লগ্নজিতা চক্রবর্তীর কথা বলতে গেলে একটু ইমন চক্রবর্তীর কথা বলতে হবে। কারণ দুই শিল্পী অনেকটা একরকম ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন ছয় বছরের ব্যবধানে। লগ্নজিতা যেমন পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুরে এক অনুষ্ঠানে গাইতে গিয়েছিলেন, ইমনও তেমন ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গাইতে গিয়েছিলেন নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে। লগ্নজিতার ক্ষেত্রে যেমন আয়োজকদের একজনই আক্রমণকারী (সাউথ পয়েন্ট পাবলিক স্কুলের মালিক মেহবুব মল্লিক, যিনি এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেস করেন বলছে কোনো কোনো প্রতিবেদন), ইমনের ক্ষেত্রেও আক্রমণ করেছিলেন আয়োজকরাই। সেখানে আবার আয়োজক ছিল পৌরসভা, মানে স্থানীয় সরকার (যা তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে)। ইমন যে হেনস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন – অন্তত সেদিন রাতেই ফেসবুকে লাইভ করে যা জানিয়েছিলেন – তার তুলনায় লগ্নজিতার ঘটনা সামান্য। ইমন ও তাঁর সহশিল্পীদের গাড়ি ঘিরে ফেলা হয়েছিল, বেরোতে দেওয়া হচ্ছিল না। তাঁরা স্বভাবতই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন এবং ইমন লাইভে বলে ফেলেছিলেন ‘আমরা কিন্তু বাইজি নই।’ তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে গোটা দুনিয়াকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিয়েছিলেন বলেও নাকি হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, প্রশাসনিক স্তরে ব্যবস্থা নেবেন। এও জানিয়েছিলেন যে স্থানীয় মানুষ তাঁকে সসম্মানে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন সে রাতে। ঘটনার দিন দুয়েক না যেতেই অবশ্য ইমন সেদিনের মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন। ওই ঘটনার জন্য কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল আমরা জানি না। বস্তুত, লগ্নজিতার বেলায় নির্দিষ্ট একজনের নাম পাওয়া গেছে, পুলিশ সেই ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করেছে। ইমনের ঘটনায় কোনো নাম পাওয়া গিয়েছিল বলে মনে পড়ে না, কেউ গ্রেফতারও হয়নি। ফলে ইমন প্রশাসনিক স্তরে কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তা বোঝা মুশকিল। তবে পরবর্তীকালে তাঁকে রাজ্যের শাসক দল বা রাজ্য সরকার আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিলক্ষণ গাইতে দেখা গেছে। এই তো কদিন আগে মুখ্যমন্ত্রীর সামনে উন্নয়নের গান গেয়ে তিনি ভাইরাল হলেন। সুতরাং ধরে নেওয়া যায়, কৃষ্ণনগরের অপমানের প্রতিকার তিনি পেয়ে গেছেন; আমরা জানি বা না জানি। মেহবুবের গ্রেফতারি এবং থানার ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশের মানে হল, লগ্নজিতার অপমানের প্রতিকারও প্রশাসন করে ফেলেছে। উনি নিজে ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে জানা যাচ্ছে শারীরিক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেনি। অন্য উদ্যোক্তারাই ঘটতে দেননি। দর্শকরাও তাঁকে অসম্মান করেননি। থানায় গিয়ে লগ্নজিতা জেনারেল ডায়রি করেছেন, এফআইআর নয়। ফলে আইনত মেহবুবের বিরাট কোনো শাস্তি হওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু ইমনের হেনস্থা নিয়ে আলোচনা দু-একদিনের মধ্যে থেমে গিয়েছিল, এখন তো বিস্মৃত। লগ্নজিতাকে নিয়ে হইচই ক্রমশ বাড়ছে। এক ভিডিও ইন্টারভিউতে দেখলাম, উনি বলছেন, সকাল থেকে মিডিয়াকে বাইট দিতে দিতে গলার অবস্থা খারাপ। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপিও এ নিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছে। প্রবল জনপ্রিয় রিপাবলিক বাংলার কর্ণধার ময়ূখ ঘোষ সান্ধ্য চিৎকারের আসর বসিয়ে ফেলেছেন এ বিষয়ে। সেখানে গুরু অর্ণব গোস্বামীর কায়দায় ময়ূখ রায় দিয়ে দিয়েছেন – পশ্চিমবঙ্গ প্রায় বাংলাদেশ হয়ে গেছে সেকুলারদের দোষে। সোনামুখ করে তাঁর রায় শুনতে এবং মাঝে মাঝে দু-একটা বাক্য নিজের বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী বলে সেই রায়কে পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ পরিবারে বৈধতা দিতে স্টুডিওতে যথারীতি উপস্থিত ছিলেন জনৈক হিন্দু সাধু থেকে শুরু করে বামপন্থী অধ্যাপক-সাহিত্যিক পর্যন্ত সকলেই। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও তথৈবচ। কেউ শিরোনামে লিখেছে পশ্চিমবঙ্গ ‘অলমোস্ট বাংলাদেশ!’, এক সাংবাদিক শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে প্রশ্ন করেছেন ‘কী থেকে কী হয়ে গেল?’ মিঠুন চক্রবর্তী বলেছেন বাংলার এমন অবস্থা হয়েছে যে, এখানে মা বললে সাম্প্রদায়িক বলে দেগে দেওয়া হয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এত আতঙ্ক কেন? দুটো কারণে – ১) যিনি মঞ্চে উঠে শিল্পীর সঙ্গে অসভ্যতা করেছেন তিনি ধর্মে মুসলমান, ২) তিনি দেবী চৌধুরানী ছবির ‘জাগো মা’ গানটা শুনে ‘সেকুলার’ গান গাইতে বলেছেন। এ থেকেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে – পশ্চিমবঙ্গেও ছায়ানটে ঢুকে ভাংচুর করা, হারমোনিয়াম আছড়ে ভেঙে ফেলার মত সন্ত্রাসবাদ দেখা যাবে অবিলম্বেই।
কানার নাম পদ্মলোচনের মত, লগ্নজিতার দিকে যিনি তেড়ে গিয়েছিলেন সেই হিংস্র লোকটির নাম মেহবুব (প্রিয়তম)। অতএব তিনি যে মুসলমান তাতে সন্দেহ নেই। কেবল পরিচিত মুসলমানবিদ্বেষীরা নয়, দেখতে পাচ্ছি ধর্মনিরপেক্ষরাও ভীষণ খেপে উঠেছেন এই তথ্যেই। অথচ জানি না কী করে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে মেহবুবকে যাঁরা আরও খারাপ কিছু করা থেকে নিরস্ত করেছেন তাঁদের মধ্যে কোনো মুসলমান ছিলেন না, বা দর্শকদের মধ্যেও কেউ মুসলমান ছিলেন না। তবে ওসব তথ্যের খোঁজ রিপাবলিকের ময়ূখ থেকে শুরু করে পাড়ার মিন্টুদা পর্যন্ত কেউই করছে না। কারণ আমরা জানি, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাট থেকে ৫০ কোটি টাকা আবিষ্কার হলেই প্রমাণ হয় না যে সব হিন্দু বা সব বামুন দু নম্বরি। কিন্তু সন্দেশখালির শাহজাহান শেখ বা ভাঙড়ের আরাবুল ইসলামের দৌরাত্ম্য দিয়ে প্রমাণ হয় – সব মুসলমানই গুন্ডা।
অতএব যা ঘটেনি তাও বলা হচ্ছে। ‘জাগো মা’ গেয়েছেন বলে লগ্নজিতাকে কিন্তু কেউ সাম্প্রদায়িক বলেনি। ‘সেকুলার’-রা তো নয়ই, মেহবুবও বলেননি। তিনি যে অসভ্যতা করেছেন, সেটা পশ্চিমবঙ্গে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে গত দেড়-দুই দশকে। তার একটা প্রমাণ ইমনের ঘটনা, যা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। ইমনের ‘আমরা কিন্তু বাইজি নই’ কথাটার মধ্যে মেহবুবদের এহেন আচরণের আসল কারণটা ধরা আছে। বাইজি ডাকতেন কারা? জমিদাররা। আমার টাকা আছে, আমি তোমায় এনেছি। এখন আমি যা করতে বলব, যতক্ষণ ধরে করতে বলব, তোমায় করতে হবে। এই সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতায় তাঁরা গানবাজনার আসর বসাতেন। এই অসুস্থ সংস্কৃতির পশ্চিমবঙ্গে প্রত্যাবর্তন হয়েছে ২০১১ সালের পর থেকে। একজন বা কয়েকজন আয়োজকের ইচ্ছানুযায়ী চলে যে কোনো অনুষ্ঠান; রুচির আলোচনা সেখানে অপ্রাসঙ্গিক। এটা গোটা রাজ্যেরই বাস্তবতা। সে কারণেই ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, কোনো বইমেলায় ‘আয়ো আয়ো জিলে লে’ গান চালিয়ে উদ্দাম নৃত্য হচ্ছে। কার ইচ্ছায় এসব হবে সেটা যে সবসময় টাকার জোরে ঠিক হয় তা নয়, হয় ক্ষমতার জোরে। কোনো অনুষ্ঠানে সে ক্ষমতা হয়ত কাউন্সিলরের হাতে, কোথাও পঞ্চায়েত প্রধানের হাতে, কোথাও যেখানে অনুষ্ঠান হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের হাতে। অবশ্য অনেক টাকা না থাকলেও ক্ষমতাবান হওয়া পশ্চিমবঙ্গে আজ আর সম্ভব নয় বললেই চলে। যা-ই হোক, এই কারণেই মেহবুবের মত ব্যক্তির মনে হয় যে শিল্পী কোন গান গাইবেন আর কোনটা গাইবেন না সেটা তিনি ঠিক করে দিতে পারেন। তাঁর নাম কানাই মল্লিক হলেও ওরকমই মনে হত। হঠাৎ বাংলাদেশে দীপু দাসকে পুড়িয়ে দেওয়া হল বা রবীন্দ্রনাথকে গাল পাড়া শুরু হল, অমনি এপারের রক্ষণশীল মুসলমানের সাহস লাফিয়ে বেড়ে গেল – ব্যাপারটা এরকম নয়। স্রেফ সংখ্যার কারণেই এভাবে রাতারাতি সাহস বেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশ থেকে ঢুকে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা নিজেদের সংখ্যা অস্বাভাবিক বাড়িয়ে নিয়েছে – এই গপ্পোটা প্রায় ৩০ বছর ধরে শোনানো হচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের। গত ১৬ ডিসেম্বর এসআইআরের খসড়া বেরোবার পরে যারা এখনো সে গপ্পো বিশ্বাস করছে, তাদের কাছে ঘোড়ার ডিমের অমলেটও বেচে দেওয়া সম্ভব। কারণ এখন শুভেন্দু অধিকারী পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের অবিশ্বাস করছেন না।
এবার দ্বিতীয় প্রশ্নে আসা যাক। কেন ‘সেকুলার’ গান গাইতে বলবে? কথাটা যাঁরা বলছেন তাঁরা সকলেই যে হিন্দুত্ববাদী তা নয়। অনেক প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক মানুষও বলছেন – এটা শিল্পীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। গানকে সাম্প্রদায়িক খোপে ফেলা অন্যায় এবং মৌলবাদের লক্ষণ।
আলবাত অন্যায়। কিন্তু কথা হচ্ছে, ধর্মীয় গানের জায়গায় কেউ যদি ধর্মনিরপেক্ষ গান শুনতে চায়, সেটা কী করে মৌলবাদের লক্ষণ হয়? মাতৃপূজার গান সাম্প্রদায়িক নয়, কিন্তু ধর্মীয় তো বটেই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতের অনেকটাই ধর্মীয়, এই উপমহাদেশের সঙ্গীতের অনেকটা তো বটেই। কবীর সুমন তো শ্রীকান্ত আচার্যের সঙ্গে এক কথোপকথনে বলেছিলেন কীর্তন আর রামপ্রসাদী গান ছাড়া তাঁর নিজের গান, সলিল চৌধুরীর গানের অস্তিত্বই থাকত না। একইভাবে সুফিদের বাদ দিয়ে ভারতীয় সঙ্গীত হয় না, সারি জারি বাদ দিয়েও হয় না। সেই কারণেই ধর্মীয় গান শোনা এবং গাওয়া ভারতের প্রত্যেকটা মানুষের অধিকার। গানের ধর্ম হয় কি হয় না সে তর্কই নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু ধর্মীয় গানের বাইরেও তো গান আছে। সেসব গান শুনতে চাওয়াও কোনো শ্রোতার পক্ষে অন্যায় নয়। যে কোনো গানের অনুষ্ঠানেই শ্রোতারা শিল্পীর কাছে বিভিন্ন গান শোনার আবদার করে থাকেন। শিল্পী কিছু আবদার রাখেন, কিছু রাখেন না। তবে মারতে যাওয়া আবদার করার ভঙ্গি নয়, শিল্পীকে তুই তোকারি করাও অন্যায়। কিন্তু ‘সেকুলার’ গান শুনতে চাওয়াই অন্যায় এবং মৌলবাদের লক্ষণ হয়ে গেল কী করে, এমনকি ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের কাছেও? লগ্নজিতা তো আর কিংবদন্তি পান্নালাল ভট্টাচার্য বা ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত যথাক্রমে শ্যামাসঙ্গীত আর কীর্তনের বিশেষজ্ঞ নন। ‘জাগো মা’ গানটাও সিনেমার গান। ফলে তাঁর কাছে অন্যরকম গান শুনতে চাইলেই মৌলবাদ, বাংলাদেশ, জামাত, সৌদি আরব, ইসলামিক স্টেট, তালিবান ইত্যাদির ছায়া পশ্চিমবঙ্গের উপর ঘনিয়ে এল – এমন মনে করার কারণ কী?
এর তুলনায় অনেকেই এবছরের গোড়ায় ঘটে যাওয়া স্নিগ্ধজিৎ ভৌমিকের ঘটনার কথা তুলেছেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি ‘অ্যায় খুদা’ গাইছিলেন। ফেসবুকে পোস্ট করে জানিয়েছিলেন, দর্শকদের একাংশ তাঁকে বলেন যে এইসব গাওয়া চলবে না। তাঁকে মঞ্চ থেকে নেমে যেতে হয়। এই ঘটনার সঙ্গে লগ্নজিতার ঘটনার কি সত্যিই কোনো তুলনা হয়? লগ্নজিতার বয়ানেও কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না যে মেহবুব তাঁকে বলেছেন ‘জাগো মা’ জাতীয় গান গাওয়াই চলবে না। বরং বলেছেন ‘অনেক জাগো মা হয়েছে, এবার একটু সেকুলার গা’। তার আগে ৪৫ মিনিট নির্বিঘ্নে গেয়েও ফেলেছিলেন লগ্নজিতা। তাতে কখানা ওই ধরনের গান ছিল তা আমরা জানি না।
প্রথম ঘটনায় দর্শকদের স্পষ্ট এবং অর্থহীন বিদ্বেষ ‘খুদা’ শব্দটা সম্পর্কে, কারণ গানটায় ওই শব্দটা থাকলেও ওটা মোটেই মুসলমানদের ভক্তিমূলক গান নয়, সাদামাটা প্রেমের গান।
এর সঙ্গে বরং তুলনা চলতে পারে বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবকে পাকিস্তানের রেডিওতে ‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’ গানে ‘হে রাম’ গাইতে নিষেধ করার। সে নিষেধের প্রতিবাদে তিনি ভারতে ফিরে এসেছিলেন। লগ্নজিতার গাওয়া ‘জাগো মা’ কিন্তু সিনেমার গান হলেও ধর্মীয় গানই।
ফলে মেহবুবের কাণ্ডটা হিন্দুধর্মের গান নিয়ে আপত্তি, নাকি একরকম গান শোনার প্রত্যাশা নিয়ে গিয়ে অন্যরকম গান শোনার বিরক্তি – তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে। অবশ্যই ব্যাপারটাকে চট করে হিন্দু-মুসলমান করে ফেললে বিতর্কটা জমাট বাঁধে, বিদ্বেষের রাজনীতি করার সুবিধা হয়, চ্যানেলের টিআরপি বাড়ে। কিন্তু বেশি চিন্তার কথা হল, বহু প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থী মানুষও এত কিছু বিচার করছেন না। সন্দেহ হয়, আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদ এবং পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের মুসলমান মৌলবাদের মাঝে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে তাঁরাও ‘সেকুলার’ শব্দটাকে পরিহার্য মনে করছেন, ব্যক্তি মুসলমানের গুন্ডামিকে বৃহত্তর সন্ত্রাসবাদের অংশ হিসাবে দেখতে শুরু করেছেন। ক-এর নিন্দা করলে খ-এর নিন্দাও করতে হবে – দক্ষিণপন্থীদের তৈরি এই বাইনারির ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছেন।
আবার গোড়ায় ফিরে যাই। ২০১৯ সালে ইমনের ঘটনায় যা বোঝা গিয়েছিল, তা হচ্ছে বাঙালি সমাজে শিল্পীদের যে সম্মান ছিল, তা অপস্রিয়মাণ এবং শিল্পীদের নিরাপত্তার প্রবল অভাব ঘটেছে। লগ্নজিতার ঘটনাও আসলে তারই পুনরাবৃত্তি। প্রথমটার আশু প্রতিকার নেই। কিন্তু শিল্পীদের নিরাপত্তার অভাব দূর করা অত জটিল ব্যাপার নয়। লগ্নজিতা বলেছেন, সাধারণত ওঁদের অনুষ্ঠানে কমবেশি পুলিশ থাকে। কিন্তু ওই অনুষ্ঠানে ছিল না। প্রশ্ন তোলা উচিত – কেন ছিল না? যে কোনো ছোটখাটো প্রকাশ্য অনুষ্ঠান আয়োজনের অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁরা সকলেই জানেন যে আগেভাগে পুলিশকে জানিয়ে তাদের অনুমতি নিতে হয়। এই নিয়ম করা হয়েছে, যাতে অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বুঝে পুলিশ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে। যদি লগ্নজিতার কথা ঠিক বলে ধরে নিই, যে এই ধরনের অনুষ্ঠানে সবসময়েই কিছু পুলিশকর্মী থাকেন, তাহলে এক্ষেত্রে ছিলেন না কি এই কারণে যে অনুষ্ঠানের আয়োজক মেহবুব একটা আস্ত স্কুলের মালিকপক্ষের একজন, অর্থাৎ পয়সাওয়ালা প্রভাবশালী ব্যক্তি (এবং তৃণমূলী)?
এ প্রশ্ন তুলতে প্রায় কাউকে দেখছি না। এমনকি শিল্পীও দেখলাম সাবধানে এসব প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন একের পর এক সাক্ষাৎকারে। তাঁর যেন বেশি আগ্রহ কোন গানের পর গোলমাল হয়েছে তা নিয়ে এবং ‘সেকুলার’ শব্দটা নিয়ে। অবশ্য আজকের পশ্চিমবঙ্গে সেটাই স্বাভাবিক। এ তো সেই বাংলা নয়, যেখানে এক জনপ্রিয় শিল্পী গান লিখেছিলেন ‘তুমি আসবে বলেই আমার দ্বিধারা উত্তর খুঁজে পায়নি/তুমি আসবে বলেই দেশটা এখনো গুজরাট হয়ে যায়নি।’ এসআইআরের খসড়ায় সীমান্তের এপারে নিম্নবর্গীয়, হিন্দু বাঙালিদের দুর্দশা এবং ওপারের অশান্তিতে দীপু দাসের দুর্দশায় প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা দেখার পরেও এখন তো বাংলাই গুজরাট হতে চাইছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








