মনের মধ্যে চেপে রাখা রাগ, বিদ্বেষ, ঘৃণা শেষপর্যন্ত চেপে রাখতে পারলেন না বিজেপি নেতা তথা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সংসদে ভারতের সংবিধানের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে চলা বিতর্কে জবাবি ভাষণ দিতে গিয়ে গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি বলে বসলেন, ‘আজকাল একটা ফ্যাশন হয়েছে। সারাক্ষণ আম্বেদকর, আম্বেদকর, আম্বেদকর…এতবার যদি ভগবানের নাম নিতেন তাহলে সাত জন্মের স্বর্গবাস ঘটত।’ এরপরেই বিরোধীরা শাহকে ক্ষমা চাইতে হবে – এই দাবি নিয়ে সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু করেছেন। এই প্রবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত প্রায় রোজ দেশের নানা জায়গায় বিক্ষোভ দেখাচ্ছে বিভিন্ন বিরোধী দল এবং দলিত, আদিবাসী সংগঠন।

এখানে একটা মজার ব্যাপার লক্ষণীয়। শাহ কিন্তু ভাষণ দিচ্ছিলেন আম্বেদকরকে নিয়ে কংগ্রেস যে দ্বিচারিতা করে তা নিয়ে। শাহের পুরো বক্তব্য খুব কম লোকই শুনেছে বা পড়েছে। আমাদের প্রথমে সেটা একটু দেখে নেওয়া উচিত। তবেই ভারতবর্ষের প্রকৃত চেহারা তার সমগ্রতায় বোঝা যাবে। আম্বেদকর নিয়ে শাহ যা বলেছেন তা মোটামুটি এইরকম যে, আম্বেদকর আম্বেদকর করাটা এখন ফ্যাশন। এতবার ভগবান ভগবান করলে সাত জন্মের স্বর্গ মিলত। কংগ্রেস তার শাসনকালে আম্বেদকর নিয়ে কী করেছে? একটাও মূর্তি বানায়নি। আমরা বানিয়েছি ২০১৪ সালের পর থেকে। আম্বেদকর দেশের প্রথম মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, আম্বেদকর মন্ত্রিসভায় না থাকলেও খুব কিছু যাবে আসবে না। কংগ্রেস কোনোকালেই আম্বেদকরকে পছন্দ করে না, গুরুত্ব দেয় না, খালি মুখে আম্বেদকর আম্বেদকর করে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই ছিল আম্বেদকরকে নিয়ে অমিত শাহের কথা। এখন প্রশ্ন হল, এই প্রশ্নে কংগ্রেস আর বিজেপির মধ্যে ফারাক কী? কংগ্রেসের কথায় পরে আসা যাবে। আগে দেখা যাক আম্বেদকর প্রশ্নে বিজেপির অবস্থান কী? বিতর্কের শুরুর দিকে রাহুল গান্ধী তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, শুধু বিজেপিই নয়, গোটা সঙ্ঘ পরিবার যাঁর ভাবাদর্শে গড়ে উঠেছে, সেই বিনায়ক দামোদর সাভারকর মনে করতেন যে ভারতের সংবিধানের কোনো ভারতীয়ত্ব নেই। ভারতের সংবিধান হওয়া উচিত মনুস্মৃতি। কারণ হিন্দুরা সেটাকে বেদের পরেই সব থেকে বেশি সম্মান দেয়। রাহুল প্রশ্ন করেছিলেন, বিজেপি কি তাদের আদর্শগত গুরুর বক্তব্যের সঙ্গে একমত? শাহ কিন্তু তাঁর বক্তব্যে একবারও সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দিকে যাননি। অথচ সাভারকরের বক্তব্য ও ভাবনাচিন্তার উপরেই তাঁর দল এবং সরকারের ভাবনা, কার্যকলাপ প্রতিষ্ঠিত। এই প্রসঙ্গে একবার আমরা সাভারকরের বক্তব্যটা স্মরণ করে নেব। তিনি বলেছিলেন

The worst thing about the Constitution of India is that there is nothing Indian about it. Manusmriti is that scripture which is most worshippable after Vedas for our Hindu nation and which from ancient times has become the basis for our culture, customs, thought and practice. This book, for centuries, has codified the spiritual and divine march of our nation. Even today the rules which are followed by crores of Hindus in their lives and practice are based on Manusmriti. Today, Manusmiriti is Hindu law. That is fundamental.” (Women in Manusmriti)

অর্থাৎ ভারতের সংবিধানের সবচেয়ে খারাপ বিষয় হল এতে ভারতীয় বলে কিছু নেই। মনুস্মৃতি হল সেই ধর্মগ্রন্থ যা আমাদের হিন্দু জাতির জন্য বেদের পরে সবচেয়ে বেশি উপাসনাযোগ্য এবং প্রাচীনকাল থেকেই যা আমাদের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, চিন্তাভাবনা ও অনুশীলনের ভিত্তি হয়ে আছে। এই বই আমাদের জাতির বহু শতাব্দীর আধ্যাত্মিক এবং ঐশ্বরিক অগ্রগতিকে সংহিতার চেহারা দিয়েছে। এমনকি আজও কোটি কোটি হিন্দুর জীবন ও অনুশীলন মনুস্মৃতি অনুসরণ করেই চলে। আজ মনুস্মৃতিই হিন্দু আইন। এটা একেবারে মৌলিক বিষয়।

একথা যে শুধু সাভারকরই বলেছেন তা নয়। বিভিন্ন সময়ে বিজেপি-আরএসএসের বিভিন্ন কর্মকর্তা দুর্বল মুহূর্তে এই একই কথা বলে ফেলেছেন। এমনকি তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত বিচারপতিরাও বলেছেন। ২০২৩ সালে গুজরাট হাইকোর্টের একজন বিচারপতি এমনই মন্তব্য করেছিলেন যখন এক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে ধর্ষণের জেরে গর্ভবতী হয়ে পড়ে গর্ভপাতের অনুমতি চেয়েছিল। বিচারপতি সমীর দাভে কোর্টে বসেই বলেছিলেন, মনুস্মৃতি অনুযায়ী মেয়েদের ১৪-১৫ বছরে বিবাহ এবং ১৭ বছরের মধ্যে সন্তানের জন্ম দেওয়া উচিত।

এই হচ্ছে অবস্থা।

গত দশ বছরে নরেন্দ্র মোদীর শাসনে যা খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে তা হল বিজেপিই দেশের এক নম্বর পার্টি, যারা দলিতদের উপর হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা জাতপাতভিত্তিক নিপীড়ন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে সর্বাপেক্ষা এককাট্টা। তাদের আমলে দলিতদের পিটিয়ে মারা, ধর্ষণ করে হত্যা করা, গায়ে পেচ্ছাপ করে ভিডিও বানিয়ে প্রচার করা – এসব হয়ে চলেছে। তাদের আমলেই তাদের পার্টির লোকেরা প্রকাশ্যে ‘এসসি এসটি মুর্দাবাদ’ স্লোগান দিয়েছে। তাদের শাসনকালে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে মনুস্মৃতির ভাবাদর্শে পুনর্গঠিত করা হয়েছে। অবশ্যই বেসরকারিকরণের ধূপ ধুনো সহ। একবিংশ শতাব্দীতে নাম না করে যতরকমভাবে মনুস্মৃতিকে লাগু করা যায়, দেশের বর্তমান সংবিধানকে খাটো করা যায়, ধ্বংস করা যায় – সবই এরা করেছে। সংবিধান অনুযায়ী ভারতবর্ষ একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে রামমন্দিরের প্রতিষ্ঠায় অযোধ্যায় হাজির হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা রামলালাকে স্নান করিয়েছেন। তা গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ দেশের সংবিধানকে ধ্বংস করে মনুস্মৃতির ভাবধারা লাগু করতে মোদী সরকার কিছুই বাকি রাখেনি।

সুতরাং কী দাঁড়াল? সাভারকরের কথামতই বিজেপির ভাবনা, চিন্তা, সংস্কৃতি, অনুশীলন সবকিছুর ভিত্তি হল মনুস্মৃতি। আর আম্বেদকর কী করেছিলেন? মনুস্মৃতির প্রশ্নে তাঁর অবস্থান কী ছিল? আম্বেদকরের নিজের কথা অনুযায়ী, তিনি ছিলেন ভারতে শূদ্রদের রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী। ফলত মনুস্মৃতির বিরুদ্ধে ছিল ঘৃণা ও ক্রোধ। আমাদের দেশে দলিত তথা শূদ্র তথা অস্পৃশ্যদের সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ভাবাদর্শ হল মনুস্মৃতি – এই ছিল তাঁর অভিমত। ১৯২৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর দ্বিতীয় মাহাড় সত্যাগ্রহের সময়ে আম্বেদকর মনুস্মৃতি পুড়িয়ে ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে অত্যুচ্চ শিখরে নিয়ে যান।

এখন কথা হল, বিজেপি-আরএসএস বা সঙ্ঘ পরিবারের এহেন আম্বেদকরের প্রতি তীব্র অসূয়া, ঘৃণা থাকাই স্বাভাবিক। আছেও তাই। এদিকে সংসদে শাহ বলেছেন, কংগ্রেস আম্বেদকরকে নিয়ে দ্বিচারিতা করে, আম্বেদকরকে গুরুত্ব দেয় না। অথচ রাতদিন ‘আম্বেদকর আম্বেদকর’ করে। কী আশ্চর্য! এই অভিযোগ তো হুবহু বিজেপি সম্পর্কেও করা যায়। তারা প্রকৃত প্রস্তাবেই আম্বেদকরের বিরোধী, মনুস্মৃতির সমর্থক। শাহের কথা অনুযায়ী ২০১৪ সালের পর থেকে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে আম্বেদকরের মূর্তি স্থাপন করেছে। অতএব তারা আম্বেদকরকে গুরুত্ব দেয়। দ্বিচারিতার এর থেকে ভাল উদাহরণ আর কী হতে পারে? গুচ্ছ গুচ্ছ মিথ্যাভাষণ সত্ত্বেও শাহ যখন বলে ফেলেন, এতবার আম্বেদকরের নাম নেওয়ার বদলে যদি ভগবানের নাম নেওয়া হত, তাহলে সাত জন্মের স্বর্গবাস হতে পারত, তখন আম্বেদকরের প্রতি তাঁর আসল মনোভাব জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়ে।

তবে একথাও ঠিক যে কংগ্রেস কখনোই আম্বেদকরের বন্ধু ছিল না। ঐতিহাসিকভাবেই তারা ছিল আম্বেদকরের বিরোধী। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আম্বেদকরের ছিল সাপে নেউলে সম্পর্ক। দুজনের কেউই কাউকে বিশ্বাস করতেন না। আম্বেদকরের বহু লেখায় তার প্রমাণ আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আম্বেদকর নেহরুর নেতৃত্বে তৈরি হওয়া দেশের প্রথম মন্ত্রিসভায় যোগদান করেছিলেন। কেন? কংগ্রেসের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হলে সে দেশ হবে দলিতদের কারাগার – একথা বলা সত্ত্বেও যে কারণে তিনি স্বাধীন দেশের সংবিধান রচনা করার গুরুদায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছিলেন, সেই কারণেই তিনি মন্ত্রিসভায় ডাক পেয়ে সে ডাক ফেরাননি। যদিও আজন্ম তিনি যাঁদের বিরোধী তাঁদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করবেন তা নিয়ে প্রথম থেকেই তাঁর নিজেরও সন্দেহ ছিল। মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার সময়ে পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন ‘যাঁরা কোনোকালেই আমার বন্ধু নন, তাঁদের সাথে কীভাবে কাজ করব, তা নিয়ে আমার নিজেরই সংশয় ছিল। আমার আগে ভারতবর্ষের আইনমন্ত্রী হিসাবে যাঁরা কাজ করেছেন, কাজের সেই যোগ্যতামান বজায় রেখে আইন সম্পর্কিত জ্ঞান ও সূক্ষ্ম বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে আইনমন্ত্রীর কাজ আমি চালিয়ে যেতে পারব কিনা, তা নিয়ে আমার নিজেরই সন্দেহ ছিল। কিন্তু আমি মনের সব দ্বিধা, দ্বন্দ্ব চেপে রেখে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব গ্রহণ করি। আমি ভেবেছিলাম দেশ গড়ার কাজে সহযোগিতার যে ডাক আমি পেয়েছি, তা অস্বীকার করা ঠিক নয়।’

আসলে আম্বেদকর যখন দেখলেন তাঁর লক্ষ্য ১০০% পূর্ণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই, তখন ভাবলেন অন্তত কিছু রক্ষাকবচ দলিত/অস্পৃশ্যদের জন্যে ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় রাখা যায় কিনা তা দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে যখন সেরকম একটা সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। হিন্দু কোড বিল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আম্বেদকর এই মনোভাবই প্রকাশ করেছিলেন। কংগ্রেস যখন মনেপ্রাণে চাইছিল ওই বিল কিছুতেই পাশ না হয়, তখন নেহরু যে অংশত ওই বিল নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে তাঁর পদত্যাগপত্রে আম্বেদকর বলেছিলেন ‘পুরোটা নষ্ট হবার থেকে খানিকটা বাঁচানো ভাল – এই প্রবাদ বাক্য মনে রেখে আমি অগত্যা এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই।’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত আম্বেদকর কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে পারলেন না। পদত্যাগপত্রে তিনি চারটে কারণ উল্লেখ করেছিলেন এবং তার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। তার মধ্যে দুটো কারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার একটা হল, আম্বেদকর বহু চেষ্টা করেও দলিত/অস্পৃশ্যদের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আম্বেদকর লেখেন ‘এই সরকার অনগ্রসর শ্রেণি ও তফসিলি জাতির ব্যাপারে যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে আমি মোটেই খুশি নই। সংবিধানে অনগ্রসরদের জন্য কোনো রক্ষাকবচ যুক্ত না করায় আমি খুব দুঃখিত ছিলাম। রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত কোনো কমিশনের সুপারিশ কার্যকরী করার উপর তা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে; কিন্তু এখনো এই সরকার কোনো কমিশন নিযুক্ত করার কথা ভেবে উঠতেই পারেনি।’

স্বাধীনতার পরেও দলিত/অস্পৃশ্যদের অবস্থার যে কিছুমাত্র উন্নতি হয়নি তাও আম্বেদকর তাঁর পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, ‘কিন্তু বর্তমানে তফসিলিদের অবস্থা কেমন? আমি যা দেখি, তাতে আগের থেকে কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না। সেই পুরনো নিষ্ঠুরতা, অত্যাচার এবং পক্ষপাতিত্ব – যা আগে ছিল, তা আজও আছে এবং সম্ভবত আজকের অবস্থা আরও বেশি খারাপ।’

এই ছিল আম্বেদকরের পর্যবেক্ষণ। তাই তিনি বলেন ‘এই সরকারের তফসিলিদের প্রতি অবহেলার কারণে আমার মনে যে ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে, তা সবসময় আমি চেপে রাখতে পারিনি এবং একবার তফসিলিদের একটা প্রকাশ্য সভায় সে ক্ষোভ ফেটে বেরিয়েছিল।’

আরো পড়ুন জাতের মধ্যে জাত খোঁজা সংরক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল করার তাল

হিন্দু কোড বিল নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে মতানৈক্য ছিল আম্বেদকরের মন্ত্রিসভা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত কারণ। এই বিলে তিনি বেশকিছু প্রগতিশীল ধারা যোগ করেছিলেন যা কংগ্রেস কিছুতেই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। বিশেষ করে বিলের যে অংশগুলোতে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার, নারীর সম্পত্তির উপর মালিকানার অধিকার প্রভৃতি স্বীকৃত হয়েছিল, সেগুলো কংগ্রেসের উচ্চবর্ণের কায়েমি স্বার্থসম্পন্ন অংশের তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়ে ব্যাপক টানাপোড়েন, লড়াই চলতে থাকে। নেহরু শেষপর্যন্ত যখন এই কায়েমি স্বার্থের কাছে মাথা নত করে বিলটাকে খারিজ করে দেন তখনই আম্বেদকর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

আসলে ভারতীয় রাজনীতিতে কোনো শক্তিই আম্বেদকরের রাজনৈতিক বন্ধু ছিল না, আজও নেই। শাসকশ্রেণির সমস্ত দলের সঙ্গেই আম্বেদকরের মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। এমনকি কমিউনিস্টরাও আম্বেদকরকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে যে মৈত্রী স্বাভাবিক ছিল, সেই দলিত-কমিউনিস্ট মৈত্রী গড়ে উঠতে পারেনি। তবে আদ্যন্ত মনুবাদী গৈরিক ফ্যাসিবাদী হিসাবে বিজেপি এবং সমগ্র সঙ্ঘ পরিবারের কাছেই যে আম্বেদকর সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত শত্রু – একথা বুঝতে বিদ্বান হয় না। ফলে আম্বেদকরকে নিয়ে তাদের দ্বিচারিতাই সবথেকে বেশি। মন্ত্রিসভা থেকে আম্বেদকরের পদত্যাগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শাহকে তাই সরাসরি মিথ্যাভাষণ করতে হল। বলতে হল, আম্বেদকর কাশ্মীরের জন্যে সংবিধানে ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ ঢোকানো নিয়ে অখুশি ছিলেন। এটাও নাকি ছিল তাঁর পদত্যাগের কারণ। অথচ সত্য অন্যরকম। আম্বেদকর অখুশি ছিলেন কাশ্মীর নিয়ে গা জোয়ারি করে পাকিস্তানের সঙ্গে শত্রুতা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে। কারণ তার ফলে অনাবশ্যকভাবে ভারতের সামরিক খাতে খরচ বাড়ছে বলে তিনি মনে করতেন। পদত্যাগপত্রে লিখেছিলেন ‘১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট আমরা যখন একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে যাত্রা শুরু করি, তখন…প্রতিটি দেশ ছিল আমাদের বন্ধু। এখন চার বছর বাদে সমস্ত বন্ধু দেশ আমাদের পরিত্যাগ করেছে…এই পররাষ্ট্রনীতি আমাদের পক্ষে কত বিপজ্জনক হয়েছে তার উদাহরণ হিসাবে সামরিক খাতে অযথা ব্যয় বরাদ্দের পরিমাণ দেখা যায়…আমরা দেশের মোট বার্ষিক ৩৫০ কোটি টাকা রাজস্বের মধ্যে ১৮০ কোটি টাকা সামরিক খাতে ব্যয় করি। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন বিপুল পরিমাণ সামরিক ব্যয়ের তুলনা মেলা ভার।’

তাই কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে অযথা সংঘাত চালিয়ে যাওয়া একটা ধ্বংসাত্মক কাজ বলে আম্বেদকর মনে করতেন। তিনি কাশ্মীরের মুসলমানপ্রধান অঞ্চল পাকিস্তানকে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ অঞ্চল ভারতে রাখার পক্ষে ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন ‘বৌদ্ধ ও হিন্দু অঞ্চল দেওয়া হোক ভারতকে এবং মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল দেওয়া হোক পাকিস্তানকে – ঠিক ভারত ভাগের ক্ষেত্রে আমরা যা করেছি। আমরা যথার্থই কাশ্মীরের মুসলমানপ্রধান এলাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নই। এটা কাশ্মীরের মুসলমান এবং পাকিস্তানের বিষয়।’

কাশ্মীর নিয়ে এই ছিল আম্বেদকরের বক্তব্য। অথচ সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যাভাষণ দিলেন শাহ, যাতে মনে হয় আম্বেদকর বোধহয় আজ বিজেপি সেখানে যা করছে, ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বিলোপ ইত্যাদি – তা করতে বলে গিয়েছিলেন। আম্বেদকর আসলে যা বলেছিলেন, বিজেপি কি তা মেনে নিতে তৈরি? সেদিন কংগ্রেস যে তা মানেনি তা তো দেখাই যাচ্ছে। কিন্তু আজ বিজেপি পাকিস্তান এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যে শত্রুতা করছে কংগ্রেসের চেয়ে একশো গুণ তীব্রতায় – তা কি আমজনতার কাছে পরিষ্কার নয়? এ তো আম্বেদকর যা বলেছিলেন তার ঠিক উল্টো। আম্বেদকরের যে পদত্যাগপত্র তুলে ধরে কংগ্রেসকে বিড়ম্বনায় ফেলতে চেয়েছেন শাহ, তা কিন্তু বিজেপির কাছে শত গুণ বেশি বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এখন বিরোধীরা, বিশেষ করে কমিউনিস্টরা, কী ভূমিকা পালন করে তা দেখার। তারা কি শুধুই সুযোগ পেয়ে হাওয়া গরম করবে? নাকি আম্বেদকর প্রশ্নে এবং বিজেপির মনুবাদী রাজনীতির স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রশ্নে গুরুতর আলোচনা ও প্রচারের দিকে যাবে?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.