লাক্ষাদ্বীপে নৌসেনার আরেকটি ঘাঁটি তৈরি করতে চলেছে ভারত। তারজন্য বিত্রা দ্বীপে ইতিমধ্যেই জমি অধিগ্রহণের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গতবছরেই মিনিকয় দ্বীপে দ্বিতীয় নৌসেনা ঘাঁটি গড়ার কাজ শুরু হয়। ছত্রিশটি প্রবাল দ্বীপ নিয়ে গঠিত লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। এর মধ্যে দশটি দ্বীপ মানুষের স্থায়ী বসবাসের যোগ্য। অন্য কয়েকটি দ্বীপের জমিও স্থানীয় মানুষ নানা কাজে ব্যবহার করেন। ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমে আরব সাগরে এই দ্বীপপুঞ্জ জৈববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। লাক্ষাদ্বীপের ৯০ শতাংশের বেশি হল বনাঞ্চল। লাক্ষাদ্বীপে সাম্প্রতিককালে পর্যটন কেন্দ্র, সেনা ঘাঁটি করার নামে জমি অধিগ্রহণের ফলে স্থানীয় অধিবাসীদের জীবিকা, বাসস্থান থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কা বাড়ছে। তারই সঙ্গে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ তথা বাস্তুতন্ত্র।

আন্তর্জাতিক জলপথ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লাক্ষাদ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্ব রয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রের তলার তেল ও দুষ্প্রাপ্য আকরিক বিভিন্ন দেশ এবং কর্পোরেট দুনিয়ার কাছে আকর্ষণীয়। আবার সামরিক ক্ষেত্রেও লাক্ষাদ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে তা আরও বেড়েছে। চীন বর্তমানে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রপথে মুক্তোর মালা গড়ে ভারতকে ঘিরতে চাইছে। নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। সেই সুযোগে ওইসব দেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে। বিত্রা দ্বীপ থেকে মালদ্বীপের দূরত্ব ৯৩৫ কিলোমিটার। পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে বিত্রার দূরত্ব প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার। বলা হচ্ছে, বিত্রায় প্রতিরক্ষা ঘাঁটি তৈরি করলে নাকি ইরানের হরমুজ প্রণালী থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভারতীয় নৌসেনার নজরদারির সুবিধা হবে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অনেকের মতে, লাক্ষাদ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়াবে। ২০০৭ সালে আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত – এই চারটি দেশ কৌশলগত নিরাপত্তার লক্ষ্যে আলাপ আলোচনার জন্য সমঝোতায় আবদ্ধ হয়। চতুর্পাক্ষিক এই সমঝোতা কোয়াড নামে পরিচিত। এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্যের মোকাবিলা করা। যৌথ সামরিক মহড়ার পাশাপাশি চারটি দেশের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানও কোয়াডের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ফলে বিত্রার সামরিক ঘাঁটি থেকে তথ্য আদানপ্রদানের মাধ্যমে আমেরিকার নজরদারি ও প্রভাব বাড়তে পারে। ভারত মহাসাগরে দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে তাদের সামরিক ঘাঁটি তো আছেই। তারা বিভিন্ন দেশের দ্বীপাঞ্চলে সরাসরি, বা সেই দেশগুলির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে, ঘাঁটি গড়ে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। ইউপিএ সরকারের আমলে বিতর্কিত ভারত-মার্কিন কৌশলগত সমঝোতা এবং তারপর মোদী সরকারের আমলে পরিবর্তিত বিদেশনীতি আমেরিকার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। আমেরিকার পরম মিত্র, সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র ইজরায়েলের সঙ্গেও এখন ভারত সখ্য গড়ে তুলেছে। সামরিক ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে সমঝোতা করছে। পহলগাম কাণ্ডই হোক বা বাণিজ্য যুদ্ধ – আমেরিকার ভূমিকা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, ভারতের পক্ষেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোটেই নিরাপদ বা সুবিধাজনক নয়। চীন ও আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশের সমুদ্রপথ দখল করার প্রতিযোগিতায় ভারত সামিল হলে বা কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করলে, নিজের নিরাপত্তার জন্যও তা বিপজ্জনক হতে পারে।

লাক্ষাদ্বীপে কেবল সামরিক ঘাঁটিই বাড়ছে না। পর্যটন, পরিকাঠামো, মাছ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে নানা কোম্পানিকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে সেই কাজ চললেও, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে তা বিশেষ মাত্রা পায়। তখন প্রধানমন্ত্রী মোদী লাক্ষাদ্বীপ সফরে গিয়েছিলেন। সেই সফরকে কেন্দ্র করে মালদ্বীপের কয়েকজন মন্ত্রীর ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের জেরে ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মালদ্বীপ বয়কট করে লাক্ষাদ্বীপে ঘুরতে যাওয়ার জন্য সোশাল মিডিয়ায় প্রচার শুরু করে বিজেপির সদস্য সমর্থকরা। তারপরই কেন্দ্রের ২০২৪-২৫ সালের অন্তর্বর্তী বাজেট এবং ২০২৫-২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে লাক্ষাদ্বীপের পর্যটন ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্ব পায়। গতবছর পরিকাঠামো উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকার ৩,৬০০ কোটি টাকার পরিকল্পনাও গ্রহণ করে। কেন্দ্রের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রক গত অক্টোবর মাসে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ৪,০০০ কোটি ডলার পুঁজি বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন কোম্পানিকে আহ্বান জানায়। বিভিন্ন কোম্পানি পর্যটনের পরিকাঠামো গড়ার বরাত পাচ্ছে।

আমেদাবাদের প্রাভেগ বিলাসবহুল তাঁবু ও রিসর্ট গড়ে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট করে। গুজরাটে বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি, উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় রামমন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে এই কোম্পানি বিনিয়োগের সুযোগ পেয়েছে। লাক্ষাদ্বীপের দুটি দ্বীপে নানা পরিকাঠামো গড়ার বরাত পেয়ে রাতারাতি এই কোম্পানির শেয়ার দর বেড়ে যায়। ছোট ছোট কোম্পানির পাশাপাশি বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলিও লাক্ষাদ্বীপের পর্যটন শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করছে।

ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জও অবস্থানগত দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রশাসিত এই দ্বীপপুঞ্জের ৩৮টি দ্বীপ মানুষের স্থায়ী বসবাসের যোগ্য। এই দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ৮৭% অরণ্য অঞ্চল। এটি দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণি ও উদ্ভিদে সমৃদ্ধ। আন্দামান নিকোবরের কাছেই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সম্প্রতি মায়ানমারের কোকো দ্বীপে চীন সামরিক ঘাঁটি গড়ায় আন্দামান নিকোবরের সামরিক গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। ভারত এই দ্বীপপুঞ্জে সামরিক পরিকাঠামো উন্নত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। বিমান ঘাঁটি, জেটির আধুনিকীকরণ, সেনা আবাস, সড়ক পথ নির্মাণ, উন্নত নজরদারি ইত্যাদির মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করতে চায় ভারত সরকার। ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত হল গ্রেট নিকোবর দ্বীপের ইন্দিরা পয়েন্ট। এই গ্রেট নিকোবরে নতুন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হচ্ছে। যুদ্ধ জাহাজ নোঙর করা, বিমানবন্দর, সেনা ঘাঁটির জন্য পরিকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গড়া সমেত নানা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দেশের নিরাপত্তার কথা বলা হলেও, উন্নয়নের নামে জনবসতি বাড়ানো, পর্যটন শিল্পের উন্নতিও এর অন্যতম লক্ষ্য।

গ্রেট নিকোবরে নীতি আয়োগের এই ‘মেগা উন্নয়ন’ প্রকল্পে দ্বীপটির চেহারাই নাকি বদলে যাবে। ২০৫০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ৪,০০০% বেড়ে যাবে। ৮১,০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থের এই প্রকল্পে দেশবিদেশের নানা কোম্পানি কাজের বরাত পাচ্ছে। আদানি গোষ্ঠী ছাড়াও বরাত পেয়েছে বিতর্কিত মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, নবযুগ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড প্রভৃতি। মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে ৯৬৬ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছিল। তার মধ্যে ৫৮৫ কোটি টাকা পেয়েছিল বিজেপি। কোম্পানিটি বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি কাজের বড় বড় বরাত পাচ্ছে। নবযুগ ইঞ্জিনিয়ারিং বিজেপিকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে দিয়েছিল ৫৫ কোটি টাকা। এরা উত্তরাখণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের চারধাম প্রকল্পেও কাজের বরাত পেয়েছে। সামুদ্রিক মাছের উপরেও কর্পোরেট দুনিয়ার নজর পড়েছে। ২০২৫-২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে লাক্ষাদ্বীপ ও আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মৎস্যশিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কেন্দ্রশাসিত দুটি দ্বীপপুঞ্জই ভারতের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’-এর অন্তর্গত। কোনো দেশের এই জোনের অন্তর্ভুক্ত এলাকার সমুদ্রগর্ভের তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনি, সামুদ্রিক মাছ সহ যাবতীয় সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান ও ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নৌযান চলাচল, প্রতিরক্ষার একচেটিয়া অধিকার সেই দেশের। এর সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব যেমন মেটেনি, তেমন দ্বীপ ও সমুদ্রের প্রাকৃতিক সম্ভারে এই একচেটিয়া রাষ্ট্রীয় অধিকার বড় বিপদ। অন্য দেশে প্রভাব বাড়িয়ে কোনো দেশ যেমন এই প্রাকৃতিক সম্ভার লুঠ করতে পারে, তেমন কর্পোরেটগুলিও সরকারি সাহায্যে তার মালিকানা পেতে পারে। কর্পোরেট ও রাষ্ট্রের মেলবন্ধনে স্যাঙাত পুঁজিবাদ এভাবে পুঁজি বিনিয়োগ ও প্রাকৃতিক সম্ভার দখলের সুযোগ নিচ্ছে। বিশ্বের নানা প্রান্তে এই দখলকে কেন্দ্র করে যেমন সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, তেমন দেশের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই কর্পোরেট স্বার্থে তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। লাক্ষাদ্বীপ এবং আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ঠিক সেটাই হচ্ছে। দেশের নিরাপত্তার জন্য যদি এই দ্বীপপুঞ্জগুলি এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে পর্যটন, পরিকাঠামো ইত্যাদি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে কেন? সমুদ্রের মাছ, বনজ সম্পদ যাঁদের জীবিকা, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রাকৃতিক সম্ভার রক্ষা করে আসছেন, তাঁরা আজ জীবিকা হারাবেন, বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ হবেন কেন?

লাক্ষাদ্বীপের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষই নানা উপজাতি গোষ্ঠীর, যাঁদের প্রায় সবাই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না করে, তাঁদের অন্ধকারে রেখে নানা প্রকল্প গ্রহণের অভিযোগ উঠে আসছে। বিত্রা দ্বীপেও একই অভিযোগ। সামরিক ঘাঁটির জন্য স্থানীয় উপজাতিদের উচ্ছেদ হতে হবে কিনা, তাঁদের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। ওই উপজাতির মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস সামুদ্রিক মাছ ও নারকেল গাছ। দেশের নিরাপত্তার নামে, বাণিজ্যের নামে সেই তাঁদের অস্তিত্ব বিপন্ন করা হচ্ছে। ভারতের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ থেকে যদি ভারতবাসীদেরই কার্যত উচ্ছেদ করে প্রাকৃতিক সম্ভারে কর্পোরেটের একচেটিয়া অধিকার কায়েম করা হয়, তাহলে তাকে উন্নয়ন বলা যায় না।

আরো পড়ুন লাদাখ, অরুণাচল, হাসদেও, নিকোবর – পরিবেশ জাহান্নামে

একই বিপদের মুখে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জও। পরিকাঠামো উন্নয়ন, খনি, পর্যটন ইত্যাদির নামে এখানকার বাস্তুতন্ত্র, জৈববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে এখানে বহুকাল ধরে বাস করা নানা বিরল উপজাতির অস্তিত্বও গভীর সংকটে। গ্রেট নিকোবরের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে ১৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা গভীর বনাঞ্চল। পরিবেশ মন্ত্রক ইতিমধ্যেই সেখানে ৮,৫০,০০০ গাছ কাটার অনুমতি দিয়ে দিয়েছে। উপজাতিগুলির অনেক গ্রামের অস্তিত্বই উপগ্রহ মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে না। এর অর্থ, সেই গ্রামগুলিকে আগামীদিনে লোপাট করে দেওয়া হতে পারে।

বনজ সম্পদের উপর হাজার হাজার বছর ধরে নির্ভরশীল উপজাতিগুলির অস্তিত্ব বাঁচাতে আন্তর্জাতিক মহল থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তেরোটি দেশের ৩৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে এই প্রকল্প নিয়ে আপত্তি জানিয়ে খোলা চিঠি দেন। তাঁদের মতে, প্রকল্পটি আংশিকভাবে রূপায়িত হলেও বিরল উপজাতিগুলির মৃত্যু পরোয়ানায় সই করা হবে। তাদের এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কাজ আন্তর্জাতিক অপরাধের সামিল। একাধিকবার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়ে এইসব প্রকল্প বাতিল করার আবেদন জানিয়েছিলেন।

প্রকল্প বাস্তবায়নে বনাধিকার আইনও মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। গ্রামসভা, উপজাতি পরিষদকে সব ঠিকমত না জানিয়ে বিভ্রান্ত করে কাজ চলছে। ২০২২ সালের অগাস্ট মাসে উপজাতি পরিষদ ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ দিলেও, সেবছরের নভেম্বর মাসে তা প্রত্যাহার করে নেয়। কারণ তাদের অভিযোগ – প্রকল্পের জন্য উপজাতিগুলির গ্রাম, জঙ্গল নিয়ে নেওয়ার কথা পরিষদকে জানানো হয়নি। উপজাতিরা উচ্ছেদ হবেন কিনা, হলে তাঁদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা কী – তাও এখনো স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। দেশের নিরাপত্তার অজুহাতে সব আইন যথাযথভাবে না মেনেই কেন্দ্রের বিভিন্ন মন্ত্রক ছাড়পত্র দিয়ে চলেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ৩,৫০,০০০ মানুষের বসতি গড়া, নানা পরিকাঠামোর জন্য বিনিয়োগের সঙ্গে দেশের নিরাপত্তার কোনো সম্পর্ক নেই। উন্নয়নের নামে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জও হতে চলেছে কর্পোরেট দুনিয়ার লোভনীয় গন্তব্য।

বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা, প্রাকৃতিক সম্ভারে পুঁজির মালিকানা, পুঁজি নির্দেশিত উন্নয়নের শিকার লাক্ষাদ্বীপ এবং আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। সেখানকার উপজাতির মানুষ ও পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র, জৈববৈচিত্র্যের উপর এর ভয়াবহ ফল হবে। উপজাতিদের একপ্রকার নিশ্চিহ্ন করেই এগিয়ে চলেছে এই তথাকথিত উন্নয়নের রথ।

দেশের নিরাপত্তার নামে সামরিক তৎপরতা বাড়ালে যদি পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র, জৈববৈচিত্র্য বিপন্ন হয়, দেশবাসীকে জীবিকা ও বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ হতে হয়, তাহলে দেশ কি নিরাপদ থাকে? প্রকৃতি, পরিবেশ রাষ্ট্রীয় সীমা মানে না। সে সীমা তৈরি করেছে মানুষ। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক সম্ভার লুঠ, তথাকথিত উন্নয়নের নামে নানা প্রকল্প এই বিশ্বে ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণাম টের পাওয়া যাচ্ছে। কোনো দেশই এর থেকে নিরাপদ নয়। যুদ্ধ, সামরিক কর্মকাণ্ড নিরাপত্তা দিতে পারে না, বরং গোটা পৃথিবীকে বিপন্ন করে। পুঁজির স্বার্থে সেই বিপদ ডেকে আনা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা, উপজাতিদের অধিকার আদায় বা যুদ্ধবিরোধী লড়াই – সবই তাই পুঁজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.