অরুন্ধতী রায়কে শুধু লেখিকা বললে কিছুই বলা হয় না। তাঁর নামের সঙ্গে অনেক বিতর্ক জড়িয়ে থাকলেও, শুধু বিতর্কও তাঁর পরিচয় নয়। তাঁর পরিধি অনেক ব্যাপ্ত। তাঁর বহু প্রতীক্ষিত আত্মজীবনীমূলক লেখা, যা আবার খানিকটা তাঁর মায়ের জীবনী বললেও ভুল হয় না, সেই মাদার মেরি কামস টু মি ভারতে প্রকাশিত হল গত বছর অগাস্টের শেষাশেষি। এই লেখা সেই বইয়ের একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া বলা যায়।
মাদার মেরি, বা মেরি রয়, অত্যন্ত অনিচ্ছুকভাবেই জন্ম দিয়েছিলেন সুজানা অরুন্ধতীর। অরুন্ধতীর শৈশব থেকেই এই বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন তিনি নিজেই। মা বললেই যে স্টিরিওটিপিকাল ছবি ভারতীয় মননে ভেসে ওঠে, তার বিপ্রতীপে অবস্থান মেরি রয়ের। বারবার অরুন্ধতীর লেখায় ফুটে উঠেছে সেই ছবি। ঠিক এখানেই লেখকের জাদু। মায়ের ভয়ংকর বিষাক্ত ব্যবহারের সম্মুখীন হয়ে বেড়ে উঠেছেন যে মেয়ে, নিজের ছোটবেলার দৃশ্য নির্মাণে তাঁর ভূমিকা নিতান্তই নির্মোহ এক কথকের, যিনি নৈর্ব্যক্তিকভাবে সত্যকে তুলে ধরেন। একাধারে প্রবল ব্যক্তিত্বময়ী স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা, যিনি সেই যুগের কেরালার প্রায় মফস্বলে সহশিক্ষার জন্য লড়াই করেন, একার চেষ্টায় বোর্ডিং স্কুল তৈরি করেন, এমনকি সেখানে লিঙ্গসাম্যের প্রাথমিক পাঠও দেন, সিরিয় খ্রিস্টান মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে মা হিসাবে মেয়ে ও ছেলের প্রতি তীব্র রাগ পদে পদে প্রকাশ করেন, যা হয়ত কোনোভাবে, তাঁর দাম্পত্য সম্পর্কের এবং অন্যান্য পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা এবং অযাচিত সন্তানলাভের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একদিকে প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে স্কুল এবং তার ছাত্রছাত্রীদের আগলে রাখা, অন্যদিকে বিশেষ করে নিজের মেয়ের প্রতি ভয়াবহ বিরূপতা – মেরির এই দ্বৈত সত্তা অরুন্ধতীর কলমে জীবন্ত হয়ে উঠলেও, কোথাও মেরিকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায় না। সন্তানদের প্রতি তাঁর প্রবল উচ্চাশাজনিত ভয়াবহ দুর্ব্যবহার, অপশব্দ প্রয়োগ, এমনকি নির্মম শাস্তি কথাও অরুন্ধতী তুলে ধরেন। কিন্তু একটিবারের জন্যেও মেরির প্রবল ব্যক্তিত্ব, অনন্ত লড়াই এবং শক্তির প্রতি তাঁর অসীম শ্রদ্ধা এবং জীবন মৃত্যু পেরনো উথালপাথাল ভালোবাসাকে চিনে নিতে আবিষ্ট পাঠকের ভুল হয় না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মায়ের পাশাপাশি অরুন্ধতী শিল্পীর তুলিতে এঁকে চলেন নিজের জীবনচিত্র। নদী ও তার মাছেদের সঙ্গে বন্ধুত্বের শৈশব, কৈশোর থেকে শুরু করে তাঁর নিজের যৌবনের শুরুতে জীবিত ‘যিশু’-র সঙ্গে দেখা এবং দেখামাত্র প্রেম, মায়ের সংসার ছেড়ে এসে দিল্লিতে নতুন জীবনের সূচনা, আর্কিটেকচার স্কুল, হোস্টেল, বন্ধুত্ব, ছোট ছোট ঢেউ দিয়ে সাজানো তাঁর প্রথম যৌবনের গল্প। সেখানেও যদিও মিসেস রয় অনুপস্থিত এবং অরুন্ধতী বারবার চেষ্টা করেন নিজের জীবন নিজের মাপে তৈরি করতে, তবুও মেরি যেন আনাচেকানাচে থেকেই যান। তা সত্ত্বেও এই সময়টা অনেকটাই অরুন্ধতীর নিজের। সেই সময়ে তাঁর নিজস্ব যিশুর সঙ্গে একেবারে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে বিয়ে এবং দাম্পত্য জীবনের শুরু। পরে এই যিশুকেই অরুন্ধতী যখন ছেড়ে যাবেন অপরাধবোধে দ্রব উদাসীনতায়, জানবেন হয়ত যিশুর প্রতি এক ক্ষমাহীন ভুল করছেন। কিন্তু যেমন লীলা মজুমদার হলদে পাখির পালক বইতে লিখেছেন, সেই ছোটবেলাতেই অরুন্ধতীর গায়ে হলদে পাখির ডানার ছোঁয়া লেগেছিল। তাই মেরির মতই, শুধুমাত্র সংসার বা আপনজনের সম্পর্কে থিতু হওয়া তাঁর জন্য নয়। সেই ছোটবেলাতেই তাঁর একমাত্র মামা জি আইজাকের কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন ব্যর্থতার আনন্দ। সেই আনন্দ উপভোগ করতে শেখা মেয়ের জন্য ভালবাসার বাসাও কখনো কখনো বড্ড দম আটকানো হয়ে পড়ে। আর অরুন্ধতী, যিনি ছোট্ট বয়স থেকে মায়ের নিঃশ্বাস আটকে আসাকে ভয় পেয়েছেন, তাঁর তো বাসা ছেড়ে উড়ে যাওয়াই নিয়তি।
সেখান থেকে আবার দিল্লি, এবার দেখা মিকি রয়, অর্থাৎ তাঁর বাবার সঙ্গে। অরুন্ধতীর জটিল এবং অচল পরিবারের আরেক অদ্ভুত সদস্য, বক্সার বাবার সন্তান, মেরি রয়ের উলটো মেরুর মানুষ মিকি রয়। এই একই সময়ে অরুন্ধতীর লেখক জীবনেরও বোধহয় সূচনা, যদি চিত্রনাট্য লেখাকে সরাসরি লেখা বলা যায়। প্রথম উপন্যাস গড অফ স্মল থিংস অবধি পৌঁছনোর রাস্তার প্রথম মাইলফলক হয়ত ওইটিই।
আরো পড়ুন একজন হার না মানা তওয়াইফ অথবা মনীশের মা
পাশাপাশি এই লেখা যতটা অরুন্ধতীর মা ‘গ্যাংস্টার’ মিসেস রয়, বাবা ‘নাথিং ম্যান’ মিকি রয় সম্পর্কে, বা ছোট্ট অরুন্ধতীর মায়ের বোর্ডিং স্কুল থেকে বেরিয়ে আর্কিটেকচার স্কুল হয়ে ম্যাসি সাহিব (১৯৮৫) ছবিতে অভিনয় করা থেকে লেখিকা অরুন্ধতী রায় হয়ে ওঠার গল্প, ততটাই বদলাতে থাকা ভারতের চালচিত্রও। ভারতের সামাজিক রাজনৈতিক ইতিহাসে উৎসাহী ছাত্রের কাছে বিবর্তিত ভারতের যাত্রাপথকে অননুকরণীয় ভঙ্গিতে তুলে ধরার জন্য এই বইটি স্মরণীয় হয়ে থাকা উচিত। নিজের আত্মজীবনীর চারপাশেই নকশি কাঁথার মত করে নিপুণ হাতে অরুন্ধতী বুনে চলেন কংগ্রেসি শাসনে দিল্লির ছবি, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন আর সালওয়া জুড়মের মাওবাদী দমন থেকে আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের ইতিহাস। আজ যখন উমর খালিদকে মনে করে চিঠি লিখছেন জোহরান মামদানি, তখন অরুন্ধতীর নিজের অভিজ্ঞতায় ফুটে ওঠে এস এ আর গিলানি বা জি এন সাইবাবার কারাবাসের কথা। অরুন্ধতীর নিজের কাশ্মীরের অভিজ্ঞতা মনে করায় – কীভাবে রাষ্ট্র বরাবর এদেশের কিছু বিশেষ অঞ্চলের মানুষকে কখনোই নিজের বলে গ্রহণ করেনি। প্রকৃতপক্ষে এই লেখার পরতে পরতে অরুন্ধতী দেখিয়েছেন যে বিষবৃক্ষের বীজ বপন হয়েছিল সেই ১৯৯০-এর দশকেই। সে গাছের শিকড় আজ ছড়িয়ে গেছে এদেশের আনাচে কানাচে, বিষফলের কটু গন্ধে আজ বাতাস ভারি, কিন্তু শুরুটা হয়েছিল অনেক দিন আগেই।
এই বইয়ের হেঁটে চলে বেড়ানো চরিত্রগুলির মধ্যেই অরুন্ধতী নিপুণভাবে বুনে দিয়েছেন তাঁর লেখার ‘ফিকশনাল’ চরিত্রগুলিকে। সে তাঁর প্রথম উপন্যাস গড অফ স্মল থিংসের ভেলুথাই হোক, বা মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এর আঞ্জুম। তারা উঠে এসেছে তাঁর নিজের জীবন থেকে, বা তাদের জীবন ছায়া ফেলেছে অরুন্ধতীর প্রতিটি পদক্ষেপে। তবে কাল্পনিক ও আসল নানা রঙের চরিত্রের ভিড়ে অবশ্যই সব থেকে বড়, প্রায় দৈত্যাকার ছায়া মেরি রয়ের। কিন্তু কী আশ্চর্য সেই ছায়ার চরিত্র! না সে লালন করে সন্তানস্নেহ, না তা বহু চেষ্টা সত্ত্বেও গ্রাস করতে পারে লেখক, সমাজচিন্তক, মানুষ অরুন্ধতীকে। বরং মনে হয়, সেই ‘গ্যাংস্টার’ মায়ের ছায়াই হয়ত অরুন্ধতীর হলদে পাখির পালক, যা সারাজীবন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় এক যাত্রা থেকে আরেক যাত্রায়। এই সমস্ত যাত্রাই যেন শেষ হয় মেরির পাশে গিয়ে। তাই সমুদ্রে মায়ের চিতাভস্ম বিসর্জন দেওয়া অরুন্ধতীর জন্য ভয়ংকর বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। যে মায়ের জন্য তাঁর গোটা জীবন যন্ত্রণার অভিব্যক্তি হয়ে থাকার কথা ছিল, যাকে আজকাল আমরা ‘চাইল্ডহুড ট্রমা’ বলি, তিনি সেই মায়ের একা সমুদ্রে চলে যাওয়া দেখতে দেখতে যন্ত্রণায় দীর্ণ হয়ে যান। মাদার মেরি তাঁর কাছে যে শুধুমাত্র ব্যক্তিমানুষ বা আত্মীয় মা নন, বরং দুই সত্তার সম্মিলনে জন্ম নেওয়া এক বৃহত্তর চেহারা, তা পরিষ্কার হয়ে যায় আরও একবার। মিসেস রয়ের (নাকি মিস্টার রয়, কারণ দেশটা তো ভারত) চরিত্রচিত্রণে তথা নিজের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের বিশ্লেষণে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতের সার্থক সমন্বয় এই বইটির সম্পদ এবং সম্ভবত সেটিই এই বইয়ের সবথেকে বড় সাফল্য।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








