যীশু দেবনাথ

গত ৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এ রাজ্যের প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হওয়ার পর প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। কোর্টের নির্দেশে অন্যান্যদের সঙ্গে চাকরি হারিয়েছেন কয়েকশো প্রতিবন্ধী শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীও। প্রতিবন্ধীদের কাজের সুযোগের অভাব, সমাজে প্রতিবন্ধীদের কর্মদক্ষতা সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারণা, সর্বোপরি দেশজুড়ে বেকারত্বের ক্রমবর্ধমান বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে এত প্রতিবন্ধী মানুষের চাকরি চলে যাওয়ার ঘটনাকে আমরা দেখছি একটা বৃহত্তর মানবিক বিপর্যয় হিসাবেই। দৃষ্টিহীন শিক্ষকদের সংগঠন অল বেঙ্গল ব্লাইন্ড টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের নির্দেশের প্রেক্ষিতে একটি রিভিউ পিটিশন ফাইল করে। আইনজীবীদের পরামর্শে এ রাজ্যের প্রাচীনতম দৃষ্টিহীনদের সংগঠন ব্লাইন্ড পার্সন্স অ্যাসোসিয়েশন তাঁদের পাঁচজন সদস্যকে দিয়ে ব্যক্তিগতভাবেও একটি রিভিউ পিটিশন দাখিল করায়। কিন্তু গত ৫ অগাস্ট সুপ্রিম কোর্টে এই দুটি রিভিউ পিটিশনসহ সমস্ত আবেদন খারিজ হয়ে গেছে।

আদালতের নির্দেশে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাতেও রয়েছে বিস্তর ফাঁকি। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসা থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধীদের জন্য আসন সংরক্ষণ – সব ক্ষেত্রেই রয়েছে বিস্তর জটিলতা আর অনিশ্চয়তা। এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ২০১৬ সালের তুলনায় আসন সংখ্যা দ্বিগুণের চেয়েও বেড়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা কমে গেছে বহুগুণ। কারণ হিসাবে স্কুল সার্ভিস কমিশন ও মধ্যশিক্ষা পর্ষদ জানাচ্ছে – ২০১৬ সালে প্রত্যেক স্কুলে নিজস্ব রোস্টার অনুসরণ করা হত। তার ফলে প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের জন্য আসন সংরক্ষণ যা ছিল, তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন শতাংশের চেয়েও বেশি। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রীয় রোস্টার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ফলে মোট আসনের নিরিখে প্রতিবন্ধীদের জন্য ৪% সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ২০১৬ সালের তুলনায় বহুগুণ কমে গেছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যেমন বাংলায় ২০১৬ সালে মোট আসন ছিল ১,৩৭৫। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩,০২৪। ২০১৬ সালের পুরনো রোস্টার ব্যবস্থা অনুসারে দৃষ্টিহীনদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল ৭৬, নতুন রোস্টার ব্যবস্থা মেনে দৃষ্টিহীনদের জন্য ১% আসন সংরক্ষণ করার ফলে তা কমে হয়েছে ৩২। প্রত্যেকটি বিষয়ের ক্ষেত্রেই এইরকমভাবে মোট আসন বাড়লেও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন কমে গেছে বহুগুণ। এর ফলে ২০১৬ সালে যেসব প্রতিবন্ধী শিক্ষক চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ে যাবেন। নতুন পরীক্ষার্থীদের কথা তো বলাই বাহুল্য।

এই বিষয়টিকে সামনে রেখে ব্লাইন্ড পার্সন্স অ্যাসোসিয়েশন কলকাতা হাইকোর্টে আরেকটি মামলা দায়ের করেছে। আসন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মামলাকারীদের বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালের সমস্ত চাকরিচ্যুত শিক্ষক, যাঁদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির কোনো প্রমাণ মেলেনি, তাঁদের নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই নির্দেশ মানতে হলে ২০১৬ সালের শিক্ষকদের পদগুলোকে পুরনো রোস্টার অনুসারে সংরক্ষিত রাখতে হবে। এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নতুন করে যেসব শিক্ষকের পদ যুক্ত হল, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন রোস্টার পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। সহজ কথায়, ২০১৬ সালে যত আসন সংরক্ষিত ছিল, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তা কমানো যাবে না।

আরো পড়ুন স্পেশাল স্কুলে দৃষ্টিহীন শিশুর মৃত্যু: আমাদের অবহেলা

এছাড়া দৃষ্টিহীন পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনুলেখকের বিষয়ে স্কুল সার্ভিস কমিশন কোনো নির্দেশিকা প্রকাশ করেনি। ব্লাইন্ড পার্সন্স অ্যাসোসিয়েশন সহ কয়েকটি সংগঠন স্মারকলিপি প্রদানের পর অনুলেখকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, তাতেও অস্পষ্টতা ছিল। কমিশনের আঞ্চলিক দফতরগুলো পরীক্ষার্থীদের অনুলেখককে সঙ্গে করে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করার জন্য পরীক্ষার্থীদের বাধ্য করছিল। গত ২৫ অগাস্ট ব্লাইন্ড পার্সন্স অ্যাসোসিয়েশন ও ফোরাম ফর স্টুডেন্টস উইথ ডিসেবিলিটিজের নেতৃত্বে শতাধিক প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থী এর প্রতিবাদে সেন্ট্রাল স্কুল সার্ভিস কমিশনের দফতরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদারের কাছে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি দল স্মারকলিপি দিয়ে দাবি করে – অনুলেখক গ্রহণের ক্ষেত্রে তাকে সঙ্গে নিয়ে আসার নিয়মটি অযৌক্তিক এবং এর ফলে পরীক্ষার্থীরা হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। এই নিয়ম বাতিল করতে হবে। আগাম অনুমতি গ্রহণের পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রেই অনুলেখকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরিচয় যাচাই করে পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

অনুলেখক খুঁজে পেতে পরীক্ষার্থীদের প্রায়ই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সেই কারণে বেশ কিছু কেন্দ্রীয় পরীক্ষা গ্রহণকারী সংস্থা পরীক্ষার্থীদের অনুলেখক দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এ বিষয়ে বেশকিছু সরকারি নির্দেশিকাও আছে। বিক্ষোভকারীরা দাবি জানান, স্কুল সার্ভিস কমিশনকেও প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের অনুলেখক জোগানোর দায়িত্ব নিতে হবে। চেয়ারম্যান অনুলেখকের অনুমতি গ্রহণের ক্ষেত্রে তাকে সঙ্গে নিয়ে আসার নিয়মের অযৌক্তিকতার ব্যাপারে সহমত হন এবং বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এই নিয়ম পরিবর্তন করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে পরিকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে পরীক্ষা কেন্দ্রে অনুলেখককে অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন না বলে জানান। এক্ষেত্রে পরীক্ষার্থী যাতে যে কোনো নিকটবর্তী আঞ্চলিক দফতরে গিয়ে অনুলেখকের অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। কমিশনের পক্ষ থেকে অনুলেখকের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নেওয়ার দাবিও ন্যায্য বলে তিনি মেনে নেন।

২০১৬ সালের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (RCI) অনুমোদিত স্পেশাল বি এডকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এবারের নিয়োগে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারেও চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তিনি মৌখিকভাবে আন্দোলনকারীদের জানান, এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও RCI অনুমোদিত স্পেশাল বি এড ডিগ্রি স্বীকৃতি পাবে। এ বিষয়ে তিনি একটি সরকারি নথি উল্লেখ করেন, তবে আন্দোলনকারীদের তার কোনো কপি দেননি।

গত ২৭ অগাস্ট কমিশনের পক্ষ থেকে অনুলেখক গ্রহণের পদ্ধতি বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বেশকিছু ক্ষেত্রে আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। বিরাট সংখ্যক আসন সংকোচনের ফলে চাকরিচ্যুত প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের পুনর্বহালের সুযোগ প্রশ্নের মুখে। রাজ্যজুড়ে নকল প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেটের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির কথাও প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে শোনা যাচ্ছে। প্রতিবন্ধীদের জাতীয় পরিচয়পত্র (UDID card) দেওয়ায় সরকারের শিথিল মনোভাবের ফলে প্রতিবন্ধীদের চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়াটিও পরিচ্ছন্ন অবস্থায় নেই। এর ফলে প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে অপ্রতিবন্ধীদের ঘুরপথে সুযোগ করে দেওয়ার অপচেষ্টা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলো জোরালো আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্লাইন্ড পার্সন্স অ্যাসোসিয়েশন নতুন করে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও ভাবছে। তবে এই পর্বতপ্রমাণ বাধার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধীদের ন্যায্য আন্দোলনে জয়ী হতে প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সক্রিয়তা। আমরা তাকিয়ে আছি সেই দিকেই।

নিবন্ধকার প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.