লোকসভা ভোটে বিজেপি বেশ কয়েকটি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বা প্রধান বিরোধী পক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ না দিয়ে জিততে মরিয়া। প্রথম দুই দফার নির্বাচনে ভোটদানের নিম্ন হারে তারা চিন্তায় ছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই ভোটদানের হার ৬% বাড়িয়ে দিল নির্বাচন কমিশন। প্রধানমন্ত্রীর একের পর এক ঘৃণাভাষণেও কার্যত কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না কমিশন। লোকসভা নির্বাচন যত এগোচ্ছে তত কমিশনের পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট হচ্ছে। তারই সঙ্গে আগামীদিনে দেশ কোন পথে চলবে, ভোট দেওয়ার অধিকারটুকুও থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে। বিরোধী পক্ষের অন্যতম বড় অভিযোগ, এবার বিজেপি ক্ষমতায় এলে দেশের সংবিধান, গণতান্ত্রিক কাঠামো পুরোপুরি বদলে যাবে। এক দেশ এক ভোটের নামে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, বিভিন্ন ভোটের পৃথক পৃথক চরিত্র সব বদলে দিয়ে একনায়কতন্ত্রের ভিত আরও শক্ত করা হবে। নির্বাচনে বিজেপির বেপরোয়া মনোভাব এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় সেই অভিযোগেরই সত্যতা প্রমাণিত হচ্ছে।
যে দল কেন্দ্রে ক্ষমতায়, এবারে চারশোর বেশি আসন জেতার দাবি করছে, তারাই কাশ্মীরে প্রার্থী দিতে পারেনি। সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ তুলে দিয়ে, জম্মু-কাশ্মীরকে তিন টুকরো করার পর লাদাখবাসীও মোদী গ্যারান্টিতে আস্থা হারিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। মোদী ম্যাজিক যে কাজ করছে না তাও স্পষ্ট। অথচ প্রধান বিরোধী পক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করতে দিয়ে একাধিক আসন জিততে মরিয়া বিজেপি। পঞ্চায়েত বা পৌরসভার মত তৃণমূল স্তরের নির্বাচনে শাসকের দাপটে যা হয়ে থাকে, তারই প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে লোকসভা ভোটে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মোদী-শাহের গুজরাট মডেলে সুরাটে ইতিমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গেছে বিজেপি। কংগ্রেস প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। বিজেপি ছাড়া অন্য প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছেন। ইতিমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘জয়ী’ বিজেপি প্রার্থীকে শংসাপত্রও দিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, নোটা থাকা সত্ত্বেও ভোটগ্রহণ না করে বিজেপিকে জয়ী বলে ঘোষণা করা কতখানি নৈতিক ও গণতান্ত্রিক রীতি সম্মত? সুরাটের ১৬,৫৫,০০০-এর বেশি ভোটার বিজেপি প্রার্থীকে বা নোটাতে ভোট দিতে পারলেন না। অতি তৎপরতার সঙ্গে কংগ্রেস প্রার্থীর মনোনয়ন পত্র বাতিল এবং চাপ দিয়ে অন্যান্যদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করিয়ে আগামীদিনে কি ভোট ব্যবস্থাই তুলে দেওয়ার মহড়া হল সুরাটে? বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যুগলবন্দিতে সেই সন্দেহ দানা বাঁধতে বাধ্য।
কেবল সুরাট নয়, গুজরাটেরই গান্ধীনগর। একদা লালকৃষ্ণ আদবানি এবং বর্তমানে অমিত শাহের এই কেন্দ্র ঘিরেও উঠে আসছে নানা অভিযোগ। এবারের ভোটে মোট ৩৯ জন প্রার্থী মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে নজনের মনোনয়ন পত্র বাতিল হয়েছে, ১৬ জন মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করেছেন। শেষপর্যন্ত প্রার্থী রয়েছেন শাহ সমেত মোট ১৪ জন। অভিযোগ উঠেছে, অনেকে মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করেছেন হুমকির কারণে। মনোনয়ন বাতিলের ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতজন প্রার্থী থাকলে নাকি দুটি ইভিএম করতে হত। তাতে অসুবিধা কী ছিল? তবে কি ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ সত্যি? দাবি করা হচ্ছে, শাহ নাকি ওই কেন্দ্রে রেকর্ড ভোটের ব্যবধানে জিতবেন। প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলে বিপুল ব্যবধানে জেতা কঠিন। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে শক্তিমান প্রমাণ করতে তাই বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যুগলবন্দিতে এই কাজ করা হল। অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে আদবানিকে লৌহপুরুষ বলা হত। তাঁরই কেন্দ্রে আরও বেশি ব্যবধানে জিতে শাহ নিজেকে অমিত শক্তির অধিকারী প্রমাণ করতে না পারলে স্বৈরতন্ত্র শক্তিশালী হবে কী করে?
সুরাটেরই পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছিল মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে। সতেরো বছরের পুরনো মামলা খুঁচিয়ে তুলে কংগ্রেস প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করা হল। তিনি তড়িঘড়ি বিজেপিতেও যোগ দিলেন। হয়তো ওয়াশিং মেশিনে বিশুদ্ধ হওয়ায় সেই মামলা ধামাচাপাও পড়ে যাবে। কিন্তু গণতন্ত্রের গায়ে যে কলঙ্কের দাগ পড়ল তা কি মোছা যাবে? বাকি প্রার্থীদের উপরেও চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগ রয়েছে। চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে বামপন্থী এসইউসিআই দলের প্রার্থী লড়াই করছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিপিআই তাঁকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবুও ইন্ডিয়া জোটের প্রার্থী না থাকায় এই কেন্দ্রে বিজেপির লড়াইটা অনেক সহজ হয়ে গেল। মধ্যপ্রদেশেরই খাজুরাহো কেন্দ্রে ইন্ডিয়া জোটের সমাজবাদী পার্টির প্রার্থীর মনোনয়ন পত্র নির্বাচন কমিশন বাতিল করে দিয়েছে। এখানেও অন্যান্য প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। এই কেন্দ্রে ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়ে গেছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁকেই সমর্থন করছে ইন্ডিয়া জোট।
মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গোয়াসহ বিভিন্ন রাজ্যে ভোটে হেরেও সাম্প্রতিক অতীতে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। জনাদেশকে বিন্দুমাত্র মর্যাদা দেওয়ার সাহস তাদের নেই। দশ ছর ধরে চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক এইসব কাজকেই বীরত্ব বলে প্রচার করা হচ্ছে। তার জন্য শাহকে চাণক্যের শিরোপা দিয়েছে গোদি মিডিয়া, আর এসবের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সেই অর্থের উৎস নির্বাচনী বন্ডের তথ্যেই অনেকখানি স্পষ্ট হয়েছে। এবার জনাদেশ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষাতেও বিজেপি রাজি নয়। ভোটই যাতে না হয়, হলেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাই না করতে পারে তার মহড়া শুরু হয়েছে। বিজেপির বার্তা খুব স্পষ্ট। ওরা যা চাইবে, তাই হবে। ভোট ব্যবস্থাটাও পরিচালিত হবে ওদেরই ইচ্ছায়। নির্বাচন কমিশন ওদের আজ্ঞাবাহক মাত্র।
তাই ভোটদানের হার নিয়েও নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট পরিসংখ্যান দিচ্ছে না। ১৯ এপ্রিল প্রথম দফা ভোট শেষ হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল ৬০% ভোট পড়েছে। ২৬ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার পর জানানো হয়েছিল ৬১% ভোট পড়েছে। প্রাথমিক পরিসংখ্যানের থেকে চূড়ান্ত হিসাবে ভোটদানের হার কিছুটা বাড়ে ঠিকই, কয়েকদিনের মধ্যে তা জানিয়েও দেওয়া হয়। কিন্তু ১১ দিনেও যখন চূড়ান্ত হার কমিশন জানাতে পারল না, তখন প্রশ্ন উঠল। তারপর নির্বাচন কমিশন যে হিসাব দিল, তা প্রাথমিক হিসাবের থেকে ৬% বেশি। চূড়ান্ত হিসাব দিতে এতদিন লাগার কথা নয়। ভোটের হার চূড়ান্ত হিসাবে অতখানি বেড়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক। সবচেয়ে বড় কথা, আসনভিত্তিক ভোটদানের তথ্যও পরিষ্কারভাবে কমিশন জানায়নি। কংগ্রেস, সিপিএম সহ বিভিন্ন দল হিসাব পরিষ্কারভাবে জানতে চাইলেও কমিশন এখনো জানায়নি। কমিশনের আচরণে কারচুপির সন্দেহ বাড়ছে। প্রথম দুই দফায় ভোটের হার কম হলে বিজেপিরই অসুবিধা। তাই ভোটের হার বাড়িয়ে কারচুপির আশঙ্কাও বেশি।
দুই দফার ভোটে মোদী ম্যাজিক উধাও বুঝে বেলাগাম ঘৃণাভাষণ দিতে শুরু করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। মুখোশ খুলে সরাসরি সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিচ্ছেন তিনি। বিরোধী দলের বক্তব্যকে বিকৃত করা, যে কথা কোনোদিন বিরোধীরা বলেননি তা নিয়ে চরম মিথ্যাচারের মাধ্যমে চলছে ঘৃণাভাষণ। কংগ্রেসের ন্যায় পত্র নামক ইশতেহার বের হওয়ার পরেই মোদীজি তাঁর গ্যারান্টির কথা ভুলে গেছেন। জুমলাবাজি ধামাচাপা দিতে ন্যায় পত্রকে বিকৃত করা হচ্ছে। কংগ্রেসের ন্যায় পত্রে আর্থসামাজিক বৈষম্য দূর করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামাজিক ন্যায়ের জন্য দেশজুড়ে আর্থসামাজিক ও জাতিভিত্তিক জনগণনার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের সমানাধিকারের অঙ্গীকার স্মরণ করে তফসিলি জাতি, উপজাতি, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি ও সংখ্যালঘুদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, রোজগারে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারি এবং উদ্বৃত্ত জমি পিছিয়ে পড়া মানুষের মধ্যে বন্টনের কথাও বলা হয়েছে। কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘুই নয়, ভাষাভিত্তিক সংখ্যালঘুদের প্রতি বঞ্চনা দূর করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাসভূমিকে রক্ষা করতে তফসিলভুক্ত অঞ্চল বাড়ানোর অঙ্গীকারের পাশাপাশি বনাধিকার আইনকে কার্যকরী করতে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি ন্যায় পত্রে দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেসের ন্যায় পত্রে বৈষম্য দূর করা ও সম্পদের পুনর্বন্টনের অঙ্গীকারকে পুরোপুরি বিকৃত করছেন মোদীজি।
বিজেপি বলছে, কংগ্রেস নাকি হিন্দুদের সম্পত্তি কেড়ে মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেবে। হিন্দু নারীদের গয়না, মঙ্গলসূত্র কেড়ে নেওয়া হবে। পিছিয়ে থাকা জনজাতি, ধর্মীয় ও ভাষিক মানুষের সমানাধিকারের উপর এভাবেই সাম্প্রদায়িকতার রং চড়াচ্ছে বিজেপি। সম্পদের পুনর্বণ্টন বা গরিবদের জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ধনীরাই ভয় পায়। মোদীজির আমলে সব কা সাথ সব কা বিকাশের গ্যারান্টি ব্যর্থ হয়েছে। আর্থিক বৈষম্য ব্রিটিশ আমলের থেকেও বেড়েছে। আর্থিক অসাম্যের সঙ্গে জাতি, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গগত বৈষম্যের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কংগ্রেসের ইশতেহারে সেসব দূর করার কথা বলা হয়েছে, আর তাতেই চটেছেন মোদীজি সহ গোটা বিজেপি। কারণ বিজেপির আর্থিক ও সামাজিক নীতি এই বৈষম্যের উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। কংগ্রেসের ইশতেহারে তাকেই আঘাত করা হয়েছে।
মোদী রাজত্বের দশবছরে কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপরেই নয়, দলিতদের উপর অত্যাচারও বহুগুণ বেড়েছে। হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে মনুবাদের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়েছে। জনগণনায় জাতিগণনাকে বিজেপি এই কারণেই ঢোকাতে চাইছে না। ভারতে জাতিগত, ধর্মীয় সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে আর্থিক বৈষম্যের সম্পর্কটা তারা আড়াল করতে চায়। বিজেপির আমলে কর্পোরেট মহলকে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে দেওয়ার জন্য বনবাসী জনজাতির উপর আক্রমণ তীব্র হয়েছে। তাদের উচ্ছেদ করতে জাতিগত দাঙ্গা লাগানো হয়েছে। মণিপুরসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রতিটি রাজ্য তার প্রমাণ। আদিবাসী, মূলবাসী জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিকে তফসিলি অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত করলে কর্পোরেটের জমি লুঠ করতে সমস্যা হবে। সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করার অন্যতম উদ্দেশ্য জম্মু-কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সম্পদকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া। তাই আজ লাদাখবাসী তাদের অধিকারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। কর্পোরেটের সুবিধা করে দিতেই বনাধিকার আইন, পরিবেশ আইন লঘু করা, বন আইন সংশোধন করা হয়েছে।
সেই সত্যকে আড়াল করতেই আদিবাসী, মূলবাসীদের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করা হচ্ছে। মুসলমান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আদিবাসীদের বিরোধ বাধানো হচ্ছে। এই কাজটি পরিকল্পিতভাবে করে চলেছে আরএসএসের বিভিন্ন সংগঠন। একদিকে তফসিলি জাতি, উপজাতিদের উপর আক্রমণ বেড়েছে। অন্যদিকে ধর্মীয় উন্মাদনার মাধ্যমে তাদেরই একাংশকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা হচ্ছে। আদিবাসী, বনবাসীদের উচ্ছেদের করতে দাঙ্গা লাগানোর পাশাপাশি চলছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। ছত্তিসগড়, ঝাড়খণ্ডে উচ্ছেদ অবাধ করতে নকশাল দমনের নামে বনবাসীদের হত্যা করা হচ্ছে। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের রাজনীতি যে পুঁজিবাদকেই সমৃদ্ধ করে, একদল লোকের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভবনের সুযোগ করে দেয় তা আজ স্পষ্ট। তাই বহুমাত্রিকতা, বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করার দরকার। আমাদের সংবিধানে ভাষা, জনজাতি, ধর্ম, সংস্কৃতিগত বহুমাত্রিকতাকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বিজেপি তাকেই ধ্বংস করতে চাইছে। কংগ্রেসের ইশতেহারের ছত্রে ছত্রে সংবিধানের সেই চরিত্রকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই কর্পোরেটের আজ্ঞাবাহক বিজেপি চটেছে।
মোদীজি বলছেন, কংগ্রেস সোনাদানা কেড়ে নেবে। ভারতে ৭০ কোটির বেশি মানুষ পেটভরা পুষ্টিকর খাবার পান না। ক্ষুধা সূচকে দেশের স্থান তলানিতে। গত মঙ্গলবার কেন্দ্রেরই রিপোর্ট জানিয়েছে যে গৃহস্থের সঞ্চয় কমছে, বাড়ছে ঋণ। ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ – এই তিন বছরে গৃহস্থের নিট সঞ্চয় কমেছে নয় লক্ষ কোটি টাকা। পাশাপাশি ব্যাঙ্কের ঋণ বেড়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকা। এটা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ। মহাজনের থেকে বা সম্পত্তি বন্ধক রেখে উচ্চ সুদের হারে ধারের হিসাব সরকারি রিপোর্টে মেলে না। গয়না বন্ধক রেখে মানুষ ধার নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কংগ্রেসের অভিযোগ, এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সোনা বন্ধক দিয়ে ধার নেওয়ার পরিমাণ ১ লক্ষ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। যা ভারতে কোনোদিন হয়নি। অর্থনীতির এই বেহাল দশাকে আড়াল করতেই ঘৃণাভাষণ দিচ্ছেন মোদীজি। শুধু তাই নয়। নির্বাচনী প্রচারে বলছেন, বিরোধীরা জিতলে নাকি রামমন্দির, কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির বিপন্ন হবে। সরাসরি ধর্মীয় উস্কানি। দশবছর ধরে বিজেপি নেতারা একের পর এক ঘৃণাভাষণ দিয়ে গেছেন। এবার প্রধানমন্ত্রীকেও দিতে হচ্ছে। এতদিন গরুকে কেন্দ্র করে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছিল। এবারের নির্বাচনী সভায় শ্রাবণ মাসে মাংস খাওয়াকেও কটাক্ষ করেছেন। দেশের মানুষকে পেটভরা খাবারের গ্যারান্টির বদলে কে কী খাচ্ছে তা নিয়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া হচ্ছে।
আরো পড়ুন আমিষ খান বলে গাঙ্গুলি জেঠিমা, ঘোষ কাকুও দেশের মানুষ নন?
নির্বাচনী সভায় এমন ঘৃণাভাষণ সম্পূর্ণ বেআইনি। নির্বাচন কমিশনকে জানানো সত্ত্বেও মোদীকে কোনো নোটিস পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। কমিশন মামুলি চিঠি দিয়েছে বিজেপি সভাপতিকে। উপরন্তু কর্ণাটক বিজেপির এক্স সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করা চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক ভিডিও নিয়ে অভিযোগ ওঠার পরে কমিশন এক্সকে বলেছে ওই ভিডিও সম্বলিত পোস্টগুলো মুছে দিতে, কিন্তু বিজেপিকে কোনো শাস্তি দেয়নি। বরং কর্ণাটকের কংগ্রেস সরকারের পুলিস বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডা আর তাদের আইটি সেলের মাথা অমিত মালব্যর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে শমন পাঠিয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন সচেতনভাবে নিষ্ক্রিয় থেকে ঘৃণা ছড়ানোয় মদত দিচ্ছে। মোদী গ্যারান্টি উধাও হয়ে এখন সরাসরি সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে এই রূপান্তর বুঝিয়ে দিচ্ছে বিজেপি কতখানি বেপরোয়া। নির্বাচনী সভায় যারা এভাবে দেশের সংবিধানকে অমান্য করে, সত্যকে বিকৃত করে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার মহড়া দেয় – তারা আবার ক্ষমতায় এলে কী করবে তা সহজেই অনুমেয়। আম আদমির বিনাশের বিনিময়ে কর্পোরেটের বিকাশে সম্পদের আরও কেন্দ্রীভবন ঘটবে। জীবিকা, বাসস্থান থেকে আম জনতার উচ্ছেদ অভিযান আরও বেপরোয়া হবে। সেসব আড়াল করতে ধর্মীয়, জাতি, ভাষাগত দাঙ্গা আরও বাড়বে। দেশে সবচেয়ে বড় ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’ হল বিজেপি।
উত্তরবঙ্গে বিজেপির হোর্ডিং দেখেছিলাম। লেখা আছে সবার উপরে রাষ্ট্র সত্য। বিজেপির কাছে মানুষ নয়, সমাজ নয়, রাষ্ট্রই সত্য। কারণ ওটি একটি শক্তিশালী যন্ত্র। সেই যন্ত্র নিয়ন্ত্রণে এলে কী করা যায় তা দশবছর ধরে দেখছে দেশবাসী। রাষ্ট্র আর শাসক সমার্থক। দশবছরে বারবার সরকার ও শাসকের আচরণে মনে হয়েছে, এই রাষ্ট্র কাঠামোয় গণতন্ত্র, নাগরিকের অধিকার গৌণ। মন্ত্রী ও সরকারের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কটা যেন রাজা-প্রজার মত। রাজার প্রশস্তি করাই প্রজার কর্তব্য, প্রশ্ন করলেই স্থান হবে গারদে। সাংবাদিক থেকে সাধারণ নাগরিক – কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। রাষ্ট্র প্রশ্নাতীত এক যন্ত্র। সম্পদের কেন্দ্রীভবনে সাহায্য করা এবং সেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষা করাই রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য।
‘আমরা ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান চাই শুনে আপনারা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। অথচ আপনাদের বর্তমান সমাজে জনসমষ্টির দশজনের মধ্যে নয়জনের ব্যক্তিগত মালিকানা তো ইতিমধ্যেই লোপ পেয়েছে, অল্প কয়েকজনের ভাগ্যে সম্পত্তি থাকার একমাত্র কারণ হল ওই দশ ভাগের নয় ভাগ লোকের হাতে কিছুই না থাকা। … সম্পত্তির অধিকারের এমন একটা রূপ আমরা তুলে দিতে চাই যা বজায় রাখার অনিবার্য শর্ত হল সমাজের বিপুল সংখ্যাধিক লোকের সম্পত্তি না থাকা।’ ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত কমিউনিস্ট ইশতেহারে লিখেছিলেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস। কংগ্রেসের ইশতেহারে জমি পুনর্বণ্টন আর সম্পত্তির হিসাব নেওয়ার কথা বলাতেই ভয় পেয়েছে বিজেপি। কমিউনিজমের ভূত আজও ওদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








