রীতিমত সিনেমা যেন, একেবারে বলিউডি স্টাইলে। রাজ্যের রাজধানীর এক সভায় চিকিৎসকদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিচ্ছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, যিনি সদ্য বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে আবারও ক্ষমতায় এসেছেন। তরুণ চিকিৎসক তনভীর নিয়োগপত্র নেবেন। হঠাৎই সারি সারি ক্যামেরায় দেখা গেল, সম্মানীয় মুখ্যমন্ত্রী তাঁর মুখের কাপড় ধরে টানলেন। রীতিমত হাসতে হাসতে। সহস্র ক্যামেরা দেখল পাশে দাঁড়ানো তাঁর পার্ষদরাও ক্ষমতার এই কুৎসিত প্রকাশে আহ্লাদিত।
অপমানিত তরুণী আর চাকরির কথা ভাবেননি। সেটাই স্বাভাবিক। ওই রাজ্যে বাস করলে যে প্রতিদিন তাঁকে আঙুল তুলে চিহ্নিত করে অসম্মানিত করা হবে, তা তিনি বিলক্ষণ বুঝেছেন। শুধু প্রশ্ন রইল, ভরা সভায় এত বড় লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে কী প্রতিবাদ হল? বিষয়টা সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন, কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্নটাই বদলে যেতে লাগল। নিগৃহীতা তো শুধু মানুষ নন, তিনি মেয়েমানুষ। তার চেয়েও বড় কথা – তিনি মুসলমান। অতএব তাঁর সঙ্গে যা খুশি করা যায়। গল্প এখানেই শেষ নয়। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের নাকি বয়স হয়েছে, তাই এরকম হতেই পারে। বয়স হলেও এই বেয়াদপি তামাশা কোন আইনের ফাঁক দিয়ে করা যায় তা তিনি এবং তাঁর সহযোগীরাই জানেন। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার এই, যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং নীতীশের এই ব্যবহারে দুঃখপ্রকাশ দূরে থাক, উল্টে অত্যন্ত কদর্য মন্তব্য করে মেয়েটিকে জাহান্নামে যেতে বলেছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী সঞ্জয় নিষাদ সভ্যতার সব সীমা ছাড়িয়ে হাসতে হাসতে বলেছেন ‘হিজাবে হাত দিয়েছে বলে এত? আর কোথাও হাত দিলে কী হত?’ ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, শ্লীলতাহানির মামলায় পিঠ বাঁচাচ্ছেন।
১৯৭৫ সাল যখন আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ হিসাবে ঘোষিত হয়েছিল, সেইসময় সারা পৃথিবীর মত ভারতেও নারী আন্দোলনের বিভিন্ন দিশা তৈরি হয়। ওই নারী বর্ষের সময় থেকে নারী আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি নিয়ে এবছর অনেক জল্পনা চলছে। পঞ্চাশ বছরে মেয়েদের অধিকার কতটা পাওয়া হল, আন্দোলনই বা কোনখানে এসে পৌঁছেছে – তার মূল্যায়ন চলছে বিভিন্ন জায়গায়। এরই মধ্যে আমরা এই আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে দেখলাম পাটনায়। আরও বিস্ময়াবিষ্ট হলাম এই দেখে, যে গুটিকয়েক মানুষ সবসময়েই প্রতিবাদ করেন, তাঁদের বাদ দিয়ে বৃহত্তর নারী সমাজের এতে কোনো হেলদেল নেই। যাঁরা নিজেদের নারীবাদী মনে করেন, তাঁদের তরফ থেকে প্রতিবাদের চেয়ে বেশি যা এল, তা হচ্ছে হিজাব-নকাব পরা উচিত কি উচিত নয় তা নিয়ে মন্তব্য। অথচ শাঁখা, সিঁদুর, লোহা, ঘোমটা ইত্যাদি নিয়ে এঁদের কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা প্রশ্ন নেই। ইদানীং তো মেয়েদের উপনয়ন দিয়ে এক অদ্ভুত রকমের সাম্যের গল্প তৈরি করা হচ্ছে। উপবীত জিনিসটাই যে অসাম্য সৃষ্টিকারী সে ভাবনা উধাও।
আরো পড়ুন অতুলের আত্মহত্যা পিতৃতন্ত্রেরই ফল, নারীবাদের দোষ নয়
সংবিধান অনুযায়ী পরিধানের অধিকার নাগরিকের নিজস্ব অধিকার। তা নিয়ে জবরদস্তি চলে না। কোনো মহিলার মুখের কাপড় খুলে দেওয়ার মত ধৃষ্টতা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ১৭ ডিসেম্বরের এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ২০ ডিসেম্বর বলেছে, এটি কেবল মেয়েটির ব্যক্তিগত মর্যাদাই লঙ্ঘন করে না, তাঁর স্বাধিকার, কর্তৃত্ব এবং ধর্মীয় স্বাধীনতাকেও লঙ্ঘন করে।
অন্যদিকে বারবার প্রশ্ন উঠছে, মুখ্যমন্ত্রী যদি কোনো হিন্দু মহিলার ঘোমটা ধরে টান দিতেন, তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াত? এতক্ষণে হয় তাঁকে ক্ষমা চাইতে হত, অথবা তাঁর বড় শরিক তাঁকে উন্মাদ বলে ক্ষমতাচ্যুত করত। ভারতের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল পুরো সময়টাই মাথায় ঘোমটা দিয়ে থেকেছেন, তা নিয়ে কেউ কখনো কোনো অস্বস্তির কথা বলেনি। সংখ্যালঘুর কথাও যদি ওঠে, তাহলে ভারতের অন্য এক রাষ্ট্রপতি, জ্ঞানী জৈল সিং, চিরকাল পাগড়ি পরে থেকেছেন। তা নিয়েও তো কেউ আপত্তি করেনি।
পাটনার সেই অনুষ্ঠানে কোনো ড্রেস কোড ছিল বলে জানা যায়নি। তাহলে কি শুধু হিজাব দেখেই মুখ্যমন্ত্রীর মাথা বিগড়ে গেল? সত্যিই কি দেশটা এমন নরকে পরিণত হয়েছে যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিজেই একজন চিকিৎসককে জাহান্নামে পাঠাতে চাইছেন? এর আগে জম্মুতে বৈষ্ণোদেবী মেডিকাল কলেজে ভর্তির পরীক্ষায় অধিকাংশ সফল ছাত্রছাত্রী মুসলমান হওয়ায় সেই পরীক্ষা বাতিল করার দাবি তোলে সংঘ পরিবার। সংরক্ষণ দূরে থাক, স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাতেও মুসলমান কৃতকার্য হলে দেশের শাসকের দলবল এখন ক্ষিপ্ত হচ্ছে। লালুপ্রসাদ-তেজস্বী যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল নীতীশের ঘটনায় যথার্থই বলেছে, হয় নীতীশের মাথা খারাপ হয়েছে, নয় ১০০% সংঘবাদী হয়ে উঠেছেন।
চিকিৎসক বললেই মনে পড়ে যায়, পশ্চিমবঙ্গের এক মহিলা চিকিৎসকের ভয়াবহ পরিণতির কথা, যাঁর জন্য গোটা দেশ প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল গতবছর। অথচ এই চিকিৎসকের সম্ভ্রমহানির জন্য প্রকারান্তরে যেন তাঁকেই দায়ী করা হচ্ছে। বারবার এটাই হয়ে চলেছে। মেয়েদের উপর আক্রমণ হলেই তাদের পোশাক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারোর চোখে পোশাক খানিক কম হলে সমস্যা, এখন দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ঢাকা থাকলেও সমস্যা। আসল কথা, সমস্যা খুব স্পষ্টভাবেই জাত ধর্মের বিভাজন নিয়ে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিভেদ-বিষ এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে সবাইকে, যে আজ নারীবাদী বা মানবাধিকার কর্মীরাও ওসবের ভিত্তিতেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। অথচ তার মূল্য কিন্তু দিতে হচ্ছে সকলকে। বিলকিস বানোর নিগ্রহকারীদের কারামুক্ত করে সংবর্ধনা দেওয়ার ঘটনা, অথবা কাঠুয়ার আসিফার ধর্ষণকারীদের পক্ষে মিছিলের ঘটনায় অনেকেই নিশ্চুপ ছিলেন, বা এখনো সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলেন। আজ সেইজন্যই দেখতে হচ্ছে উন্নাওয়ের ধর্ষণে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কুলদীপ সেঙ্গারের মুক্তি এবং তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ধর্ষিতা ও তার পরিবারের অত্যাচার সহ্য করার দৃশ্য। তা নিয়েও এখন পর্যন্ত প্রতিবাদের ঝড় নেই।
মহাভারত এইভাবেই ঘটে। ঘটছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







