বিশ্বজিৎ রায়

বৃহস্পতিবার শিক্ষকদের রক্তে লাল হল মহানগরীর রাজপথ। বিকাশ ভবনের সামনে প্রতিবাদরত শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীদের বর্বরোচিতভাবে লাঠিপেটা করল তৃণমূল সরকারের পুলিস। শিক্ষিকাদের উপর পুরুষ পুলিস দিয়ে নির্মমভাবে অত্যাচার করা হল। বহু শিক্ষক গুরুতর আহত হয়েছেন, বেশ কয়েকজনের মাথা ফেটেছে, পা ভেঙেছে, রক্ত ঝরেছে। পাশবিকভাবে নিরস্ত্র শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপর ৪-৫ ঘন্টা ধরে তাণ্ডব চালাল রাজ্য সরকারের পুলিস। কী অপরাধ এই মানুষগুলোর? তারা নাকি আইনভঙ্গ করেছেন। অথচ কত আইন রাজ্য সরকার নিজেই ভঙ্গ করে চলেছে। সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী একটা বিরাট দুর্নীতির চক্রকে আড়াল করার জন্য হাজার হাজার যোগ্য শিক্ষককে পথে বসিয়ে দিলেন। পশ্চিমবাংলার প্রায় ৯,০০০ মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের প্রায় ৭৮ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ ধংসের মুখে ঠেলে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রকৃতপক্ষে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন।

দাবি আদায়ের জন্য রাজপথকেই বেছে নেওয়ায় প্রতিবাদী শিক্ষকদের অভিবাদন জানাই। হাজার হাজার শিক্ষক বিকাশ ভবন অভিযান করে রাজ্য সরকারের শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির আঁতুড় ঘরে যেমন সজোরে ধাক্কা মেরেছেন, তেমন গোটা পশ্চিমবাংলার ছাত্র জনতার অভিমুখটাকেও রাজপথের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। ক্ষমতা দখলের নীতিহীন নোংরা রাজনীতির বিপরীতে এটাই আজ বিকল্প রাজনীতি, জনতার রাজনীতি। এই আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়ানো উচিত রাজ্যের আমজনতার। এটাই সময়ের আহ্বান।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গত ৩ এপ্রিল নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার পরই রাজ্যজুড়ে কান্নার রোল ওঠে। ২০১৬ সালে এসএসসি পাশ করে নিয়োগ পাওয়া ২৬,০০০ শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়। সকলেই টিভির পর্দায় দেখেছেন – বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় সাড়া জাগানো ফল করে আসা শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও চাকরি গেছে। বিষয়টা তো কেবল জীবন-জীবিকার নয়, মর্যাদারও। শিক্ষক নিয়োগে রাজ্য সরকারের নেতা মন্ত্রী আমলাদের দুর্নীতির কারণে হাজার হাজার শিক্ষকের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ছাত্রছাত্রীদের আদালতের রায়ে বিতাড়িত শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতেও দেখা গেছে। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে একটা স্কুলের সঙ্গে গড়ে ওঠা মর্যাদার সম্পর্ক মুছে গেল এক কলমের খোঁচায়। বাকরুদ্ধ প্রধান শিক্ষকের গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ার দৃশ্যও আমরা দেখেছি। কারণ রাজ্য সরকারের দুর্নীতির কারণে সুপ্রিম কোর্ট যাঁদের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে, সেই শিক্ষকরাই বহু প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে কয়েক বছর ধরে ওই স্কুলে মানুষ গড়ার কাজ করছিলেন। পরদিন থেকে তাঁরা আর স্কুলে আসতে পারবেন না। কিন্তু এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হল কেন?

যাঁরা দুর্নীতি করে নিযুক্ত হয়েছেন এবং সেই দুর্নীতির সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের চিহ্নিত না করে, যোগ্যদেরও চাকরি বাতিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কি কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায়? হাজার হাজার যোগ্য শিক্ষকের চাকরি বাতিলের মধ্য দিয়ে যে সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার সম্পূর্ণ দায় রাজ্য সরকারের। শিক্ষকহীনতার কারণে কয়েক হাজার স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগ, বাণিজ্য বিভাগ, কলা বিভাগের পঠনপাঠন বন্ধ হওয়ার মুখে। ফলে এই স্কুলগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। সরকারি নিয়োগে দুর্নীতি হলে তার দায় সরকার কী করে এড়িয়ে যেতে পারে? দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির দাবি করা এবং চূড়ান্ত অন্যায় ও অমানবিকতার শিকার যোগ্য শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারি স্কুলশিক্ষাকে রক্ষা করা আজ খুব জরুরি।

আগের সরকারের আমল থেকেই সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্জলি যাত্রা শুরু হয়েছে। আগেকার সমস্ত শিক্ষানীতির মতই জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এবং রাজ্য শিক্ষানীতি ২০২৩ সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। প্রতিবছর শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ফি বাড়ছে। পড়াশোনার খরচ বাড়ছে অথচ সাধারণ পরিবারগুলোর আয় বাড়ছে না। রাজ্যের সরকারি স্কুলে জুতো, ব্যাগ, সাইকেল বিতরণ করা নিয়ে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, কিন্তু স্কুলে পড়াশোনার জন্য যা প্রয়োজন, সেই স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ করছে না সরকার। নতুন নিয়োগ কার্যত বন্ধ, তার উপর এতবছর চাকরি করা হাজার হাজার যোগ্য শিক্ষকের চাকরিও বাতিল হয়ে গেল। বহু স্কুল চলছে আংশিক সময়ের শিক্ষক দিয়ে। বহু স্কুল ধুঁকছে পরিকাঠামোর অভাবে। স্কুলবাড়ির অবস্থা খারাপ, উপযুক্ত গবেষণাগারে নেই, গ্রন্থাগার নেই, পানীয় জল নেই, বাথরুম নেই। সরকারি স্কুলে পাশ-ফেল নেই, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে চালু হয়েছে সেমিস্টার। এতে ছাত্রছাত্রীদের শেখার সুযোগ যথেষ্ট কম। তার উপর অবৈজ্ঞানিক পাঠ্যক্রম, ইতিহাস বিকৃতি ইত্যাদি সামগ্রিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যে রাজ্যে ২৬,০০০ চাকরি বাতিলের ফলে স্কুলশিক্ষায় যে সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার সমাধান হিসাবে উচ্চশিক্ষা দফতর স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস্টার মডেলে পঠনপাঠন চালানোর প্রস্তাব রেখেছে। এ আসলে কেন্দ্রের জাতীয় শিক্ষানীতির কার্বন কপি। বস্তুত রাজ্য সরকার শিক্ষাব্যবস্থার কোনো দায় না নিয়ে শূন্যপদে নিয়োগ না করে একদিকে স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক চালু করার পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে ক্লাস্টার মডেলের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা করতে চাইছে যাতে এক স্কুলে কোনো বিষয়ের শিক্ষক না থাকলে সেই বিষয় পড়তে ছাত্রছাত্রীদের অন্য স্কুলে যাওয়া বা শিক্ষকদের অন্য স্কুলে গিয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করছে। অর্থাৎ এত চাকরি বাতিলের ফলে জনগণের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও কমবে এবং বেসরকারি শিক্ষার প্রতি টান বাড়বে।

এখন প্রশ্ন হল, শিক্ষাক্ষেত্রের এই দুর্নীতি, বেসরকারিকরণের নীল নকশা এবং শিক্ষার বুনিয়াদ ধ্বংস করার পরিকল্পনা কি কেবল এই রাজ্যে? পাশের রাজ্য ত্রিপুরার দিকে তাকান। ওই রাজ্যে সিপিএম সরকারের আমলে নিয়োগে অনিয়মের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ১০,০০০ চাকরি বাতিল হয় ২০১৭ সালে। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশেও বিজেপি সরকারের দুর্নীতির ফলে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে ৬৯,০০০ শিক্ষকের চাকরি চলে গেছে। গতবছর সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে নিট পরীক্ষা নিয়ে যে বিরাট দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তাও আমরা জানি।

আরো পড়ুন একেবারে নিট দুর্নীতি, একটুও জল মেশানো নেই

এই পরিস্থিতিতে উচ্চবিত্তরা তো বটেই, সাধ্যের বাইরে গিয়ে মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরাও সন্তানকে পাঠাচ্ছেন বেসরকারি স্কুলে, কমছে সরকারি স্কুলের ছাত্রসংখ্যা। আবার এই ছাত্র কমে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে তুলে দেওয়া হচ্ছে সরকারি স্কুল। এভাবেই একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমাদের আশপাশের বহু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল। আমাদের করের টাকায়, সমাজের শিক্ষাপ্রেমী মানুষদের দেওয়া জায়গা এবং শ্রমের উপর ভিত্তি করে যে স্কুলগুলো গড়ে উঠেছিল, প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেসব স্কুলে পড়াশোনা শিখেছে, এ হল সেইসব স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি চক্রান্ত।

এখন সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা করার একমাত্র পথ আন্দোলন। দেশের সমস্ত শিক্ষাঙ্গন জ্ঞানচর্চার জন্য। সেখানে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের পদচারণা মেনে নেওয়া যায় না। তাই প্রয়োজন সংগঠিত আন্দোলন, ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। জনগণের করের টাকায় জনগণের জন্য গড়ে ওঠা সরকারি স্কুলগুলোকে যদি সরকারই রক্ষা না করে, তাহলে সরকারের দরকার কী? ভোটে জিতে কর্পোরেটের সেবা করা, নেতা মন্ত্রী আমলাদের আখের গোছানোর জন্যই কি সরকার গঠন? এই প্রশ্ন আজ তোলা দরকার। যোগ্য শিক্ষকদের স্কুলে ফেরানো, দুর্নীতিগ্রস্তদের কঠোর শাস্তি, সমস্ত শূন্যপদে নিয়োগসহ সামগ্রিক সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা করতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.