কিবরিয়া আনসারী
বিশ্বব্যাপী নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রের অন্যতম হল বুলডোজার। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বুলডোজারের ব্যবহার সাম্প্রতিককালে অত্যন্ত বেড়ে গেছে। তবে উন্নয়ন যজ্ঞে নয়, বরং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর কাজে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে, পায়ের তলার রাজনৈতিক মাটি শক্ত করতে, কিছু মানুষকে খুশি করতে এদেশের সংখ্যালঘুদের বুকের ছাতির উপর দিয়ে বুলডোজার চালাচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র। সংখ্যালঘুদের জব্দ করতে পেরে হিন্দুত্ববাদী নেতা, কর্মীরা বুক ফোলাচ্ছে। কিন্তু তারা বোঝে না, সংখ্যালঘুরাও ভারতমাতারই সন্তান। সংখ্যালঘুদের উপর দিয়ে বুলডোজার চালানো মানে ভারতমাতার বুকের উপর দিয়েই বুলডোজার চালানো।
২০১৪ সাল। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশের মসনদে বসেন ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা নরেন্দ্র মোদী। তারপর থেকেই দেশজুড়ে মাথা চাড়া দিতে থাকে হিংসা, বিভাজনের রাজনীতি। প্রাতিষ্ঠানিক সাম্প্রদায়িক হিংসা ও প্রতিশোধমূলক আচরণের প্রতীক হয়ে ওঠে বুলডোজার। মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই সেখানে মুসলমানবিদ্বেষের রাজনীতি প্রবলভাবে মাথা চাড়া দিয়েছিল। দেশের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলমান বাস করেন উত্তরপ্রদেশে। সেখানে গত কয়েক বছরে মুসলমানদের বাড়িঘর নানা অজুহাতে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আদিত্যনাথের সরকার। মুসলমানপ্রধান অঞ্চলের মানুষ যাতে কোনোরকম নাগরিক সুযোগসুবিধা না পায়, তা নিশ্চিত করতে পৌর প্রশাসন ও পঞ্চায়েতগুলোর উপরে উত্তরপ্রদেশ সরকার চাপ দেয় বলেও অভিযোগ করেন অনেকে। ঘৃণার রাজনীতির মাধ্যমে সামাজিক বিভাজন ঘটিয়ে মুসলমানদের একঘরে করে রাখার চেষ্টায় রয়েছে গেরুয়া শিবির।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সম্প্রীতি উত্তরপ্রদেশের ফতেহপুরে ১৮০ বছরের পুরনো এক মসজিদের একাংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আদিত্যনাথের প্রশাসন। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) সকালে ফতেহপুর জেলার লালৌলি শহরের সদর বাজারে অবস্থিত নূরী জামে মসজিদের পিছনের একটি অংশ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অবিনাশ ত্রিপাঠী এবং এএসপি বিজয়শঙ্কর মিশ্রের নেতৃত্বে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযানের সময়ে ভারি পুলিশবাহিনি ও অন্য বাহিনি মোতায়েন করা হয়। প্রথমে ফতেহপুরের নূরী মসজিদ কমিটিকে একটি নোটিস ধরিয়েছিল পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট। নোটিসে বলা হয়, নালা নির্মাণে নাকি মসজিদের পিছনের অংশ বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলে সেই অংশ ভেঙে ফেলতে হবে। মসজিদ কমিটি এ জন্য একমাস সময় চেয়েছিল। কিন্তু সেই সময় দেওয়া হয়নি। মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি সৈয়দ নূরী বলেন, এলাহাবাদ হাইকোর্টে দায়ের করা রিটের শুনানি ১৩ ডিসেম্বর থাকলেও, প্রশাসন তার আগেই বুলডোজার নিয়ে এসে একাংশ ভেঙে দিয়েছে।
মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের এক মুসলমান নেতার বাড়িও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়িটা নাকি অবৈধভাবে তৈরি। তারপর জেলাস্তরের একজন আমলা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন যে এতদ্বারা পুলিসের উপরে কিছুদিন আগে চালানো এক আক্রমণের ন্যায্য পাওনা মেটানো হল। উত্তরপ্রদেশে বুলডোজার দিয়ে একটা শপিং কমপ্লেক্সও মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মালিক বিরোধী দলের একজন মুসলমান কর্মী। ঘটনার কিছুদিন আগে তাঁকে ধর্ষণের দায়ে আটক করা হয়েছিল।
এই ‘বুলডোজার নীতি’ নতুন কিছু নয়। মোদীর ভারতে শুধু সন্দেহভাজন হওয়ার অপরাধে মানুষের বাড়িঘর প্রায়ই ঘটা করে ভেঙে ফেলা হয়, আর এই ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই মুসলমান। সবক্ষেত্রে অজুহাত মোটামুটি একই – এগুলো বেআইনি নির্মাণ। বিজেপিশাসিত রাজ্য সরকারগুলো মুসলমানদের প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো আর পার্টির হিন্দু আধিপত্যবাদী ভোটারদের খেপিয়ে তোলার জন্য বুলডোজারকে আদর্শ হাতিয়ার হিসাবে পেয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, এভাবে বুলডোজার দিয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার জন্য বেআইনি নির্মাণ বা সরকারি জমি দখলের অভিযোগ খাড়া করা হলেও, সমস্ত বেআইনি নির্মাণ বা জবরদখল হওয়া জমিতে তৈরি ইমারত কিন্তু ভাঙা হচ্ছে না। অভিযোগ মুসলমানদের বিরুদ্ধে থাকলে তবেই বুলডোজার পৌঁছয়। আইনশৃঙ্খলাজনিত কোনো ঘটনায় কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঘরবাড়ি ভাঙার জন্য বুলডোজার পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যদি তেমন কোনো অভিযোগ না থাকে, তাহলে পরিকল্পনা করে তেমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।
উত্তরপ্রদেশেই প্রথম শুরু হয় এই তথাকথিত ‘বুলডোজার জাস্টিস’। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ ২০২০ সাল থেকে তাঁর আমলাদের নিয়মিত বুলডোজার ব্যবহারের আদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। বিজেপি সরকারের চোখে যে অপরাধী বা সরকারবিরোধী প্রতিবাদে জড়িত, বিশেষ করে যদি সে মুসলমান হয়, তাহলেই তার সম্পত্তি ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয় বুলডোজার। আদিত্যনাথ ক্ষমতায় আসার অনেক আগে থেকেই ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্যের জন্য পরিচিত। মূলত তিনিই বুলডোজারকে ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসাবে তুলে ধরেন। এর ফলে তিনি ‘বুলডোজার বাবা’ উপাধিও অর্জন করেছেন। শুধু প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা নয়। বুলডোজারকে ইতিমধ্যে প্রান্তিক হয়ে যাওয়া এক সম্প্রদায়কে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার কাজেও লাগানো যায়। ‘নাগরিক’ উন্নয়নের জন্য যেসব জায়গা চিহ্নিত করা হচ্ছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে, সেগুলো যে মুসলমান অধ্যুষিত – তা বোধহয় নিতান্ত কাকতালীয় নয়।
বিজেপি শাসনে মধ্যপ্রদেশের মন্দসৌর ও খারগোন, গুজরাতের সবরকান্থ ও খাম্বাট, দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী, উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজ, কানপুর ও সাহারানপুরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর বুলডোজার চালিয়ে বহু বাড়িঘর, দোকান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়। কয়েকদিন আগে রাজস্থানে দুই স্কুলছাত্রের মারামারির জেরে প্রশাসন বুলডোজার পাঠিয়ে মুসলমান ছেলেটাকে অভিযুক্ত করে তার বাড়িঘর ভেঙে দেয়। অর্থাৎ বুলডোজার যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রকাশ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনো মুসলমান যে কোনো ব্যাপারে অভিযুক্ত হলেই তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করে সরকার নিজেই রায় ঘোষণা করে বুলডোজার পাঠিয়ে সাজা দিচ্ছে। এ যেন অনেকটা এনকাউন্টারের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার মত। অপরাধ প্রমাণ করার দরকার নেই, অভিযুক্তকে গুলি করে দিলেই হল। বিজেপির সরকার শক্তিশালী; মোদী কড়া প্রশাসক, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন – এসবের দৃষ্টান্ত হিসাবে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করার অস্ত্র হয়ে উঠেছে বুলডোজার। পাশাপাশি আছে মেরুকরণের রাজনীতি।
হরিয়ানার নুহ-তে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর বেপরোয়া বুলডোজার চালিয়েছিল রাজ্য সরকার। অবশ্যই লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের ঘরবাড়ি-দোকানপাট। আদালতে পেশ করা হলফনামায় হরিয়ানার বিজেপি সরকার জানিয়েছিল, বুলডোজার যত বাড়ি, দোকান ও সম্পদ ধ্বংস করেছিল তার ৮০ শতাংশই ছিল মুসলমানদের। গত দুবছরে দেশে ১,৫০,০০০ হাজার বাড়ি ধুলোয় মিশিয়েছে বুলডোজার, প্রায় ৭,৫০,০০০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছেন।
গত লোকসভা নির্বাচনে চারশো পারের ডাক দেওয়ার পর ২৪০ আসন পাওয়া পদ্ম শিবিরের ভরাডুবিই বলতে হবে। অপ্রত্যাশিত খারাপ ফল হয় উত্তরপ্রদেশে। অতঃপর উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী সঞ্জয় নিশাদ দলের পরাজয়ের কারণ হিসাবে বুলডোজারের অপব্যবহারকে চিহ্নিত করেন।
তার প্রতিক্রিয়ায় আদিত্যনাথ বুলডোজার নীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদে কেবল চাকরি করার জন্য বসেননি, যারা দোষী তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্যও বসেছেন এবং সেই কাজই করছেন। অনেক বিজেপি সমর্থক স্পষ্টত এই মতের পক্ষে। গত বছরের ৯ নভেম্বর আদিত্যনাথের এক সমর্থক মায়াপুর শহরে এক জনসমাবেশে বুলডোজারে চড়ে উপস্থিত হন।
উত্তরপ্রদেশের অনুসরণে একাধিক বিজেপিশাসিত রাজ্যে চলছে বুলডোজার নীতি। আদিত্যনাথের শাসনে উত্তরপ্রদেশে বেলাগাম এনকাউন্টারও মাথাচাড়া দিয়েছে। যদিও বিরোধীদের অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে খোদ মোদী বুঝিয়ে দিয়েছেন বুলডোজার উন্নয়নই আসল উন্নয়ন। ২০২৪ সালের মে মাসে উত্তরপ্রদেশে এক বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নিজে আদিত্যনাথের বুলডোজার রাজনীতিকে সমর্থন করেন। উত্তরপ্রদেশে এক বক্তৃতায় বিরোধীদের অভিযোগকে ফুৎকারে উড়িয়ে মোদী বলেন, ‘কিছু মানুষ আছেন যারা যোগীর পরিচয় করাতে বুলডোজারের উদাহরণ দেয়। আমি ওদের বলব, আপনারা চোখ খুলে দেখুন স্বাধীনতার পর উত্তরপ্রদেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যত উন্নয়ন হয়েছে তা শুধু যোগীজির কারণে হয়েছে।’ এরপর বলেন ‘উত্তরপ্রদেশের সাংসদ হওয়ার সুবাদে আমি গর্ববোধ করি যে আমার কাছে এমন একজন মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন।’
দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক পদে বসে থাকা ব্যক্তি যখন বুলডোজারকে সিলমোহর দেন, তখন কি আর বুলডোজার থেমে থাকে? যতই সুপ্রিম কোর্ট বুলডোজার ন্যায়কে অন্যায়, বেআইনি বলে ঘোষণা করুক।
স্বভাবতই আদিত্যনাথের পথেই হাঁটছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর ধামি।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে তারা রাজনৈতিকভাবে প্ররোচিত শাস্তিমূলক ভাঙচুরের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারি আধিকারিকদের সরাসরি উসকানিতে এসব ঘটেছে এবং এর ফলে অন্তত ৬১৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের বেশিরভাগই মুসলমান। গতবছর নির্বাচনে বিজেপি ধাক্কা খেলেও তথাকথিত ‘বুলডোজার জাস্টিস’ এখনো চালু আছে।
সুপ্রিম কোর্টের তিরস্কারের পরেও আদালতের নির্দেশ অমান্য করেই অসাংবিধানিক বুলডোজার লাগাতার চলছে। কোনো বিজেপি সরকারই যে দেশের সাংবিধানিক পরিকাঠামোর তোয়াক্কা করে না তা পরিষ্কার।
ধরা যাক, সংখ্যালঘুদের শায়েস্তা করার যে লক্ষ্যমাত্রা গেরুয়া শিবির ধার্য করেছে তা পূর্ণ হল। তারপর? তখন কি ক্ষমতায় টিকে থাকতে সংখ্যাগুরুদের নিয়ে নতুন খেলা শুরু হবে? সংখ্যাগুরুদের মধ্যে উঁচু নিচু ভাগ করে দুর্বলদের উপর আক্রমণ শুরু হবে? আজ সংখ্যালঘুদের টাইট দেওয়া হচ্ছে বলে বুলডোজার নিয়ে যারা উচ্ছ্বসিত, তখন হয়ত বুলডোজার তাদের দিকেই ঘুরে যাবে। তেমন কিন্তু ইতিমধ্যেই হয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। রাজস্থানেই যেমন এক হিন্দু পরিবারের মা-মেয়ের প্রাণ গিয়েছিল বুলডোজারে। অতএব বুলডোজার থামানোর প্রয়াস এখনই করা উচিত।
বিজেপির ঘৃণ্য রাজনীতিতে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও বেড়ে গেছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বেশি দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছে বলে সেন্টার স্টাডি অফ সোসাইটি অ্যান্ড সেকুলারিজম (সিএসএসএস)-এর রিপোর্টে উঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশে ৫৯ খানা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩২। অর্থাৎ এক বছরে দাঙ্গা বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৪%। সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে মহারাষ্ট্রে। সেখানে বারোটা দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএসএসএস রিপোর্ট। উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে সাতটা করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
দেশের প্রথম সারির কিছু সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করে এই রিপোর্ট তৈরি করেছে সিএসএসএস। অধিকাংশ দাঙ্গাই সংগঠিত হয়েছে ধর্মীয় উৎসব ও শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অযোধ্যার রামমন্দিরে প্রাণপ্রতিষ্ঠার সময় চারখানা দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। সরস্বতীপুজোর বিসর্জনকে কেন্দ্র করে সাতখানা, গণেশ উৎসবে চারখানা এবং বকরি ঈদে দুটো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। সিএসএসএস-এর রিপোর্ট থেকেই স্পষ্ট, রাজনৈতিক স্বার্থে কীভাবে দেশে ধর্মীয় উৎসবকে হাতিয়ার করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে।
আরএসএস-বিজেপি সমাজকে এমন বিষাক্ত করে তুলেছে যে আজ একজন হিন্দু কোনো মুসলমানকে দেখলেই সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েন। আবার হিন্দুদের সম্পর্কেও মুসলমানদের ধারণার বদল ঘটে গেছে। অবশ্য এখনো অনেক গ্রামাঞ্চলে এই বিষ ঢুকতে পারেনি। অনেক হিন্দুপ্রধান গ্রাম আছে যার এক প্রান্তে অল্প কিছু মুসলমান বাস করেন। কিন্তু তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন না। একইভাবে অনেক মুসলমানপ্রধান গ্রাম আছে, যার এক প্রান্তে কিছু হিন্দু বাস করেন। তাঁরাও আতঙ্কিত নন, বরং পরস্পরের পাশে থাকেন। আবার হিন্দুপ্রধান গ্রামে কাজকর্ম, ব্যবসাপাতি করেন মুসলমানরা। মুসলমানগরিষ্ঠ গ্রামেও অনেক হিন্দু কাজ করেন, কোনো দিন কোনো সমস্যা হয়নি। বহু মাদ্রাসায় হিন্দু শিক্ষক, শিক্ষিকা আছেন। তাঁরা ছাত্রছাত্রীদের নিজের সন্তানের মত স্নেহ করেন। শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কে ধর্মীয় পরিচয় কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি।
আরো পড়ুন ওয়কীল হাসানের গণতন্ত্র, না মুকেশ আম্বানির ধনতন্ত্র?
এগুলোই আবহমানকাল ধরে চলে আসা ভারতের সমাজচিত্র। হিন্দু, মুসলমান ধর্মে পৃথক হলেও আত্মিক যোগ অটুট। এই ভারতকেই বদলে দিতে চায় রাজনীতির কারবারিরা। তারা সাম্প্রদায়িক তাস খেলে ফায়দা তুলতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, বিভাজনের রাজনীতি করে এক সম্প্রদায়কে অন্য সম্প্রদায়ের শত্রু বানিয়ে কি দেশের উন্নতি করা যাবে?
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছাড়াও আছে গণপিটুনি। ২০২৪ সালে ১২ খানা গণপিটুনির ঘটনায় দশজন খুন হয়েছেন। এঁদের একজন হিন্দু, একজন খ্রিস্টান, আটজন মুসলমান। অবশ্য ২০২৩ সালে ২১ খানা গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছিল। সিএসএসএস রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, অধিকাংশ গণপিটুনির ঘটনাই গোরক্ষকদের কীর্তি এবং করা হয়েছে গোহত্যার অভিযোগ তুলে। এছাড়াও ভিনধর্মের ছেলে/মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো এবং মুসলমান হওয়ার জন্যেও গণপিটুনিতে মানুষের প্রাণ গেছে। বিজেপিশাসিত রাজ্যেই এ ধরনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। মহারাষ্ট্রে তিনখানা; ছত্তিশগড়, গুজরাট, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে দুখানা করে এবং কর্নাটকে একখানা।
অন্য সংখ্যালঘুরাও নিরাপদে নেই। গত ডিসেম্বরে খ্রিস্টানদের উপর আক্রমণ ও হিংসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশের ৩০ খানার বেশি গির্জার প্রতিনিধি এবং চারশোর বেশি বর্ষীয়ান খ্রিস্টান নেতা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও প্রধানমন্ত্রী মোদীকে চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, দেশজুড়ে খ্রিস্টানদের চাঁদমারি করা হচ্ছে। খ্রিস্টানদের সমাবেশগুলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অবিলম্বে খ্রিস্টানদের উপর এই হিংসা বন্ধ হোক। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উপযুক্ত পদক্ষেপ নিন। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, শুধুমাত্র সেই বড়দিনের মরশুমেই খ্রিস্টানদের উপরে কমপক্ষে ১৪ খানা হামলা হয়েছে। খ্রিস্টানদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ধর্মাচরণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। হামলাকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না। প্রশাসন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, শত্রুতা বাড়ছে। এছাড়াও চিঠিতে লেখা হয়েছে, ১১০ জনের বেশি যাজককে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা খ্রিস্টানদের হয়রান করার ইঙ্গিত।
আসামের এক আইন তো ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সামিল। ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অপব্যবহারের কথাও খ্রিস্টান নেতাদের ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল। মুসলমানদের মত, খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধেও ঘৃণাভাষণ বাড়ছে। শান্তিপূর্ণ প্রার্থনাসভা এবং ধর্মীয় পুস্তিকা বিতরণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। দলিত খ্রিস্টানদের তফসিলি জাতির মানুষের প্রাপ্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। কেন্দ্রকে লেখা ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন বিশপ থমাস আব্রাহাম, বিশপ ডেভিড ওনেসিমু, বিশপ জোয়াব লোহারা, রেভ ডঃ রিচার্ড হাওয়েল, সিনিয়র মেরি স্কারিয়া, ফাদার সেড্রিক প্রকাশ এসজে, ডঃ জন দয়াল, লুই এসজের মত বিশিষ্ট খ্রিস্টান নেতারা। বিশিষ্ট সমাজকর্মী শবনম হাসমিও খ্রিস্টানদের প্রতি সংহতি জানিয়ে সই করেছিলেন।
খ্রিস্টানদের উপর হামলার উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে ইভাঞ্জেলিক্যাল ফেলোশিপ অফ ইন্ডিয়া (ইএফআইআরএলসি) এবং ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরাম (ইউসিএফ)-এর মতো সংস্থাও। তারা বলেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ৭২০-র বেশি হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে আমাদের দেশ ১০৫তম স্থানে, মানব উন্নয়ন সূচকে ১৩৪তম স্থানে। চীন, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভুটানের থেকেও পিছিয়ে। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৭৬ খানা দেশের মধ্যে ১৫৯তম, দেশকে ‘গণতন্ত্রের অযোগ্য’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর সুখী দেশগুলোর মধ্যেও ভারতের স্থান ১৪৩-এ ১১৭।
বিজেপি অনেকসময় ‘বটেঙ্গে তো কটেঙ্গে’ অর্থাৎ হিন্দুরা বিভক্ত হলে তাদের ‘ওরা’ কেটে ফেলবে – এমন মুসলমানবিদ্বেষী ও ভীতি উদ্রেককারী পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক স্বার্থে বিজেপির তৈরি গভীর সামাজিক ক্ষত কখনো সারানো যাবে কিনা কে জানে! বুলডোজার হিন্দু ও মুসলমান – উভয় সম্প্রদায়ের স্মৃতিতেই চিরকাল থাকবে। তবে আগামীদিনে অন্তত আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে – এটুকু আশা নিয়েই বেঁচে থাকা।
নিবন্ধকার পেশায় সাংবাদিক
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








