বাঙালি হিসাবে এক যুগও হয়নি, যখন ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ার সুবাদে ফুটবল সাংবাদিকদের এবং ফুটবল ভক্তদের ভারতীয় ফুটবলে নতুন যুগের উন্মেষ সম্পর্কে উল্লসিত হতে দেখেছিলাম ইন্ডিয়ান সুপার লিগের (আইএসএল) সূচনালগ্নে। মূলত ক্রিকেটের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের পথে হেঁটে বলিউডি গ্ল্যামার আর বিদেশি ফুটবলারে সজ্জিত একটি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ শুরু হতে চলেছে বলে সেদিন যেরকম উত্তেজিত হতে দেখেছিলাম সহকর্মীদের, তাতে ফুটবল সাংবাদিকতার সাইডলাইনে থাকা আমার মনে হয়েছিল, হয়ত সত্যিই অদূর ভবিষ্যতে দেখব ভারত বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলছে। ভারতে তখনই চালু থাকা জাতীয় লিগটার কী হবে, বিভিন্ন শহরের সুপ্রাচীন লিগগুলো এবং তাতে খেলা ক্লাবগুলোর কী গতি হবে, সন্তোষ ট্রফি বা ডুরান্ড কাপের মত প্রতিযোগিতার আর দাম থাকবে কিনা, না থাকলে সেটা ভাল না মন্দ – এসব প্রশ্ন তখন ফুটবলবোদ্ধা সিনিয়রদের করলে তাঁরা যেভাবে তাকাতেন, সেটা টেনিদা যে কায়দায় ‘যা যা, মেলা ফ্যাচ ফ্যাচ করিস না’ বলে পটলডাঙায় – একেবারে সেই জাতীয়। তাই চুপ করে যেতাম।

এই এক যুগে অনেককিছু ঘটেছে। আইএসএল পত্রে পুষ্পে পল্লবিত হয়েছে, মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল আইএসএলে না খেললে ক্লাব থাকারই মানে হয় না বলে মনে করেছেন দুই দলের সদস্য সমর্থকরাই। অতঃপর কখনো কর্পোরেট সহায়তায়, কখনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে দুই দলই ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর সঙ্গে গা ঘষাঘষি করার টিকিট আদায় করেছে। পিছিয়ে পড়া মহমেডান স্পোর্টিংও শেষমেশ গিয়ে পৌঁছেছে অভিজাতদের টেবিলে। মোহনবাগান এখনো মোহনবাগান আছে, নাকি এটিকে হয়ে গেছে – তা নিয়ে কাজিয়া চলেছে। বছর বছর ইস্টবেঙ্গল আইএসএলে খেলতে পারবে কিনা তা নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। কলকাতা ফুটবল লিগ আছে না উঠে গেছে তা বুঝতেই আমার মত কাগজ পড়ে ফুটবলের খবর রাখা লোককে হিমশিম খেতে হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় ফুটবল একচুলও এগিয়েছে কিনা বুঝতে পারিনি। বরং বছর দুয়েক হল ফিফা র‍্যাংকিং ক্রমাগত নামতে দেখছি। তারপর হঠাৎ সেদিন খেয়াল করলাম – ভারতের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন সুনীল ছেত্রী সোশাল মিডিয়ায় একখানা লম্বা পোস্ট করেছেন এবারের আইএসএল অনির্দিষ্টকালের জন্যে পিছিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে। কিন্তু তাঁর দুশ্চিন্তা কেবল আইএসএল নিয়ে নয়, তিনি লিখেছেন যে ভারতীয় ফুটবল বাস্তুতন্ত্রের সকলেই চিন্তিত, আহত এবং ভীত। অর্থাৎ এই সংকট কেবল কোনো ইতিহাস, ঐতিহ্য ছাড়াই ভারতীয় ফুটবলের শীর্ষবিন্দু হয়ে যাওয়া লিগটির নয়। ভারতীয় ফুটবলই বিপদে পড়েছে। যদিও যথার্থ তারকার মতই তাঁর বয়ান কাউকে দায়ী করেনি এই সংকটের জন্য, কিন্তু শেষে একটি বাক্যে লেখা আছে ‘আমরা সকলে মিলে এই ঝড়ের মোকাবিলা করব’। তার মানে স্বীকার করা হল – ঝড়ের মুখে পড়েছে দেশের ফুটবল। কেন উঠল এই ঝড়? সে বিষয়ে কৌতূহলী হতেই চোখে পড়ল জয়দীপ বসু লিখিত হু স্টোল মাই ফুটবল?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

লেখক কেবল প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, দেশের শীর্ষস্থানীয় ফুটবল সাংবাদিকদের অন্যতম নন। ২০২২-২৫ পর্বে ভারতীয় ফুটবলের রসাতলে যাওয়া সম্পর্কে তিনি যা লিখেছেন তাকে ঘোড়ার মুখের খবর বললে অত্যুক্তি হয় না, কারণ এই সময়ে তিনি সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের মিডিয়া বিভাগের প্রধান ছিলেন। মনে রাখতে হবে, তিনি কোনো রাজনৈতিক সুপারিশে নিযুক্ত হননি, তাঁকে নিযুক্ত করেছিল সুপ্রিম কোর্টের আদেশে তৈরি ফুটবল ফেডারেশনের প্রশাসক কমিটি। পরে যখন নির্বাচনের মাধ্যমে ফেডারেশনের সভাপতি হন কল্যাণ চৌবে এবং তাঁর সঙ্গীসাথীরা নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে নেন, তখন অপছন্দের লোক মনে হলে এই বইয়ের লেখককে বিদায় দেওয়ার অধিকার এবং ক্ষমতা তাঁদের ছিল। ফলে এখন যদি এ বইয়ে তোলা অভিযোগগুলোকে কেউ শত্রুভাবাপন্ন লোকের লেখা বলে উড়িয়ে দিতে চান, তাঁকে পাত্তা দেওয়া যাবে না।

লেখক জানাচ্ছেন, ২০২৩ সালের ২০ জুলাই ছিল দিল্লির পক্ষে স্বাভাবিক ভীষণ গরম একটি দিন। সেই গরমে ফেডারেশনের সদর দফতর ফুটবল হাউসের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কনফারেন্স রুমে চলছিল রাজ্য সংস্থাগুলিকে নিয়ে এক জরুরি সভা। নিয়মানুযায়ী সেই সভায় লেখকের উপস্থিত থাকার কথা নয়, কিন্তু তিনি একটি খবর তখনই ফেডারেশন কর্তাদের জানাতে নিয়মের তোয়াক্কা না করে সেই সভায় ঢুকে পড়েন। খবরটি এমন যে অপেক্ষা করা কোনো ফুটবলপ্রেমী ভারতীয়ের পক্ষেই সম্ভব হত না। একটু আগেই জানা গেছে যে ৬৪ মাস পরে ভারতের পুরুষদের জাতীয় দল ফিফা র‍্যাংকিংয়ে প্রথম একশোয় ফিরেছে। এই খবরে স্বভাবতই আনন্দিত এক্সিকিউটিভ কমিটির এক সদস্য তৎক্ষণাৎ আশা প্রকাশ করেন, এই সবে শুরু। দুঃখের বিষয়, পরবর্তীকালে দেখা গেছে সেটা শুরুই ছিল বটে, তবে পতনের। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে জাতীয় দলের কোচ ইগর স্টিমাচের আপত্তি সত্ত্বেও থাইল্যান্ডের কিং’স কাপ এবং কুয়ালালামপুরের মারডেকা কাপে অংশগ্রহণের পরেই ভারত ১০২ নম্বরে নেমে যায়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পতনের গতি বাড়ে। ওই মাসে র‍্যাংক ছিল ১১৭, জুন মাসের পর থেকে ১২৪ থেকে ১২৭-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। আজ এক বছর পরে, এই আলোচনা লেখার সময়ে দেখলাম, ভারত নেমে গেছে ১৩৩ নম্বরে। এই পতন কেন হল, তারই বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে এই বইতে।

সিনেমার আলোচনায় ‘স্পয়লার’ না দেওয়া একটি অলিখিত নিয়ম। বইয়ের আলোচনায়, বিশেষত গল্প-উপন্যাস নয় এমন বইয়ের আলোচনায় তেমন নিয়ম নেই। কিন্তু আজকাল এমনিতেই পাঠক কমেছে, ক্রেতা কমেছে আরও বেশি। পাঠকরাও অনেকে বিনা পয়সার পিডিএফ খোঁজেন। অমন সন্ধানের উৎসাহে জল ঢেলে দেওয়াই কর্তব্য মনে করি, তাই গলগল করে বইয়ের তথ্য সব ফাঁস করব না। কিন্তু এটুকু বলা অবশ্যই দরকার যে এই বই পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায় – পৃথিবীর ইতিহাসে যা একাধিক দেশে ঘটেছে, ভারতেও তা ঘটছে। সর্বগ্রাসী ফ্যাসিবাদী শাসন জনপ্রিয় খেলার রাশ হাতে তুলে নেয়, কারণ যা যা জনপ্রিয়, সমাজের ভোল পালটে দিতে সবই তার দরকার। ভারতীয় ফুটবলের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। এর ফল শেষমেশ কখনো ভাল হয় না, আমাদের দেশের ফুটবলের ক্ষেত্রেও হচ্ছে না।

আইনকানুনের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে ফেডারেশন সভাপতির পদ আঁকড়ে বসে থাকা প্রফুল্ল প্যাটেলকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সরে যেতে হয়েছিল ২০২২ সালের মে মাসে এবং দায়িত্ব নিয়েছিলেন আদালত নিযুক্ত প্রশাসকরা। তাকে ‘তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ’ গণ্য করে ফিফা সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে সাসপেন্ড করে ১৬ অগাস্ট। ফলে অবিলম্বে ফেডারেশনের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন সম্পন্ন করে নতুন পরিচালকদের নিযুক্তি অনিবার্য হয়ে পড়ে। লেখক স্পষ্ট লিখেছেন – সভাপতি নির্বাচনে প্রবাদপ্রতিম বাইচুং ভুটিয়াকে হারানো কল্যাণ চৌবে ফেডারেশনের ত্রিসীমানায় ছিলেন না নির্বাচনের কয়েকদিন আগেও। তিনি কোনো রাজ্য সংস্থার প্রতিনিধি পর্যন্ত ছিলেন না ফেডারেশনে, কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল না। তাহলে কোন জাদুমন্ত্রে তিনি শুধু জিতলেন না, ৩৩-১ ফলে জিতলেন (ফেডারেশনের ইতিহাসে কেউ সরাসরি লড়াইয়ে অত বড় ব্যবধানে সভাপতি নির্বাচিত হননি)? লেখক পরিষ্কার জানিয়েছেন ‘কিন্তু যেই নির্বাচন ঘোষিত হল, চৌবে শীর্ষস্থানীয় প্রার্থী হয়ে দাঁড়ালেন, ভোটদানকারী পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় বলে নয়। তিনি রাজনৈতিক তাস ভাল খেলেছিলেন বলে। ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্য চৌবে ততদিনে দলের টিকিটে দু-দুটো নির্বাচনে হেরে গেছেন। কিন্তু শাসক দলের নেতৃত্বকে তিনি বোঝাতে পেরেছিলেন যে তাঁরই সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদে দলের প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত’। ফলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল যে প্রায় সব ভোটদাতাই চৌবেকে ভোট দিতে বাধ্য হলেন। লক্ষণীয়, চৌবেকে মনোনয়ন দিয়েছিল গুজরাট স্টেট ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। শুধু তাই নয়, লেখক লিখছেন ভোটগ্রহণের আগের রাতে ভোটদাতাদের এআইএফএফ প্রদত্ত হোটেল থেকে একটি বাসে তুলে এক রিসর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এক প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সেখানে তাঁদের বলেন, চৌবে নির্বাচিত হলে ভারতীয় ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁরা কী কী করবেন। বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার আস্থাভোটের আগের রাতগুলোর কথা মনে পড়া স্বাভাবিক নয় কি?

বইয়ের ছত্রে ছত্রে চৌবের বিরুদ্ধে কী কী দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তার বর্ণনা রয়েছে এবং সব অভিযোগই কীভাবে বিনা তদন্তে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে তাও লেখা হয়েছে। তবে এদেশের রাজনীতিতে বা ক্রীড়া প্রশাসনে দুর্নীতি তো নতুন কিছু নয়। ইন্ডিয়ান অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মাথা, কংগ্রেস নেতা সুরেশ কালমাদিকে আমরা কেউই ভুলে যাইনি। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান থাকাকালীন জগমোহন ডালমিয়ার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, এন শ্রীনিবাসনের তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ক্রিকেট প্রশাসনের ধারেকাছে আসাই নিষেধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জয়দীপবাবু লিখছেন – এমনও হয়েছে যে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান লোকেদের কাছে চৌবে সম্পর্কে অভিযোগ জানিয়েও কোনো সাড়া পাননি অভিযোগকারী।

অবশ্য ভারতের জাতীয় দলগুলোকে নিয়ে যে ধাষ্টামো চালানো হয়েছে গত তিন বছরে, তার তুল্য কিছু অন্য কোনো খেলার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসকরাও করেছেন কিনা সন্দেহ। স্টিমাচের সঙ্গে ফেডারেশনের গোলমাল, ফেডারেশনের ঔদ্ধত্য এবং শেষমেশ গলা নামিয়ে মান বাঁচানোর ইতিবৃত্ত ফুটবলপ্রেমী মাত্রেই জানেন। সংবাদমাধ্যমে তা বহু আলোচিত, ফলে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু পুরুষদের সিনিয়র দলের কথা বাদ দিলেও, অন্য দলগুলোকে নিয়ে কীরকম ফাজলামি করা হয়েছে তার লম্বা তালিকাটি একবার দেখে নেওয়া যাক।

আরো পড়ুন ইগর গাথা: ভারতীয় ফুটবলের অধোগতির লক্ষণ, খারাপ বিজ্ঞাপন

২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ ছেলেদের দলকে নিয়ে যথেষ্ট সফল হন কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ। দলটি এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্যায়ে পৌঁছয়। কিন্তু বিবিয়ানোর চুক্তির পুনর্নবীকরণ না করে তাঁকে আইএসএল দলের কোচ হওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। মহিলাদের জাতীয় দলের কোচ হিসাবে থমাস ডেনারবির তিন বছরের চুক্তি শেষ হওয়ার পর লঙ্গম চাওবা দেবীকে এনে, মাত্র একটি টুর্নামেন্টের পরেই সরিয়ে দেওয়া হয়। তারপর কোচ হন সন্তোষ কাশ্যপ। তাঁকেও বেশিদিন রাখা হয়নি, অতঃপর দায়িত্ব পান ক্রিসপিন ছেত্রী। কিন্তু তিনি একইসঙ্গে ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগের একটি দলেরও কোচ হয়ে বসে আছেন, কারণ ফেডারেশন তাঁর সঙ্গে কোনো স্থায়ী চুক্তি করেনি।

মহিলাদের অনূর্ধ্ব-২৩ দলেরও কোনো স্থায়ী কোচ নেই। ক্লিফোর্ড মিরান্ডা এসেছেন এবং গেছেন। তাঁর পরে নৌশাদ মুসা এসেছিলেন অস্থায়ী কোচ হিসাবে। দুটি ম্যাচের পরেই বিদায় নেন এবং এখন ফেরত এসেছেন। অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ রঞ্জন চৌধুরী ছিলেন মাত্র একটি টুর্নামেন্টের জন্য। জয়দীপবাবু লিখেছেন, তাঁকে সুযোগ দেওয়ার কারণই ছিল তিনি অসম্ভব কম মাইনে নিতে রাজি হয়েছিলেন এবং নিজের চাকরিস্থল থেকে ছুটি আদায় করতে পেরেছিলেন। এমনকি অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচ ইশফাক আহমেদের সঙ্গেও স্থায়ী চুক্তি করেনি ফেডারেশন।

এসবের চেয়েও হাস্যকর (বা করুণ) অবশ্য আই লিগ আইনত শেষ হওয়ার আগেই চার্চিল ব্রাদার্সকে জয়ী ঘোষণা করে মহা সমারোহে ট্রফি দিয়ে দেওয়া।

বস্তুত, এই বই পড়লে মনে হয়, সন্তোষ ট্রফির ফাইনাল সৌদি আরবে আয়োজন করার গিমিক বাদ দিলে, প্রাক্তন গোলরক্ষক এবং বিজেপি নেতা চৌবের আমলে ভারতীয় ফুটবল সর্বতোভাবে পিছন দিকে এগিয়ে গেছে। এই আমলে এআইএফএফ যেন এক সার্কাসের দল, যার নেতৃত্বে আছে এক জোকার। রাজ কাপুর অভিনীত মিষ্টি জোকার নয়, হিথ লেজার বা জোয়াকিন ফিনিক্স অভিনীত ভয়ঙ্কর জোকার। তাই লেখককে গোড়াতেই ভারতীয় ফুটবলের ভক্তদের কাছে আলাদা করে এ বই লেখার জন্য কৈফিয়ৎ দিতে হয়েছে এবং সেখানে প্রথম লাইনেই লিখেছেন ‘I hated writing this book.’

সুতরাং ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুর্ভাবনা জ্ঞাপন করেও কারা দায়ী সে ব্যাপারে সুনীল যতই নিরাপদ স্কোয়্যার পাস খেলুন, ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের বলটা যে কে চুরি করেছে তা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না।

পরিশেষে ‘মেলা ফ্যাচ ফ্যাচ’ না করে পারছি না। কলকাতা নাকি ভারতীয় ফুটবলের মক্কা। ধন্যি মেয়ে মুক্তি পেয়েছে ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে, আজও বাঙালি জাঁক করে বলে ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’। অথচ বাংলায় এমন একখানা বই লিখে উঠতে পারলেন না কেউ? ফি বছর মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলকে নিয়ে তো বস্তা বস্তা বস্তাপচা বই বেরোচ্ছে কলকাতা বইমেলায়। না হয় এই শহরের কোনো সাংবাদিক এআইএফএফের অভ্যন্তরে ছিলেন না। তা বলে কি তাঁরা অন্দরমহলের খবর পান না?

WHO STOLE MY FOOTBALL? – The Untold Story of AIFF 2022-25
Writer: Jaydeep Basu
Publisher: Badal Ray
Cover, cartoon and graphic design: Debanjan Majumder
Price: Rs 350/-

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.