আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে তৈরি মন্থন ছবিটি কি আজকের ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনগ্রসরতার বাস্তবকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না? ঘুরে ফিরে এই প্রশ্ন মাথায় খোঁচা দিতে থাকে। স্বাধীনতার ৭৭ বছর পরেও জাতিভেদ আর সম্পদের অসম বন্টনের ছবি আজকের প্রজন্মের কাছেও এত পরিচিত লাগে কেন?
১৯৭৬ সালে নির্মিত মন্থন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে রেস্টোর করে এবছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হল। পরিচালক শ্যাম বেনেগাল এবং মূল অভিনেতাদের মধ্যে একমাত্র নাসিরুদ্দিন শাহ উপস্থিত ছিলেন। কারণ বাকি অভিনেতাদের বেশিরভাগই, যেমন গিরীশ কারনাড, স্মিতা পাতিল, অমরীশ পুরী প্রমুখ, জীবিত নেই। ওই সময়ের বিকল্প সিনেমার অভিনেতাদের অন্যতম প্রধান ও প্রায় শেষ জীবিত মুখ নাসিরুদ্দিন। নাসির প্রায় সমকালীন বাণিজ্যিক ছবির অমিতাভ বচ্চনের প্রত্যুত্তর। নাসির, শাবানা আজমি, ওম আর স্মিতাদের নিয়ে বেনেগাল হিন্দি ছবির সমান্তরাল দুনিয়া নির্মাণ করেছিলেন সেই সাতের দশকে। তবে কানে এবছর মন্থনকে ফিরে দেখার প্রেক্ষিতে শুধু ছবির কাহিনি, পরিচালনা বা অভিনয় নিয়ে আলোচনা করলে দায়িত্ব মেটে না। ছবিটির প্রিন্ট রেস্টোর করা এবং তার প্রাসঙ্গিকতাকে ফিরে দেখা একটি নতুন প্রবণতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা ইতিহাস বিস্মৃত ভারতীয় চরিত্রবিরোধী। তাই মন্থনের এই সময়ানুবর্তী রোমন্থনকেও আলোচ্য করে তোলা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সাতের দশক ছিল এমন এক সময়, যখন ভারতীয় সিনেমায় মূলধারা ও সমান্তরাল, এমনকি পালটা সমান্তরাল ধারা, দিব্যি পাশাপাশি চলছে। জঞ্জীর (১৯৭৩)-এর ‘অ্যাংগ্রি ইয়াংম্যানে’-এর রাগ দেখে আঙুল তুলে প্রশ্ন করা যাচ্ছে অ্যালবার্ট পিন্টো কো গুস্যা কিঁউ আতা হ্যায় (১৯৮০)। দশক শুরু হয়েছে ১৯৬৯ সালের উসকি রোটি আর ভুবন সোম – ভারতবর্ষের নব্য বাস্তববাদী ছবি দিয়ে। এই নব্য বাস্তববাদ পথের পাঁচালী-র সমাজ বাস্তবতা অতিক্রান্ত। আরও রূঢ়, লাবণ্যবর্জিত। দশকের শুরুতে কলকাতা থেকে ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১ দিয়ে দেশের এই নতুন রাগী বাস্তবতার সিনেমাকে পথ দেখাতে শুরু করেছেন মৃণাল সেন। আবার সমস্ত রাগের অভিঘাতের নির্যাসকে সিনেমায় গম্ভীর ও শান্ত রূপ দিচ্ছেন মণি কউল ও কুমার সাহনি। তারই মধ্যে হিন্দি মূলধারার সাপেক্ষে নিজের দৃঢ় ও ঋজু সমান্তরাল রেখা টানতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বেনেগাল।
এই ধারা দিওয়ার বা শোলে-র তুলনায় অনেকটা বাঁদিকে থাকা মায়া দর্পণ বা দুবিধা-র মাঝের পথ, তাই সাধারণ দর্শকের বোধের নাগালে। তবে সিনেমার শিক্ষানবিশ হিসাবে একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এখানে রাখতে চাই। বেনেগালের প্রায় প্রতিটি ছবিই সিনেমা শিল্পের চেয়ে ভারতীয় সমাজের কাছে বেশি প্রাসঙ্গিক। বেনেগাল মূলধারা ও বিকল্প সিনেমার মাঝের পথ ধরে মূলত সমাজ বাস্তবতার কাহিনীই বলতেন। তাঁর কাজে আগাগোড়া প্রথা ও সংস্কারসর্বস্ব ভারতের সমাজকে বেশ নিরপেক্ষ ও কিছুটা স্নেহমাখা দৃষ্টিতে দেখানো হয়েছে। উপরন্তু নির্দ্বিধায় সত্যজিতের দেখানো রাস্তায় নিজের মুলুকের মাটির প্রলেপ দিয়ে তিনি ভারতীয় নিউ ওয়েভের মুখ্য কর্ণধার হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। কিন্তু তাঁর হাতে সিনেমা স্বতন্ত্র শিল্প হিসাবে কতটা মুক্তি পেয়েছে তা পণ্ডিতরা ভাল বলতে পারবেন। আমার মতে রায়, ঘটক, সেনের পর ভারতীয় ছবিকে বেনেগাল অবশ্যই আরও বলিষ্ঠ করেছেন। কিন্তু মণি কউল এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাই কউল সম্বন্ধে বেনেগাল নিজেই বলেছিলেন যে ভারতীয় সিনেমায় উসকি রোটি ততটাই গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যতটা পথের পাঁচালী। অথচ এরপর যখন নিজের প্রথম ছবি বানাচ্ছেন, তখন কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের প্রিয় ছাত্র, কউল বা সাহানিদের পথে না হেঁটে নিজেকে সত্যজিতের উত্তরসূরি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই শিল্প সাধনার লড়াই তাঁকে করতে হয়নি। শোলের ‘গাঁওয়ালো’-দের পাশে মন্থনের গ্রামবাসীরাও সাধারণ মানুষের আলোচনায় উঠে এসেছে। বেনেগাল জনপ্রিয় হয়েছেন।
মন্থন সম্বন্ধে পরিচালক বেনেগাল বলেছেন, ‘সিনেমা যে সমাজ পরিবর্তনের পথে এক অতি জরুরি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, মন্থন তারই শক্তিশালী উদাহরণ।’ আর কী আশ্চর্য সমাপতন! যে সময় দেশে লোকসভা নির্বাচন চলছে, বিজেপিবিরোধী দলগুলি সংবিধানের আসন্ন সংকটকে নিজেদের বয়ান করে তুলে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে, ঠিক সেইসময় পাশ্চাত্যের বিখ্যাত চলচ্চিত্র উৎসবে মন্থনকে ফিরে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনা কিঞ্চিৎ শিহরণ জাগায় বইকি। ভারতে সাদা বিপ্লবের জনক ভার্গিস কুরিয়েন যে বিরাট মিল্ক কো-অপারেটিভ আন্দোলন শুরু করেছিলেন তারই ছায়ায় মন্থনের কাহিনি লেখা হয়। ছবির প্রযোজক গুজরাটের পাঁচ লক্ষ ডেয়ারি কৃষক, যাঁরা প্রত্যেকে দুটাকা করে দিয়ে এই ছবি তৈরির খরচ জুগিয়েছিলেন। সমবায় তৈরির গল্প নিয়ে ছবি, তার প্রযোজনাও সমবায় পদ্ধতিতে। ভারতের প্রথম ক্রাউড ফান্ডেড ছবি। সবদিক থেকেই অভিনব।
গ্রামে দুধের সমবায়ে দলিত হরিজনদের প্রথম ভোটে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব পাওয়া আজকের ভারতেও কত প্রাসঙ্গিক! অবশ্য দলিত আর সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক নেতারা চিরকাল ভোটব্যাঙ্ক হিসাবেই দেখে এসেছেন। কাজেই আজকের রাজনীতিতে নাম করা দলিত প্রতিনিধিরা কতটা টোকেন আর কতটা নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াইয়ে ব্রতী তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
আরো পড়ুন মদন তাঁতী বনাম বারীন সাহা
পঞ্চাশ বছর আগের গুজরাটের গ্রামবাসীরা সমবায় সমিতির মহিমা আবিষ্কার করছে। নিম্নবর্গের বিত্তহীন মানুষ শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সচেতন হচ্ছে এবং নিজেদের মধ্যে লড়াই ঝগড়া করতে করতেই স্বনির্ভর হয়ে উঠছে। এহেন কড়া বাস্তবকে তার নিজস্বতা বজায় রেখে, কোনোরকম নাটকীয়তার আশ্রয় না নিয়ে সিনেমার পর্দায় নিয়ে আসা রীতিমত কঠিন। বিজয় তেন্ডুলকরকে সঙ্গী করে এরকম কঠিন সমাজবাস্তবতাকে সহজ চিত্রনাট্যের রূপ দিয়েছেন বেনেগাল। তাঁর আরেক কৃতিত্ব অবশ্যই হিন্দি ছবিতে কিছু তাবড় অভিনেতাকে প্রতিষ্ঠা করা। একথা সবাই জানেন যে শাবানা, নাসির, স্মিতা, ওম থেকে অমরীশ পুরি, কুলভূষণ খারবান্দা, সুপ্রিয়া পাঠক, দীপ্তি নাভাল – সকলেরই হাতে খড়ি তাঁর ছবিতে। মন্থনে দলিত গ্রামবাসীর ভূমিকায় স্মিতা আর নাসিরের অভিনয় নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই, কারণ এঁরা স্বীকৃত কিংবদন্তি। কিন্তু গিরীশের সাবলীল অভিব্যক্তি আর কুলভূষণের পরিমিত ম্যানারিজম দেখলে ভারতীয় সিনেমার গৌরবোজ্জ্বল অতীত চোখের সামনে প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। মন্থন দেখতে দেখতে মনে হয় সমাজবাস্তবতার সিনেমার প্রতিমূর্তি যদি হন কেন লোচ, তবে তার ভারতীয় সংস্করণ নিশ্চয়ই বেনেগাল। অঙ্কুর (১৯৭৪), নিশান্ত (১৯৭৫) দিয়ে হিন্দি ছবির যে বিকল্প বয়ান শুরু হয়েছিল, মন্থনে তা আরও পরিণত এবং পোক্ত হয়।
এই নিয়ে তিনবার কান ক্লাসিকসে পুরনো ভারতীয় ছবি রেস্টোর করে দেখানো হল। ২০২২ সালে জি অরবিন্দনের থাম্পু (১৯৭৮) এবং সত্যজিতের প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০) দেখানো হয়। গত বছর মণিপুরী ছবি আরিবামের ইশানু (১৯৯০) দেখানো হয়। এই অভিনব ও জরুরি কাজটি গত কয়েকবছর ধরে করে চলেছেন আর্কাইভিস্ট শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর। এই একান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে মানুষটি একটি আলাদা অধ্যায়ের দাবিদার হয়ে রইলেন।
আজকের দিনে ছবিটির প্রাসঙ্গিকতা দিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তার একটি মজার দিকও আছে। কুলভূষণ অভিনীত গ্রামের মোড়ল যখন সমবায়ের ভোটে এক দলিতের কাছে হেরে যায়, তখন সে ভীষণ রেগে গিয়ে গিরীশ অভিনীত ডক্টর রাওকে বলে তাকে জয়ী ঘোষণা করা হোক। সেরকম হলে সে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে চেয়ার ছেড়ে দেবে, কিন্তু এক দলিতের কাছে সে কখনোই ভোটে হারতে পারে না। আজও যে দেশে জাতিভেদ ও বিদ্বেষ রয়ে গেছে তার জন্য আমাদের পূর্বসুরিদের এই মানসিকতাই দায়ী, যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। এর চেয়েও মজার সমসাময়িকতা রয়েছে ছবিটির একদম শুরুতেই। গিরীশ, অর্থাৎ ডক্টর রাও, যখন প্রথম গ্রামের স্টেশনে নামছেন তখন গ্রামের কিছু লোক তাঁকে আপ্যায়ন করতে মালা নিয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু তাদের আসতে কিঞ্চিৎ দেরি হয়েছে। নতুন সরকারি অতিথিকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে বলে তারা যারপরনাই ক্ষমা চেয়ে বলে, ‘মাফ করবেন ডাক্তারবাবু, আজ ট্রেন একেবারে সময়ে স্টেশনে ঢুকেছে। তাই আপনাকে অপেক্ষা করতে হল!’
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








