রণদীপ নস্কর

এখন ভাবলে অবাক লাগে, একটা সময়ে আমাদের দেশে শ্যাম বেনেগাল, মণি কল, জন আব্রাহাম, আদুর গোপালকৃষ্ণন, কুমার সাহানি, গোবিন্দ নিহালনির মতো পরিচালক কাজ করে গেছেন; ‘প্যারালাল ওয়েভ’ নামক এক অতুলনীয় ছবির ধারার জন্ম হয়েছে। একদিকে যেমন মূলধারার হিন্দি ছবি রমরমিয়ে চলেছে, তেমনই তার সমান্তরালে কয়েকজন পরিচালক নিজের মত করে দেখতে চেয়েছেন এ দেশের বাস্তবকে।

বেনেগালের উত্থান বড় আশ্চর্য সময়ে – সাতের দশক। সেই সময়ের বোম্বের ছবিতে ক্রমশ নিম্নবিত্ত শ্রেণির মুখ হয়ে উঠছেন অমিতাভ বচ্চন, তাঁর চরিত্রগুলোর মাধ্যমেই ওই মানুষগুলো বাস্তব এসে পড়ছে সিনেমার পর্দায়। অতএব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তাঁর ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান’ ভাবমূর্তি। এর উল্টোদিকে বেনেগাল আসছেন তাঁর সম্পূর্ণ অন্য চলচ্চিত্রভাষা নিয়ে। আনছেন অঙ্কুর (১৯৭৪), নিশান্ত (১৯৭৫) এবং মন্থন (১৯৭৬)। তাঁর কাজ যেমন রাষ্ট্রের প্রকল্প ও নীতির সঙ্গে নাগরিকের পরিচয় করাতে শুরু করল, নাগরিককে দেশ-ইতিহাস-সংস্কৃতি চেনানোর হাতিয়ার হয়ে উঠল তাঁর সিনেমা, তেমন উল্টোটাও সত্যি। তিনি সিনেমার মাধ্যমে দেশ চিনতেও চাইলেন। তাঁর সিনেমায় সামাজিক বাস্তবতা ধরা পড়ার পাশাপাশি এসে দাঁড়াল ভারতের পুরাণ, চিত্রকলা, সঙ্গীতের সুদীর্ঘ ইতিহাস। তাঁর ছবি হয়ে দাঁড়াল ভারতের তাবৎ শিল্প, সংস্কৃতির সার্থক মোহনা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমি এই লেখায় মূলত কথা বলব ১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া বেনেগালের ছবি সুরজ কা সাতওয়াঁ ঘোড়া ছবিটা নিয়ে। এই ছবি – সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে – কিছুটা হলেও পরিচিত, বলা উচিত, ভাইরাল। কারণ আর কিছুই নয়। থেকে থেকেই এই ছবির একটা সংলাপ ভাইরাল হয়। প্রেম ব্যাপারটা যে আদতে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেই সংক্রান্ত একটা সংলাপ। খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ছবিটা ভারতের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতির উল্লেখ করতে করতে এই সংলাপের সত্যতায় সিলমোহর দিয়েছে। কখনো অনায়াসে দেবদাস-এর সংলাপ বাস্তবের প্রেম-পটভূমিকায় নায়িকার আলম্ব হয়ে থেকেছে, কখনো ছবির গল্পের নারীচরিত্রের তুলনায় টেমপ্লেট হয়ে দাঁড়িয়েছে রাধা বা মীরাবাঈয়ের জীবন। বেনেগালের ছবি বারবার বাস্তবকে যাচাই করে নিতে চেয়েছে ইতিহাস-পুরাণের কষ্টিপাথরে। কখনো আটের দশকের ভারত হয়েছে তাঁর মহাভারতের আধুনিকীকরণের পটভূমি, কখনো তিনি গুজরাটের কৃষক-পোষিত ছবির – যার মধ্যে সরাসরি প্রচারিত হয়েছে সরকারি কোঅপারেটিভ ডেয়ারি প্রকল্প – নামকরণ করেছেন অমৃত মন্থনের প্রসঙ্গ টেনে এনে। অঙ্কুর ছবির মত কখনোসখনো উঠে এসেছে মহাভারতের সরাসরি প্রতিকথন: স্ত্রীকে বাজি রেখে জুয়ায় স্বামী হারলে, স্ত্রী স্বামীর তাকে বাজি রাখার অধিকার নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয়। অতএব ক্রমাগত পুরাণ, ইতিহাসকে টেনে আনা, প্রায়ই সেগুলোকে খণ্ডন করা অথবা সমসময়ে গড়ে পিটে নেওয়া, আবার নাগরিকের রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন, সরকারি প্রকল্পে কোন শ্রেণির উপর কীরকম প্রভাব পড়ল তা খতিয়ে দেখা – এই অনুসন্ধান বা ছানবিনের জায়গাটা বেনেগালের ছবির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল।

সুরজ-ও তেমনই একখানা ছবি। এ তো আসলে মানেক মোল্লার তিন বন্ধুকে নেহাতই সময় কাটানোর জন্য গল্প বলা নয়, আসলে দেশ-রাজনীতি চেনার পাঠও। প্রাচীন যুগের প্রেম একেবারে সৃজনশীলতার উপর ভর করেই দাঁড়িয়েছিল, তার বিশেষ কোনো আর্থসামাজিক ভিত্তি ছিল না – এমন একটা ভাসা-ভাসা ভাবনা আমাদের ভাল লাগে বটে। কিন্তু এই ছবিতে মানেক মোল্লার গল্প কেবল তদানীন্তন সমাজচিত্র তুলে ধরে তা নয়; একেকটা চরিত্র আর্কিটাইপ হয়ে দর্শককে দেখিয়ে দেয় যে বরাবর প্রেমের পরিণতির নির্ধারক হয়ে থেকেছে বিভিন্ন আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক গণ্ডি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ছবির তিনবছর পরে দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে ছবিতে অমরীশ পুরী অভিনয় করবেন মেয়ের জাঁদরেল বাপের চরিত্রে। আর সুরজ কা সাতওয়াঁ ঘোড়ায় তিনি ছেলের ধূর্ত বাবা মহেশ্বর দালালের অন্য অংশ হিসাবে। এই ছবিতে তিনি যখন অভিনয় করছেন, তাঁর আচরণ প্রতি পদে মধ্য বা উত্তর ভারতীয় পুরুষের স্টিরিওটাইপ হয়ে উঠছে। সে মেয়েদের পণের চিন্তা করাই হোক, বা স্ত্রী বহুগামিতার খবর পেয়ে ক্ষুব্ধ হলে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়াই হোক। যতবার এইরকম আচরণ ছবিতে ফুটে ওঠে, ততবার মানেকের অমোঘ সংলাপ মনে পড়ে – কবিতা, গদ্য বা নাটকে যার আভাস পাওয়া যায় তা হয়ত প্রেম হতে পারে। কিন্তু যে মুহূর্তে তাকে সামাজিক গণ্ডির মধ্যে নিয়ে আসার প্রশ্ন ওঠে, তখনই তাকে নির্ভর করতে হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপর। জীবন, তার বয়ানে, আসলে প্রেমের অপেক্ষা।

পাঠক, এই বাক্য শুনে আপনার কি মনে পড়ছে না এই ছবির দুই দশক পরে মুক্তি পাওয়া প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যেরবাকিটা ব্যক্তিগত (২০১৩) ছবির কথা? সেই ছবিতে কলকাতার যুবক প্রেম কাকে বলে তা জানতে বা প্রেমের রসাস্বাদনের খোঁজে পৌঁছে গিয়েছিল মায়াপল্লী মোহিনীতে। সেখানে তার আলাপ হল শম্পার সঙ্গে। কিন্তু শহরে ফিরে তাকে পাকাপাকিভাবে ঘরে আনার বন্দোবস্ত করে যখন সে ফের শম্পার খোঁজে গেল, তখন শম্পা তো দূরস্থান, মিলল না আস্ত গ্রামটাই। যেন কুলধারার মত মিলিয়ে গেছে গোটা একখানা বসতি। হতোদ্যম প্রমিতের সঙ্গে কলকাতার রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয়ে যায় হুবহু শম্পার মত দেখতে একজনের। ছবিটা এখানেই শেষ। ভাবুন, প্রমিতের দুই দশক আগে প্রায় প্রমিতের সিনেম্যাটিক পূর্বসূরিই হল ধর্মবীর ভারতীর গল্প অবলম্বনে তৈরি ছবি সুরজ কা সাতওয়াঁ ঘোড়ার নায়ক মানেক মোল্লা। সে-ও প্রকৃত প্রস্তাবে প্রেমকে খুঁজেছিল বিভিন্ন নারীর অবয়বে, নৈকট্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যখনই সামাজিক বন্ধনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে, কোনো না কোনো কারণে সেই মহিলারা দূরে সরে গেছেন। শেষে এক অজানা উপায়ে দেখা হয়ে যায় সতী আর মানেকের। ভগ্নহৃদয়, মানেকের প্রতি আস্থাহীন সতী দৌড়ে পালায়, মানেক দৌড়য় পিছু পিছু। কাহিনির প্রেমকে বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে নামিয়ে সুরজ কা সাতওয়াঁ ঘোড়ায় বেনেগাল দেখতে চেয়েছেন মিলনের পথে সামাজিক অন্তরায়গুলো কী কী, অথবা মিলনের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শর্তগুলো কী। এই দুঃসাহস, প্রেমের রাজনৈতিক দিকগুলো খতিয়ে দেখার স্পর্ধা সেই সময়ে তো বটেই, আজই বা কতজন মানুষের রয়েছে?

শুধু সুরজ কা সাতওয়াঁ ঘোড়া নয়, দেখা যাবে বেনেগালের পূর্ববর্তী ছবিগুলোতেও যে কটা প্রেমের প্রসঙ্গ এসেছে সেগুলোকে তিনি খুঁটিয়ে দেখতে চেয়েছেন এই ছবির মানদণ্ডগুলোর নিরিখেই। যেমন মান্ডি (১৯৮৩) ছবিতে টুংরুস আর ফুলমণির দুটো ছোট্ট দৃশ্যে কৌতূহলের উদ্রেক হয় – টুংরুস কি গোপনে ফুলমণির প্রতি আসক্ত হয়েছিল? এই কৌতূহল শেষতক নিবৃত্ত হবে না, এমনকি প্রশ্রয়ও পাবে না। কারণ ছবিটা সচেতনভাবেই টুংরুসের মনের গভীরে বেশি ছানবিন করে না। কিন্তু যদি তাদের প্রেম না হয়ে থাকে, সেই তথাকথিত অসম্পূর্ণতার কারণ কী?

অথবা অঙ্কুর ছবিতে লক্ষ্মীর গর্ভে ছোটবাবুর সন্তান এসেছে – একথা হাওয়ায় ভাসতে থাকায় লক্ষ্মীরই সম্মান নিয়ে টানাটানি হয় কেন? শুধু তাকেই তিরস্কৃত হতে হয় কেন? অথবা মন্থনে ঠিক কোন সন্দেহের বশে ডঃ মনোহর রাওকে বিন্দুর স্বামী ভিটে মাড়াতে বারণ করে? বেনেগালের ছবিতে যে কোনো সম্পর্ক, সে নিষ্কাম প্রেম হোক বা যৌনতাসম্পন্ন, যেসব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছে, সেইসব বাধাবিপত্তি কোন সামাজিক প্রেক্ষাপট, কোন মানসিকতা, কোন প্রবণতা থেকে উঠে আসছে – সেটাই যেন বেনেগাল হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। সেই প্রয়াস আরও সপাট, আরও নির্ভার হয়েছে মানেক মোল্লার আখ্যানে। তিনি ভারতের সমসময়ের, শাশ্বত প্রেমকাহিনিগুলোকে, মানুষের মেলামেশার সম্পর্কগুলোকে দেখতে চেয়েছেন আর্থসামাজিক পরিস্থিতির আতসকাচের তলায়।

বেনেগাল সেই বিরলগোত্রীয় পরিচালক, যিনি ফিল্মকে যষ্টি করে এগিয়েছেন ভারতের ইতিহাস-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য চেনার পথে। এদেশে যখন একবগ্গা ইতিহাস লেখা রেওয়াজ, তাঁর ছবি তখন সযত্নে ইতিহাসকে পক্ষপাতহীনভাবে ধরে রেখেছে। এদেশে এখন বহুত্বকে ভুলিয়ে দেওয়ার একটা চর্চা চলছে, অথচ বেনেগালের ছবি দেখিয়েছে যে এদেশের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক বহুত্বই এদেশের প্রাণ। তার সামনে নত হওয়া উচিত, তাকে স্বীকার করা উচিত। প্রথাকে তিনি নিঃশর্তভাবে মেনে নেননি, প্রথা-পুরাণ-উপকথার উজান বেয়ে এগোলেও তাদের প্রতি-আখ্যানও রচনা করেছেন সাধ্যমত।

এহেন পরিচালকের প্রয়াণ, বলাই বাহুল্য, আপামর ভারতীয় দর্শককে অনেকটা দীন করে দিয়ে গেল। আশা করা যায়, বেনেগালের ছবি আরও নানাভাবে আলোচিত হবে। তার থেকে বড় শ্রদ্ধার্ঘ্য কোনো মাল্যদানে হতে পারে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.