতৃত্বের প্রতিবাদ দমনের আগ্রাসী মনোভাবকে ধিক্কার জানিয়ে কবি লেখেন
আমি তো আমার শপথ রেখেছি
অক্ষরে অক্ষরে
যারা প্রতিবাদী তাদের জীবন
দিয়েছি নরক করে।
(মাটি খোঁড়া পুরোনো করোটি)
একইভাবে কয়েকবছর আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনকেন্দ্রিক সন্ত্রাসের প্রসঙ্গে অনুব্রত মণ্ডলের উদ্ধত আস্ফালন নিয়ে লিখেছিলেন
দেখ্ খুলে তোর তিন নয়ন
রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে
দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন।
আরও আগে, গুজরাট গণহত্যার বীভৎসতার নিরিখে আতঙ্ক ও যন্ত্রণার বিহ্বলতা প্রকাশ করতে গিয়ে লিখেছিলেন
যেদিন নদীর জলে ভেসেছিল দু-হাজার শব
যেদিন পাড়ার সব দুয়োরে কুলুপ আঁটা ছিল
যেদিন শহরজোড়া গাছে গাছে ঝোলা কাটা হাত
অসাড় ইশারাভরে ডেকেছিল হৃৎপিণ্ডগুলি
যেদিন মাটির থেকে উঠেছিল শুধু কচি হাড়
বুভুক্ষু সমস্ত মুখ ভরে দিয়েছিল হুতাশনে
রাজপথে ছুটেছিল যেদিন উলঙ্গ নারীদল
এবং স্তনের শীর্ষে গাঁথা ছিল হাজার ত্রিশূল
যেদিন কবন্ধগুলি মদভাণ্ড রেখে ডানপাশে
নিজেরই মুণ্ডের চোখ খুঁজেছিল টেবিলের নীচে
যেদিন পৃথিবী তার সম্বিৎ হারিয়ে ছিল চুপ।
(যেদিন, জলই পাষাণ হয়ে আছে)
আজ এই ছত্রগুলি কি লিখতে পারতেন কবি? ত্রিশূল শব্দের ব্যবহার নিয়ে কেউ কি আইনি অভিযোগ জানাত?
এই জমে ওঠা নারকীয় পাশবিকতার উল্লাসকে ভর্ৎসনা করেই তিনি মুসোলিনি সম্পর্কিত রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক ভুল ধারণাকে আশ্রয় করে লিখেছিলেন ‘ইতালিতে কবি’ – একটি কবিতা যা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদে আক্রান্ত রাষ্ট্রের বাস্তব উন্মোচনের পাশাপাশি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় শিল্পী, বুদ্ধিজীবীদের নৈতিক কর্তব্য
তাঁকে তো বোঝাতে হবে এ এমন সময় বাঁচার
যখন নেতারা চলে প্রকাশ্যেই হামা দিয়ে লুম্পেনের তর্জনীসংকেতে
এ এমন সময়, যখন
শুধুই চিৎকারশব্দে যে-কোনও আকাট মিথ্যে সুঘোষিত সত্য হয়ে ওঠে
এ এমন সময়, যখন
আইনের শাসনহীন গোটা দেশে একনায়কের ইচ্ছা একমাত্র আইন
এ এমন সময়, যখন
এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় নিরপরাধের মাংসে ঘাতকেরা নিত্য করে হোম –
এক দশকেরও আগে লেখা ‘গোয়েবেলস’ নামের এক অসামান্য কবিতা সময়ের পরিখা অতিক্রম করে করোনাপীড়িত দেশে থালা বাজিয়ে অতিমারী দূরীকরণের একনায়কীয় পরিহাসের মুখে সপাটে আছড়ে পড়ে বলে
তুমি যা বলাও তা-ই হয়ে ওঠে জনকলরব
বেজে ওঠে ঢাকঢোল, ঘরে ঘরে বাজে ঝুমঝুমি –
বিকারবিহীন আমি সহজেই মেনে নিই সব
ঘটে যা তা সত্য নয়, সেই সত্য যা রচিবে তুমি
(মাটিখোঁড়া পুরোনো করোটি)
পরিবর্তন ও সুদিনের ক্রমশ অপসৃয়মান ঘোষণার ঘনঘটার মধ্যে দাঁড়িয়ে মস্তিষ্ক বন্ধক রেখে নিজেদের কবর খননের প্রবণতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কবি লেখেন
আমি তখন হাঁটতে থাকি, হেঁটেই যাই, সঙ্গে জোটে যাত্রী আরো অনেক –
তারাও সবাই প্রশ্ন করে: কেমন বদল?
জানে, জানে। সে জানে সব। ভরসা রেখে সামনে এগোই, চলো
সবার চোখে ঠুলি পরাই, আর
সর্বনাশের এপার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মুগ্ধ চোখে দেখতে থাকি ওপার।
কবি আমাদের এই রাজনৈতিক আত্মহননের ধারাবাহিক অভ্যাসের ব্যবচ্ছেদ করেই লেখেন
ছিলে নিছক বেড়াল, আমিই বাঘ বানালাম তাকে
নিজের হাতেই খল কেটে পথ দিলাম কুমিরটাকে।
এখন ওরা সেই আমাকেই কামড়ে খেতে চায়
আটকাতে চাই যদি ওদের যে কোন অন্যায়।
পেতেছিলাম ফাঁদ, পড়েছি উল্টোরকম ফাঁদে
বুঝতে পারবে সবাই সেটা আর কবছর বাদে।
পরিত্রাণের ছলনায় ভুলে আমরা কি এভাবেই বারবার জাগিয়ে তুলি না নতুন কোনো বিভীষিকার রাজ? ২০১৪ সালে সুদিনের আশা করা অনেকেই পরে প্রত্যক্ষ করেছে দেশজুড়ে জাঁকিয়ে বসা এক নির্মম, সুকৌশলী একনায়কতান্ত্রিক আগ্রাসন, যার বার্তা, আবার সেই গোয়েবেলসের অনুষঙ্গ টেনে, আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন শঙ্খ ঘোষ
একমাত্র লক্ষ্য হল অলীক আশ্বাস আর আশা
পরিসংখ্যানের ভারে যে কোন মোহন প্রতিশ্রুতি
যে কোনো আহুতি
উঁচু থেকে আরো আরো উঁচু কোন খরতর স্বরে
কেবলই জাগাতে হবে ভয়
সহজে বোঝাতে হবে প্রতিবাদীমাত্রে শুধু ষড়যন্ত্রী, আর
প্রতিরোধকারী আক্রমণকারী –
হাত পা হবে হিম
নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে সংবাদমাধ্যম সব, শিল্পের মাধ্যম যতকিছু
প্রেস বা রেডিও কিংবা ফিল্ম।
(‘গোয়েবলস ১৯৩৩’, শুনি শুধু নীরব চিৎকার)
হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি এবং আই টি সেল সমর্থিত বর্তমান ফ্যাসিবাদী শাসনের করাল আবর্তে দাঁড়িয়ে এই ছত্রগুলি মনে হয় যেন জাগ্রত বিবেকের গণতান্ত্রিক বজ্রনির্ঘোষ, যা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আমাদের সাম্প্রতিক বিপন্নতার পরিবেশকে স্পষ্ট করে তোলে। ‘সুদিন’ নামক আরেক ব্যঙ্গাত্মক কবিতায় দেশ ও রাজ্যের নানা স্তরে ব্যাপ্ত হিংসাত্মক দলীয় আগ্রাসনকে একসূত্রে বেঁধে প্রশাসনিক প্রশয়ে বেড়ে ওঠা দুষ্টু বা দামাল বা তাজা ছেলেদের জঘন্য দৌরাত্ম্যকে বিদ্ধ করেন কবি
আজও নাকি মাথা তুলে হাঁটতে চায় কিছুবা বেল্লিক
এখনও সংবাদ দিতে চায় সাংবাদিক!
সেখানে সার্থক আজ আমার সমর্থ আর দৃপ্ত দামালেরা
তাদেরই সবল হাতে আমার এ রাজ্যপাটে সব কিছু ঘেরা!
ভাতা ও পুরস্কারের মায়াজালে আড়ষ্ট সমাজকে সুকঠোর দংশন করে তাঁর বক্তা জানান দেয়
উচ্চশির সংবর্ধনা পাবে সব, সঙ্গে কিছু ডোল
সুদিন এসেছে ফিরে নাগিনীরা দিকে দিকে খোল দ্বার খোল!
ব্যাপক দুর্নীতি ও নিয়মিত হিংসার পাশাপাশি ট্র্যাফিক সিগনালে রবীন্দ্রসঙ্গীত ধ্বনিত হওয়ার যুগে, প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থে লিখিত রবীন্দ্রনাথেরই সাবধানবাণী মনে রেখে তীব্র শ্লেষের সঙ্গে কবি আমাদের মনে করিয়ে দেন ট্র্যাজেডি ও প্রহসনের সংমিশ্রণে নির্মিত আমাদের আজকের দুর্দশার কথা।
আরো পড়ুন কবি ও কাঙাল শক্তি: উত্তরাধিকার ইন্দ্রনাথে
শঙ্খ ঘোষের কবিজীবনের যে কোনো মনোযোগী পাঠক জানবেন যে এরকম আরও সহস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। লাশ নিয়ে দলাদলি, চরম দারিদ্র্য, নারীঘাতী নানাবিধ ঘৃণ্য অপরাধ, নির্বিচার বৃক্ষচ্ছেদ – এমন বিবিধ সামাজিক, রাজনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে বারবার সশব্দে রুখে দাঁড়িয়েছে শঙ্খ ঘোষের কবিতা। নৈঃশব্দ্য, অন্তর্মুখীনতা ও নির্জনতা যদি তাঁর কাব্যজগতের এক মেরু হয়, তবে অন্য মেরুতে আছে আমাদের সার্বিক কৌমজীবনের প্রতিটি স্খলন সম্পর্কে সচেতন এক অমোঘ কালজয়ী স্বর যা সংবেদনশীল পাঠকের কাছে হয়ে উঠতে পারে শুদ্ধতার পরশপাথর। এই শঙ্খ ঘোষকে যাঁরা শুধু নীরবতার তর্জনী হিসাবে তর্জমা করেন, তাঁরা আসলে নিজেদের কাপুরুষতা ও সুবিধাবাদী আচরণকে এক নান্দনিক অতীন্দ্রিয়বাদে লুকিয়ে ফেলতেই উৎসাহী।
আলজেরিয়া ও ভিয়েতনামে ফরাসী উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম বা ইউরোপব্যাপী আণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দাঁড়িয়ে স্যামুয়েল বেকেটের নাটকের চরিত্রগুলি যেমন আত্মমগ্ন অসারতায় অস্থির হয়ে থাকে, এঁরাও সেভাবে সকল নিশ্চিত ও অনস্বীকার্য কার্যকারণ উপেক্ষা করে বিমূর্ত ভাবের দুনিয়ায় চু কিত কিত খেলতে থাকেন। অবশ্য আজ উপাচার্য, কাল এমেরিটাস, পরশু কোনো সরকারি কমিটির পরম সম্মানীয় প্রধান হওয়ার বাসনায় লালায়িত যাঁরা, তাঁদের এমন আচরণ আশ্চর্যের নয়। সুললিত তৎসম ভাষা অন্তরের ভিখিরিপনাকে কতই বা লুকোবে? শঙ্খ ঘোষের চেতনার রক্ত এঁদের শিরায় নেই। শঙ্খ ঘোষ কোন ক্লীবতার শিখণ্ডী নন। বিবেকের শীতঘুমে অভ্যস্ত ক্রীড়নকদের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি বারবার বলে গেছেন ‘জেগে থাকাও, জেগে থাকাও একটা ধর্ম’ (‘বুড়ো’)। তিনি পাঞ্চজন্য। আমরা কি অর্জুন হব?
লেখক চন্দননগর কলেজে ইংরিজির অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








