আঠারোর স্পর্ধা বা একুশের দীপ্তি নিয়ে আমাদের থরোথরো আবেগের অন্ত নেই। মানসিক স্বাস্থ্যের কথা মধ্যবিত্ত কার্পেটের বাইরে খানিক বেরিয়েছে বটে, কিন্তু তাও রয়েসয়ে, ঢেকেঢুকে। মা-বাবা, শিক্ষক যতদূর ভাবছেন বয়ঃসন্ধির ভবিষ্যৎকাল নিয়ে, বর্তমান ততই আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী হয়ে রয়ে যাচ্ছে যেন। ‘তেরো-চৌদ্দের’ যে বালাইয়ের সমব্যথী হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ছুটি’ গল্পে, ইতিহাস সাক্ষী, তেমন স্নেহশীল বিটপ বালকজীবনে বিরল। সচেতনভাবেই ‘বালকজীবন’ বলছি। কারণ বয়ঃসন্ধির মেয়েবেলা যতটা গুরুত্ব পায় – প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হলেও – ‘টিন-এজ’ পুরুষ নিয়ে আলোচনা তার থেকে চোখে পড়ার মত কম। স্বরভঙ্গ নিয়ে দু-চার কথা, ‘সদ্য শেখা গালাগালি’ নিয়ে কিছু মেদুর উচ্চারণ আর যৌনতার উন্মেষ সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনা যে হয় না, তা নয়। কিন্তু তাতে বয়ঃসন্ধির পুরুষের বিপন্নতা, তার অন্যকে বিপন্ন করে নিজের সত্তার বৈধতা প্রমাণ করার মারণপ্রয়াস বা ক্ষেত্রবিশেষে নিজের ক্ষতিসাধন করে নিজের কাছের লোকেদের কাছে – যাদের কাছ থেকে সে কোনো দুর্জ্ঞেয় কারণে দূরে সরে যাচ্ছে – সেই তাদের কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠার মরিয়া গা-জোয়ারি নিয়ে কথা-কবিতা-সভা কোথায়? তপ্ত দুপুরে রঞ্জনার বারান্দায় আসার অপেক্ষা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে নয়ের দশকের কিশোর, মাঝবয়সে এসে তারই মনে হয় – শুধু ধর্ম নয়, বারান্দাবাড়ি আর ভাঙা সাইকেলের শ্রেণিবৈষম্যও নয়, পরিবার ও সমাজের দ্বারা জ্যাঠামোয় অভিযুক্ত হওয়ার আতঙ্কও বিষম হয়ে দেখা দিয়েছিল সেই অসহ্য বিকেলবেলায়।

দিন পালটেছে স্বাভাবিক নিয়মেই। স্কুলবাসের ধোঁয়াঢাকা পথ চেয়ে থাকা বিষণ্ণ কিশোর ফুটবল লাথানো আর দুর্লভ চটিবইয়ে প্রশমন খোঁজে না আর। বস্তুত, প্রশমন তাকে আর খুঁজতে হয় না। প্রশমনই তাকে খুঁজে নেয়। নিভৃত চার দেয়ালের কোণে মোবাইলের নীল আলো তার চাপল্য, আদরপিয়াসী নরম, বিপন্ন হিংস্রতাকে আশ্রয় দেয়। কোনোকিছুর আবডাল তাতে নেই, যে ভাষায় সেখানে কথা হয় তাতে প্রবেশাধিকারও নেই জেন-এক্স বা মিলেনিয়াল মা-বাবার। ক্রিপ্টো-ডিজিটাল মৃত্তিকায় টিন-এজ প্রেম, খিস্তি, সুরক্ষাহীনতা, ঈর্ষা ও যৌন হিংসা ঘাস হয়ে আসে এই গহীন একুশ শতকে। খেলার মাঠ ধূ ধূ করে, বন্ধু দেখলে মুখচোখে আলো ফোটে না আর, ছাদ-ক্রিকেটের দাপাদাপি বা গলির ফুটবলের আদিম রূপকথা নিয়ে পুরনো পাড়াগুলো স্থবির হয়ে থাকে। এবাড়ি থেকে ওবাড়ি, এ ফ্ল্যাট থেকে ও ফ্ল্যাটে মোবাইল গেমের ইনভিটেশন বা ইন্সটা রিলের নোটিফিকেশনের যান্ত্রিক বিপ শুধু বেজে যায় সতর্ক সাইরেনের মত।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এরকমই এক কোকিলের কেশে কেশে রক্ত তোলা বসন্তে অ্যাডলেসেন্স আসে। জলছবি, ঝালমুড়ি, মাধ্যমিকের বাংলা মাধ্যম এখন অস্তাচলগামী, পাড়া বলে সেভাবে কিছুর অস্তিত্বই নেই যেন, শিশু ও মা-বাবা কেবল অন্তহীন কেরিয়ার-খোঁজ নিয়ে ভীড় জমায় দামি থেকে সাধ্যাতীত হয়ে চলা স্কুল, কঠোরভাবে নৈর্ব্যক্তিক আইআইটি, নীট পাঠশালে। ছেলেমেয়েকে দেখে নিজের ছোটবেলা চেনা যায় না। তাদের চাহিদার সঙ্গেও মিল খায় না যেন কিছুই। সাধ্য, এ যাবৎ লালিত কিছু বোধ, খানিক লজ্জা ঘেন্নাকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে সহকর্মীর বছর ষোলর সন্তান জানিয়ে দিয়েছে – বাবা-মায়ের সঙ্গে সে গোয়া যাবে একটাই শর্তে। যদি তাকে বিচে বিকিনি পরে বিয়ার খেতে বাধা না দেওয়া হয়। বন্ধুর ফোন আসে রাত করে। বিটিএস ব্যান্ডের সঙ্গে আলাপ করতে কোরিয়া যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে পাড়ার নবম শ্রেণি পাখায় ওড়না বেঁধে ঝুলে পড়ল আজ বিকেলেই। আট বছরের পুটকে, বাবার সঙ্গে ক্রিকেট খেলায় জেতা উদযাপন করছে বাপের দিকেই মধ্যমা নির্দেশ করে। মুখেও একপদী, দ্বিপদী শব্দব্রহ্ম। খাবি খাওয়া মা-বাপ আকুল জিজ্ঞাসে, ‘কোথা থেকে? কীভাবে?’ এলোমেলো উত্তর ওড়ে – পুলকারের দাদা; স্কুলের বন্ধু যার হাতে চব্বিশ ঘন্টা একটা স্মার্টফোন গুঁজে দিয়ে মা-বাবা দরজা এঁটে ডিভোর্সগন্ধী ঝগড়ায় মেতে আছে গত একবছরেরও বেশি সময়; ক্লাসের সেই ‘ডেয়ারডেভিল’ ছেলেটা যে কাল বাড়ির ওয়াই-ফাইয়ের সদ্ব্যবহার করে বীর সিং দেখেছে দু’দুবার…।

জেমি মিলারের প্রথম বিশ্বের থেকে খুব দূরে নেই আমাদের তৃতীয় বিশ্বের গ্রাম-মফস্বলও। ক্লাস শেষের কলেজমাঠে চৈত্রের হাওয়া পাক খায়। কিছু বছর আগেও ফুটবলের দাপটে শেষ ক্লাসে নিজের গলা শুনতেই বেগ পেতে হত। এখন কলেজে কলেজে জাতীয় শিক্ষানীতি-জারিত কালবেলা। ছেলেমেয়ে খুঁজে পাওয়াই যায় না বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার দিনেও। মাঠে খেলাও প্রায়-অতীত। বেরনোর মুখে গাছের বেদিতে পাঁচ ছোকরার জটলা দেখতে পাই। এগিয়ে গেলে বোঝা যায় – এরা কেউ আড্ডা দিচ্ছে না, আগামী মিছিলের প্ল্যান করছে না, এমনকি একসাথে ফোনেও কিছু দেখছে-টেখছে না। সবার হাতে যার যার ফোন। চলছে অন্তহীন স্ক্রোলিং, গেম পেটানো এবং যা সবচেয়ে ভয়াবহ, চলছে ক্রিকেট-জুয়া। দুসপ্তাহের বেশি ক্লাসে না আসা মোটের উপর ভাল ছাত্রের খোঁজ করি। ভয় হয়, এ-ও কি বেরিয়ে গেল সোনার গয়নার কারিগর হয়ে বা রাজমিস্ত্রির কাজে? উত্তরে অন্ধকার আরও জমাট বাঁধে। গেমিং পোর্টালের ধাক্কায় তার বিরাট টাকা ধার। পরপর হেরেছে সে আইপিএলের শুরু থেকেই। ‘পালিয়ে গেছে স্যার। বাড়িতে খুঁজতে লোক এসেছিল। বাবা-মাকে শাসিয়ে গেছে।’

সাড়ে দশটার ক্লাসেও সব ছেলেমেয়ে আসে না। সারারাত ফোন-টোন ঘেঁটে ঘুম ভাঙে না তাড়াতাড়ি। যে কজন থাকে, তাদের কথা ভেবে সিঁড়ি ভাঙি। দোতলায় উঠে মধ্যবয়স ভির্মি খায়। আপাত শান্ত, পড়াশুনোর মধ্যে থাকা মেয়েটা ফোন ক্যামেরার সামনে ওড়না দুলিয়ে বানিয়ে নিচ্ছে ভাইরালকামী রিল। দেখতে পেয়ে মাটিতে মিশে যায় যেন। ‘কেন করছিস এরকম? শখে?’ চোখ ফেটে জল যা বলে তাতে বুঝি, এ সভ্যতায় আমরা তামাদি হয়ে যাচ্ছি ক্রমে। ‘আমার দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না স্যার। খালি বলে, আমি নাকি বোরিং, শুকনো-পাকানো। রোজ বলে স্যার। এই দেখুন ইন্সটায় একটা ছবি দিয়েছি, নীচে রোনাল্ডোর ছবি রিপ্লাই দিয়েছে।’ ইংরেজ ক্লাবের জার্সিতে রোনাল্ডোর সিউ-সেলিব্রশনের ছবি দেখি। কিছুই মাথায় ঢোকে না। গিরিবর্ত্মের মত হা হা করা প্রজন্ম-ব্যবধানের ওপার থেকে মেয়ে বলে চলে, ‘তাতে সবাই লাভ দিল স্যার। ক্লাসের সবাই। ওদের দেখিয়ে দেব স্যার….আমারও রিলে লাখ ভিউ পেয়ে দেখিয়ে দেব…’ বেকুব দশা কাটায় সদ্য কাজে যোগ দেওয়া সহকর্মী। ‘বুঝলে না দাদা? ম্যাঞ্চেস্টার…’ অ্যান্টি-র‍্যাগিং, অ্যান্টি-গ্রিভান্সের অফিস-আলমারির দিকে তাকিয়ে ফিচেল হাসে গাফাম-নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব।

অ্যাডলেসেন্স ওয়েব সিরিজ চেনায়, পচন শুধু সন্ততির নয়। আট আনা দায় যদি ভোগবাদের হয়; তবে পচনের আট আনা দায় এই আমাদের, মা-বাবাদেরও। সরকারি শিক্ষার অন্তর্জলিযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক বড়লোকের সাথে গা-ঘষাঘষি অনিবার্য হয়ে ওঠে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত শিশুরও। আবদারের উদ্বর্তনও হতে থাকে তার তালে তালে। আট-নবছর স্পষ্ট জানায় তার পছন্দের হাতঘড়ির ব্র‍্যান্ড, জামার নাম, কোন থিমে সাজবে তার আগামী জন্মদিনের পার্টির জমক, মায় কোন মেক-আপ সেট না কিনলে এই মুহূর্তেই বৃথা হয়ে যাচ্ছে তার যাপন। এমনই এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে সে দেখে, তার জন্মদিন কাঁপিয়ে বাজছে চটুল এড শিরান। প্রশ্রয়ী হেসে মা-বাবা জানাচ্ছেন, ‘ও তো সব জানে, সব বোঝে, ভীষণ ইন্টেলিজেন্ট!’ স্কুলবাসে একটু গোবেচারা ধরনের কাউকে দেখলে লালায়িত দুর্দম বালকের অনুজ্ঞা ‘চেক হার কালার! অর এল্স…’ গোবেচারার প্রাণান্ত হয়। তেরো-চোদ্দর হ্যোয়াটস্যাপ গ্রুপে ছক কষা হতে থাকে, কে হবে আগামী বিডিএসএম-এর চাঁদমারি। নিজের না পাওয়ার কষ্ট থেকে নিজের সন্তানকে দূরে রাখতে চাওয়ার ইপ্সা, মুখের কথা না ফেলতে হাতে জিনিস দিতে চাওয়ার ‘হিউব্রিস’ আর সক্রিয় ‘পেরেন্টিং’-এর ঘাম-ঝরানো এড়াতে হাতে এগিয়ে দেওয়া তত্ত্বাবধানহীন ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, কম্পিউটার – এই ত্র‍্যহস্পর্শে শিশু-কিশোরের আঙুলের ডগায় এখন ‘বুলিইং’-এর গাণ্ডীব, বিকৃত যৌনতার শরযোজনা, এমনকি অপরাধপ্রবণতার ব্রহ্মাস্ত্রও। এই ব্যূহ, চক্র, তির, তিরন্দাজের মধ্যে কোমলমতির বর্ম হয়ে ওঠার কথা ছিল যে মা-বাবার, তাদের তো এই মারণকাল কখনো বাধ্য করছে দেড়লাখি স্কুলের মাইনে জোগাড় করতে রাতবিরেতে বাড়ি ফিরতে, কখনো তাদেরই টেনে নিচ্ছে ভোগলালসার অন্ধকূপে। নির্মম একাকিত্বে শিশু-কিশোরের ভূগোল টলমল করায় পর্নো সাইট, জুয়াখেলা, বুলিইং, ব্লু হোয়েলের অচিরাচরিত মাধ্যাকর্ষণ।

টিন-এজ বা ইয়াং অ্যাডাল্টদের এইসব সংকটের ফলিত রূপগুলো সামনে আসে আরও ভয়াবহভাবে। মাধ্যমিক স্তরে বেশ ভাল ফল করা ছেলেকে বাবা-মা বোঝাতেই পারছেন না যে আরও পড়াশোনা প্রয়োজন। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে – সে গেম খেলবে। ক্লাস সিক্স, সেভেন থেকে জন্মদিনের আবদার মেটানো এক্স বক্স, প্লেস্টেশন ছাপিয়ে তার হাতে এসে গেছে ঢাউস মনিটর, দানবীয় গেমিং কনসোল। বাড়িতে আসা অতিথি-অভ্যাগত তো দূরের কথা, বাবা-মায়ের সঙ্গেই সে কালেভদ্রে শব্দ বিনিময় করে। বোঝানো, বকুনি, শাসনের হুমকি – কিছুতেই কাজ হয় না। নিজের ঘরে কে ঢুকল, কে বেরোল – সবেতেই বেহুঁশ কিশোর কানে হেডফোন লাগিয়ে খেলে চালিয়ে যায় ভার্চুয়াল মারণযজ্ঞ। অবস্থা এমনই হয়ে দাঁড়ায় যে, সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলেও সে মলত্যাগের সময় পায় না। অগত্যা অসুস্থতা, ডাক্তার, চিকিৎসা এবং সুস্থ হওয়ামাত্র আবার সেই পুরনো কাজে ফেরা। কোনো বন্ধু নেই। দুনিয়ার কোনো কোণে থাকা মাল্টিপ্লেয়ার গেমের কো-অপ অবতারই তার বন্ধুশ্চসখা; শিবির পাল্টালে সে-ই আবার হয়ে উঠবে প্রবল শত্রুপক্ষ।

গেমিংয়ে টালমাটাল আরেক কিশোরের বাবা জানালেন, তাঁর ছেলেও লেখাপড়া ত্যাগের সিদ্ধান্তে অচল। বারো ক্লাসের পর ঘর বন্ধ থাকে দিনের পর দিন। খাবার দরজার বাইরে রেখে আসা হয়। ঘরের ভিতরে মেসেজ পাঠানো যায় কেবল। তার এক-দুই শব্দের উত্তর আসে বহুক্ষণ পর। তার খেলা গেমের অনলাইন স্ট্রিমিং করে সে স্বপ্ন দেখছে ল্যাম্বোর্গিনির। মনে পড়ে, এই সেই ছেলে, কিছু বছর আগে যার জন্মদিনের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে কানে এসেছিল বাবা-মায়ের শ্লাঘা, ‘টপ মডেলটাই নিতে হল। রিয়ার ওয়াইপার আছে ওর সব বন্ধুদের গাড়িতে। তাই ও তার নিচে কিছুতে মানলই না…”। সেখানে চার বাড়িতে বাসনমাজা, ঘরমোছার মাসমজুরি নিয়ে নিজের বকছাঁট চুল কাটা বাঁকা সোনার আংটিওলা ছেলের ফোনের ডাউনপেমেন্ট করছেন যে ঘর্মাক্ত মা, যাঁর মনে আস্থা আছে ‘ভিডিও করে পয়সা করবে বলেছে ছেলে’ – তাঁকে দোষ দেওয়ার জায়গাও তো কমে আসে।

অ্যাডলেসেন্স-এর তৃতীয় পর্ব বোধহয় আজকের দিনের অন্যতম কঠিন দৃশ্য-অভিজ্ঞতা। অনলাইন দুর্বিপাকে আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রায় অনপনেয়ভাবে যে আমরা হারাতে চলেছি, সেটাই ছত্রে ছত্রে যেন বোঝানো হল। মনোবিজ্ঞানের সবচেয়ে ঋজু, আধুনিক, ভয়ডরহীন পদ্ধতিও যেন বেসামাল হয়ে পড়ে ১৩ বছরের ছেলেটার সামনে। কীভাবে জট পেকে গেছে পুরুষতন্ত্র, যৌন হিংসা, বিপন্নতা এবং অন্যের ক্ষতি করে আত্মপ্রতিষ্ঠার রিরংসা ওই সদ্য শৈশব পেরনো মানুষটার মধ্যে, তার সমাধান তো দূর, সংকটটার দিকে তাকিয়েই বিহ্বল হয়ে থাকে শুশ্রূষার যাবতীয় ম্যানুয়াল। আসলে আমাদের চোখের সামনে, আমাদের ঘরের ভিতর থেকে আমাদের ছেলেমেয়েগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হল, হচ্ছে – এবং আমরা কিচ্ছুটি বুঝতে পারছি না, কিছু করা তো দূরস্থান। শেষ পর্বের একদম হেরে যাওয়া বাবা-মায়ের মত আমরা বেশিরভাগই বোধহয় আত্মপ্রবঞ্চনার মত করেই কেবল বলে যাব, ‘আমরা কী করতে পারতাম? যা চেয়েছিল, তাই দিয়েছিলাম। আমাদের তো ছোটবেলায় কিছু কেউ দেয়নি তেমন। আর সময়? সময় কী করে দিতাম? কখন শুনতাম তার গভীর ক্ষতের কথা, গান-কবিতা-নাটক-সিনেমা একসাথে করে তা নিরাময়ের চেষ্টা কখন করতাম? স্কুলের মাইনে, টিউটরের ফিজ, কোচিং সেন্টার, কলেজের জন্য টাকা জমাতে জমাতে তো দিন ঢলে যেত কখন, বুঝতেই পারিনি….’

আরো পড়ুন দহাড়: চিৎকার কর মেয়ে, দেখ কতদূর গলা যায়

রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক মরেছিল। কিন্তু তার মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে সে স্পষ্ট করে দিতে পেরেছিল যে তাকে হত্যার দায় এই ছুটিহীন নির্মম সাফল্যখেকো ব্যবস্থার। একালেও ফটিকের খবর কমবেশি টিভি, কাগজ খুললেই আসে। এই দুর্ভাগাদের কোনো ‘অকর্মণ্যভাবে ঘুরিয়া বেড়াইবার নদীতীর, দিনের মধ্যে যখন-তখন ঝাঁপ দিয়া পড়িয়া সাঁতার কাটিবার সেই সংকীর্ণ স্রোতস্বিনী’ ছিল না। ফলে তাদের সঙ্গে যে একটা বিরাট ফাঁকি হয়ে গেছে, তা তারা বুঝলই না। অগত্যা না পাওয়া আইফোন, বুলিইং-এ উত্যক্ত করা বা হওয়া, যৌন ঈর্ষা – এইসব কারণ দেখিয়ে এরা চলে যায়।

পরিবার থেকে রাষ্ট্র – সব্বাই খুশি। আসল কারণগুলো জেনে ফেললে, স্বীকার করে ফেললে আমাদের বড়দের ব্যর্থতাটাই তো বেআব্রু হয়ে পড়ে।

তা কি কখনো চাওয়া যায়?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.