লীশা কে নায়ার

সেপ্টেম্বর মাসে যখন দক্ষিণ আন্দামান জেলার ভারি বৃষ্টি কদিনের জন্যে একটু কমেছে, তখন নবীন হালদার (৩৫) একদিন সকালে নারকেল পাড়তে বেরিয়েছিলেন। নিজের রুটিন অনুযায়ী তাঁর গুপ্তপাড়া ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার (FLC) পার হয়ে যাওয়ার কথা। ওখানে জেলে নৌকোগুলো মাল নামায় এবং সমুদ্র থেকে ধরে আনা মাছের নিলাম হয়। জায়গাটা পোর্ট ব্লেয়ার থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। ওটা পেরিয়ে নবীনকে যেতে হত এমন একটা জমিতে, যার দুদিকে দুটো খাঁড়ি। সাধারণত একজন সঙ্গীকে নিয়ে নবীন ভোরবেলা নারকেল পাড়েন, তারপর কাঁধে করে বাজারে নিয়ে যান বিক্রি করতে। কিন্তু সেদিন পাড়াপাড়ির কাজটাই চলেছিল দুপুর পর্যন্ত। তার কারণ এক অপ্রত্যাশিত অতিথির সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়া।

নবীন এই প্রতিবেদককে বললেন ‘আমরা প্রথমে কুমিরটাকে খেয়াল করিনি। আমি বাঁশের লাঠি দিয়ে নারকেল পাড়ছিলাম আর আমার সঙ্গের জন মাটি থেকে নারকেলগুলো কুড়োচ্ছিল। আমরা জানি যে ওই খাঁড়িতে কুমির আছে। কিন্তু সেগুলো কোনোদিন উঠে আসে না, তাই আমরা খুব বেশি চিন্তা করি না। ও যখন নারকেল কুড়োচ্ছিল, আমি দেখতে পেলাম ওর কাছেই একটা কুমির। দেখেই আমি বললাম শিগগির সরে যা। আমরা ভাবতেই পারিনি যে কুমিরগুলো অত উপরে উঠতে পারে।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নবীন দক্ষিণ আন্দামানের গুপ্তপাড়ার বাসিন্দা। গোটা দ্বীপের খাঁড়ির ধারের অনেক পাড়ার মতই গুপ্তপাড়ায় গত কয়েক বছরে কুমিরের আসা যাওয়া আগের চেয়ে ঘনঘন দেখা যাচ্ছে। অনেকসময় জল থেকে অনেক দূরেও তাদের দেখা যাচ্ছে, যেখানে তাদের যাওয়ার কথাই নয়।

কুমির, সংরক্ষণ ও সংঘাত

নোনাজলের কুমির একেবারে সর্বোচ্চ স্তরের শিকারী প্রাণী। এরা সামনে যে আসবে তাকেই শেষ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন ওরা শিকার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত আন্দামানের নোনাজলের কুমির ব্যাপক শিকার করা হত তাদের চামড়া আর ডিমের জন্যে। ফলে প্রায় অবলুপ্ত প্রাণী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৭২-এর প্রথম তফসিলে এই কুমিরদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার পর থেকে। ১৯৮০-র দশকে ম্যানগ্রোভ কাটায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা ওদের মোহনার বাসস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার আরও সুবিধা করে দেয়। ওই জিনিসটা কুমিরের বেঁচে থাকার জন্যে জরুরি। এখন বনবিভাগের হিসাব এবং সংরক্ষণ সংক্রান্ত সমীক্ষাগুলোর তথ্য অনুযায়ী আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে কুমিরের সংখ্যা ৪০০-৫০০। সরকারি আধিকারিকরা সংরক্ষণের সাফল্যে আনন্দিত, কিন্তু খাঁড়ির ধারের বাসিন্দারা বলছেন এর মূল্য তাঁদের দিতে হচ্ছে।

গুপ্তপাড়া ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টারের মৎস্যজীবী ভি করুপ্পুস্বামী (৪০) বললেন ‘আগে আমরা গলাজলে গিয়ে মাছ ধরতাম, কিন্তু এখন হাঁটুজলে যেতেও ভয় করে। একবার রাতের বেলায় একটা কুমির আবার নৌকোর ঠিক পাশে চলে এসেছিল। ওরা জেটি থেকে কুকুর টেনে নিয়ে চলে যায়। এরকম আগে দেখা যেত না। গত দশ বছরে এই ব্যাপারটা বেশি দেখতে পাচ্ছি।’ এরকম অভিজ্ঞতা গুপ্তপাড়ার অনেকেরই। বাসিন্দারা বলছেন কুমিরগুলোকে এখন ছোট নদীনালা এবং এমন সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে যেখানে আগে দেখতে পাওয়া বিরল ঘটনা ছিল। মানে এরা এখন আর মূল খাঁড়িতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জেটি, মাঠ বা বাড়িঘরের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে।

নবীন বললেন ‘কুমির এইসব নদীনালায় আগে ছিল না। গত ৮-১০ বছরে এদের ক্রমশ বেশি করে দেখতে পাচ্ছি। জেটির কাছে মাছ ধরার জন্যে যে টোপ ফেলা হয়, তার অবশিষ্ট খাবার খেতেই ওরা আসে। একবার এসে পড়লে কিছুদিন থেকে যায়। দু-তিন বছর আগে একটা কুমির তো একেবারে আমার বাড়ির পিছনে চলে এসেছিল।’

অনেক বাসিন্দারা মতে এত বেশি কুমির দেখা যাচ্ছে খাঁড়িতে ফেলে দেওয়া খাবারের জন্যে। জেলেরা বলছেন ফেলে দেওয়া টোপের খাবার এবং ফেলে দেওয়া মাছ কুমিরদের আকর্ষণ করে। তবে তাঁরা এও বললেন যে সমস্যাটা ছিলই, ওগুলোর জন্যে কেবল সমস্যার তীব্রতা বেড়েছে।

গুপ্তপাড়ার বাসিন্দা কুমুদরঞ্জন সওজল বললেন ‘খাঁড়িতে উচ্ছিষ্ট তো সবাই ফেলে, শুধু জেলেদের দোষ দেয়া কেন? আগে এখানে লোকও কম ছিল। এখন লোক বেড়েছে আর তারা উচ্ছিষ্ট মাংস-টাংস খাঁড়িতে ফেলছে। কুমির তো আসবেই।’

উচ্ছিষ্টের যে এখানে একটা ভূমিকা আছে তা স্থানীয় বাসিন্দারা স্বীকার করেন, কিন্তু তাঁদের বক্তব্য, এর সঙ্গে গভীরতর বাস্তুতন্ত্রগত বদল এবং জনবিন্যাস বদলে যাওয়া যুক্ত। কোনো কোনো মৎস্যজীবী এই অভিযোগও করলেন যে বসতি এলাকার কাছাকাছি ধরা পড়া কুমিরগুলোকে বন্দি করে রাখার বদলে খোলা সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, যেখান থেকে ওরা শেষমেশ সাঁতরে ফেরত চলে আসে খাঁড়িতে। ওই মৎস্যজীবীদের মতে, এই ধরনের প্রাণী মানুষের সঙ্গে যুক্ত খাবারে অভ্যস্ত হয়ে গেলে বারবার বসতি এলাকার কাছেই ফিরে আসে।

বনবিভাগের কর্মীরা এই দাবি নস্যাৎ করলেন

প্রিন্সিপাল চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্টস সঞ্জয় কুমার সিনহা বললেন ‘কোনো কুমির ধরা পড়লেই তাকে চিড়িয়াটাপু বায়োলজিকাল পার্কে রাখা হয়। এই মুহূর্তে আমরা প্রায় ৮০টা কুমিরকে ওখানে খাওয়াই। যদি কুমিরগুলোকে আগে সমুদ্রে ছাড়া হয়েও থাকে, তেমন ঘটনা একটা নির্দিষ্ট এলাকাতেই ঘটে থাকবে। কিন্তু কুমির তো নানা জায়গায় দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের কাছে ২০০০-এর দশকেও কুমিরের আক্রমণের ঘটনার কাগজপত্র আছে। সুতরাং এটা নতুন সমস্যা নয়।’

সঞ্জয়ের মতে, সরকারি নথি অনুযায়ী ২০০২ সাল থেকে ২২টা কুমিরের আক্রমণ ঘটেছে।

‘আগে বছরে তিন থেকে চারটে আক্রমণ হত। বরং গত ২-৩ বছরে আক্রমণ কমে গেছে। গত তিন বছরে তেমন একটা ঘটনাও ঘটেনি। সচেতনতা বেড়েছে, সতর্ক করে দেওয়ার জন্যে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে আর আমরা আরও বেশি করে কুমির ধরছি। শুধু এবছরেই আমি ২৫টা কুমিরকে ধরার আদেশ দিয়েছি, তার মধ্যে ১৩টাকে ইতিমধ্যেই ধরে ফেলা হয়েছে।’

দক্ষিণ ফাউন্ডেশন আর ম্যাড্রাস ক্রোকোডাইল ব্যাংক ট্রাস্টের অছি পরিষদের সদস্য মীরা উম্মেন বললেন, খাঁড়ির কাছে বর্জ্য জিনিস ফেলা আন্দামানে মানুষ-কুমির সংঘাতের অনেকগুলো কারণের একটা। এই কুমিরগুলোর বর্ধিত উপস্থিতির আরও এক প্রধান কারণ হিসাবে তিনি তুলে ধরেন এই প্রজাতির স্বাভাবিক ব্যবহারকেও। মীরা সবিস্তারে বোঝালেন যে নোনাজলের কুমির নিজের এলাকায় অত্যন্ত আধিপত্যকামী প্রাণী। বড় পুরুষ কুমির অনেক ক্ষেত্রে ছোটগুলোকে এদিক ওদিক ছড়িয়ে যেতে বা খালি জায়গায় চলে যেতে বাধ্য করে। পাশাপাশি স্ত্রী কুমির গর্ভবতী অবস্থায় খুব আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এলাকা দখলের এই চাপের সঙ্গে বদলাতে থাকা প্রাকৃতিক চালচিত্র কুমিরগুলোকে এমন সব জায়গায় ঠেলে দেয় যেখানে আগে তারা সচরাচর যেত না। মীরা বললেন “খাঁড়ি এবং ম্যানগ্রোভের কাছে জৈব বর্জ্য ফেলা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। দ্বীপের লোকেরা আগেও এভাবে বর্জ্য পদার্থ ফেলতেন ঠিকই, কিন্তু তখন কুমিরের সংখ্যা অনেক কম ছিল। আর বর্জ্যের পরিমাণও কম ছিল, কারণ স্থানীয় লোক এবং পর্যটকের সংখ্যাও কম ছিল।”

তিনি আরও বললেন যে কুমিরের যাতায়াত ভারি বৃষ্টি এবং হড়পা বানের সময়ে তুলনায় সহজ হয়ে যায়, যখন বড় বড় এলাকাগুলো ডুবে যায়। “ওইসব সময়ে ওরা ভুল করে মানুষের বসতির কাছাকাছি এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে। খাঁড়ি বা নদীর মুখ, যেখানে পুষ্টিকর খাবারের প্রাচুর্য, মাছ আর অন্যান্য শিকার জড়ো হয়, সেই জায়গাগুলো কুমিরের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।”

যখন জল বেড়ে যায়

এই চলাফেরা আরও বাড়িয়ে তুলেছে বৃষ্টিপাতের ধরনে বদল। বেশি ভারি বৃষ্টি চলতে থাকলে খাঁড়িগুলো উপচে পড়ে সাময়িকভাবে ছোট ছোট নদীনালা, এমনকি উপচে পড়া গ্রামের রাস্তাগুলোকেও একসঙ্গে যুক্ত করে দেয়। এই অবস্থায় কুমিরগুলো সেইসব জায়গার নাগাল পেয়ে যায় যেখানে আগে পৌঁছতে পারত না। খামখেয়ালি বর্ষা আর ঘূর্ণিঝড়ের ফলে হওয়া হড়পা বানেও কুমির তার স্বাভাবিক বাসস্থান হারিয়ে ফেলে। তাই তুলনায় শান্ত জলের দিকে যেতে হয়, যেগুলো জনবসতির কাছাকাছি। খাঁড়িগুলো যত দুকূল উপচে পড়ে তত জলভাগ আর গ্রামগুলোর ভেদ মুছে যায়, ফলে মানুষের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

২০২৪ সালের এক সমীক্ষায় জানা গেছে যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ-কুমির সংঘাতের ঘটনা ঘটে এবং কুমির দেখা যায় বর্ষার মরশুমে, অর্থাৎ জুন থেকে ডিসেম্বরে। প্রায় অর্ধেক ঘটনাই খাঁড়িগুলোতে ঘটে। ওই সমীক্ষায় কুমির দেখতে পাওয়ার ঘটনায় চোখে পড়ার মত বৃদ্ধির কথা জানা গিয়েছিল। ২০১৫ সালে মাত্র তিনটে ঘটনা ছিল, ২০১৬ সালেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩। এক বছরে আট গুণ বৃদ্ধি। তারপর থেকে সংখ্যাটা ধারাবাহিকভাবে দুই অঙ্কে রয়েছে। মাংলুতান নালা থেকে দক্ষিণ আন্দামানে সবচেয়ে বেশিবার কুমির দেখতে পাওয়ার হিসাব পাওয়া গেছে, গুপ্তপাড়া নালা সেদিক থেকে চতুর্থ।

সরকারি নথি অবশ্য ক্ষতির যে ছবিটা তুলে ধরে তা তুলনামূলকভাবে সীমিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী গোটা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কুমিরের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আটটা, তার মধ্যে মাত্র দুটো দক্ষিণ আন্দামানে আর গুপ্তপাড়ায় একটাও নয়। গবাদি পশু খোয়া যাওয়ার ঘটনাও বেশি নয়। গোটা দ্বীপপুঞ্জে মাত্র তিনটে আক্রমণ হয়েছে গবাদি পশুর উপর, যার মধ্যে দুটো দক্ষিণ আন্দামানে।

কিন্তু ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে করা গ্রাউন্ড সার্ভেগুলো অনুযায়ী, সরকারি নথি আর মানুষের অভিজ্ঞতায় বিস্তর তফাত আছে। গবেষকরা এমন বহু আক্রমণ নথিবদ্ধ করেছেন যার রিপোর্ট নেই। ২০২৩ সালের মধ্যে মধ্য ও দক্ষিণ আন্দামান অঞ্চলে ছয়খানা আক্রমণের কথা নথিভুক্ত হয়েছে। তার মধ্যে শুধু গুপ্তপাড়া-মাংলুতানেই চারটে। মাছ ধরা ছেড়ে দিয়ে দোকানদার হয়ে যাওয়া কুমুদরঞ্জন সওজল (৬৩) বললেন ‘আমি মাছ ধরা ছেড়ে দিয়েছি ১৯৯৯ সালে। কিন্তু যখন ধরতাম, এদিকে কুমিরও দেখা যেত না আর এই জায়গাটা ডুবেও যেত না। এখন দুটো একসাথে ঘটে।’

বাসিন্দারা বলছেন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বদলে যাওয়ায় দ্বীপের জীবনযাত্রারই পরিবর্তন হয়ে গেছে। দক্ষিণ আন্দামান জেলায় সামগ্রিক বৃষ্টিপাত ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের প্রায় ২০% বেড়ে গেছে, যদিও কোনো বছরে বেশি আর কোনো বছরে কম হয়। ২০২৫ সালে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বর্ষা সাধারণত যখন আসে তার চেয়ে তাড়াতাড়ি এসেছিল। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর দেশের জন্যে বৃষ্টিপাতের লং পিরিয়ড অ্যাভারেজ যা, তার চেয়ে ১০৪% বেশি বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত করেছিল। বর্ষার কোর জোনে গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে ১০৬% বৃষ্টি বেশি হয়েছিল।

জলবায়ু মডেলগুলো সাবধান করছে যে এই পরিবর্তনগুলো আরও তীব্র হতে চলেছে। ২০২২ ইন্টারগভমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ছোট দ্বীপগুলো খামখেয়ালি বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড়ের ফলে হওয়া হড়পা বানে বিশেষভাবে বিপন্ন হবে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতের অত্যন্ত বেশি ক্ষতির ঝুঁকিসম্পন্ন অঞ্চলে পড়বে। এখানে বাতাসের গতি সেকেন্ডে ৫৫ মিটার পর্যন্ত হয়ে যাবে। গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনা বেড়ে গেছে। ২০২০ সালে বছরে প্রায় পাঁচটা হয়েছিল, এখন তার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ২০১৫ সালের এক সমীক্ষা ইতিমধ্যে গুপ্তপাড়াকে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্লাবিত হওয়ার পক্ষে বিপদসংকুল জায়গা বলে চিহ্নিত করেছে।

আরো পড়ুন বিপন্ন লাক্ষাদ্বীপ ও আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ

গ্রামবাসীরা বলছেন, জলবায়ুর খামখেয়ালিপনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা একসঙ্গে দুটো বিপদের সঙ্গে লড়াই করছেন – জলস্তর বৃদ্ধি আর কুমিরের সঙ্গে সংঘাত বেড়ে যাওয়া। স্থানীয় নেতাদের বিশ্বাস, বহুদিন আগে পরিত্যক্ত এক জল প্রকল্প দুটো সমস্যাই কমাতে পারে।

বহুকাল ধরে শেষ না হওয়া বাঁধ

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মানুষের ব্যবহারের জলের মূল উৎস হল ধনিখারি বাঁধ। আরেকটা বিকল্প হিসাবে গুপ্তপাড়া নালা বাঁধ তৈরি শুরু হয় ১৯৯২-৯৩ সালে। এই প্রকল্পের কাজ পরে থামিয়ে দেওয়া হয় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে। বহুবছর ধরে ওখানকার জলে পলি আর নুড়ি জমে জমে গভীরতা এবং ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। দক্ষিণ আন্দামান জেল পরিষদের অধ্যক্ষ প্রকাশ অধিকারী বললেন ‘নদীর পলি পরিষ্কার করতে হবে। তবে জলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বন্যার সময়ে এমনকি গুপ্তপাড়া জংশনেও একটা কুমির ধরা পড়েছিল। এখন থানার কাছের খেলার মাঠে নিয়মিত ওদের দেখা পাওয়া যায়। বন্যার সময়েই কুমিরগুলো চলে আসে। বাঁধটা যদি শেষ করা হয়, তাহলে জল নিয়ন্ত্রণ করা যাবে আর গরমকালের জন্যে জমিয়েও রাখা যাবে। কিছুদিন আগে যে বন্যা হল সেটা স্রেফ অবহেলার জন্যে হয়েছে।’

প্রকাশের আবেদন প্রশাসন মেনে নিয়েছে এবং আন্দামান পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (APWD) ওই বাঁধের প্রস্তাব নিয়ে আবার কাজ শুরু করেছে। চিফ ইঞ্জিনিয়ার টি কে প্রিজিত রেখ বললেন ‘এই বাঁধের ভালো জলাধার হিসাবে কাজ করার সম্ভাবনা আছে। এরকম ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় তৈরি করা গেলে ভারি বৃষ্টির সময়ে নিয়ন্ত্রণ রেখে জল ছাড়া যেতে পারে। আমরা কাগজপত্র আর মেমোর‍্যান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং চূড়ান্ত হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছি। যদিও পলি পরিষ্কার করা আমাদের কাজের মধ্যে পড়ে না, তবু আমরা সেটা করে নেব।’

হড়পা বান শুধু দক্ষিণ আন্দামানে সীমিত নয়। গত কয়েক মাসে ডিগলিপুর, স্বরাজ দ্বীপ (হ্যাভলক) আর কার নিকোবরেও তেমন ঘটার বেশকিছু ছবি ও ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে। প্রিজিতের মতে এই বানগুলোর জন্যে একইসঙ্গে দায়ী খামখেয়ালি বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড় এবং খাঁড়ির কাছাকাছি অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ। সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসাবে তিনি মান্নারঘাট গ্রামের কথা বললেন, যা কুমিরের নিয়মিত যাতায়াতের এলাকা রাইট মায়ো ক্রিকের কাছে অবস্থিত।

সহাবস্থান

বনাঞ্চলের মুখ্য সংরক্ষণকারী সঞ্জয় কুমার সিনহা বললেন ‘আগামীদিনে বাঁচার একমাত্র পথ হল সহাবস্থান। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে আমাদের উপর প্রবল চাপ রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা এই দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাসে প্রথমবার কুমির মেরে ফেলার আদেশ দিয়েছিলাম, তা নিয়ে অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে। জোরালোভাবে বলা হয়েছে মেরে না ফেলে বন্দি করতে। সবচেয়ে ভালো পথ হল কুমিরদের সম্মান দেওয়া, তাদের আচরণ বোঝা এবং সতর্ক থাকা।’

কুমুদের দোকানে প্রায়ই বৃষ্টি ধরে যাওয়া পর্যন্ত জেলেরা বসে থাকেন। তাঁদের কথাবার্তা মাছ ধরার লাইসেন্সের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া থেকে এই পেশাটাই ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে ঘোরাফেরা করে। সঙ্গে থাকে কাছাকাছি কোথাও আরও একটা কুমির দেখতে পাওয়ার ঘটনা। কুমুদ পান এগিয়ে দিয়ে হেসে বললেন ‘আন্দামানে কুমিরের জীবনের দাম আছে, মানুষের জীবনের দাম নেই।’

পরিসংখ্যান বলছে পুরুষদের কুমিরের আক্রমণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মহিলারাও ঘটনা ঘটে যাওয়ার বহুদিন পরে পর্যন্ত আতঙ্কে ভোগেন। বহুবছর আগে কুমিরের হাতে পড়ে কোনোমতে বেঁচে যাওয়া একজনের মেয়ে বললেন ‘আমার বাবা ওই আক্রমণের আগে দিনরাত মাছ ধরত। এখন বিছানায় পড়ে গেছে। আগে আমাদের গ্রামের সবাই মাছ ধরতে যেত। বাবার পা চলে যাওয়ার পর থেকে আমি আমার ছেলে বা স্বামীকেও যেতে দিই না। বাড়ির একজন পুরুষ আগে থেকেই বিছানায়, আবার ওরকম কিছু হলে কী হবে? আমি এখন বাড়িতেই বেশি থাকি, কারণ ওদের রোজগার করতে বেরোতে হয়।’

অন্যরা বললেন, তাঁরা মানিয়ে চলতে শিখে গেছেন।

যেমন মহামায়া সওজল বললেন ‘কুমির খাঁড়িতে থাকে, আমরা উঁচু জমিতে থাকি। আগে, ২০১৭ বা ২০১৮ নাগাদ খুব ভয় পেতাম। এই নিয়ে এত বছর বাঁচার পরে এখন আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন আর এতে ভয় পাই না।’

প্রতিবেদক একজন ফ্রিলান্স সাংবাদিক এবং 101reporters.com-এর সদস্য। এই প্রতিবেদন ওই ওয়েবসাইট ও নাগরিক ডট নেটের সহযোগিতার ভিত্তিতে মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.