সময়ের কী বিচিত্র ছন্দ ব্যবহার! আজ মনমোহন সিং চলে যাবার পরে আমার কেন যে বাংলা সিনেমা নিয়ে ভাববার সময়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের কথা মনে পড়ল? মৃণাল সেন অস্ত যাচ্ছেন, ঋতুপর্ণ উদিত হচ্ছেন। একটু তথ্যের দিকে মনোযোগী হলেই দেখা যাবে, মৃণাল ক্রমশ একা হওয়ার ইতিবৃত্ত ও চূর্ণ স্মৃতি জমিয়ে যাচ্ছেন। এক দিন অচানক (১৯৮৯), মহাপৃথিবী (১৯৯১) ও অন্তরীণ (১৯৯৩) বস্তুত বিশ শতকের দীর্ঘশ্বাসের ক্রমবিন্যাস, চলে যাওয়া দিনের স্মৃতি। ঋতুপর্ণ ঠিক সেসময়েই আমাদের নজর কাড়লেন। উনিশে এপ্রিল মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। কেন জানি না আমার মনে হয় মৃণালের পক্ষে যা বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনসন্ধ্যা, ঋতুপর্ণর পক্ষে তা সুপ্তোত্থিত মধ্যবিত্তের নবীন প্রভাত। এক নবীন মেঘের সুর লাগল আমাদের নাগরিকতায়, যেখানে পথপ্রান্তের আলোছায়া কেবিন হঠাৎ ‘কিস মি ডার্লিং’ নামে কটাক্ষ বিস্তার করল। মোটকথা আঠারো শতক থেকে রামমোহন রায় ও তাঁর উত্তরসূরিরা যে বিশ্বচেতনায় মথিত হয়েছিলেন, এমনকি জওহরলাল নেহরু থেকে ইন্দিরা গান্ধীও, এই রূপান্তর তা নয়। একে ম্যাকডোনাল্ডিকরণ বলা যেতে পারে, যেখানে মদালসা কারেন্সির ভুবনমোহিনী বাহুবিস্তার। আর সকলেই জানেন ওই যুগেই ১৯৯১ সালে সংসদে ভারতের উদারীকরণের নথিটি পেশ করেছিলেন মনমোহন।

অতঃপর মেকলের মন্ত্রে উজ্জীবিত যে বাঙালি জনসভায় সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ও জ্যোতি বসুর বক্তৃতায় বিদ্রোহের বাণী শুনত, বসার ঘরে বিদ্যাসাগর ও সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি ঝোলাত, ইংরিজি কাগজের সম্পাদকীয় থেকে হারমোনিয়াম যার গৃহশোভা – সেই প্রজাতি রক্তাল্পতায় নিঃস্ব হয়ে এল। বদলে এল টি-শার্ট ও ব্র্যান্ডেড জিনস, মায়াবনবিহারিণী হরিণীর হাতে শোভা পেতে লাগল বিয়ার মাগ ও এমন মধ্যবয়সী বালক বন্ধু যে নিজের বাহুসন্ধিতে ও বক্ষদেশে ডিও বর্ষণে সদা প্রস্তুত। ফেলুদা, ব্যোমকেশ বা যে কোনো নকশাল আরব্য রজনীর নস্ট্যালজিয়া হিসাবে আবির্ভূত হতে বাধা নেই, কিন্তু সপ্তাহান্তে সিঙ্গল মল্ট প্রামাণ্য সত্য হিসাবে আইস কিউবের সঙ্গে হাজির থাকাটাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়াল। এই নব্য ধনী সম্প্রদায়ের দেবদূত হয়ে দেখা দিলেন ঋতুপর্ণ। তাঁর বাচনভঙ্গি, আখ্যানের সুষমা বিস্তার, আঙুলের মুদ্রা ও রাজনীতি বর্জন দর্শকসমাজের কাছে আশ্বাস হয়ে দাঁড়ায়। আমি বলতে চাই, বাংলা সিনেমায় ছিল সেট ডিজাইন, ঋতুপর্ণর সূত্রে প্রবেশ করল ইন্টেরিয়র ডেকরেশন। বিজ্ঞাপন রচয়িতার অসামান্য দক্ষতা তাঁর চলচ্চিত্রকে অলীক কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য স্বস্তি নিলয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিল। সত্যজিৎ রায় ও রাজেন তরফদার (শ্যাম বেনেগালও) বিজ্ঞাপন দুনিয়ার পদস্থ নাগরিক ছিলেন। কিন্তু তাঁদের সিনেমা বিজ্ঞাপনের মত ছিমছাম নয়। অপরদিকে ঋতুপর্ণ সচেতনভাবেই তাঁর কর্মজীবনকে সম্প্রসারিত করে অন্য একটি জায়মান মধ্যবিত্ততার বিজ্ঞাপন হয়ে উঠলেন। সেখানেই তাঁর মূল কৃতিত্ব।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আজ থেকে বছর পনেরো আগে বাঙালি নাগরিক সমাজ ও মধ্যবিত্ত যে নিজেকে অভাবগ্রস্ত মনে করেছেন, ঋতুপর্ণ যে প্রকৃতই এক অনুপস্থিতি, তা তাঁর শেষযাত্রায় মিডিয়া প্রচার ও জনসমাগম দেখে অনুমান করা যায়। একজন অনতি প্রৌঢ়ের (১৯৬৩-২০১৩) চলে যাওয়া যে কোনো সমাজেই বিষণ্ণতা ডেকে আনে। উপরন্তু নয়ের দশকের সামাজিক জলবায়ুতে বামফ্রন্টের স্থিতাবস্থার রাজনীতিতে মধ্যবিত্তের আশা, বাসনার সঙ্গে অসামান্য গাঁটছড়া বাঁধতে পেরেছিলেন ঋতুপর্ণ। উনিশে এপ্রিল, এমনকি হীরের আংটি (১৯৯২)-ও মূলত টিভির পর্দায় সেসময়ের দর্শকের কাছে আরামপ্রদ অবসর বিনোদন মনে হয়।

 

বাংলা সিনেমায় ছিল সেট ডিজাইন, ঋতুপর্ণর সূত্রে প্রবেশ করল ইন্টেরিয়র ডেকরেশন। বিজ্ঞাপন রচয়িতার অসামান্য দক্ষতা তাঁর চলচ্চিত্রকে অলীক
কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য স্বস্তি নিলয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিল।

 

আসলে সাতের দশকের শেষ থেকেই বাংলা ছবির অন্তর্জলী যাত্রার সূচনা হয়। উত্তমকুমারের মৃত্যু যে শূন্যতা সৃষ্টি করে তা পূর্ণ হওয়া সম্ভব ছিল না। স্টুডিওগুলির জীর্ণ দশা, যাঁরা কুশীলব, যাঁরা ক্যামেরা ইত্যাদি নাড়াচাড়া করেন তাঁদের মধ্যে পাঁচ ও ছয়ের দশকের লোকেদের দক্ষতার লেশমাত্র নেই। ভদ্রতা ক্রমশ টালিগঞ্জ স্টুডিও থেকে লুপ্ত হতে থাকে। আটের দশকে এসে দেখা যাবে বাংলা ছবি মূলত ‘মাস্তানমঙ্গল কাব্য’। এই পরিস্থিতিতে ঋতুপর্ণ আবার এমন গল্পের কথক হয়ে উঠলেন যা শোনার জন্য সবান্ধব বা সস্ত্রীক উপস্থিতি বিড়ম্বনা হয়ে ওঠে না। সেদিক থেকে বাংলা ছবির মূলধারার তিনি নিকটাত্মীয়। নিউ থিয়েটার্সের যুগ থেকেই বাংলা ছবি গল্প বলা, বিশেষত সাহিত্য থেকে গল্প বলার অভ্যাস চালু করে। তখন বাঙালি মূলত সাহিত্য দেখার আহ্লাদেই প্রেক্ষাগৃহে রওনা দিত। কিন্তু কখনো সামাজিক অতিশয়োক্তি, কখনো সাংস্কৃতিক বিরোধিতা সেই যাত্রাপথে কাঁটাগাছ পোঁতায় সেই পথ বিপদসংকুল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজ অনস্বীকার্য যে ঋতুপর্ণ ওই আগাছা থেকে মূল পথটি শুধু উদ্ধারই করেননি, মার্জিত রুচির প্রতি বাঙালির যে গোপন গর্ব তাকে অনেকটাই উস্কে দিতে পেরেছিলেন। ফলে তাঁর ছবি ভদ্রলোককে ছবিঘরে টেনে নিতে পারত, বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনা চক্রে যাকে বলা হয় ‘Re-introduction of bhadralok sensibility into vernacular cinema’। ঋতুপর্ণর এ এক অসামান্য অবদান। অনেকদিন বাদে তিনি বাংলা ছবির এমন একজন পরিচালক যাঁর ণত্ববিধান ও ষত্ববিধান বিষয়ে জ্ঞান ছিল। তাঁর ছবি দেখে বৈঠকখানা ও সভাঘরের মধ্যে তফাত বোঝা যেত এবং শয়নকক্ষ মাত্রেই রমণকক্ষ হয়ে উঠত না।

বাঙালিত্ব বিষয়ে আমাদের যে ধারণা – ইংরিজি ও বাংলায় স্নিগ্ধ বাক্যবিন্যাসে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের মত ক্ষণিক ও দীপ্ত রসিকতা, জীবনের এক ধরনের ঔজ্জ্বল্য – ঋতুপর্ণর ছবিকে মলাট দিয়ে রাখত। অন্তত এই পরিচালকের আবহ বার্তায় জীবনের আর্দ্রতা তত গুরুত্ব পেত না। ফলে আমরা খুশি হয়েছিলাম। তিনি আমাদের বিব্রত করেন অথচ আমরা কোনোমতেই বিপন্ন বোধ করি না। ঋতুপর্ণ সম্পর্কের সমস্যা নির্মাণ করতেন, তাতে পরেরদিকের দেহজ সমীকরণের ইশারাও আলাদা, তবু একইসঙ্গে বলা যে এই সমস্যা বিষয়ে একটি স্বস্তিবাচন তাঁর করতলধৃত আমলকি হিসাবেই অন্তিমে পরিবেশিত হত। পরিণামে পারিবারিক জীবনে ছন্দপতন ঘটে না, ব্যক্তিগত নৈরাশ্য কূলপ্লাবী হয় না, অর্থাৎ ঋতুপর্ণ স্থিতাবস্থার আশ্চর্য স্থপতি।

 

ঋতুপর্ণ অবলীলাক্রমে আপাত ‘নিষিদ্ধ’ একটি কার্যক্রমকেও কী করে যে মূলধারায় সংযুক্ত করলেন! এখানেই ঋতুপর্ণর রহস্য। তিনি আসলে আখ্যান রচয়িতা। সুকথক, কিন্তু কোনো সময়েই অনুসন্ধানী নন।

 

এ পর্যন্ত বলে মনে হয়, তাহলে ঋতুপর্ণর দেখায় কি অন্যরকম অভিপ্রায় প্রশ্রয় পায়নি? পেয়েছে। আর পেয়েছে বলেই অ্যাকাডেমির সামনে তাঁর সহমর্মী, যাঁদের আজকাল এলজিবিটিকিউ বলা হয়, যাঁরা সংখ্যালঘু, তাঁরা ঋতুপর্ণর আকস্মিক অকালপ্রয়াণকে একটি প্রতীকী বিয়োগগাথা হিসাবে স্মরণ করেছেন। মান্য, সত্যজিৎ যেভাবে চারুলতাকে দেখেছিলেন ঋতুপর্ণ সেভাবে দেখেননি। তাঁর দেখায় রান্নাঘরের কান্না, অলিন্দের ফোঁপানি এবং কবিতার ভাষা ব্যবহার করলে ‘পেরেক হয়ে যিশুর কষ্ট’ বোঝার আর্তি নজরে আসে। তিনি প্রচলিত যৌন অস্তিত্বে চিহ্নিত ছিলেন না। তাঁকে তেমনভাবে সমকামী বলাও উচিত হবে না হয়ত। তিনি স্পষ্টই এক ধরনের রূপান্তরকামী, যিনি নিজের নারীত্বে ক্রমাগত উদ্ভাসিত হচ্ছিলেন। ব্যাকরণগত অর্থে ঋতুপর্ণ সুপুরুষ নন, কিন্তু সুদর্শন। আর তাঁর ধারণা অনুযায়ী নারীর নিজস্ব কামনা তিনি গল্পের পর গল্পে বলে যাচ্ছিলেন। বিশুদ্ধ পুরুষ হিসাবে এই গল্প বলা বেশ বিপজ্জনক, এমনকি নন্দনতত্ত্বের শাস্ত্রীয় অনুরাগীরা মেলোড্রামার আঁচ পেয়ে মুখ ফেরাতে পারেন। তবে ঋতুপর্ণ আত্মপক্ষের বিবৃতি দিচ্ছিলেন বলেই হয়ত তাঁর ছবি আকর্ষণ হারায়নি, বরং নতুন কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল। ঋতুপর্ণর নারীরা সীমাতিক্রমণ করেন না। সমস্যা নির্মাণ করেন, কিন্তু সেই সমস্যার নিষ্পত্তি সিনেমাতেই অনায়াসলভ্য। একথা উনিশে এপ্রিল, উৎসব (২০০০), তিতলি (২০০২) প্রসঙ্গে একেবারেই সত্য। চোখের বালি (২০০৩) ছবিতে বিনোদিনীর ঋতুরক্ত তাঁকে আহ্লাদিত করে। দৃশ্যের সেই আহ্লাদ তিনি দর্শককে উপহার দিতে চান। আবার দোসর (২০০৬) ছবিতে যৌবনের প্রান্তে বর্ষীয়সী রূপসী বর্ণনা করার আনন্দ তিনি রোমহর্ষে উপভোগ করেন। এমনকি দহন (১৯৯৭) নামে যে ছবিটিতে তিনি নিষ্ঠুরতার কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, সেখানেও সবাই দেখতে পাই স্বীকৃতির সাধনা। অন্তর্ভুক্ত হওয়াই তাঁর মূল অন্বিষ্ট। হানাদারি ঋতুপর্ণর রাশিচক্রে ছিল না।

এইজন্যেই ঋতুপর্ণ দ্রুত মিডিয়ার উপচার পেলেন, জনতা তাঁকে পথ ছেড়ে দিল। তিনি যে প্রতিভা – এ বিষয়ে কারোর কোনো সংশয় রইল না। সত্যজিৎকে অপরাজিত (১৯৫৬)-র পরেও তিনি কতটা শিল্পী – তার পরীক্ষা দিতে হয়েছে, ঋত্বিক তো আমৃত্যু প্রত্যাখ্যাতই রয়ে গেলেন। বারীন সাহা ও মৃণালকে বাঙালি কতটা মেনে নিয়েছে তা অদ্যাবধি অনিশ্চিত। রাজেন তরফদার, অজয় কর, অসিত সেন, নির্মল দে, তরুণ মজুমদার ও পার্থপ্রতিম চৌধুরী, এমনকি তপন সিংহও দর্শককে জয় করেছেন। কিন্তু সেই জয়পতাকা ছিদ্রযুক্ত, তাতে অনেক প্রশ্ন সুমুদ্রিত। ঋতুপর্ণ অবলীলাক্রমে আপাত ‘নিষিদ্ধ’ একটি কার্যক্রমকেও কী করে যে মূলধারায় সংযুক্ত করলেন! এখানেই ঋতুপর্ণর রহস্য। তিনি আসলে আখ্যান রচয়িতা। সুকথক, কিন্তু কোনো সময়েই অনুসন্ধানী নন। সত্যজিতের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হয়। কিন্তু ঋতুপর্ণ সত্যজিতের মত প্রকরণ নিয়ে অসামান্য পরীক্ষানিরীক্ষা তো করেননি বটেই, বিষয় নিয়েও করেননি। সাতের দশকের শহরের ছবিগুলিতে সত্যজিৎ নিজেকে যেমন আমূল পালটে ফেলায় উদ্যোগী হন, ঋতুপর্ণ সেরকম ঝুঁকি নেওয়ার কথা ভাবতেও পারেন না। তিনি আত্মরতিপরায়ণ, কিন্তু আয়নার কাচ ভেঙে ফেলার সাহস দেখাতে পারেননি কখনো।

গত শতাব্দীতে পিয়ের পাওলো পাসোলিনি ও জঁ জেনে কী নিষ্ঠুরভাবেই না স্বীকারোক্তি রেখেছেন সমকামনার! জঁ ককতো ও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা কত রোমাঞ্চকর অভিযানে লিপ্ত হয়েছেন সমকামনার পোতাশ্রয় পার হয়ে! পাসোলিনি জানতেন তাঁর প্রয়াণ সংবাদ নিউইয়র্ক টাইমস প্রথম পাতায় ছাপবে। জানতেন রাষ্ট্রপতি তাঁর শবানুগমন করবেন। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা তাঁকে মৌন করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক খ্যাতির তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও জেনের মৃত্যু হল প্যারিসের সাধারণ হোটেলে। কারণ? জারজ ও সমকামী, চোর ও খুনি জেনে অনায়াসে লিখতে পারতেন শিল্পীর আত্মপরিচয় লে ফুনঁ বুল।

 

গত শতাব্দীতে পিয়ের পাওলো পাসোলিনি ও জঁ জেনে কী নিষ্ঠুরভাবেই না স্বীকারোক্তি রেখেছেন সমকামনার! জঁ ককতো ও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা কত রোমাঞ্চকর অভিযানে লিপ্ত হয়েছেন সমকামনার পোতাশ্রয় পার হয়ে!

 

এগারো বছর আগের এক দিন ঋতুপর্ণর জন্য শোক মিছিলে জনৈক সাংবাদিক ডুকরে কেঁদে উঠে বলেছিলেন ‘তুই তো শেষে ঋত্বিক ঘটক হয়ে গেলি রে!’ হয়ত উত্তরকালে আর কোনো বাঙালি চলচ্চিত্রকার নিজের নামের আদ্যক্ষর ‘ঋ’ দিয়ে সাজাবেন না। দুজনেই অকালপ্রয়াত। প্রথম জন ৫০ হওয়ার তিনমাস পরে, দ্বিতীয় জন তিনমাস আগে। কিন্তু কী আশ্চর্য তফাত! প্রথম জনের শবযাত্রায় সামান্য একটা লরি জোগাড় করার জন্যে লোককে রাস্তায় নামতে হয়েছিল আর দ্বিতীয় জন সুরক্ষিত ছিলেন রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের আশীর্বচনে। ঋত্বিক সর্বস্ব দিয়ে চলচ্চিত্র ব্যবস্থাকে আক্রমণ করেছিলেন, ইতিহাসকে চিহ্নিত করতে দ্বিধা করেননি। ফলে তাঁর জন্যে নির্দিষ্ট ছিল করুণ ধূসর পথ। ঋতুপর্ণ অসামান্য গুণী। তাঁর গয়না ঝলমল করে ওঠে জড়োয়ার হারের মত। তাতে এত দীপ্তি ‘যে আঁধার আলোর অধিক’ তা চোখে পড়ে না।

আরো পড়ুন মদন তাঁতী বনাম বারীন সাহা

তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রমাণিত ভক্ত। কিন্তু খেয়াল করেননি রবীন্দ্ররচনার অন্তরালে কী পরিত্যক্ত শূন্যতা! দ্রষ্টব্য হওয়ার অধিকারকে সুরক্ষিত রাখায় ঋতুপর্ণর সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকায়, পুরুষের দৃষ্টিপাতের পদ্ধতি নিরাপদেই থেকে যায়। পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতির একটি ইটও খসে না। উদারীকরণের প্রথম বাঙালি পরিচালক ঋতুপর্ণ প্রসঙ্গে এটুকুই আপাতত।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.