যীশু দেবনাথ
সুপ্রিম কোর্ট গত ৩ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের নির্দেশে ২০১৬ সালে স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত সমস্ত শিক্ষকের চাকরি বাতিল করার সময়ে নির্দেশনামার ৪৯ নম্বর ধারায় উল্লেখ করেন যে এই রায় সমানভাবে প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। কিন্তু নতুন নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা তাঁদের কাজে বহাল থাকবেন। নির্দেশের এই অংশটিকে দেখে আপাতভাবে মনে হয়েছিল যে এর ফলে প্রতিবন্ধী শিক্ষকরা আদালতের রায়ের কঠোরতম অভিঘাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাবেন। বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার উলটো। এই নির্দেশের সবচেয়ে বড় সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সার্ভিস কমিশন। নভেম্বর মাসে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির নতুন নিয়োগের তালিকা প্রকাশের সময়ে প্রতিবন্ধীদের তালিকায় কয়েকজন দাগি শিক্ষকের নাম প্রকাশ করে তারা কলকাতা হাইকোর্টে দাবি করে যে সুপ্রিম কোর্ট দাগি প্রতিবন্ধীদের বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথা বলেছে। তাদের এই অভিসন্ধি বানচাল করেছে আদালত।
তবে এহ বাহ্য। প্রকৃতপক্ষে, সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং তারপর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিকল্পনা মোতাবেক হওয়া নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি আক্রমণ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এই রাজ্যের কয়েকশো প্রতিবন্ধী চাকরিহারা শিক্ষক। একথা সকলেই জানেন যে ২০১৬ সালের নিয়োগে যে পরিমাণ শূন্য পদ ছিল, তার দ্বিগুণেরও বেশি শূন্য পদে নিয়োগ করা হচ্ছে ২০২৫ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। কিন্তু প্রতিবন্ধীদের বেলায় দেখা গেছে, আসন সংখ্যা সব ক্ষেত্রেই তিনগুণের বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালে মহিলাদের জন্য চিহ্নিত এবং সমস্ত মাধ্যম মিলিয়ে বাংলা, ইংরিজি ও ইতিহাস বিষয়ে শূন্যপদ ছিল যথাক্রমে ৭৬, ৮৯, ৩৯। সেখানে ২০২৫ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সেই সংখ্যা কমে হয়েছে যথাক্রমে ৩২, ৩৬ ও ২৩। অথচ নতুন নিয়োগে আবেদনকারী পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। এ বিষয়ে দৃষ্টিহীনদের সংগঠন ব্লাইন্ড পারসন্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রশ্নের উত্তরে স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার জানিয়েছিলেন, শূন্য পদের হিসাব দিয়েছে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। তাঁদের কিছু করার নেই। তাছাড়া সম্প্রতি রোস্টার পদ্ধতির পরিবর্তন হওয়ায় শূন্যপদের এই নতুন বিন্যাস সৃষ্টি হয়েছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এখানে মনে রাখা দরকার, এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়া অন্যান্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার চেয়ে সবদিক থেকেই আলাদা। এই নিয়োগের সঙ্গে এমন অনেক মানুষের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে যাঁরা বিনা দোষে কষ্টার্জিত চাকরি হারিয়েছেন। তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার খেসারত দিতে হচ্ছে তাঁদের। আদালত সে কথা মনে রেখেই এসএসসিকে আরেকবার পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। শূন্য পদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালতের সেই উদ্দেশ্যকে মনে রাখা প্রয়োজন। তা না হলে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যতজন প্রতিবন্ধী নিযুক্ত হয়েছিলেন, সেই সংখ্যা বাড়ানোর বদলে যে রোস্টার পদ্ধতি তাকে কমিয়ে দেয়, সেই রোস্টার পদ্ধতি এই নিয়োগের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যই নয়। কিন্তু সরকার সে বিষয়ে একেবারেই উদাসীন।
অ্যাসোসিয়েশনের তরফে কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের করা এক মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়। এর উত্তরে এসএসসির আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রায় ২০% খালি থেকে যায়। তাই এবার নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য সংরক্ষিত পদ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বক্তব্যের মধ্যেই দেশের সংরক্ষণের নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখানোর মনোভাব স্পষ্ট। সংরক্ষণ প্রক্রিয়া সংবিধানস্বীকৃত এবং নির্দিষ্ট আইনের অধীন। কোনো ব্যক্তি কিংবা সরকারের মনগড়া ধারণা বা ইচ্ছানুসারে তা কমানো কিংবা বাড়ানো যায় না। তার জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়।
এই নতুন রোস্টার পদ্ধতির বিপদের ছবিটা পরিষ্কার হল মাত্র কয়েক দিন আগে। ২০২৫ সালের শিক্ষক নিয়োগের ইন্টারভিউয়ের তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায়, বাংলা বিষয়ে দৃষ্টিহীনদের জন্য সংরক্ষিত আসনে মহিলাদের জন্য চিহ্নিত আসন মিলিয়ে মোট ৩২টি শূন্যপদের জন্য ইন্টারভিউতে ডাক পেয়েছেন ৪৮ জন। এঁদের মধ্যে ২০১৬ সালের প্যানেলভুক্ত চাকরিচ্যুত দৃষ্টিহীন শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৫ জন। বাকি সকলেই নতুন পরীক্ষার্থী। এছাড়া অসংরক্ষিত আসনে দৃষ্টিহীন শিক্ষকদের মধ্যে ডাক পেয়েছেন ১২ জন। অর্থাৎ বাংলায় নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ২০১৬ সালের দৃষ্টিহীন শিক্ষকদের ৬১ জনের মধ্যে মাত্র ২৯ জন ইন্টারভিউতে ডাক পেয়েছেন। বত্রিশ জন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষক আসন সংকোচনের ফলে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগই পেলেন না। ইতিহাস এবং ইংরেজির মত বিষয়গুলোতেও চিত্রটা একইরকম। অর্থাৎ কল্যাণবাবুর তত্ত্ব যে কতটা মনগড়া এবং ভিত্তিহীন, এই পরিসংখ্যান তা সহজেই প্রমাণ করে দিচ্ছে।
এই ঘটনা-পরম্পরা এক কঠোর বাস্তবতার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষকরা আরেক ধরনের অবিচারের শিকার হয়েছেন। যেখানে সুপ্রিম কোর্ট তার নির্দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করেছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদের সংরক্ষিত আসন যথেচ্ছভাবে কমিয়ে এক চরম বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যা শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণেই তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোতে এমন বেশকিছু ব্যক্তির নাম প্রকাশিত হয়েছে যাঁদের নাম ২০১৬ সালের সংরক্ষিত আসনের তালিকায় ছিল না। তাঁরা অভিজ্ঞতার জন্য নম্বর পেয়েছেন। এঁরা কারা? বেশকিছু সম্ভাবনার কথা মনে আসে। এঁরা হয়ত শিক্ষকতা করতেন, কিন্তু প্রতিবন্ধী হিসাবে পরিচয় দেননি। এবার নতুন করে প্রতিবন্ধী হিসাবে আবেদন করেছেন। অথবা ২০১৬ সালের নিয়োগের সঙ্গে এঁদের কোনো সম্পর্ক নেই, অন্য কোনো সময়ে কিংবা বেসরকারি ক্ষেত্রে তাঁরা শিক্ষকতা করেছেন। আবার এমনও হতে পারে যে আবেদন করার সময়ে তাঁরা ভুল তথ্য দিয়েছেন। স্কুলে নিয়োগের ক্ষেত্রে যেভাবে দুর্নীতির প্রশ্ন জড়িয়ে আছে, তাতে এই সম্ভাবনাগুলোকে নির্বিচারে গ্রহণ করার ভরসা আমরা পাচ্ছি না। বরং যথাযথ নথি পরীক্ষা এবং মেডিকাল চেকআপের মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা যাচাই করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাটাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বলে মনে হয়।
২০১৬ সালে ভারতে নতুন প্রতিবন্ধী আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের জন্য আসন সংরক্ষণ ৩% থেকে বেড়ে হয়েছে ৪%। এই নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আরেকটি নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে। চলাফেরা সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা আছে, এমন মানুষদের জন্য সংরক্ষিত আসনটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষের জন্য। অর্থাৎ একজন চলাফেরা সংক্রান্ত (Locomotor) প্রতিবন্ধী মানুষ যদি তফসিলি জাতিভুক্ত হন, তবেই তিনি এই সংরক্ষণের সুযোগ পাবেন। ফলে ২০১৬ সালের চলাফেরা সংক্রান্ত প্রতিবন্ধী শিক্ষক যাঁরা তফসিলি জাতিভুক্ত নন, তাঁরা এবারের পরীক্ষায় সংরক্ষণের সুযোগ পাননি।
আরো পড়ুন এসএসসি: প্রতিবন্ধী শিক্ষক, পরীক্ষার্থীরাও বিপন্ন
অন্যদিকে সংরক্ষিত আসনের নামকরণ নিয়েও একটি ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি তৈরি করেছে সরকার। আগে OH অর্থে Orthopedically Handicapped শব্দবন্ধটি বোঝানো হত। ২০১৬ সালের নতুন আইনে এই শব্দবন্ধ বদলে LD বা Locomotor Disability করে দেওয়া হয়েছে। অথচ এবারের শূন্য পদের তালিকায় প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রে OH, LD দুটিই রয়েছে। ফলে রাজ্যের অসংখ্য প্রতিবন্ধী মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং ভুল ক্যাটেগরিতে আবেদন করেছেন। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে একাধিকবার এসএসসির কাছে দরবার করা হলেও কর্তৃপক্ষ সদুত্তর দেননি। ভুল আবেদনের জন্য অনেক পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও ইন্টারভিউতে যাওয়ার সুযোগ পাননি।
দশ বছর পর নতুন করে স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে বিরাট প্রত্যাশা এই রাজ্যের চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল, তার অংশ ছিলেন ২০১৬ সালের প্যানেলভুক্ত প্রতিবন্ধী শিক্ষকরাও। সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি এবং আদালতের বিচারে যাঁদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে পাওয়া চাকরি অন্যায়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে, সেইসব প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত আসন কমানোর মাধ্যমে দ্বিতীয়বার যে অন্যায় করছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, তার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই লড়ছে প্রতিবন্ধীদের নানা সামাজিক সংগঠন। কিন্তু এই দ্বিমুখী আক্রমণের সামনে এই রাজ্যের প্রতিবন্ধী শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীরা সংখ্যাগত শক্তির বিচারে নগণ্য। তাঁদের ভরসা দেশের আইন, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং যুক্তিবাদী ও শিক্ষানুরাগী সংবেদনশীল মানুষের সর্বাত্মক সমর্থন। আমরা তাকিয়ে আছি সেদিকেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








