দেশের নাগরিকদের আলোচনা করা, মতামত জানানোর সুযোগ না দিয়েই তড়িঘড়ি সংসদে পাশ হয়ে গেল দ্য বিকশিত ভারত – গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ) বিল, সংক্ষেপে ভিবি-জি রাম জি বিল। মনরেগা তুলে দিয়ে এটিকে আইনেই পরিণত করতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার। প্রস্তাবিত আইনের ৩৭ নম্বর ধারা অনুসারে মনরেগা আইনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংক্রান্ত বিধি, বিজ্ঞপ্তি, গাইডলাইন – সবই বাতিল হবে। ইউপিএ সরকারের আমলে ২০০৫ সালে পাশ হয়েছিল ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট (নরেগা)। গ্রামভারতের প্রত্যেক পরিবারকে বছরে অন্তত ১০০ দিন কাজ পাওয়ার অধিকার দিয়েছিল এই আইন। ২০০৯ সালে এর নাম হয় মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট (মনরেগা)। ভারতে সেই প্রথম কাজের অধিকার আইনি স্বীকৃতি পায়। নতুন ভিবি-জি রাম জি বিলটিতে বছরে ১০০ দিনের বদলে ১২৫ দিন কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আপাতভাবে মনে হবে, অধিকার বেড়েছে। তাহলে এত বিতর্ক কেন?
নাম বদল নিয়ে সঙ্গত কারণেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর নাম মুছে দেওয়াই নয়, হিন্দি ও ইংরিজি মিশিয়ে এমন কায়দায় নামকরণ হয়েছে, যে আদ্যক্ষরে জি রাম জি শব্দবন্ধ থাকে। গৈরিকীকরণ সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে। বিলটিতেও আইনের পুরো নামকরণের পাশাপাশি আদ্যক্ষরের উল্লেখ আছে। নামকরণে হিন্দি ভাষার ব্যবহারে ভাষা আগ্রাসনের অভিযোগও উঠেছে। অনেকেই বলছেন, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের রাজনীতি অনুসারেই এই নামকরণ। তার জন্য মহাত্মা গান্ধীকে অপমান করতেও বিজেপি পিছপা হয়নি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কিন্তু নাম বদলের বিতর্কেই ঘোরাফেরা করলে নতুন আইনের আসল চরিত্র আড়াল হয়ে যাবে। মনরেগা আইন বাতিল করে নতুন নামের আইনই কেবল আসছে না। কাজের অধিকারকে অনেকটাই কেন্দ্রের বরাদ্দনির্ভর দয়ার দানে পরিণত করা হয়েছে। সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মী যোগেন্দ্র যাদবের মতে, কাজের চাহিদা বাড়ানোর বদলে তার জোগান নিয়ন্ত্রণ করা এই বিলের উদ্দেশ্য। ফলে কাজের সুযোগ কমবে। অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মী জঁ দ্রেজ বলেছেন, আসলে নাম বদল আইনটির চরিত্র থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর প্রয়াস।
এই আইন অনেক ক্ষেত্রে মনরেগার সঙ্গে হুবহু এক, শুধুমাত্র ধারার নম্বরের কিছু অদলবদল ঘটেছে। কিন্তু সঙ্গে এমন কিছু অংশ জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে মৌলিক চরিত্রটিই গেছে বদলে। মনরেগার ৭(১) নম্বর ধারা অনুসারে, জব কার্ডের অধিকারী কাজের জন্য আবেদন করলে সেই আবেদন গ্রহণের ১৫ দিনের মধ্যে, অথবা আগাম আবেদন করলে যে তারিখে কাজের জন্য আবেদন করেছেন সেদিন থেকে কাজ না পেলে তাঁকে বেকার ভাতা দিতে হবে। ভিবি-জি রাম জি বিলের ১১(১) নম্বর ধারায় সেই কথাই বলা আছে। কিন্তু ৬ নম্বর ধারা অনুসারে ভরা চাষের মরশুমে এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকবে।
মনরেগায় বলা হয়েছিল, গ্রামাঞ্চলে বেকার সমস্যা কমানো এবং উদ্বৃত্ত শ্রম গ্রামোন্নয়নের কাজে লাগানো আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য। ভিবি-জি রাম জি-তে সেই উদ্দেশ্য বদলে দেওয়া হয়েছে। ভরা চাষের মরশুমে পর্যাপ্ত খেতমজুরের যোগান নিশ্চিত করায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কাজের নিশ্চয়তার অধিকারের বদলে শ্রম বাহিনীর জোগান দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান কাদের স্বার্থে? বড় বড় কৃষি খামার, বড় চাষিদের সস্তা মজুরির শ্রমিক জোগান দিতেই নয়া আইনে গুরুতর বদল ঘটানো হয়েছে। অর্থাৎ অধিকার সংক্রান্ত আইনে অধিকারেরই সংকোচন ঘটানো হল। অভিযোগ ছিল, মনরেগার ফলে খেতমজুর পেতে সমস্যা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে খেতমজুরের চাহিদা কমছে কৃষিক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায়। কিন্তু যে কজনকে প্রয়োজন হয়, তাঁদেরও অত্যন্ত কম মজুরি দেওয়াই আসল মতলব। মনরেগা মজুরির হার বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই বড় কৃষি লবিগুলির স্বার্থরক্ষায় মজুরদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হল।
ভিবি-জি রাম জি বিলে কেন্দ্রীয় সরকারের খবরদারিও বেড়েছে। পিএম গতি শক্তি ন্যাশনাল মিশনের অঙ্গ হিসাবে কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। কার্যত গ্রামসভা, পঞ্চায়েত, এমনকি রাজ্য সরকারও নয়, কাজের পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রই শেষ কথা বলবে। ৪(৪) নম্বর ধারা অনুযায়ী, কেন্দ্র গ্রামগুলিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করবে। ৪(৫) নম্বর ধারা অনুযায়ী, কেন্দ্র রাজ্যভিত্তিক অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ ঠিক করবে। ৪(৬) নম্বর ধারা অনুসারে, এর চেয়ে বেশি অর্থ খরচ হলে রাজ্য সরকারকে তার দায় বহন করতে হবে। অর্থাৎ কাজের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ হবে না। কেন্দ্রের বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হবে। নাহলে বাড়তি অর্থের ব্যয়ভার রাজ্যের। আবার ২২(২) নম্বর ধারা অনুসারে, মোট খরচের ৬০% কেন্দ্র বহন করবে, ৪০% রাজ্য সরকারগুলিকে বহন করতে হবে। মনরেগায় খরচের ৯০% বহন করে কেন্দ্র। নয়া আইনে কেবলমাত্র উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি এবং উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে ব্যয়ের ৯০% বহন করবে কেন্দ্র। অর্থাৎ কেন্দ্রের ব্যয়ভার কমছে, রাজ্যের বাড়ছে। আবার গ্রামসভা, পঞ্চায়েত, রাজ্যের ক্ষমতা কমিয়ে কেন্দ্রের খবরদারি বাড়ানো হচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোই কেবল দুর্বল হবে না, কাজের অধিকার সংক্রান্ত আইন নিছক সরকারি বরাদ্দনির্ভর প্রকল্পে পরিণত হবে। এই কারণেই অভিযোগ, অধিকার কেড়ে কাজকে দয়ার দানে রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
কাজে স্বচ্ছতার নামে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তার মাধ্যমে কেন্দ্র নজরদারি ও তদারকি করবে। কিন্তু যাদের জন্য এই আইন, সেই গ্রামীণ মজুররা তো আর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার ঢালাও সুযোগ পাবেন না। তথ্য তাঁদের অধরাই থেকে যাবে। মানুষের অংশগ্রহণের কথা যতই বলা হোক, আসলে মূল অংশীদার মজুররাই থেকে যাচ্ছেন অন্ধকারে। বাস্তবে কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ, কারা কাজ পাবেন সেসব নির্ধারণ, সেই সংক্রান্ত তথ্য প্রাপ্তির অধিকার তাঁদের থাকবে না। সামাজিক নিরীক্ষার কথা যতই বলা হোক, সব নিয়ন্ত্রিত হবে কেন্দ্র আর রাজ্য সরকারের মাধ্যমে। রাজ্যের বোঝা বাড়ায় অপেক্ষাকৃত গরিব রাজ্যগুলিতে কাজের সুযোগ আরও কমবে। অথচ সেই রাজ্যগুলিতেই কাজের সুযোগ ও মজুরি আরও বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল।
মনরেগা আইনের পিছনে গণআন্দোলনের বড় অবদান ছিল। বামপন্থী দলগুলি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বারবার কাজের অধিকার সংক্রান্ত আইনের দাবি তোলা হয়েছিল। কাজের অধিকারকে সংবিধানের মৌলিক অধিকারে পরিণত করার দাবিও বহু বছরের। ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকারকে অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে বামেরা সমর্থন করে। সেই কর্মসূচিতে এমন আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়। যদিও বামেরা প্রাথমিকভাবে বছরে ১০০ দিনের চেয়েও বেশি দিনের কাজের নিশ্চয়তার দাবি করেছিল। আন্দোলনগুলি থেকে উঠে আসা বিভিন্ন দাবি আইনের খসড়া তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলনের কর্মী ও সংগঠকদের নিয়ে গঠিত জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদ আইনের খসড়া প্রস্তুত করে সরকারকে দেয়। সরকার কিছু সংশোধন ও পরিমার্জনের পর সেটি সংসদে পেশ করেছিল। স্ট্যান্ডিং কমিটিতে আলোচনা, সংসদে আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে আইনটি পাশ হয়। সমাজকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ – সবাই মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
আইন পাশ হওয়ার পর ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের ২০০টি জেলায় এটি কার্যকর হয়। এরপর ধাপে ধাপে ২০০৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে গোটা দেশে চালু হয়। ভারতে নয়া উদারনীতির প্রবক্তা কংগ্রেস রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে এই আইন করেছিল। ২০০৪ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’-র বিরুদ্ধে জনাদেশে এনডিএ সরকার ভোটে হারে। সেই জনাদেশ ছিল নয়া উদারনীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আবার বামেদের সমর্থনেই ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় আসায় তাদের কিছু দাবি মানা ছাড়া সরকারের উপায় ছিল না। তাই আর্থিক সংস্কারের ‘মানবিক মুখ’ নামক একটি জিনিসের কথা বলা হয়েছিল। যদিও নয়া উদারবাদী আর্থিক সংস্কার মানবিক হতে পারে না। তবুও নরেগা, অরণ্যের অধিকার, তথ্যের অধিকার, খাদ্য নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন অধিকার সংক্রান্ত আইন করতে ইউপিএ সরকার বাধ্য হয়েছিল। জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের সংগঠকদেরও এগুলিতে বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু শিল্প-বাণিজ্য মহল এবং আমলাদের একাংশ কখনোই নরেগাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। এই আইনের ফলে শ্রমের বাজার যে সস্তা থাকবে না, শ্রমের জোগানে ঘাটতি হবে – সেকথা তারা ভালোই টের পেয়েছিল।
২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় ফিরেই এই আইনকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লোকসভায় একে বিদ্রুপ করতেও পিছপা হননি। ব্যয় বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় না বাড়ানো, খবরদারি বাড়ানো, জব কার্ড ছেঁটে দেওয়া থেকে শুরু করে নানা কৌশলে মনরেগাকে ধাপে ধাপে লঘু করে দেওয়া চলছিল। যদিও করোনা অতিমারীতে প্রকোপে লকডাউনের সময়ে মনরেগার তাৎপর্য বোঝা গিয়েছিল। অতিমারী কাটিয়ে আমরা নাকি ‘নিউ নর্মাল’ যুগে প্রবেশ করেছি। কেন্দ্রের সেই অপকর্ম ধারাবাহিকভাবে চলতেই থেকেছে।
২০১৯-২০ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে মনরেগায় বরাদ্দ হয়েছিল ৬০,০০০ কোটি টাকা; সংশোধিত বরাদ্দ বেড়ে হয় ৭১,০০০ কোটি টাকার বেশি। তবুও ২০২০-২১ সালে বাজেট বরাদ্দ আগের বছরের খরচের থেকে অনেকখানি কম হয় – ৬১,৫০০ কোটি টাকা। সে বছর অতিমারীর জন্য সংশোধিত বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় ১,১১,৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু তার পরের বাজেটে ‘নিউ নর্মাল’ অবস্থার বাহানায় বরাদ্দ কমে হয় ৭৩,০০০ কোটি টাকা।
মতলব পরিষ্কার। একশো দিনের কাজ ঠিক মত হলে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা কমবে। যে প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি লকডাউনে অমানবিক, নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছিল। তাঁদের না পাওয়া গেলে বাণিজ্য-শিল্প মহলের সুবিধা হবে না। সেটাই তো বিকশিত ভারতের আসল লক্ষ্য। ফলে ২০২৩-২৪ সালে মনরেগায় বাজেট বরাদ্দ আরও কমে হয় মাত্র ৬০,০০০ কোটি টাকা। খরচ বেড়ে যাওয়ায় সংশোধিত বরাদ্দ বাড়িয়ে ৮৬,০০০ কোটি টাকা করতে কেন্দ্র বাধ্য হয়। কিন্তু তারপর থেকে বরাদ্দ এতটুকুও বাড়েনি। ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে ৮৬,০০০ কোটি টাকাই বরাদ্দ হয়েছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, অস্বাভাবিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির নিরিখে প্রকৃত বরাদ্দ আসলে কমেছে।
এর পরিণামে বছরে ১০০ দিন তো দূরের কথা, গড়ে কাজ মিলছে ৫০ দিনের সামান্য বেশি। এমনকি ২০২০-২১ সালেও পরিবার পিছু গড়ে কাজ জুটেছিল মাত্র ৫১.৫ দিন। ২০২৪-২৫ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৪২.৭৭ দিন। খুব কম পরিবারই মনরেগায় বছরে ১০০ দিনের কাজ পায়। বেকার ভাতা না পাওয়া, মজুরি সঠিক সময়ে না পাওয়া – সব মিলিয়ে মনরেগায় দেওয়া আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রামীণ মজুররা। তারই সঙ্গে আধার লিংক, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির অজুহাতে অনেক জব কার্ড বাতিল হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি কেন্দ্রের গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী কমলেশ পাসওয়ান লোকসভায় জানিয়েছেন – ১৬,৩০,০০০-এর বেশি জব কার্ড বাতিল হয়েছে। এর সবগুলিই ন্যায্য কারণে বাতিল হয়েছে বলে ভাবার কোনো কারণ নেই।
যেমন অন্যায্য পশ্চিমবঙ্গে তিন বছরের বেশি সময় ধরে মনরেগার কাজ বন্ধ হয়ে থাকা। রাজ্য সরকারের দুর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে রাজ্যের মজুরদের মজুরির টাকা দেওয়া কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। ২০২২ সালের মার্চ মাস থেকে অর্থ দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ। অভিযোগ সত্যি। ভুয়ো জব কার্ড, মিথ্যা কাজের খতিয়ান দিয়ে গ্রামে গ্রামে তৃণমূল মনরেগায় ব্যাপক দুর্নীতি করেছে। তৃণমূলের দুর্বৃত্তদের অর্থ লুঠের বড় উৎস ছিল মনরেগা। জব কার্ড নিজেদের কাছে রেখে দেওয়া, শ্রমিকদের মজুরির একটা অংশ আত্মসাৎ করা সহ নানা দুর্নীতি একেবারে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত শিকড় গেড়েছিল। পাশাপাশি মনরেগায় ১০০ দিনের থেকে কম কাজ দেওয়া, বেকার ভাতা না দেওয়া, মজুরি বকেয়া রাখার অজস্র উদাহরণ রয়েছে। ২০২১-২২ সালে যেখানে পরিবার পিছু কাজ পাওয়ার জাতীয় গড় ছিল বছরে ৫০.১ দিন, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে এই গড় ছিল ৪৭.৯৪ দিন। সেবছর দেশে কাজ পাওয়া মজুরদের মধ্যে মহিলারা ছিলেন ৫৪.৭%। পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৪৬.৭৫%।
অথচ কেন্দ্র তৃণমূলের একজন দুর্নীতিবাজেরও শাস্তির ব্যবস্থা করেনি। সিবিআই, ইডি – কেউই কিছু করল না, শাস্তি পেলেন গ্রামবাংলার মজুররা। কেন্দ্রের বেআইনি এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মামলা করলে কলকাতা হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ১ অগাস্ট থেকে কাজ আবার শুরুর নির্দেশ দেয়। কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে সেখানেও কলকাতা হাইকোর্টের রায়ই বহাল থাকে। তবু আজও রাজ্যে মনরেগার কাজ চালু হয়নি। দুর্নীতিবাজ তৃণমূল তা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলেছে। কর্মশ্রী বলে এক প্রকল্প চালু করেছে, যা কখনই মনরেগার সঙ্গে তুলনীয় নয়। কারণ এটি আইনি অধিকার নয়, ভিবি-জি রাম জি-র মতই আইনি অধিকারকে দয়ার দানে পরিণত করা। তৃণমূল সরকার আগেই কর্মশ্রীতে অধিকারকে দয়ার দানে রূপান্তরিত করেছে, এবার কেন্দ্র ঠিক তাই করল। সেই সত্যকে আড়াল করার জন্য কর্মশ্রীর নাম আবার বদলে মহাত্মাশ্রী করে চমকের রাজনীতি করছে তৃণমূল সরকার।
মনরেগার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক মেয়েদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। মহিলারাই ১০০ দিনের কাজে বেশি অংশ নেন। কেন্দ্রের আর্থিক সমীক্ষা জানাচ্ছে, ২০২৩-২৪ সালে মনরেগায় কাজ করা মজুরদের মধ্যে ৫৮.৯% ছিলেন মহিলা। ২০২৪-২৫ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত এই হার ছিল ৫১.৯৭%। মহিলারা সস্তা শ্রমের বড় যোগানদার। মনরেগায় তাঁদের কাজের সুযোগ মজুরির হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এঁদের বড় অংশ আবার খেতমজুর। একই বছরের আর্থিক সমীক্ষার রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৩-২৪ সালে গ্রামে কর্মরতা মহিলাদের ৬৪.৪% কৃষিক্ষেত্রে কাজ করতেন। এঁদের একাংশ যেমন নিজের পরিবারের জন্যই বিনা মজুরিতে চাষের কাজ করেন, তেমন আরেক অংশ খেতমজুর। চাষের মরশুমে প্রকল্পের কাজ হলে এঁদের কম মজুরি দিয়ে খেতমজুরের কাজ করানো যাবে না। একশো পঁচিশ দিনের কাজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে না, উলটে কাজের সুযোগ আরও কমবে।
এককথায়, ভিবি-জি রাম জি-র আসল মতলব হল শ্রমের বাজারকে আরও সস্তা করা। মনরেগা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই চটজলদি বিল পেশ করে, স্ট্যান্ডিং কমিটিতে না পাঠিয়ে, নাগরিকদের আলোচনার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে ধ্বনি ভোটে তাকে পাশ করিয়ে নেওয়া হল। বিজেপির রামরাজ্যে মালিকের বিকাশের বিনিময়ে মজুরের বিনাশ যে অবধারিত, ভিবি-জি রাম জি তা আবার প্রমাণ করে দিল।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







