জাতীয় মহিলা কমিশনের তথ্য অনুসারে ২০২৩ সালে ২৮,৮১১ জন মহিলা তাঁদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগ দাখিল করেছেন। এর ৫০ শতাংশের বেশি অভিযোগ এসেছে উত্তরপ্রদেশ থেকে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো যে তথ্য দেয়, সেখানেও উত্তরপ্রদেশের নাম নারী নির্যাতনের সংখ্যার নিরিখে থাকে একদম উপরে। উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকার একদিকে দাবি করে যে কোনো যৌন হেনস্থার মামলায় তারা অভিযুক্তর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রীর উপর যৌন নিগ্রহের ঘটনায় পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা আশ্চর্য করে।

২০২৩ সালের ১ নভেম্বর আইআইটি-বিএইচইউয়ের এক ছাত্রীকে তিনজন দুষ্কৃতী যৌন নির্যাতন করে, তার পোশাক খুলে নেওয়ার পর ভিডিও তোলে এবং সেই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়। এই কাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা তীব্র প্রতিবাদ করে, ফলে পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ঘটনার প্রায় দুমাস কেটে গেলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। ক্রমে প্রকাশ পায় যে এই তিনজন দুষ্কৃতী বিজেপির আইটি সেলের সদস্য। এমনকি এই ধর্ষণের ঘটনার পরেও তারা মধ্যপ্রদেশে গিয়ে বিজেপির হয়ে নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করেছে। একথাও প্রকাশ্যে আসে যে এই তিনজন দুষ্কৃতী এই ধরনের ঘটনা আগেও ঘটিয়েছে

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বুঝতে অসুবিধা হয় না, ধর্ষণের ঘটনার দীর্ঘ ৬০ দিন পরে গ্রেফতারের কারণ অবশ্যই তাদের রাজনৈতিক পরিচয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিজস্ব নির্বাচন কেন্দ্র বারাণসীর এই ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবশ্য মুখ খোলেননি। যেমন দেশের আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কেই খোলেন না। ক্রমশ সোশাল মিডিয়ায় দেখা যায় এই তিন দুষ্কৃতীর বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গে ছবি। তার মধ্যে রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানী এবং মোদী স্বয়ং। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় যে ব্রিজভূষণ সিংয়ের মতই এই ধর্ষকদেরও বাঁচানোর প্রক্রিয়া চলছে। স্মৃতি নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের ভয়ংকর ঘটনায় একেবারে স্পিকটি নট।

বারাণসীর এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার কতটা ভয়ংকর হতে পারে। মুখে তারা “বেটি বচাও বেটি পঢ়াও” স্লোগান দিলেও নিজের দলের সদস্যদের বাঁচানোর জন্য নারী নির্যাতনকে গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। তাহলে আমাদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, এদেশে নারীর নিরাপত্তা কোথায়?

আদিত্যনাথ সহ অন্যান্য বিজেপি নেতারা বারবার বলেছেন, উত্তরপ্রদেশ এখন মডেল রাজ্য। উত্তরপ্রদেশের আইনশৃঙ্খলাকে তাঁরা দেশের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করেছেন। বারাণসীর এই ধর্ষণের ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে অপরাধীদের মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও মোটরবাইকের নম্বর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বাইকের নম্বর জানা সত্ত্বেও পুলিশ যদি দুমাস সময় নেয় অপরাধীদের চিহ্নিত করতে, তাহলে শাসনব্যবস্থা কীভাবে চলছে তা স্পষ্টই বোঝা যায়।

এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকার এবং উত্তরপ্রদেশ সরকার ব্যস্ত অযোধ্যার রামমন্দির উদ্বোধন নিয়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম আমাদের নানারকমভাবে সেই খবর পরিবেশন করছে। কখনো আমরা মন্দির উদ্ঘাটনের নিমন্ত্রণ পত্র ছবি দেখছি, কখনো কারা নিমন্ত্রিত সেই তালিকা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এই গণধর্ষণের ঘটনা খবরের কাগজের পাতায় বা টিভি চ্যানেলে কলকে পাচ্ছে না। মহিলা কুস্তিগীরদের যৌন হেনস্থার প্রতিকার না পেয়ে যে খেলোয়াড়রা পুরস্কার ফেরত দিচ্ছেন, তাঁদের ব্যঙ্গ করেও নানারকম লেখালিখি চলছে। শুধু মেডেল কেন, টাকাপয়সা কেন ফেরত দিচ্ছেন না, সরকারি চাকরি কেন ছেড়ে দিচ্ছেন না ইত্যাদি তির্যক মন্তব্যে সোশাল মিডিয়া ভরে যাচ্ছে। সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলগুলোও যে বিজেপির মুখপাত্র হয়ে উঠেছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

আরো পড়ুন ভুল করেছেন সাক্ষী মালিক

২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লির গণধর্ষণ কাণ্ডের পর দেশের বহু সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে যোগ দিয়েছিলেন। বিজেপি সরকার আসার পর কিন্তু মানুষ যে কোনো প্রতিবাদকেই ভয় পেতে শিখেছে। সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নারী সংগঠন বা ছাত্র সংগঠনগুলোও যে খুব সদর্থক ভূমিকা নিতে পেরেছে এই ধরনের ঘটনায়, তা বলা যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলো এই মুহূর্তে সাধারণ নির্বাচন নিয়ে চিন্তিত। সব দলই কীভাবে ২০২৪ নির্বাচন নিয়ে ঘুঁটি সাজাবে সেই পরিকল্পনা চালাচ্ছে। ব্রিজভূষণ এবং বারাণসীর ছাত্রীকে ধর্ষণের এই ঘটনা – দুটোই আমাদের মতন সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে দেয় বিজেপি শাসনে নারীর নিরাপত্তার দাম কতটুকু।

লেখাপড়া বা খেলাধুলো করার স্বাধীনতা আমাদের দেশের মেয়েদের কাছে খুব সহজে আসেনি। অনেক লড়াই করে আমরা এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছি। বলাই বাহুল্য, কলেজ ক্যাম্পাসে বা খেলাধুলোর জগতে যদি এই ধরনের যৌন হেনস্থা চলতে থাকে, তাহলে মেয়েরাও কিছুদিন পরে খেলাধুলো বা উচ্চশিক্ষায় যোগ দিতে চাইবে না। কারণ প্রবৃত্তিগতভাবেই যে কোনো মানুষ আগে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবে। এবছর ভোট দেওয়ার সময়ে দেশের মেয়েরা কি মনে রাখবে যে বিজেপি শাসনে নারীর নিরাপত্তা নেই? ভারতীয় নারীদের কাছে ২০২৪ সালে আরও এক বড় প্রশ্ন, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও কি নারী সুরক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে? নারী উন্নয়ন থমকে গেলে সার্বিকভাবে সমাজের উন্নয়ন যে হবে না সেই বোধটুকুও কি আমরা স্বাধীনতার এতবছর পর ভুলে যেতে চলেছি?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.