সুপ্রিম কোর্ট বলছে মণিপুরে আইন নেই। ঠিক তখনই জ্বলছে দিল্লি লাগোয়া হরিয়ানা রাজ্যের গুরগাঁও (হিন্দুত্বের ঠ্যালায় যার নাম এখন গুরুগ্রাম), ট্রেনে নিরাপত্তারক্ষীর হাতে খুন হচ্ছেন সংখ্যালঘু যাত্রী। অপরের প্রতি অসহিষ্ণুতা আজ তীব্র ঘৃণায় রূপান্তরিত। ‘দেশভক্তরা’ দেশবাসীকে হত্যা করে উল্লাসে মেতে উঠেছে। আর প্রতিবাদীরা ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা পেয়ে কারাগারে বন্দি। রাষ্ট্র পালটে দিচ্ছে সংবিধানের অর্থ। মে মাস থেকে মণিপুরে চলা জাতিদাঙ্গায় নীরবতা পালন করছিল কেন্দ্রীয় সরকার। মণিপুর যখন জ্বলছে, প্রধানমন্ত্রী তখন বিদেশ সফরে ব্যস্ত। নারী নির্যাতনের বীভৎস ভিডিও ভাইরাল হতে মৌনীবাবা কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করতে বাধ্য হলেন। জাতিদাঙ্গা শুরু হওয়ার ৭৮ দিন পর।
মণিপুরের বিজেপি সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে তিনমাস ধরে চলছে জাতিদাঙ্গা। শতাধিক মানুষের মৃত্যু, নারী নির্যাতন, হাজার হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাতেও এতটুকু বিচলিত নয় ডবল ইঞ্জিন সরকার। সুপরিকল্পিতভাবে একটা জনজাতি গোষ্ঠীকে নির্মূল করার অভিযান চলছে। সরকার নাগরিককে নিরাপত্তা তো দিতেই পারেনি, উল্টে বিপন্ন মানুষকে আক্রমণকারীদের সামনে ফেলে পুলিশ পালিয়ে যাচ্ছে। কুকিরা অধিকাংশই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। তাঁদের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধে নেমেছে সরকার, যার আঁচ লাগছে মিজোরামসহ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ডবল ইঞ্জিন সরকারের কাঁধে ভর করে চলা হরিয়ানাতেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দলের এক ধর্মীয় শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে ঘটনার শুরু। গত ৩১ জুলাই জলাভিষেক যাত্রার আয়োজন করেছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তার আগে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে উস্কানিমূলক ভাষণ দেওয়া হয়। কুখ্যাত দুষ্কৃতী মনু মানেসর বিদ্বেষপূর্ণ, উত্তেজক ভাষণ দিয়ে এই শোভাযাত্রায় মানুষকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়। রাজস্থানে গোরক্ষার নামে দুজনকে হত্যায় অভিযুক্ত এই মানেসর। উত্তেজনা সৃষ্টি, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা দিয়ে শোভাযাত্রা নিয়ে যাওয়া – সবটাই হয়েছে ছক কষে। নুহতে শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের রেশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে হরিয়ানার বিভিন্ন অংশে। উত্তেজনা ছড়ায় হাইটেক গুরগাঁওতেও। অত্যাধুনিক সেই নগরীও জ্বলেছে। সুপরিকল্পিতভাবেই রাজধানী দিল্লিতে দাঙ্গার রেশ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। হরিয়ানায় কিছু মানুষের মৃত্যু তো হয়েছেই, ঘরছাড়া হয়েছেন আরও বহু মানুষ। গরিব, সংখ্যালঘু মানুষের ঘরবাড়ি দোকানপাট এই সুযোগে বেআইনি নির্মাণের অজুহাতে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়াও শুরু করেছে পুলিস।
2 dozen medical stores & shops bulldozed in Haryana's Nuh in ongoing demolition drive on "illegal" construction. 150 shanties & 5 houses demolished
6 dead, including 2 home guards. 202 arrested, 80 in preventive detention in connection with communal clashes,… pic.twitter.com/ioC0ForDqf
— Nabila Jamal (@nabilajamal_) August 5, 2023
উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে প্রতিবেশী রাজ্য রাজস্থানেও। কংগ্রেসশাসিত ওই রাজ্যের বিধানসভা ভোট দোরগোড়ায়।
হরিয়ানা সরকারের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। খোদ বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী আসল ঘটনা ধামাচাপা দিতে মিথ্যা কথা বলছেন, সংখ্যালঘুদের দোষী করছেন বলে অভিযোগ। একজন কুখ্যাত দুষ্কৃতী কীভাবে তাঁর রাজ্যে দাপিয়ে বেড়ায়, উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণ ছড়িয়ে দেয় তার উত্তর মুখ্যমন্ত্রী দেবেন না? মানুষ খুনে অভিযুক্ত মনুকে নাকি হরিয়ানা সরকার খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ তিনি সশস্ত্র মিছিল সংগঠিত করছেন, দাঙ্গা বাধাচ্ছেন। হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী সংবিধানকে বিন্দুমাত্র মর্যাদা না দিয়ে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব কপচাচ্ছেন। দেশ জ্বালানোর গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বিজেপি। সুপ্রিম কোর্ট যখন বিজেপিশাসিত মণিপুরে আইন নেই বলছে, তখন হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, সবাইকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। ওদের রাজত্বে দাঙ্গাবাজ, হত্যাকারীরাই শুধু নিরাপদ। তাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনুকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন আর নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব প্রকাশ্যে অস্বীকার করছেন। একেই বলে “আচ্ছে দিন”।
অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনী যে নাগরিকের প্রাণরক্ষায় নয়, প্রাণহানিতে দক্ষ তা প্রমাণ হল রেলে। জয়পুর-মুম্বাই সেন্ট্রাল সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসে কর্তব্যরত আরপিএফ কনস্টেবল চেতন সিংয়ের গুলিতে প্রাণ হারালেন চারজন। নিজের সিনিয়র অফিসারকে হত্যা করার পর কনস্টেবল বেছে বেছে তিনজন মুসলমান যাত্রীকে হত্যা করে। নিহত যাত্রীরা সকলে এক কামরাতেও ছিলেন না। মুসলমান যাত্রীদের যে টার্গেট করেই হত্যা করা হয়েছে তা স্পষ্ট। শুধু তাই নয়, ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে চেতন বলছে এদেশে থাকতে হলে মোদি, যোগী, ঠাকরেকেই সমর্থন করতে হবে। ভিডিওর সত্যতা প্রমাণিত না হলেও, মিথ্যা বলে প্রশাসন উড়িয়েও দিতে পারেনি। রেল কর্তৃপক্ষ এখন ওই কনস্টেবলকে বাঁচাতে তার মানসিক ভারসাম্যহীনতার তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। লোকটি যদি মানসিকভাবে অসুস্থই হয়, যাত্রী নিরাপত্তার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাকে বহাল করা হল কেন? তার থেকে রিভলভার কেড়ে নিয়ে পরে আবার ফেরত দেওয়া হল কেন? রেলের কাছে সদুত্তর নেই। এক অর্থে চেতন অবশ্যই মানসিকভাবে অসুস্থ। কোনো সুস্থ মানুষ এভাবে বেছে বেছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী যাত্রীদের হত্যা করে না। সহনাগরিকের প্রতি কতখানি বিদ্বেষ থাকলে এমন বেপরোয়া হওয়া যায় তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না।
এমনভাবেই অপরকে ঘৃণা করতে, হত্যা করতে শেখানো হচ্ছে। সেই অপররা এই দেশেরই নাগরিক। ধর্ম, জাতি, ভাষা, সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্যময় এই দেশে অপর খুঁজে পাওয়া শক্ত নয়। অন্য ধর্ম, জাত, ভাষা বা প্রদেশের মানুষকে শত্রু মনে করলে দেশে এমনভাবেই গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র ইচ্ছা করেই আজ এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এমন বহু ঘটনার সাক্ষী দেশ। গোরক্ষার নামে গণপিটুনিতে একের পর এক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লির উপকণ্ঠে উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে গরুর মাংস মজুত রাখার গুজব ছড়িয়ে মহম্মদ আখলাককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেই হত্যার তদন্তকারী পুলিশ অফিসার সুবোধ কুমার সিং ২০১৮ সালে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে খুন হন। অনেকের মতে, আখলাক হত্যার তদন্ত ধামাচাপা দিতেই এই খুন। ২০১৭ সালের এপ্রিলে গোরক্ষকরা রাজস্থানে পেহলু খানকে হত্যা করে। তিনি হরিয়ানার নুহ জেলার বাসিন্দা ছিলেন। সেই নুহই আজ দাঙ্গাবিধ্বস্ত। পরে অভিযুক্তরা বেকসুর খালাসও পেয়ে যায়। সেই বছরেরই জুন মাসে গরুর মাংস নিয়ে যাচ্ছে – এই গুজব রটিয়ে হরিয়ানায় ট্রেনের মধ্যে পনেরো বছরের বালক জুনেইদ খানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। গোরক্ষা, লাভ জিহাদের নামে দেশজুড়ে চলছে মানুষ খুন।
কেবল মুসলমান নন, দলিতরাও আজ দেশজুড়ে আক্রান্ত। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে গুজরাটের উনায় গোরক্ষকদের হাতে আক্রান্ত হন দলিতরা। সে ঘটনায় উত্তাল হয়েছিল সারা গুজরাট। ২০১৮ সালে মহারাষ্ট্রের ভীমা কোরেগাঁওয়ের ঘটনায় ইউএপিএ আইনে রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মীদের কারারুদ্ধ করা হয়। এই মামলায় অভিযুক্ত ফাদার স্ট্যান স্বামী কারাবন্দি অবস্থায় ২০২১ সালে মারা যান । উত্তরপ্রদেশের হাথরাসে দলিত মহিলাকে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যার তথ্যানুসন্ধানে গিয়েছিলেন সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান। তাঁকে ইউএপিএ ধারায় কারারুদ্ধ করা হয়েছিল।
সারা দেশকে বদ্ধ কারাগারে পরিণত করতে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর আক্রমণ নেমে আসছে। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পরে পরেই ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল হয় সারা দেশ। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল হয়। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করা হয়। হায়দরাবাদ ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশদ্রোহীদের আখড়া বলে লোক খেপানো শুরু হয়। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদেরও ইউএপিএ ধারায় বন্দি করা হয়। মোদী ক্ষমতায় আসার আগেই ২০১৩ সালে মহারাষ্ট্রে খুন হন যুক্তিবাদী নরেন্দ্র দাভোলকর। ২০১৫ সালে আরেক মুক্তচিন্তক গোবিন্দ পানসারেকে হত্যা করা হয়। ২০১৭ সালে কর্ণাটকে খুন হন গৌরী লঙ্কেশ। মুক্তচিন্তার উপর আক্রমণ ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসার পর নাজি বাহিনী মেতে উঠেছিল বই পোড়ানোর উৎসবে। তারপর মগজ ধোলাইয়ের লক্ষ্যে ঢেলে সাজানো হয়েছিল জার্মানির শিক্ষাব্যবস্থা, ঠিক যেমনটা হচ্ছে আজকের ভারতে।
ফ্যাসিবাদ প্রচলিত আইন, সংবিধান অমান্য করার অধিকার দাবি করে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের নেতারা বারবার সংবিধানবিরোধী কথাবার্তা বলে চলেছেন, সরাসরি অপরকে হত্যার উস্কানি দিচ্ছেন। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করে নতুন সংবিধান রচনার কথা বলছেন। নতুন সংবিধানের আওয়াজ অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলেও উঠেছিল। বহুদলীয় গণতন্ত্রের বদলে দ্বিদলীয় ব্যবস্থার চর্চা শুরু হয়েছিল। তখন বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, এখন পেয়েছে। তাই সামনে বহুদিনের লালিত স্বপ্নপূরণের হাতছানি। বাজপেয়ীজি ভালো ছিলেন, মোদীজি খারাপ – এ ধরনের অতিসরলীকৃত মূল্যায়নে ফ্যাসিবাদের বিপদ লঘু হয়ে যায়।
২০২০ সালে দিল্লির নির্বাচনী প্রচারে এনআরসিবিরোধী আন্দোলনকারীদের গুলি করে মারার স্লোগান দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর। এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলন দমন করতে বিজেপি নেতা কপিল মিশ্রের ঘৃণাপূর্ণ ভাষণ এবং তারপরেই দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রমাণ করে ফ্যাসিবাদ কী ভয়ঙ্কর। অনেকেই একে দাঙ্গা না বলে গণহত্যা বলেন। পঞ্চাশ জনেরও বেশি মারা গিয়েছিলেন, তারপরেই দেশজোড়া লকডাউন। অতিমারিকে ব্যবহার করে এনআরসিবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং দিল্লির দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা যাঁরা করেছিলেন তাঁদেরই দাঙ্গায় অভিযুক্ত করে ইউএপিএ আইনে কারারুদ্ধ করা হয়। অতিমারীতে যখন মানুষ মারা যাচ্ছেন, তখন প্রধানমন্ত্রী মেতেছিলেন রামমন্দির আর সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্প নিয়ে। তবুও কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলন খেলাটাকে অনেকখানি ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ভুলে কৃষকরা নেমেছিলেন পথে। গোরক্ষাকে কেন্দ্র করে নরহত্যায় লিপ্ত হওয়ার বদলে রাজস্থানের কৃষকরা গরু নিয়ে মিছিল করে এসেছিলেন দিল্লিতে। উত্তরপ্রদেশ ভুলেছিল ধর্মীয় হানাহানি। কিন্তু বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের ঘৃণার রাজনীতি থেমে থাকেনি। অতিমারী কাটিয়ে নতুন স্বাভাবিকতার যুগে সেই রাজনীতি আরও নগ্ন হয়েছে। পরিকল্পনামাফিক মুসলমান জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত জনবসতি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া, প্রতিবাদীদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার জন্য নতুন আইন থেকে শুরু করে একের পর এক অসাংবিধানিক কাজ করে চলেছে দিল্লি পুলিস এবং বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যের সরকার।
এই বছরের মে মাসে নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধন করে বিজেপির কাঙ্ক্ষিত ভারতের রূপ দর্শন করালেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে ধর্মীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে থাকবে স্বেচ্ছাচার, ব্রাহ্মণ্যবাদ, পুরুষতন্ত্রের মারণ ভাইরাস। সংসদের ভিতরে যখন হিন্দু ধর্মমতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলছিল, বাইরে তখন যৌন হেনস্থার শিকার ক্রীড়াবিদদের উপর পুলিসের বর্বর হামলা।

সংসদের ভিতরে ও বাইরে রাষ্ট্রের আচরণ ইঙ্গিত দিল কোন পথে এগোতে চলেছে দেশ। গণতন্ত্রের বদলে এদেশের আদর্শ হবে রাজতন্ত্র, রাষ্ট্র চলবে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করা মহিলা কুস্তিগিররা যখন বিচার চাইতে গিয়ে পুলিসি নির্যাতনের মুখে, তখন অভিযুক্ত বিজেপি সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিং সংসদের ভিতর মেতে ছিলেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। এই ভারতে নাগরিকের, এমনকি পদক পাওয়া ক্রীড়াবিদদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। নিরাপত্তা পায় ব্রিজভূষণ, মনুরা।

ভয়ের কথা এটাই, যে অপরকে ঘৃণা করার এই রাজনীতি বহু মানুষের স্বীকৃতি আদায় করে। বলা ভাল, তারাই মেতে ওঠে অপরকে হত্যা করতে। আক্রমণ আর মুসলিম সম্প্রদায় বা দলিতদের উপর সীমাবদ্ধ থাকে না। আক্রান্ত হন অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষও, আক্রান্ত হন মহিলারা। বিভিন্ন জনজাতি নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে মেতে ওঠে। উত্তর-পূর্ব ভারতকে সেই জাতিদাঙ্গার পরীক্ষাগারে পরিণত করেছে বিজেপি। ডবল ইঞ্জিন সরকার কাজটা করছে মসৃণভাবে। মণিপুরে যুযুধান দুই পক্ষ মেইতেই ও কুকি জনজাতির নারীরা আক্রান্ত হলে দুই সম্প্রদায়ের নারীরা তাই ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন না। বরং একে অপরকে শত্রু মনে করেন, ঘৃণা করেন। একইভাবে গুজরাট গণহত্যায় নারী নির্যাতনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল আরএসএসের দুর্গা বাহিনী। আজ বিলকিস বানোর ধর্ষকরা মুক্তি পেলে তাদের মালা পরিয়ে বরণও করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে জম্মু-কাশ্মীরে আট বছরের বালিকা আসিফাকে ধর্ষণ করে খুন করার পর হত্যাকারীর সমর্থনে জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিলে বিচলিত হন না দেশের নারীরা। জাতীয় পতাকার এত বড় অপমানেও ক্ষোভে ফেটে পড়েন না দেশভক্তের দল। ২০০৪ সালে থাংজাম মনোরমা হত্যাকাণ্ডে উত্তাল হয়েছিল মণিপুর। মণিপুরের মহিলাদের আন্দোলনে আলোড়িত হয়েছিল সারা দেশ। কুড়ি বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। আজ আমাদের অনেকের মগজে কারফিউ। ধর্ম, জাতিগত পরিচয় সত্তার রাজনীতি আমাদের অন্ধ করে দিয়েছে।
আরো পড়ুন কাশ্মীর আর মণিপুরের হাল দেখে বাঙালির শিউরে ওঠা উচিত
ফ্যাসিবাদ কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেই সন্ত্রাস নামিয়ে আনে না, তার পক্ষে গণউন্মাদনাও সৃষ্টি করে, যার ভিত্তি অপরকে চূড়ান্ত ঘৃণা করা। তীব্র আর্থিক সংকট মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয় তাকেই সে ব্যবহার করে। নিরাপত্তাহীনতার জন্য অন্য ধর্ম, জাতি, বর্ণ বা ভাষার মানুষকে দায়ী করতে থাকেন শ্রমজীবী, কাজ হারানো মানুষ। আর সেই সুযোগেই সঙ্কটগ্রস্ত পুঁজিবাদ তার বাঁচার পথ খুঁজে নেয়। বিজেপি দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করে পুঁজিবাদকে সেই সুযোগই করে দিচ্ছে। কর্পোরেটের সঙ্গে তার মেলবন্ধন না বুঝলে এই ফন্দি ধরা যাবে না। তার চর্চা না হয় হবে অন্য নিবন্ধে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








