ডাঃ শর্মিষ্ঠা রায়

হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় মেলবন্ধন আয়োজিত শিক্ষা সম্পর্কিত সেমিনারে প্রদত্ত বক্তৃতার পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ। আজ শেষ পর্ব

পড়াশোনা সবার জন্য নয়, একথা কিন্তু সরকার একবারও বলেনি। বরং বারবার বলছে, আমরা সবার জন্যই পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছি। তার সঙ্গে এটা বলছে না যে, ছুটির পরিমাণ বাড়াতে বাড়াতে এমন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা যারা প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী, তারা ক্লাস এইটে উঠেও যোগ বিয়োগ না শিখতে পারো। ক্লাস টুয়েলভেও আমব্রেলা বানান না জানতে পারো। আমাদের কিছু করার নেই। আমরা মিড ডে মিল দিচ্ছি, সাইকেল দিচ্ছি, ব্যাগ দিচ্ছি, জুতো দিচ্ছি – এটাই কি যথেষ্ট নয়? পড়াশোনা করো না। কে বারণ করেছে? এতকিছুর পরেও গরিব ঘর থেকে যদি একটা-দুটো প্রতিভাবান ছেলেমেয়ে বেরোয়, তাদের আমরা লোন-টোন দেব। তোমরা আইআইএসটি, আইআইটি, এমআইটিতে পড়ো গিয়ে। ম্যানেজমেন্টের ডিগ্রি বানাও। কর্পোরেটদের ধান্দা চালানোর জন্যে তো তোমাদের লাগবে। ওরা ভালো মাইনেপত্র দেয়। তখন ঋণের বোঝা শোধ করে দিও।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আর যারা ক্লাস এইটেও যোগ বিয়োগ শিখল না! তাদের কী হবে? কেন? প্রধানমন্ত্রী ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগান তুলেছেন – আমরা শুনেছি। এতদিন জানতাম ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’। কিন্তু এই নতুন স্লোগানটার মানে কী? এর অর্থ হল, আমরা ফিনান্স ক্যাপিটাল বা লগ্নি পুঁজিকে দেশে আহ্বান জানাচ্ছি। যেগুলো আগে চীন বা ভিয়েতনামে চলে যেত, সেগুলো এখন এদেশে আসবে। ফলে ড্রপ আউট বাড়ুক, আমরা তাদের সস্তা মজুর হিসাবে পেয়ে যাব। এখন দেখবেন, যে কোনো বছরেই কেউ লেখাপড়া ছেড়ে দিলে একটা সার্টিফিকেট পেয়ে যায়। আগে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলে তবে সার্টিফিকেট পাওয়া যেত। এখন ছাত্রছাত্রীদের অতদিন অপেক্ষা করতে হবে না। ফার্স্ট ইয়ার পাশ করলেই সার্টিফিকেট। তারপর তুমি চাইলে পড়াশোনা না-ও চালাতে পারো। তার মানে কিছু ছেলেমেয়ে তো লেখাপড়া ছাড়বেই। আগের ব্যবস্থায় কিন্তু এটা করা যেত না। একটা সার্টিফিকেটের জন্য অন্তত গ্র্যাজুয়েট হতে হত। স্কুলের ক্ষেত্রেও একই ছক। এখনকার ৫+৩+৩+৪ ফর্মুলা, মানে ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে উঠতে, এইট থেকে নাইনে উঠতে, বা তার পরে প্রত্যেক বছর, ড্রপ আউট হবেই। অর্থাৎ ড্রপ আউট হওয়ার নতুন নতুন রাস্তা খোলা হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তে। এরাই আগামী দিনে লগ্নি পুঁজির হয়ে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগান বাস্তবায়িত করবে নিজেদের সস্তা শ্রমিকে পরিণত করে।

আরও আছে। সরকারি স্কুলে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি স্কুলেও SUPW বলে একটা খ্যাঁচাকল আছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, বেশ ভালো জিনিস। ছেলেমেয়েরা বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু এর পিছনেও আছে অন্য উদ্দেশ্য। ড্রপ আউট হলেই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র বলির পাঁঠা হয়ে দাঁড়াবে এরা। আর এরা মূলত আসবে নিচু শ্রেণির মধ্যে থেকে, পয়সাওয়ালাদের অসুবিধা হবে না। আমরা জানি, হিন্দু মতে শ্রাদ্ধের নিয়মকানুন যারা ঠিকঠাক পালন করতে পারে না, তারা বামুনকে কিছু মূল্য ধরে দিলেই দোষ কেটে যায়। আরএসএস পরিচালিত এই ব্রাহ্মণ্যবাদী শিক্ষানীতিতে, মানে শিক্ষার এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে, পয়সাওয়ালারাও তেমনি কিছু ধরে দিয়ে দোষ কাটিয়ে নেবার সুযোগ পাবে।

মনে রাখবেন, এই নীতি আমাদের সংবিধান স্বীকার করে না। এটা নয়া উদারবাদী নীতি। সংবিধানে লেখাপড়া শিখে নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ ছিল। দারিদ্র্য, পিছিয়ে পড়া জীবনের অভিশাপ কাটিয়ে মেধার প্রয়োগে শিক্ষার সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসার সুযোগ ছিল। সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে দেখেছি শ্রীনিবাস রামানুজনের মত প্রতিভাকে। মৌলিক গবেষণার সুযোগ ছিল, যার মাধ্যমে পৃথিবীকে নতুন কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। পড়াশোনা করতে চাইলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নয়া উদারবাদী নীতি সেই সমস্ত প্রচেষ্টাকে সমূলে উৎপাটিত করেছে।

আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে যারা লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাচ্ছে, তাদের জীবনের একটা বড় সময় এবং বাবা-মায়ের প্রচুর টাকা ও উদ্যম ব্যয় হচ্ছে শিক্ষার পিছনে। বিনিময়ে তারা কী পাচ্ছে? প্রথমত, শিক্ষার উদ্দেশ্য এদেশের মানুষের কাছে হল ভালো রোজগার। বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করার সময়ে বাবা-মা স্বপ্ন দেখে, ছেলে বড় হয়ে বড় অফিসার হবে, গাড়িঘোড়া চড়বে। অনেক লেখাপড়া শিখেও গাড়িঘোড়া চড়তে পেল না – এ বড় হতাশাজনক ব্যাপার, মেনে নেওয়া কঠিন।

এই মানসিকতাও এসেছে সেই মেকলের দর্শন থেকে। মেকলে চেয়েছিলেন সেই শিক্ষা, যা কালো চামড়ার ভিতরের মানুষটাকে বানিয়ে তুলবে সাদা চামড়ার কর্তাভজা অফিসার। সে তার দেশের সংস্কৃতি, মানুষকে ঘৃণা করবে। পুরস্কারস্বরূপ সে চড়তে পাবে গাড়িঘোড়া। জাতপাতলাঞ্ছিত এই দেশে এই সুযোগ পাবে একমাত্র উচ্চবর্ণের পুরুষ। তার সঙ্গে দূরত্ব বাড়বে দলিত, আদিবাসী, মুসলমান, নিম্নবর্গীয় মানুষ এবং সর্বোপরি মেয়েদের। গাড়িঘোড়া চড়া উচ্চবর্গের পুরুষটি রাজকীয় দ্যুতি ছড়াবে, আর যারা নিচে পড়ে রইল, তারা ওই পুরুষটির মত হয়ে ওঠাকেই উত্তরণ ভাববে। অথচ সমাজ চলে যে মানুষগুলোর শ্রমে, তারা কারা? সেই দলিত, আদিবাসী, মুসলমান, নিম্নবর্গীয় এবং মহিলারা। বিশেষ করে নিম্নবর্গীয় মহিলারা। এদের শ্রমেই রাজকোষ ভরে ওঠে। অথচ এদেরই বঞ্চিত রাখা হয়েছে শিক্ষা থেকে। ফলে পরশ্রমভোগীদেরই কুক্ষিগত থেকে গেছে শিক্ষা। স্বাধীনতার পর সংরক্ষণের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু যাঁরা উঠে এসেছেন, তাঁদের অধিকাংশও উচ্চশ্রেণির পাশের চেয়ারে কোনোরকমে জায়গা পেয়ে নিজের শ্রেণিকে ভুলে গিয়েছেন।

এর কারণ একটাই। শিক্ষার সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থা যুক্ত হয়নি। তাই গাদা গাদা ডিগ্রি অর্জন করার পরও কাউকে যদি ই-কমার্সের ডেলিভারি বয়ের কাজ করতে হয়, বা হাসপাতালে ডোমের চাকরিতে পিএইচডি স্কলারের অ্যাপ্লিকেশন জমা পড়ে, তখন গোটা সমাজ হায় হায় করে ওঠে। অথচ যে দেশের সংবিধান সমানাধিকারের ভিত্তিতে রচিত হয়েছিল, সে দেশে কারও মনে প্রশ্ন জাগে না – কেন রাষ্ট্রপতির ছেলের শিক্ষার অধিকার মুচির ছেলের শিক্ষার অধিকারের থেকে আলাদা হবে?

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র ফল যখন ভালো করে ফলবে, তখন আমরা দেখতে পাব – আরও কত সর্বনাশ হয়েছে। কারণ এই শিক্ষানীতির কোথাও তফসিলি জাতি, উপজাতি ও অনগ্রসর শ্রেণির কথা কিছু বলা হয়নি। তার বদলে বলা হয়েছে নতুন একটি গোষ্ঠীর কথা। সে নাম আগে কেউ কখনো শোনেনি – সোশিও-ইকোনমিকালি ডিসঅ্যাডভান্টেজড গ্রুপস (SEDGs)। এরা হল তারা, যারা সরকারের ব্যবসায়িক পার্টনারদের শ্রমিক হিসাবে কাজ করবে। এদের জন্য ‘নন-ফর্মাল এডুকেশন’-এর নিদান দেওয়া হয়েছে।

ভারত সরকারের একটা শিক্ষামন্ত্রক ছিল। সেটা ১৯৮৫ সালে নিঃশব্দে হয়ে গেল মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন রাজীব গান্ধী, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাও। কেউ বলতে পারেন, নামে কী আসে যায়? আসে যায়। এটাই ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে নয়া উদারবাদী হস্তক্ষেপের প্রথম প্রমাণ। মানুষের প্রাপ্য অধিকারের উপর দামের লেবেল লাগানোর সেই শুরু।

ইদানিং খবরের কাগজ পড়ে বা টিভিতে একটা খবর দেখে আমরা আঁতকে উঠেছি। পশ্চিমবঙ্গে নাকি কয়েক হাজার স্কুল বন্ধ হতে চলেছে ছাত্রছাত্রীর অভাবে। সরকার নাকি ওই স্কুলগুলোর জায়গাজমি বেচে দেওয়ার জন্য কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছেন। আরও জানা গেছে, এটা কেবল পশ্চিমবঙ্গের চিত্র নয়, সারা দেশেরই এক অবস্থা। ২০২৩ সালে মহারাষ্ট্রের কংগ্রেস নেতা নানা পাটোলে দাবি করেছিলেন, রাজ্য সরকার ক্লাস্টার সিস্টেম করে রাজ্যের এমন ১৫,০০০ স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার তাল করছে, যেখানে ছাত্রসংখ্যা কুড়ির নিচে। ২০২২ সালে ত্রিপুরার শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্ররা যদি একজন ছাত্র/ছাত্রী ধরে এনে ভর্তি করাতে পারে, তারা পাবে ৫০০ টাকা। শিক্ষকরা পাবেন ২০০ টাকা করে। এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আর্ন উইথ লার্ন’।

বুঝুন অবস্থা। কোভিডের সময়ে এই হাল হয়েছিল স্কুলগুলোর। এই পরিস্থিতির অজুহাতে স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে গেল। ২০২৩ সালে বিহারে অনুপস্থিতির কারণে ২০ লক্ষের বেশি পড়ুয়ার নাম কেটে দেয় স্কুলগুলো। সেখানেও অজুহাত কোভিডই। এসব এখন চোখে পড়ছে, কিন্তু এর সূচনা আজ থেকে নয়। ২০১০ সালের আশপাশ থেকেই স্কুলগুলোর ক্যাম্পাস বিক্রি হতে শুরু করেছিল। মনমোহন উচ্চশিক্ষিত, সুপণ্ডিত মানুষ ছিলেন। শিক্ষার মূল্য কি তিনি অন্য কারও চেয়ে কিছু কম বুঝতেন? অথচ এ দেশের শিক্ষার সর্বনাশ তাঁর হাত ধরেই হল। ব্যাঙের ছাতার মত বেসরকারি ডাক্তারি আর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ খুলে গেল, ছেলেমেয়েরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে পড়তে গেল, অথচ সেখানে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নেই, ওয়ার্কশপ নেই, লাইব্রেরি নেই, প্রয়োগশালা নেই, বসার জায়গা নেই। কিন্তু জমি বেচে, বাড়ি বেচে মা-বাবারা ছেলেমেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার করতে পাঠালেন।

আমাদের দেশের সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, আইনের চোখে সমস্ত মানুষ সমান। আর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থানের ভিত্তিতে কোনো মানুষের প্রতি কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। সেই সংবিধানের নামে শপথ নেওয়া নেতারা ২০০৯ সালে আনলেন শিক্ষার অধিকার আইন। সেখানে সকলের জন্য সমান শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দিয়ে তৈরি হল বহুস্তরীয় শিক্ষাব্যবস্থা। ওটা আসলে ফেলো কড়ি মাখো তেল নীতি। সরাসরি সংবিধানের ১৪ ও ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের বিরুদ্ধে যাওয়া হল। মানুষ সেকথা জানতে পারল না, সংসদের উভয় কক্ষে প্রত্যেক দলের সদস্য এই নতুন আইনে সমর্থন জানাল।

এসবের আঁচ অবশ্য পাওয়া গিয়েছিল ১৯৮৬ সালের শিক্ষানীতিতেই। সেই শিক্ষানীতিতে বড় অদ্ভুত একটা কথা বলা হয়েছিল – আমাদের লক্ষ্য, ভারতের যে সব বাচ্চার ১৯৯৫ সালের মধ্যে ক্লাস ফাইভ ও ২০০০ সালের মধ্যে ক্লাস এইট পাশ করার কথা, তারা যদি মূলধারায় পড়তে না পারে, তাহলে তাদের জন্য সমান্তরাল ‘নন ফর্মাল’ স্কুলের ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ গরিব, আদিবাসী, দলিত, মুসলমান, নিম্নবর্গের বাচ্চাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থার সেই শুরু। স্বাধীনতার পর ভারত সরকার সেই প্রথম ঘোষণা করল – দেশের সব বাচ্চার লেখাপড়ার দায় নিতে আমরা অসমর্থ। তাহলে ওই বাচ্চাদের কী হবে? তাও লেখা হল ওই শিক্ষা দলিলে। বলা হল, এই বাচ্চারা সকালে বা দুপুরে কাজে যায়, পরিবারের জন্য রোজগার করে, ফলে এদের জন্য হবে সান্ধ্য স্কুল। অতএব সরকার তার শিক্ষানীতিতে শিশুশ্রমকে স্বীকার করে নিল, যা সংবিধানবিরোধী। এমন নীতি তৈরি করা হল, যা বলল, শিশুশ্রম চলবে। শিশু শ্রমিকদের রাতে আলাদা স্কুলে পড়ানোর ব্যবস্থা হবে। এদেরই নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ সরকারের নতুন শিক্ষানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে SEDGs বলে। এদের কথা আগেই বলা হয়েছে।

এই যে সান্ধ্য স্কুল, সেখানে কি শিক্ষক নিয়োগ করা হল? না। সেখানে নিয়োগ করা হল একজন নির্দেশক (instructor)। শিক্ষক হলে তাঁকে রীতিমত যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। তাঁকে নির্দিষ্ট বেতন, অবসরের পর পেনশন দিতে হবে। কিন্তু ক্লাস টেন বা নিদেনপক্ষে এইট পাশ করা কোনো গ্রামের ছেলে হলেই তাকে নির্দেশক করা চলতে থাকল। মেয়ে হলে ক্লাস সিক্স পাশ করাই যথেষ্ট। বাচ্চাদের কী হবে, সেকথা কোথাও লেখা রইল না। প্রশ্ন উঠলে বলা হল, আমরা তো বাচ্চার একদম আপনজনকে দায়িত্ব দিয়েছি, ওতে লেখাপড়া ভালো হবে। অর্থাৎ স্কুল বদলে গেল নন-ফর্মালে, আর শিক্ষক বদলে গেল নির্দেশকে। সকলের জন্য শিক্ষার সংবিধানসম্মত অধিকারের গঙ্গাযাত্রার সেই শুরু।

আর জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০? সেটার খসড়া কে করেছে জানেন? মুকেশ আম্বানি আর কুমারমঙ্গলম বিড়লা। এখানে তাঁরা খোলাখুলি বিদেশি পুঁজি লগ্নির পক্ষে সওয়াল করেছেন। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলের নাম বদলে করেছেন ‘পাবলিক ফিলানথ্রপিক পার্টনারশিপ’। শব্দটাকে মোলায়েম করে আরও বেশি দাঁত নখ বের করে দেখিয়েছেন। উচ্চশিক্ষায় সরকারি সমস্ত অনুদান বন্ধ করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে তৈরি হয়েছে HEFA (হায়ার এডুকেশন ফাইন্যান্সিং এজেন্সি)। তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চড়া সুদে ঋণ দিচ্ছে। নিজেদের পরিকাঠামো ব্যবহার করে টাকা তুলে অর্থাৎ ফি বাড়িয়ে এই ঋণ শোধ করতে হবে। হেফা তাদের ওয়েবসাইটে লিখে রেখেছে, আগামীদিনে তারা স্কুলশিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে লগ্নি করবে। এই ইত্যাদি কথাটা খুব ভয়ঙ্কর। অর্থাৎ এদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোনো সীমা নেই। সরকার মহাজনে পরিণত হয়েছে। তার অনুদান দেওয়ার কথা ছিল, তার বদলে ঋণ দিচ্ছে। গুগল করলে জাতীয় শিক্ষানীতির ৬৬ পাতার একটা ডকুমেন্ট পাওয়া যাবে। সেখানে নীতি আছে, কিন্তু কারও সই নেই। কিন্তু মূল কস্তুরীরঙ্গন কমিটির রিপোর্ট ৫০০ পাতার। শিক্ষা সাংবিধানিকভাবে যুগ্ম তালিকাভুক্ত, কিন্তু রাজ্যগুলোকে ঘুণাক্ষরে জানতে না দিয়ে পাশ করা হয়েছে এই নীতি। অর্থাৎ মূলেই রয়েছে অস্বচ্ছতা।

এই নীতির উদ্দেশ্য শিক্ষার সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ ও গৈরিকীকরণ। হিন্দুধর্মের যেসব শিক্ষা আরএসএসের স্কুলে পড়ানো হয়, সেগুলোই এখানে যোগ করা হয়েছে। গীতার নিষ্কাম কর্মের উল্লেখ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, ব্রাহ্মণ্যবাদের বর্ণাশ্রমের জাতিবিভাগ অনুযায়ী যে যার কাজ করবে, কোনো ফলের আশা করবে না। তবে একথাও সত্য যে এই জাতীয় শিক্ষানীতি কিন্তু তৈরি হয়েছে বিশ্বব্যাংক সহ কর্পোরেট দুনিয়ার কাছে মাথা নত করার ন্যক্কারজনক ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ মানুষের নাগরিকত্বের অধিকার – সবকিছুতেই শেষ পেরেক ঠুকতে সরকারগুলো কোমর বেঁধে নেমেছে।

প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব

নিবন্ধকার দন্ত চিকিৎসক ও সমাজকর্মী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.