অভিনব বসু

একটি ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত গল্প দিয়ে শুরু করি। জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, যিনি গানের জগতে জ্ঞান গোঁসাই নামেই পরিচিত, তিনি একদিন মুড়ির ঠোঙায় একটি গান আবিষ্কার করলেন। সে গান কার লেখা বা সুর করা সেসব কিছুই ওই ছেঁড়া কাগজের টুকরোতে লেখা নেই। কাগজের উপরে তিনি দেখলেন লেখা আছে – রাগ ছায়ানট। রাগটি জ্ঞান গোঁসাইয়ের অজানা ছিল না। গানের কথাও তাঁর বড় ভাল লাগল। গানটি তিনি রেকর্ড করে ফেললেন। আর সেখানেই ঘটল বিপদ। কিছুদিনের মধ্যেই শান্তিনিকেতন থেকে আসা এক লম্বা পত্রবাণে জ্ঞান গোঁসাই বুঝলেন গানটি রবীন্দ্রনাথের লেখা। তিনি যে রেকর্ড প্রকাশ করেছিলেন তার জন্যে অনুমতি তো নেননি বটেই; উপরন্তু তাল, বোলতান সহযোগে নিজের মত করে গেয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের মোটেই তাঁর গানের উপর কোদাল চালানো ভালো লাগেনি। তাঁর নির্দেশে সে রেকর্ড বাজার থেকে তুলে নিতে হল। মনঃক্ষুণ্ণ জ্ঞান গোঁসাই নজরুলকে অনুরোধ করলেন ছায়ানটের উপরে একটি গান বেঁধে দিতে। তখন ১৯৩৪ সাল। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর চার বছর পরেও নজরুল তার শোকে একের পর এক গান, কবিতা লিখে চলেছেন। সেখান থেকে একটি গান তিনি দিলেন জ্ঞান গোঁসাইকে। সে গান রেকর্ড হল ১৯৪০ সালে। গানটি ছিল “শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়, ফিরে আয়।” রবীন্দ্রনাথের সেই বিতর্কিত গানটি ছিল, “অল্প লইয়া থাকি তাই, মোর যাহা যায়, তাহা যায়।”

প্রচলিত গল্প বললাম কারণ গোলাম মুরশিদ ছাড়া আর কারোর লেখায় এই ঘটনার উল্লেখ পাইনি। এদিকে মূল রবীন্দ্রসংগীতটির রচনাকাল ১৯০১। তেত্রিশ বছরে জ্ঞান গোঁসাই বা রেকর্ড কোম্পানি সে গান শোনেনি এমনটি হওয়া বড়ই আশ্চর্যের। বহু প্রসিদ্ধ মানুষকে নিয়েই এরকম কিছু গল্প প্রচলিত আছে। নজরুলকে নিয়ে এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ আমরা কবি জসীমুদ্দিনের লেখাতেও পাই, যার ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে পরে গোলাম মুরশিদ প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে আশা করি আমার উল্লিখিত গল্পটি তিনি তাঁর নিরীক্ষণ যন্ত্রে ছেঁকেই নিয়েছেন। তবে প্রচলিত গল্প নিয়ে গবেষণা করার জন্য এর উল্লেখ করিনি। প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী যে ধারা তখন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল, এ তারই উদাহরণ মাত্র। আমি গায়ক বা শিল্পী নই, একজন শ্রোতা মাত্র। তাই আমার এ লেখা নজরুলগীতির রাগ, সুর বা তার বিশুদ্ধতা নিয়ে নয়। আমি এখানে নজরুলগীতির বিভিন্ন দিক ও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বল্প কথায় তুলে ধরতে চেষ্টা করছি মাত্র।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬) পশ্চিমবাংলার বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী পরিবারে নজরুলের জন্ম। এই পরিবার বিহার থেকে বাংলায় বসবাস করতে আসে। তাঁর পিতা মসজিদের ইমাম ছিলেন। অনেক ভাইবোনের মধ্যে নজরুল অন্যতম। দারিদ্রের মধ্যে জন্ম তাই তাঁর নাম রাখা হয় দুখু মিয়াঁ। তাঁর জন্মের সময়ে উঠেছিল কালবৈশাখী ঝড়। পরবর্তীকালে ‘চির-নির্ভর’ কবিতায় সে বৃত্তান্ত কবি লিখে গেছেন

অবিশ্বাসীরা শোন শোন সবে জন্মকাহিনী মোর
আমার জন্মক্ষণে উঠেছিল ঝঞ্ঝা-তুফান ঘোর।
উড়ে গিয়েছিল ঘরের ছাদ ও ভেঙ্গেছিল গৃহদ্বার।
ইস্রাফিলের বজ্র-বিষাণ বেজেছিল বারবার।

নজরুল গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা শুরু করেন, কিন্তু আট বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পরে সংসার প্রতিপালনের জন্য মাজারে খাদেমের কাজ ও মোল্লাগিরি করতে বাধ্য হন। একই সময়ে তিনি ওই অঞ্চলের লেটোর দলে (ভ্রাম্যমান লোকগানের দল) যোগদান করেন। ওই দলের জন্য নাটক ও গান রচনা করতে গিয়ে নজরুল হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী ও বাংলার লোকসংস্কৃতির সাথে পরিচিত হন। আট-ন বছর বয়স থেকে নজরুল লেটো দলের সাথে যুক্ত হন আর ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই দলের জন্য গান রচনা শুরু করেন। সুকুমার সেন লিখেছেন “লেটো (বা নেটো) অর্থাৎ নাটুয়া বৃত্তি, নাট্যকর্ম। ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত লেটো সর্বসাধারণ্যে প্রচলিত ছিল। তারপর হিন্দু গুণীজনের নজর পড়ে যায় কীর্তনগানে, পাঁচালিতে, কথকতায়, যাত্রায়। তাই এই সুপ্রাচীন ধারাটি মুসলমানদের মধ্যেই তলানি রূপে রয়ে যায়। তবে লেটোর রসাস্বাদ হিন্দু-মুসলমান সমানভাবে করত।”

লেটো দলের সাথে নজরুল যে পালাগানগুলো রচনা করেন তার মধ্যে, বানর রাজকুমারের সং, রাজা হরিশ্চন্দ্র, সিন্ধু বধ, মেঘনাদ বধ, কুশ ও লব, কংস বধ, দেবযানী-শর্মিষ্ঠা, দাতা কর্ণ উল্লেখযোগ্য। পৌরাণিক ছাড়াও লেটো দলের জন্য নজরুল ব্যঙ্গাত্মক, ইসলামি, ডুয়েট, সামাজিক পালাও রচনা করেন। এইসব গানই সেই সময়ে ‘দুখুমিয়ার লেটোগান’ নামে জনপ্রিয় ছিল।

লেটোগান: ১ (মেঘনাদ বধ)

                নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করি আসিয়াছি রণে।
সম্মুখে দেখিতে পাই শ্রীরাম লক্ষ্ণণে।।
সুগ্রীবে দেখি ওই বানরের দল।
লঙ্কার কলঙ্কে দেখি বিভীষণ খল।।
হে মোর রক্ষ সেনা, হও আগুয়ান।
ধরিয়ে বানর গণে বধহ পরাণ
আমি চলি দক্ষিণ দুয়ারে।

লেটোগান: ২ (স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া)

                মন দুঃখের কথা মোড়ল, আমি বলবি কী তোমার কাছে।।
আমি না পাই খেতে, না পাই শুতে, না পাই মাথায় তেল দিতে।।
অন্ন বিনে অনাহারে, বেড়াই লোকের দ্বারে দ্বারে,
এ কথা বলব বা কারে,
থাকতে পতি, এ দুর্গতি, ভাগ্যেতে মোর কী আছে।।
নজরুল এসলামে বলে,
আজিকে এ সভাস্থলে,
ঘরের দুঃখ বলতে এলে, দুঃখের কী আর শেষ আছে।।

বারো-তেরো বছর বয়সেই নজরুলকে মিশ্র ভাষায় গান বাঁধতে দেখা যায়

                মেরা দিল বেতাব কিয়া তেরি আব্রু-য়ে কামান,
জ্বলা যাতা হ্যায় ইশ্‌ক-মে জান পেরেশান।
হেরে তোমায় ধনি
চন্দ্র কলঙ্কিনী
মরি কি সে বদনের শোভা, মাতোয়ারা প্রাণ,
বুলবুল করতে এসেছে তাই মধুপান।।

হাবিলদার নজরুল ইসলাম

“আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি। সে আজ ১৯১৭ সালের কথা।” (রুবাইয়াত-ই-হাফিজ, কাজী নজরুল ইসলাম)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে প্রায়শই বিভিন্ন দেওয়ালে সৈন্যদলে যোগদান করার বিজ্ঞাপন দেখা যেত। এই রকম একটি বিজ্ঞাপন দেখেই নজরুল সৈন্যদলে যোগদান করার জন্য মনস্থির করেন। নজরুল তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। ফৌজে নজরুলের স্থান হয় ৪৯নং বাঙালি পল্টনে। নজরুল যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না, তবে করাচী ও নৌশেরায় থাকাকালীন এক পাঞ্জাবী মৌলবী রেখে তিনি ফারসী ভাষার চর্চা শুরু করেন। শুধু ভাষাচর্চাই নয়, সেই সময়ের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত ফারসী কাব্যই তিনি পড়ে শেষ করে ফেলেন।

পল্টনে নজরুলের সর্বশেষ পদোন্নতি হয়েছিল কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত। এ ছিল আদতে স্টোরকিপারের কাজ। নজরুল যখন ফিরে এসে কবি জীবন শুরু করেন তখন মোসলেম ভারত পত্রিকায় তাঁকে ‘হাবিলদার নজরুল ইসলাম’ নাম ব্যবহার করতে দেখা যায়।

নজরুলের গানে, কবিতায় মধ্যপ্রাচ্যের ভাষা শুধু নয়, সুরের প্রভাবও লক্ষণীয়। কিছু গানে জিপসি সুরের খেলা গানগুলিতে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে।

আরবি সুরে

                শুকনো পাতার নূপুর পায়ে নাচিছে ঘূর্ণি বায়
জলতরঙ্গে ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি ঢেউ তুলে সে যায়।

মিশরীয় সুরে

                মোমের পুতুল মমির দেশের মেয়ে নেচে যায়।
বিহ্বল চঞ্চল পায়।

মুরিশ সুর (একাদশ শতকের উত্তর আফ্রিকান মুসলিম শিল্পকলা)

                রুম ঝম ঝুম ঝুম রুম ঝুম ঝুম
খেজুর পাতার নুপুর বাজায়।

কিউবান সুর

                দূর দ্বীপ-বাসিনী, চিনি তোমারে চিনি।
দারুচিনির দেশে তুমি বিদেশিনী গো, সুমন্দ ভাষিণী।।

নজরুল ইসলামকে বাংলা গজল গানের জনক বলা চলে। দিলীপকুমার রায়, আঙ্গুরবালা দেবী, ইন্দুবালা দেবী, কমলা ঝরিয়ার কণ্ঠে গীত নজরুলের গজল শ্রোতামহলে সমাদৃত হয়। পরবর্তীকালে মহম্মদ রফির কণ্ঠে কিছু গান নতুন করে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ধুমকেতু, জেল

১৯২২ খ্রিস্টাব্দে নজরুল প্রকাশ করলেন দ্বিপাক্ষিক পত্রিকা ধুমকেতু। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নজরুলকে উৎসাহিত করে বললেন “তিনি যেন শত্রু মিত্র নির্বিশেষে নির্ভয়ে সত্যি কথা বলতে পারেন।” পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় নজরুলের ‘ধুমকেতু’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। তিনি সেখানেও বলেন “তাই বিপ্লব আনি, বিদ্রোহ করি।” কিন্তু নভেম্বর মাসে সরকার ধুমকেতু বন্ধ করে দেয় এবং নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে নজরুল বলেছিলেন “আমার বাঁশীকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে, বাঁশীর সুর থেমে থাকবে না, কারণ সুর আমার বাঁশীতে নেই আছে হৃদয়ে।”

জেলে থাকাকালীন অনিয়ম, পরিশ্রম এবং পরবর্তীকালে অনশনের ফলে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই জেল জীবনের কথা তিনি ‘সুপার বন্দনা’ নামে একটি রবীন্দ্র-প্যারোডিতে প্রকাশ করেন

                তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে, তুমি ধন্য ধন্য হে।
আমার এ গান তোমারি ধ্যান, তুমি ধন্য ধন্য হে॥
রেখেছে সান্ত্রী পাহারা দোরে         আঁধার-কক্ষে জামাই-আদরে
বেঁধেছ শিকল-প্রণয়-ডোরে, তুমি ধন্য ধন্য হে॥

বিবাহ ও খোদার গজব

কুমিল্লার সেনগুপ্ত পরিবারের স্নেহ ভালবাসায় নজরুল মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এই পরিবারেরই মেয়ে আশালতার প্রতি কবি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হন। ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে, জেল থেকে ছাড়া পাবার পর তিনি কুমিল্লায় গিয়ে আশালতার পাণিপ্রার্থী হন। পরের বছর এপ্রিলে আশালতা সেনগুপ্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পরে তাঁর নতুন নাম হয় প্রমীলা। বাসর রাতে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে নজরুল গাইলেন

মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোঁপায় তারার ফুল
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল।।
কণ্ঠে তোমার পরাবো বালিকা
হংস–সারির দুলানো মালিকা
বিজলী জরীণ ফিতায় বাঁধিব মেঘ রঙ এলো চুল।।

তাঁর নিজের বিয়ের কিছুদিন আগেই ১৭ এপ্রিল বন্ধু নলিনাক্ষ সান্যালের বিয়েতে অপমানিত হতে হল নজরুলকে। বিয়ের আসরে সকলের সাথে নজরুলও খেতে বসেছিলেন। মুসলমানের সাথে একসাথে খাবেন না বলে বেশ কিছু গোঁড়া হিন্দু প্রতিবাদ করে খাবার ফেলে উঠে চলে যান। বিয়ের সভায় নজরুল গেয়ে ওঠেন

জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া!
ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া।।
হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি – ভাব্‌লি এতেই জাতির জান,
তাইত বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশ’-খান।

এর কয়েক মাস পরে বিজলী পত্রিকায় এই কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল।

জীবনে হিন্দু, মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছ থেকেই সমপরিমাণ অপমান হজম করতে হয়েছে নজরুলকে। নিজের বিয়েতে তিনি কোনো হিন্দু বন্ধুকে আমন্ত্রণ করেননি। সেইসময় ওই বিয়ে নিয়ে নিয়ে হিন্দু সমাজে যে আলোড়ন চলছিল, হয়ত সেই পরিস্থিতিকে মাথায় রেখেই কবির এই সিদ্ধান্ত। পিতৃস্থানীয় চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পরে ব্যথিত নজরুল টানা ষোলো দিন ধরে চিত্তরঞ্জনের উপরে বহু কবিতা, গান রচনা করেন। পরে সে সংকলন চিত্তনামা নামে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে একটি কবিতার লাইনের জন্য মুসলিম সমাজের চক্ষুশূল হন।

                জন্মিলে তুমি মহম্মদের আগে হে পুরুষবর
কোরানে তোমার ঘোষিত মহিমা, হতে পয়গম্বর।

মোসলেম দর্পণ পত্রিকায় এর সমালোচনা বেরোয়। “কবির ইহাও স্মরণে রাখা কর্তব্য যে ইসলামের এইরূপ অবমাননা করলে খোদার গজব সত্বরই নাজেল হইবে।”

কোরাস

গজল, ইসলামি, শ্যামাসংগীত, ব্যঙ্গাত্মক, রাগাশ্রয়ী ইত্যাদির পাশাপাশি আরেক ধরনের বিশেষ গান নিয়ে নজরুল কাজ করেছিলেন। সেটি হল কোরাস। সংখ্যায় কম হলেও গণসংগীত হিসাবে তাঁর এই গানগুলি বাংলা গানের ইতিহাসে এক বিশেষ জায়গা দখল করে রয়েছে। এর মধ্যে আছে শ্রমিকের গান, কৃষকের গান, অন্তর ন্যাশনাল সংগীত প্রভৃতি। তবে কোরাস গানে তাঁর সর্বাধিক বিখ্যাত গান সম্ভবত

দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।

গ্রামোফোন কোম্পানির ফরমায়েশি গান

১৯৩১ সাল নাগাদ কবির সাথে গ্রামোফোন কোম্পানির চুক্তি হয়, কবির প্রতিটি গান গ্রামোফোন কোম্পানি কিনবে ২০ টাকা দরে, এছাড়া গানের বিক্রির উপরে থাকবে আরাই শতাংশ রয়্যালটি। নজরুল কিন্তু গ্রামোফোন কোম্পানীর মাইনে করা স্থায়ী কর্মচারী হলেন না। ফলে নির্দিষ্ট মাসিক আয় তাঁর থাকল না। ১৯৩৪ সালে একটি রেকর্ডের দোকান খোলেন নজরুল। কলের গান বিক্রি হবে বলে সে দোকানের নাম দেন ‘কলগীতি’। মাঝে কিছুদিন মেগাফোন কোম্পানিতে কাজ করে আবার এইচএমভিতে ফিরে যান। হিন্দুস্থান রেকর্ডেও কিছুদিন কাজ করেন কবি। তখন নজরুলের গানের জনপ্রিয়তা রবীন্দ্রসংগীতের থেকেও ঢের বেশি ছিল। বস্তুত সেই সময় গ্রামোফোন কোম্পানি চলছিলই নজরুলের গানে। ফলে কবির উপর চাপ বাড়তে থাকে। কোনো কোনো দিন সাত-আটটা গানও তাঁকে লিখে, সুর দিয়ে রেকর্ড করবার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। জসীমুদ্দিন লিখেছেন

“আমি দেখিয়াছি গ্রামোফোন কোম্পানীতে নানান রকমের গানের হট্টগোলের মধ্যে কবি বসিয়া আছেন — সামনে হারমোনিয়াম — পাশে অনেকগুলি পান ও গরম চা। ছ-সাতজন নাম-করা গায়ক বসিয়া আছেন কবির রচনার প্রতীক্ষায় — একজনের চাই শ্যামাসংগীত, অপরজনের কীর্তন, একজনের ইসলামী সংগীত, অন্যজনের ভাটিয়ালি গান — আরেকজনের চাই আধুনিক প্রেমের গান।”

আরো পড়ুন বিদ্রোহ আর প্রেমের দিব্যি

এছাড়াও চলত টকি সিনেমার গান, নাটকের গান বাঁধা ও শেখানোর পালা। নজরুল নিজে সাপুড়ে (দ্বিভাষিক) ছবির কাহিনি লেখেন, গান বাঁধেন। ধ্রুব ছবিতে নারদের চরিত্রে অভিনয়ও করেন। কানন দেবীর কণ্ঠে সাপুড়ে ছবির “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই” সেই সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গান। এরকমই আরেকটি ছবি চৌরঙ্গী। সে ছবি থেকে জনপ্রিয় হয়

                রুম ঝুম ঝুম ঝুম রুম ঝুম ঝুম
খেজুর পাতার নূপুর বাজায়।

কখনো ঝুমুরের তালে লিখেছেন

                এই রাঙা মাটির পথে লো
মাদল বাজে, বাজে বাঁশের বাঁশি।

বা,

                চোখ গেল চোখ গেল, কেন ডাকিস রে—
চোখ গেল পাখী (রে)।

অথবা

                হলুদ গাঁদার ফুল, রাঙা পলাশ ফুল,
এনে দে, এনে দে নৈলে বাঁধব না বাঁধব না চুল।

কখনও লিখেছেন কীর্তন

                আমি কেন হেরিলাম নব ঘনশ্যাম
কালারে কালো কালিন্দী-কূলে।।

এত কিছু কবি সামলাতেন কীভাবে? কমল দাশগুপ্ত লিখেছেন “কাজীদা বললেন, বিশেষ ধরনের গান যখন করি তখন হারমোনিয়াম বাজিয়ে প্রথম দুটি লাইনের সুর করি এবং আজেবাজে কথা বসিয়ে সুরটাকে ধরে রাখি। হারমোনিয়াম ছেড়ে এবার ওই দুই লাইনের কথা বদল করি। মনের মতন কথা পেলে সম্পূর্ণ গানটি লিখে ফেলি।” (অফুরান নজরুল)

এই সময়ে কবি যেন একটি মেশিনে পরিণত হন। তিনি একটির পর একটি গান রচনা করে গেছেন তাঁর মনের প্রকাশ ছাড়াই। সেসব শুধুই কর্তার ফরমায়েশ। কিন্তু স্ত্রীর পক্ষাঘাত, নিজের খরচার হাত, রেকর্ডের দোকানের সঙ্গীন অবস্থার ফলে এত গান বিক্রি সত্ত্বেও তিনি সুখের মুখ খুব কমই দেখেছিলেন। এক সময়ে কবির অভাবের সুযোগ নিয়ে বেতারকেন্দ্র তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল ‘কচুরিপানা নির্মূল করার গান’।

তবে সবই কি একবারে ফেলে দেওয়ার মত? এই সময়েই কবির মনে যে ভক্তিভাব জাগ্রত হয়েছিল তার ফসল ছিল বেশ কিছু ইসলামী গান ও শ্যামাসংগীত। গায়ক আব্বাসউদ্দিন গ্রামোফোন কোম্পানির ভগবতী ভট্টাচার্যকে অনেক কষ্টে রাজি করান বাংলায় ইসলামী গানের রেকর্ড প্রকাশ করার জন্য। নজরুলকেও দিয়েছিলেন মোক্ষম টোপ। “আপনি তো জানেন কীভাবে কাফের কুফের বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে অপাংক্তেয় করে রাখবার জন্য আদাজল খেয়ে নেমেছে একদল ধর্মান্ধ। আপনি যদি ইসলামী গান লেখেন তাহলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান।”

ভগবতী রাজি হতেই আব্বাসউদ্দিন সোজা চলে যান পাশের ঘরে কাজী নজরুলের কাছে। সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে শুনে কাজীসাহেব তখনকার সব কাজ বাতিল করে দিলেন। ইন্দুবালা দেবী গান তুলছিলেন, তাঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন নজরুল। দরজা বন্ধ করে আধ ঘন্টা খাতা কলম নিয়ে বসে বেরোল “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ।”

এর একদিন পরে দিলেন “ইসলামের ঐ সোওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর।”

দুটি গানই হিট। বাংলা গানের এক নতুন ধারার সৃষ্টি হল – ইসলামী গান।

একইভাবে শ্যামাসংগীত কিন্তু সেভাবে সবার মাঝে আসছে না। কমল দাশগুপ্ত বলছেন, শ্যামাসংগীত লিখতে কবি বেশ কয়েকদিন সময় নিচ্ছেন, একলা থাকছেন। তারপর যখন তাঁর কলম চলছে তখন কবির এক অন্য রূপ। সে রূপে ভক্তিভাব প্রবল। তখন তিনি একের পর এক শ্যামাসংগীতই লিখে চলেছেন।

                বল রে জবা বল
কোন সাধনায় পেলি রে তুই
শ্যামা মায়ের চরণতল।

সেই সময়েরই আরেকটি গল্প বলি।

কাজী সাহেবের অন্যতম সহকারী চিত্ত রায় বলছেন, “ঢাকায় রেডিও স্টেশান উদ্বোধন হবে, কাজী সাহেব কলকাতা থেকে শিল্পীদের নিয়ে যাচ্ছেন। গোয়ালন্দ পর্যন্ত স্টীমার, সেখান থেকে আবার ঢাকা মেলে ঢাকা যাওয়া হবে। কোন এক স্টীমার ঘাটে স্টীমার থেমেছে, স্টীমার থেকে কাজী সাহেব কিছু একটা দেখে, হঠাৎ করে বসে কি একটা লিখছেন। লেখাটা শেষ করলেন, স্টীমারে উঠেই সবাইকে ডাক দিলেন, এস আমরা গানটা তুলে নি। কাজী সাহেব ওখানেই হারমোনিয়াম নিয়ে গান শোনাচ্ছেন, একটার পর একটা সুর। শেষে পছন্দ হল সবার যে সুরটি সেটি একটি সাউথ ইন্ডিয়ান সুরের ধাঁচে”। নদীতীরে মহিলাদের জল নিয়ে যেতে দেখে কবির কলম থেকে বের হয় এই গানটি

আমি পূরব দেশের পুরনারী (গো)।
গাগরি ভরিয়া এনেছি গো অমৃত-বারি।।
পদ্মকুলের আমি পদ্মিনী-বধূ
এনেছি শাপলা-পদ্মের মধু
ঘন বন ছায়ায় শ্যামলী মায়ায়
শান্তি আনিয়াছি ভরি’ হেমঝারি।।

যদি আর বাঁশি না বাজে

১৯৪২ সালে বেতারের এক অনুষ্ঠানের মাঝখানে কবি বাকরুদ্ধ হয়ে যান। ধীরে ধীরে তাঁর চেতনাও লুপ্ত হয়, স্থবির হয়ে যান। কে জানে হয়ত এই স্থবিরতার সংকেত তিনি আগেই পেয়েছিলেন। লিখেছিলেন

                খেলা শেষ হল, শেষ হয় নাই বেলা।
কাঁদিও না কাঁদিও না -- তব তরে রেখে গেনু প্রেম-আনন্দ মেলা।।

ব্যবসার খাতিরে কবির শূন্যস্থান পূরণের জন্য লোক খুঁজতে দেরি করেনি গ্রামোফোন কোম্পানি। এককালে বছরে নজরুলের ২০০-২৫০ গান রেকর্ড হত। ১৯৪০-এর পর থেকেই সে সংখ্যা কমতে থাকে। ৪২ সালে পঞ্চাশটা মত আর ৪৩ সালে কবির গোটা দশেক গান রেকর্ড হয়েছিল। নতুন সুরকার, গীতিকাররা নজরুলের জায়গা নিলেন। ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকল নজরুলগীতি। এ সম্পর্কে কমল দাশগুপ্তের একটি কথা উল্লেখযোগ্য “নজরুলের ভালো গানগুলি রেকর্ড হয়েছে আগেই, তাই বাকিগুলি কেউ গাইত না।” বেতারেও কমে গেল তাঁর গানের সম্প্রচার। গানের প্রচার, প্রকাশ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনমানসেও হারিয়ে যেতে থাকলেন কবি।

তথ্যসূত্র

১। দেবব্রত বিশ্বাস আধুনিকতা ও শিল্পীর স্বাধীনতা – গোলাম মুরশিদ

২। কালজয়ী নজরুল – কমলচন্দ্র মিত্র

৩। কাজী নজরুল ইসলামের অপ্রকাশিত লেটো গান – মহম্মদ আয়ুব হোসেন

৪। কাজী নজরুলের গান – নারায়ণ চৌধুরী

৫। বিদ্রোহী রণক্লান্ত – গোলাম মুরশিদ

৬। বাংলা গানের সন্ধানে – সুধীর চক্রবর্তী

৭। আমার শিল্পী জীবনের কথা – আব্বাসউদ্দিন

৮। ফিরোজা বেগমের একটি সাক্ষাৎকার থেকে

নিবন্ধকার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম সোসাইটি, বেঙ্গালুরুর পত্রিকা চলচ্চিত্রিতার সম্পাদক। প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের বেশকিছু পত্রপত্রিকায়। গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ লেখার পাশাপাশি ব্যঙ্গাত্মক রচনা লিখতেও ভালবাসেন। মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.