ডাঃ শর্মিষ্ঠা রায়

হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় মেলবন্ধন আয়োজিত শিক্ষা সম্পর্কিত সেমিনারে প্রদত্ত বক্তৃতার পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ

দুশো বছরের ইংরেজ শাসনোত্তর ভারতের প্রত্যেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ প্রভাব অত্যন্ত বেশি। শিক্ষাও তার ব্যতিক্রম নয়, আর সে কারণেই স্বাধীনতা পাওয়ার এত বছর বাদেও এদেশের অধিকাংশ সমস্যার মূল ব্রিটিশ শাসনকালের মধ্যেই খুঁজতে হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন জাঁকিয়ে বসেছে। সত্তর-আশি বছর রাজত্ব করার পর তাদের মনে পড়ল, ভারতবাসীর লেখাপড়ার বিষয়ে এবার মনোযোগ দেওয়া দরকার। এর কারণ ছিল অবশ্য। রাজত্বের সীমা অনেক বেড়েছে। এত বড় দেশ, এখানে শাসনকার্য পরিচালনা করতে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে লোক নিয়ে এসে কাঁহাতক পারা যায়? বড় বড় প্রশাসকরা অনেক মাথা চুলকে ঠিক করলেন – এক দল নতুন মানুষ লাগবে। তাদের চামড়ার রং ভারতীয়দের মত হবে বটে, কিন্তু মনের গঠন হবে ব্রিটিশদের অনুসারী। তাদের সরকারি কাজে নিয়োগ করে টাকাপয়সা, সামাজিক সম্মান ইত্যাদি দিয়ে বশ করে এমন করে তুলতে হবে যাতে দেশবাসীর তুলনায় তারা নিজেদের উচ্চশ্রেণির লোক মনে করে। জাতপাতে বিভক্ত ভারতে এদের নিতে হবে উঁচু জাতের জমিদার, ভূস্বামী শ্রেণির লোকেদের মধ্যে থেকে। শাসন চালাতে সাহায্য করবে এই বশংবদ বাহিনী, আর এদের মাধ্যমে সমাজের নিচু স্তরে ছড়িয়ে পড়বে ব্রিটিশ সংস্কৃতি ও প্রভুভক্তি।

এই তত্ত্বে যে লোকটি সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন, তাঁর নাম থমাস ব্যাবিংটন মেকলে। উগ্র পাশ্চাত্যবাদী এই ভদ্রলোক ছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের আইন সচিব ও কমিটি অফ পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের সভাপতি। প্রাচ্যের সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর তীব্র ঘৃণা ছিল। মেকলে বলতেন, ইউরোপের একটা ভালো গ্রন্থাগারের একটা তাকে যত বই আছে, গোটা ভারতবর্ষ আর আরবের সমগ্র জ্ঞানচর্চা নাকি তার সমান। এই লোকটি মাত্র চারবছর ভারতে ছিল। তার মধ্যেই শিক্ষাব্যবস্থার যে চেহারা করে গিয়েছিলেন, তা পরবর্তী ব্রিটিশ শাসনকে অত্যন্ত শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দেয়। ব্রিটিশ শাসনই শুধু নয়, ক্ষমতা হস্তান্তরের পর যাঁরা নতুন প্রভু হয়ে এলেন, তাঁরাও ওই শিক্ষানীতিরই আশ্রয় নেন। আজও ব্যবসায়ী প্রভুরা মেকলের ভিতের উপর দাঁড়িয়েই তাদের শোষণের ছড়ি ঘোরাচ্ছেন।

ভারতের শিক্ষানীতি কেমন হবে সে ব্যাপারে মেকলে ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বড়লাটের কাছে একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। সেটাই বিখ্যাত বা কুখ্যাত মেকলে মিনিটস অন এডুকেশন ইন ইন্ডিয়া। বস্তুত, ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদে বলা হয়েছিল, কোম্পানি ভারতের শিক্ষাখাতে কমপক্ষে এক লক্ষ টাকা ব্যয় করবে। এ বিষয়ে নীতি নির্ধারণ করার জন্য ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে জেনারেল কমিটি অফ পাবলিক ইনস্ট্রাকশন তৈরি হয়েছিল। তীব্র বিতর্ক তৈরি হল প্রাচ্য না পাশ্চাত্য শিক্ষা দেওয়া হবে তাই নিয়ে। দুই গোষ্ঠী আলাদাভাবে নিজেদের আবেদন বড়লাটের কাছে পাঠায়। এই বিতর্ক নিরসনের দায়িত্ব লর্ড বেন্টিংক তাঁর কমিটি অফ পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের সভাপতি মেকলের উপর ছেড়ে দেন।

তাঁর প্রস্তাবগুলো সংক্ষেপে এইরকম:

ক) প্রাচ্যের শিক্ষা বৈজ্ঞানিক চেতনাহীন এবং পাশ্চাত্যের তুলনায় নিকৃষ্ট।
খ) প্রাচ্যের শিক্ষা ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপবিত্র’। তাই এখনই এখানে পাশ্চাত্য শিক্ষা চালু হওয়া উচিত।
গ) এদেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে এই শিক্ষার প্রসার ঘটালে তা ক্রমশ নিচের তলায় চুঁইয়ে পড়বে।
ঘ) তাঁর শিক্ষানীতির ফলে এক নতুন ভারতীয় জনগোষ্ঠী তৈরি হবে, তারাই ভারতে নবজাগরণ আনবে। মেকলের প্রস্তাব অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৫ সালের ৭ মার্চ নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন।

তাঁর শিক্ষানীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পোশাকে আশাকে আদবকায়দায় এক ইংরেজ অনুগত শ্রেণি তৈরি হয়।

শিক্ষার ভাষা

ভারতবর্ষ বহু ভাষাভাষী মানুষের দেশ। স্বাধীনতার পর যখন উত্তর ভারত থেকে হিন্দিকে এদেশের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তখন দক্ষিণ ভারত থেকে প্রবল প্রতিবাদ উঠেছিল। আজ আবার সারা দেশে হিন্দি আগ্রাসন চাপিয়ে দেওয়ার এক প্রবল ষড়যন্ত্র চলছে। এরও মূল লুকিয়ে আছে মেকলের নীতির মধ্যে। মেকলে কোনো ভারতীয় ভাষাকে ভাষাই মনে করতেন না। ভারতীয় ভাষাগুলোকে বলতেন বুলি (dialect)। তাঁর বক্তব্য ছিল, শিক্ষার মাধ্যম হওয়ার যোগ্যতা কোনো ভারতীয় ভাষার নেই। এর সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল। যারা মেকলে প্রবর্তিত শিক্ষার বাহক হল, তাদের কাছে মাতৃভাষায় কথা বলা বা দেশীয় আদবকায়দা লজ্জাজনক হয়ে উঠেছিল। আজকের সমাজেও আমরা তাদের উত্তরসূরীদের দেখতে পাই। এটাই চেয়েছিলেন মেকলে ও তাঁর উত্তরসূরীরা – শাসককে সম্পূর্ণ বকলমা দেওয়া একটা গোষ্ঠী। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। আজ কর্পোরেট গাইডলাইন মেনে যে শিক্ষানীতি রচিত হয়েছে, তারও মূলে আছে ভাষা সন্ত্রাস। শাসন চালাতে গেলে শোষিতের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে হবে সবার আগে। তবেই তাকে ইচ্ছামত চালানো যাবে।

আরো পড়ুন তিন-ভাষা নীতি: হাসব না কাঁদব?

আসল সমস্যা হল, আমরাও এই তত্ত্ব নতমস্তকে মেনে নিয়েছি। ভেবে দেখিনি, মাতৃভাষা যদি হারিয়ে যায়, তাহলে হারিয়ে যাবে সমস্ত গৌরবময় ঐতিহ্য। রসগোল্লা, গুলাব জামুন হারিয়ে যাবে; থাকবে কেবল টফি আর চকোলেট। একবারও ভেবে দেখিনি, মাতৃভাষা কত বড় সম্পদ। মাতৃভাষাতেই কাকা, মামা, পিসেমশাই, মেসোমশাই, জ্যাঠামশাই, কাকিমা, মামিমা, জেঠিমা, পিসিমা, মাসিমা বলতে শিখেছি। প্রত্যেকটা সম্বোধনে জড়িয়ে আছে আলাদা আলাদা আবেগ, আলাদা আলাদা বোধ। কেবল uncle বা aunty দিয়ে এতগুলো আবেগকে কখনো প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ইংরেজদের কথায় অন্ধ, বোবা, কালা হয়ে শত শত বছর কাটিয়ে দিলাম আমরা। এর চেয়ে লজ্জার আর কী থাকতে পারে? এখন নামকরা বাংলা মাধ্যম স্কুলকে টেক্কা দিয়ে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল রমরমিয়ে চলে। বাংলা মাধ্যম স্কুল শুকিয়ে মরে যায়। এশিয়া, আফ্রিকার দেশগুলোতে বাজারের ঠিক করে দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমরা ছাগলের তৃতীয় সন্তানের মত নাচি, আর ব্রিটিশ কাউন্সিলের বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে।

১৮৩৫ সালে মেকলে আরও বলেছিলেন, সারা ভারতের লোককে লেখাপড়া শেখানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। কেবলমাত্র সমাজের উঁচু স্তরকেই আমরা লেখাপড়া শেখাব। সেখান থেকে চুঁইয়ে যা পড়বে, তা নিচের স্তর পাবে। আজ থেকে ১১-১২ বছর আগে ভারতের উচ্চশিক্ষিত প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংও এই কথাই বলেছিলেন – সকলকে বিনামূল্যে শিক্ষা দেবার ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই কি বুনিয়াদি শিক্ষার বিদ্যালয়গুলো থেকে আলো সরতে সরতে এত অন্ধকার হয়ে গেছে, যে তা ঠেলে আজ ছাত্রছাত্রীরা প্রবেশ করতে পারে না?

আসলে ভূরাজনৈতিক দ্যূতক্রীড়ায় আজ ভারত হয়ে গেছে এক স্বার্থপর দৈত্যের বাগান। এখানে শিশুরা পড়তে আসে না। টাকা না থাকলে শিক্ষার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। একটু ভুল বললাম, শিক্ষার অঙ্গন থেকে শিশুদের বের করে দেওয়া হয়। আর আমরা যারা এই শিশুদের বাবা-মায়ের সমতুল্য, তারাও মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে প্রশ্ন করতে পারি না – রাষ্ট্রপতির ছেলের শিক্ষার অধিকার একজন মুচির ছেলের সমান কেন হল না? অথচ সংবিধান আমাদের সে অধিকার দিয়েছিল। মেকলের ভাষাতত্ত্বকে বাতিল করে প্রত্যেক শিশুকে তার মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার দিয়েছিল। কেমন সে অধিকার?

পিপলস লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অনুযায়ী, ভারতে মোট ৭৮০ খানা ভাষায় মানুষ কথা বলে। এটা পৃথিবীতে দ্বিতীয়, প্রথম হল পাপুয়া নিউ গিনি। সেখানে ৮৪০ ভাষাভাষী মানুষ বাস করেন। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, এতগুলো ভাষায় শিক্ষা দেওয়া কি সম্ভব? এর উত্তর রয়েছে আমাদের সংবিধানেই। ভারতের সংবিধানের ৩৫০এ ধারায় বলা আছে, ভারতের প্রত্যেক রাজ্য এবং রাজ্যের স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম যাতে তার মাতৃভাষায় হয় তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতে হবে। রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন বোধ করলে যে কোনো রাজ্যকে এই সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। দুঃখের বিষয়, গত ৭৫ বছরে কোনো রাষ্ট্রপতি এই সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করেননি।

কিন্তু ১৯৩৮ সালে গান্ধীজী হরিপুরা কংগ্রেসের অধিবেশনে স্বাধীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে সে সম্পর্কে বলেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, স্বাধীন ভারতে মেকলে প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার যেন মূলোচ্ছেদ করা হয়। নতুন ব্যবস্থার নাম দিয়েছিলেন ‘নয়ি তালিম’। সেই শিক্ষাব্যবস্থা উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কেমন করে? ধরুন, আপনার মেয়ে পদার্থবিদ্যা পছন্দ করে। সে তার পাঠ্যবই থেকে মুখস্থ করেছে ওহমের সূত্র। তা সে গড়গড় করে লিখে আসছে পরীক্ষার খাতায়, নম্বর পাচ্ছে প্রচুর, তারপর পদার্থবিদ্যা নিয়ে উচ্চশিক্ষায় যাচ্ছে। তারপর কর্মজীবনে এমন কিছু করছে, যার সঙ্গে পদার্থবিদ্যার কোনো সম্পর্ক নেই।

যদি এমন হত, সে তার পড়ার টেবিলের জন্য একটা ল্যাম্প তৈরি করতে করতে ওহমের সূত্র বুঝে নিত? গান্ধীজি তেমনটাই চেয়েছিলেন। চাষির ঘর থেকে যে বাচ্চা স্কুলে আসে, তাকে বই পড়ে শিখতে হয় না কোন গাছে কখন ফুল আসে, কেমন তার ফল, বা সেই গাছ লকলকিয়ে বেড়ে উঠতে কতটা জল, কতটা সার লাগে। সে শিক্ষা সে বই থেকে মুখস্থ করতে যাবে কেন? তা তো হওয়া উচিত নয়। একথাই বলেছিলেন গান্ধীজি। কিন্তু তা হল কই?

পরবর্তী অংশ আগামীকাল

নিবন্ধকার দন্ত চিকিৎসক ও সমাজকর্মী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.