সন্তোষ সেন

হাসদেও অরণ্য রক্ষার আন্দোলন চলছে গত ১৩ বছর ধরে। কেন এই দীর্ঘ আন্দোলন? ছত্তিসগড়ের হাসদেও জঙ্গলের সবুজ ধ্বংস করে তৈরি হবে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প, জঙ্গল কেটে তুলে আনা হবে কালো সোনা। তাই সরকারি প্রভাব খাটিয়ে ২০১৮ সালে হাসদেও অরণ্যের মধ্যে পারসা কয়লাখনি সংলগ্ন গ্রামসভাগুলির নামে ছাড়পত্র আদায় করা হয়। এই সাজানো ছাড়পত্রের বলে পারসা কয়লাখনির জন্য সরকারের থেকে বন-ছাড়পত্র আদায় করে আদানি গোষ্ঠী। রাজস্থান বিদ্যুৎ নিগমের তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা উত্তোলন করতে ছত্তিসগড়ের হাসদেও অরণ্য, যা মধ্যভারতের ফুসফুস বলে পরিচিত, তা ধ্বংস করতে চায় আদানি গোষ্ঠী এবং ছত্তিসগড় সরকার। ২০২১ সালে এই গ্রামগুলির হাজার হাজার মানুষ প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পদযাত্রা করে রায়পুরে ছত্তিসগড়ের রাজ্যপালের কাছে পৌঁছন। আইনানুগ অধিকার রক্ষা ও অরণ্য রক্ষার আশ্বাস পান। তবু লাগাতার চলছে অরণ্য ধ্বংসের আয়োজন। চলছে প্রতিরোধ আন্দোলনও।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সর্ব আদিবাসী সমাজ, ছত্তিসগড় বাঁচাও আন্দোলন ও আদিবাসী ছাত্র সংগঠন, তফসিলি উপজাতি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করে সাজানো গ্রামসভার তদন্ত রিপোর্ট অবিলম্বে প্রকাশ করার দাবি জানানো হয়েছে। ছত্তিসগড় বাঁচাও আন্দোলন সমন্বয় সমিতি এবং মণীশ কুঞ্জম, সঞ্জয় পারাটে, শালিনী গেরা, অলোক শুক্লা, সুদেশ টিকাম, নন্দ কুমার কাশ্যপ, রমাকান্ত বাঞ্জারে একটি বিবৃতি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন (১৬ অক্টোবর ২০২৪) সমস্ত পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক ও কর্মীদের জন্য।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সর্বস্তরের জনগণের বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ সত্বেও হাসদেও অরণ্যে পারসা কোল ব্লকে কয়লাখনির জমি অধিগ্রহণের জন্য জঙ্গল সাফ করতে বদ্ধপরিকর আদানি গোষ্ঠী। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে কেন হাসদেও জঙ্গলকে বাঁচাতেই হবে? ছত্তিসগড়ের হাসদেও জঙ্গলে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ একর জায়গা জুড়ে সবুজ বৃহৎ বনানী ছড়িয়ে আছে। আছে ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম। ১৬৭ রকমের উদ্ভিদকুল ছড়িয়ে আছে এই জঙ্গলে, যার মধ্যে ১৮টি প্রজাতির উদ্ভিদ পৃথিবী থেকেই হারিয়ে যেতে বসেছে। এখানে আছে প্রায় ২০০ রকমের দুষ্প্রাপ্য ওষধি। মূলত এইসব গাছের উপরই স্থানীয় মানুষের চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষা নির্ভর করে। এখানে বাস বহু প্রজাতির জীবজন্তুর। কয়েকশো হাতির ঘরবাড়ি এই জঙ্গল। বাঘেদেরও আশ্রয়স্থল এই মনোরম জঙ্গল। আছে ৮২টি প্রজাতির পাখি, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রজাপতি। এই জঙ্গল দিয়ে বয়ে চলেছে হাসদেও নদী, যা মহানদীর এক বিরাট অংশ। এই জঙ্গলেই আদিবাসীদের বহু প্রজন্মের বাস। বর্তমানে প্রায় ১৫,০০০ আদিবাসী বাস করেন এই অঞ্চলে। জঙ্গল ও নদীর উপর নির্ভরশীল তাঁদের জীবন। হাসদেও জঙ্গলে প্রাণের বিপুল সম্ভার থাকলেও আদিবাসী জনগণের দুর্ভাগ্য – জঙ্গলের মাটির নিচে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত হয়ে আছে বিপুল কয়লার ভাণ্ডার।

স্বভাবতই এই লোভনীয় সম্পদের উপর চোখ পড়েছে আদানি কোম্পানির। এখানে ২৩টি ব্লক জুড়ে কয়েকশো কোটি টন ওজনের কয়লা স্তর থরে থরে সাজানো আছে। তার মধ্যে চারটি ব্লক থেকে কয়লা তোলার ছাড়পত্র পেয়ে গেছে দেশের পয়লা নম্বর ধনকুবের গৌতম আদানির কোম্পানি। তাই গত কয়েক বছর ধরেই এই বনাঞ্চল সাফ করার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে আদানি গোষ্ঠী আর তাদের সেবাদাস ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ ঘোষণাকারী কেন্দ্রীয় সরকার। যোগ্য সঙ্গত করে চলেছে ছত্তিসগড় সরকার। এর মধ্যেই একটি সাইটে কাজ শুরু হয়ে গেছে।

এই মহা মূল্যবান জঙ্গল, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনধারা বাঁচানোর তাগিদে গত কয়েক বছর ধরেই স্থানীয় আদিবাসীরা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় পারসা অঞ্চলে আদানির দ্বিতীয় প্রকল্প শুরু করার জন্য লক্ষ লক্ষ গাছ কেটে ধ্বংস করে ফেলার লক্ষ্যে উন্নত যন্ত্রপাতি সহ কন্ট্রাক্টর ও বিশাল পুলিসবাহিনী হাজির হয়ে যায় গত ১৬ অক্টোবর। গাছ কাটা রুখতে বিভিন্ন গ্রাম থেকে দলে দলে আদিবাসী মানুষজনও হাজির হয়ে যান। সারারাত পাহারা দিয়ে জঙ্গল ধ্বংস রুখতে পারলেও ১৭ অক্টোবর সকালে পুলিসবাহিনী নখ দাঁত বের করে জমায়েতের উপর হামলা করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তারপর প্রতিবাদীদের ব্যারিকেড দিয়ে আটকে রেখে প্রশাসন ও আদানি কোম্পানির লোকজন পূর্ণোদ্যমে গাছ কাটা শুরু করে দেয়।

ছত্তিসগড়ের আদিবাসী বাঁচাও মঞ্চ সমেত সমস্ত পরিবেশপ্রেমী সংগঠন এই হামলার তীব্র বিরোধিতা করে লড়াইয়ের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে। সমস্ত আইনকানুন, নিয়ম এবং পরিবেশ আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। জঙ্গল সংলগ্ন একটি জায়গা, যেখানে পঞ্চায়েত (এক্সটেনশন টু শিডিউলড এরিয়াজ) অ্যাক্ট, ১৯৯৬ বা PESA লাগু আছে, পঞ্চম তফসিলভুক্ত এবং গ্রামসভা দ্বারা পরিচালিত, সেখানে সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে পুলিশ প্রশাসন সশরীরে হাজির থেকে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য তথা আদিবাসী মানুষের জীবন জীবিকা ধ্বংসের কাজ করিয়ে দিচ্ছে। মানুষকে ভয় দেখিয়ে, মেরে অরণ্য থেকে দূরে সরিয়ে রেখে গাছ কাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রশক্তি আর আদানি গ্রুপ।

তবুও শান্তি, সোয়াস্তি নেই খনি শিল্পের মালিকদের। পরিবেশবান্ধব নয়, লগ্নিবান্ধব সরকার চায় খনি ব্যবসায়ীরা। পরামর্শদাতা আর্থিক সংস্থার মুখপাত্ররা রীতিমত ধমক দিয়েছে তাদের লেজুড় কেন্দ্রীয় সরকারকে। তাদের দাবি – দেশের আইনকানুন এবং পরিবেশ দফতরকে আরও বেশি করে লগ্নির জন্য সুগম করার ব্যবস্থা হোক।

এই কি উন্নয়ন? এই কি সভ্যতার অগ্রগতির নমুনা? এ কোন বর্বর দেশে বাস করছি আমরা? প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষের যাপন, সংস্কৃতি, ভাষা – সবকিছুর উর্দ্ধে কতিপয় কর্পোরেটের মুনাফা? জঙ্গল তথা পরিবেশ রক্ষার চলমান এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে, লগ্নিপুঁজির মুনাফার স্বার্থে নির্বিচারে প্রকৃতি লুঠ, কর্পোরেটের সেবাদাস কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ১৮ অক্টোবর কলেজ স্ট্রিটে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সকলে যৌথভাবে পথে নামা জরুরি প্রাণ প্রকৃতি তথা সভ্যতা রক্ষার স্বার্থে, বাঁচার ও বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে।

আসলে এক ভয়ঙ্কর পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন এদেশের মানুষ।

২০২৪ সালে মার্চ-এপ্রিলের উষ্ণতা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। জুলাই-অক্টোবর বন্যা হয়েছে দেশের একাধিক অঞ্চলে। নভেম্বরের সপ্তাহ দুয়েক পরেও ভ্যাপসা গরম। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দানা আছড়ে পড়ল অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে। পশ্চিমের মরু অঞ্চলে বৃষ্টি বেড়েছে ৭০% আর গাঙ্গেয় অববাহিকায় মরশুমি বর্ষায় ঘাটতি ছিল ৩৫%-৪০%। আগামী বছর কী হতে চলেছে? ভাবতেও ভয় হয়।

আরো পড়ুন দেউচা-পাঁচামি সরল উত্তর পাওয়ার জায়গা নয়

এসবের মাঝে মহামান্য ভারত সরকারের ভূমিকা কেমন? প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় বন্ধু আদানিকে কয়লা উত্তোলনের জন্য জঙ্গল ধ্বংসের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে হাসদেওতে। ছ হাজার গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ওই অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীসহ সকলেই কিন্তু মাতৃসমা প্রকৃতিকে রক্ষা করতে চান। কারণ নদী-জঙ্গল-পাহাড়কে তাঁরা ভালোবাসেন, দেবতা জ্ঞানে পুজো করেন। অর্থমূল্য দিয়ে বিচার করেন না। জঙ্গলের সাথে জড়িয়ে আছে তাঁদের জীবনযাপন, ভাষা, সংস্কৃতি। তাই তাঁরা মুনাফাখোর হানাদারদের বিরুদ্ধে জমি-জঙ্গল রক্ষায় ব্রতী হয়েছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে –জঙ্গল সহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ কোনো সরকার, কোম্পানি বা রাষ্ট্রের অধিকারের জিনিস হতে পারে না। সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদে জঙ্গল-পাহাড়-নদী সংলগ্ন মানুষ সমেত তামাম দেশবাসীর অধিকার রয়েছে।

এদিকে ‘মাত্র’ ন লক্ষ গাছ কেটে, ‘ন্যূনতম’ ক্ষতি করে আরও এক ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প ঘোষিত হয়েছে। গ্রেট নিকোবর দ্বীপে বন্দর, বিমানবন্দর তৈরি হবে, সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র – ৩৫,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প। এই বিরাট প্রকল্পের বরাত পাওয়ার অন্যতম দাবিদার সেই আদানি গোষ্ঠী। আর এরই জন্য ১৩০ বর্গ কিলোমিটার বনাঞ্চল সাফ করা হবে। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে নিহত গাছের সংখ্যা ন লক্ষেরও অনেক গুণ বেশি হবে বলেই বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

হে বুদ্ধিমান মানুষ, তুমি কবে বুঝবে যে জঙ্গল মানে শুধু গাছ নয়? হাজার হাজার লতাগুল্ম, বন্যপ্রাণী, পাখি, অসংখ্য অণুজীব সহ এক আস্ত বাস্তুতন্ত্রের সমাহার একেকটি জঙ্গল। এই অরণ্য ও তার সম্পদের উপর নির্ভর করে হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রা বয়ে চলে। তাই মূলনিবাসী মানুষসহ নিকোবর দ্বীপের অন্য মানুষজনও প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু নিকোবর মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে। তাঁদের প্রতিবাদের আওয়াজ আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছয় না। সংবাদমাধ্যমে কদাচিৎ উঠে আসে প্রকৃতি, পরিবেশ ধ্বংসকারী এইসব প্রকল্পের কথা।

কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, এই ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। কীরকম ক্ষতিপূরণ? এই বিশাল অরণ্য ধ্বংসের বিনিময়ে হরিয়ানায় ২৪,০০০ হেক্টর বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত অরণ্যের তকমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। সেন্টার ফর ফিনানশিয়াল অ্যাকাউন্টেবিলিটি নামের একটি সংস্থা বলছে, এই ক্ষতিপূরণ এক বিচ্ছিরি রসিকতা ছাড়া কিচ্ছু নয়। গরু মেরে জুতো দান একেই বলে। অবশ্য এখন তো রসিকতারই সময়। ‘গ্রিন ক্রেডিট’, ‘কার্বন ক্রেডিট’, ‘এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ আর ‘সংরক্ষিত অরণ্য’ তৈরির গল্পটিই আদতে সরকারি রসিকতা। ইচ্ছে মত যত খুশি অরণ্য ধ্বংস করো, বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ হিসাবে অন্য কোথাও, দেশের অন্য কোনো প্রান্তে কিছু গাছ লাগিয়ে এসো। যাকে অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হচ্ছে বনসৃজন। এই বনসৃজনের নামে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, মহুয়া, পলাশ, পিয়াল – প্রকৃতির পক্ষে ভীষণ উপকারী এইসব বড় বড় শতাব্দীপ্রাচীন গাছের পরিবর্তে বিদেশ থেকে আমদানি করা ইউক্যালিপটাস বা সোনাঝুরি গাছ যেখানে সেখানে লাগিয়ে দিলেই হল। সঙ্গে সংরক্ষিত অরণ্য এলাকা বাড়িয়ে বনবাসী মানুষকে সেখান থেকেও উঠিয়ে দেওয়া যাবে। নিদারুণ মজার খেলার কী নিখুঁত হিসাব! এই হিসাব মিলে গেলে কাঠ মাফিয়া, জঙ্গল আর পাহাড়ের লুটেরাদের শান্তি। আর না মিললে?

ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে এখন আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠেছে নদী-জঙ্গল-পাহাড় ধ্বংসের কারবারিরা। যে কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিতে তারা উঠে পড়ে লেগেছে। আমরা ভীত, সন্ত্রস্ত। অশনি সংকেত পাচ্ছি। জীববৈচিত্র্য তথা প্রাণ, প্রকৃতি লুঠের এই প্রক্রিয়ায় আমাদের অস্তিত্বই আজ প্রশ্নের মুখে।

শুধুই কি উন্নয়ন আর নগরায়নের অজুহাতে বৃক্ষ নিধন যজ্ঞ চলছে জোরকদমে? উন্নয়নের খুড়োর কল তো আছেই। সঙ্গে আছে ধর্মীয় ভাবাবেগ, উৎসব, যাত্রা আরও কতকিছু। এরকমই এক পরিবেশ ধ্বংসকারী ব্যাপার হল কাঁওয়ারিয়াদের যাত্রা। এই যাত্রার নতুন পথ তৈরি করতে উঠে পড়ে লেগেছে উত্তরপ্রদেশ সরকার। নতুন যাত্রাপথ তৈরি হচ্ছে গাজিয়াবাদের মুরাদনগর থেকে মুজফফরনগরের পুরকাজী পর্যন্ত। হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এ কাজ করতে গিয়ে এর মধ্যেই ১৭,৬০০ মত গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। তাতেই ক্ষান্ত না দিয়ে রাজ্য সরকার জানিয়েছে, নব যাত্রাপথ নির্মাণের স্বার্থে প্রায় ১,১৩,০০০ গাছ কাটা হবে। এ কি নবনির্মাণ, নাকি চরম বিনির্মাণ? চরম আতঙ্ক, উদ্বেগ, আশঙ্কার মধ্যে আবার রসিকতা করেছে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনালের বেঞ্চ। তাদের চাপাচাপিতে সরকার নাকি গাছ কাটার পরিকল্পনা কমিয়ে ৩৪,০০০-এ নামিয়ে এনেছে।

ভারতে পরিবেশ সংকটের শীর্ষবিন্দুর দিকে দ্রুত এগোচ্ছি আমরা। একদিন রুখা শুখা, অন্যদিকে বন্যাপ্লাবিত, বিষাক্ত, দূষিত দেশ উপহার দিয়ে যাচ্ছি পরবর্তী প্রজন্মকে। মানুষের কোনো একটা অঙ্গ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার চিকিৎসা হয়, মানুষ যন্ত্রণায় ছটফট করে। কিন্তু হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ মাইল বন নির্বিচারে উজাড় করে দিলেও আমরা সেভাবে গর্জে উঠি না। এর প্রতিবাদে কেন শামিল হতে পারে না আপামর নাগরিক সমাজ? এই নাগরিক মনস্তত্ত্ব বোঝা প্রয়োজন। প্রাণ, প্রকৃতি রক্ষার দাবি শহর ছাড়িয়ে গ্রামে গ্রামান্তরেও নিয়ে যাওয়া দরকার।

একদিকে জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ছত্তিসগড়ের হাসদেও অরণ্য ধ্বংসের প্রতিবাদে সেখানকার আদিবাসীরা প্রতিরোধ চালাচ্ছেন। অন্যদিকে দেশের উত্তরে লাদাখে হিমালয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য বাঁচানোর দাবিতে সোনম ওয়াংচুকরাও আন্দোলন করছেন। তার অঙ্গ হিসাবে দিল্লির লাদাখ ভবনে সোনমসহ লাদাখবাসীরা অবস্থান ও অনশন কর্মসূচী শুরু করেন ৬ অক্টোবর থেকে। সেইসময় এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সোনম সারা দেশের পরিবেশ আন্দোলনকারী এবং সমস্ত সাধারণ মানুষকে ২০ অক্টোবর পরিবেশের জন্য অনশন করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। উনি স্পষ্ট বলেছিলেন, এই অনশন শুধু লাদাখবাসীদের জন্য নয়। বরং এই অনশন সমস্ত ভারতবাসী – শিশু, কিশোর, তরুণ, যুবক, বয়স্ক সমেত সকলের পানীয় জলের জন্য। শ্বাস নেওয়া যাবে এমন বাতাসের জন্য, আলোর জন্য, বিষমুক্ত খাবারের জন্য। ওই আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় সরকার অন্তত এটুকু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, লাদাখে ষষ্ঠ তফসিল লাগু করার ব্যাপারে তাঁরা আলোচনায় আগ্রহী। এই প্রেক্ষিতে সোনমসহ অনশনকারীরা আপাতত অনশন ভঙ্গ করেছেন। কিন্তু দাবি না মানা হলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে, সমস্ত লাদাখবাদী আবার পথে নামবেন – একথা বলেই রাখা হয়েছে।।

ইতিমধ্যে আবার অরুণাচল প্রদেশে বিভিন্ন নদীর উপর ১৩টি বড় বাঁধ নির্মাণের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য। নদীর গতিপথ আটকে, নদী সংলগ্ন সবুজকে, মানবজীবনকে বিধ্বস্ত করে আবার একটি ধ্বংসের রূপরেখা তৈরি করেছে সরকার এবং পুঁজিপতিরা।

এই সর্বগ্রাসী প্রক্রিয়ায় মানুষ মরুক, বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বেড়েই চলুক, মেরুপ্রদেশ ও হিমালয়ের বরফের চাদর দ্রুত গতিতে গলে যায় যাক, সমুদ্র জলের উচ্চতা ও উষ্ণতা বেড়েই চলুক, কোনোকিছুতেই কিছু এসে যায় না। লক্ষ্য একটাই – মুনাফা বাড়িয়ে যাওয়া। তাই দেশজুড়ে চলমান পরিবেশ আন্দোলনগুলোর উপর নেমে আসছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। হাসদেও, লাদাখ, অরুণাচল, নিকোবরসহ সমস্ত পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গের সংহতিতে ২০ অক্টোবর স্ট্রিট চত্বরে ১২ ঘন্টার প্রতীকী অনশন পালন করেছেন ২৫ জন পরিবেশ কর্মী। অন্যদিকে বিরসা মুন্ডার জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সত্যাগ্রহ সপ্তাহ (১৫-২১ নভেম্বর) জঙ্গলমহল অঞ্চল সহ কলকাতার বুকেও পালিত হবে। পরিবেশপ্রেমীরা হাতে হাত ধরে পথ হাঁটবেন। সব লড়াই মিশিয়ে বিপুল জনজাগরণই সময়ের দাবি।

নিবন্ধকার বিজ্ঞান শিক্ষকবিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.