দিল্লির মসনদে আবার ফিরে এল নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এনডিএ সরকার। এবার এই জোটের কথাই বেশি তুলে ধরা হচ্ছে, হয়ত তার কারণ এবার বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া। এর বড় কারণ হিসাবে ধরা হচ্ছে উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থানের মত রাজ্যে বিজেপি প্রার্থীদের চোখে পড়ার মত পরাজয়।
কী করে এমন ফল হল উত্তরপ্রদেশে? ওই রাজ্যে লোকসভার ৫৪৩টা আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসন (৮০) রয়েছে। সেখানেই বিজেপির আসন সংখ্যা ২০১৪ সালের তুলনায় গত দুটো নির্বাচনে ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। মোদী যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন, তখন বিজেপি পেয়েছিল ৭১টা আসন। সেবার সমাজবাদী পার্টি (এসপি) পায় পাঁচটা আর কংগ্রেস মাত্র দুটা আসন, মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি) একটাতেও জিততে পারেনি। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পায় ৬২টা আসন, কিন্তু দলের ভোট বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০%। ওদিকে বিএসপি পায় দশটা আসন আর অখিলেশ যাদবের এসপি শূন্যে নেমে যায়। সোনিয়া গান্ধী রায়বেরিলি কেন্দ্র থেকে জিতলেও ব্যবধান সাড়ে তিন লাখ থেকে ১.৬ লাখে নেমে আসে। কিন্তু আমেথিতে রাহুল গান্ধী সহ অন্য ৬৬টা কেন্দ্রেই কংগ্রেস প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়। সেবার এসপি, বিএসপি আর অজিত সিংহের রাষ্ট্রীয় লোক দল (আরএলডি) জোট বেঁধে নির্বাচনে নেমেছিল। ছবিটা বদলে গেল এবারের নির্বাচনে। বিজেপির ভোট শতাংশ নেমে দাড়াঁল ৪১.৩৭%, আসন সংখ্যা কমে ৩৩। এসপি এক লাফে ২০১৯ সালের ১৮.১১% থেকে পৌঁছল ৩৩.৫৯ শতাংশে, আর কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে একাই পেল ৩৭টা আসন। বিএসপি আবার শূন্যে ফিরে গেল আর কংগ্রেস জয়লাভ করল ছটা আসনে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ কি? তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত।
এক, ‘ইউপি কে লড়কে’ – অর্থাৎ অখিলেশ আর রাহুলের – ইন্ডিয়া জোটের তরফে আসন সমঝোতা এবার বিজেপিবিরোধী ঐক্যকে শক্তি জুগিয়েছে। কিন্তু বলে রাখা ভাল, ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে এই একই জোট প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয় এবং বিজেপি বিরাট জয় পেয়েছিল।
দুই, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রাজ্যে ক্রমাগত শক্তি বিস্তারের চেষ্টা নাকি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ আর মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই তিনি এবারের নির্বাচনে প্রায় হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। এই যুক্তি মানলে এটাও বলা উচিত যে তা করে থাকলে কিন্তু যোগীর নিজেরও রাজনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। রাজ্যে দলের একজন সভাপতি থাকলেও হার-জিতের দায়িত্ব তো মুখ্যমন্ত্রীরই বেশি।
আরো পড়ুন সংখ্যা সর্বদা সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের প্রমাণ নয়
এখানে একটা ছোট ঘটনার উল্লেখ করতে হবে, যা বিজেপির উপর বড় চাপ সৃষ্টি করে থাকতে পারে। তা হল শরিকদের আচরণ। উদাহরণস্বরূপ নেওয়া যাক প্রতাপগড় এবং কৌশাম্বি লোকসভা আসনে এবারের নির্বাচনে দুই আঞ্চলিক দলের মধ্যে মর্যাদার লড়াই। প্রতাপগড়ের ভাদ্রি এস্টেটের রাজাদের বংশধর রঘুরাজ প্রতাপ সিং কুন্ডা বিধানসভা থেকে ১৯৯৩ থেকে ২০২২ – টানা সাতবার জয়ী হন। প্রথমে নির্দল প্রার্থী হিসাবে, তারপর ২০২২ বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরই তৈরি জনসত্তা দল (লোকতান্ত্রিক)-এর হয়ে। রাজা ভাইয়া নামে পরিচিত এই লোকটি এলাকার দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্যক্তিত্ব। আগে অখিলেশের দলকে সমর্থন জানিয়ে থাকলেও, পরে বিজেপির ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নিয়ে তাঁর সমর্থকদের লোকসভায় নিজের ইচ্ছানুযায়ী ভোট দিতে বলেছিলেন। তাই হয়ত এহেন রাজা ভাইয়াকে নানা কথা শোনান এনডিএর শরিক অপনা দল (সোনলাল) নেত্রী অনুপ্রিয়া প্যাটেল। অনুপ্রিয়া প্যাটেল মোদী মন্ত্রীসভার সদস্য। তিনি কৌশাম্বির কাছেই মির্জাপুর লোকসভা আসন থেকে এবারেও জিতেছেন। রাজা ভাইয়ার দল আবার লোকসভা নির্বাচনে কোনো প্রতিনিধি দেয়নি।
এই অনুপ্রিয়া কৌশাম্বি লোকসভা আসনে প্রচার করতে গিয়ে কুন্ডা বিধানসভা এলাকার এক জনসভায় রাজা ভাইয়ার উপর আক্রমণ শানান। তাঁকে ‘স্বঘোষিত রাজা’ ইত্যাদি বলেন। আগে থেকেই কৌশাম্বি আর প্রতাপগড় লোকসভা কেন্দ্রে রাজনৈতিক দাপট নিয়ে অনুপ্রিয়া আর রাজা ভাইয়ার মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ চলছিল, সেটা এরপর সম্মুখসমরে পরিণত হয়। ক্ষুব্ধ রাজা ভাইয়া একেবারে আস্তিন গুটিয়ে নেমে পড়লেন এবং নিজের সমর্থকদের বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি কোনোভাবেই বিজেপি প্রার্থীর পক্ষে নেই। অনুগামীদের ফের বুঝিয়ে দেওয়া হল যে এবার সবাই নিজের বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দিতে পারে।
ভোটগণনার দিন দেখা গেল, কৌশাম্বিতে দুবারের বিজয়ী বিজেপি প্রার্থী বিনোদ কুমার সোনকর এসপির পুষ্পেন্দ্র সরোজের কাছে লক্ষাধিক ভোটে হারলেন আর প্রতাপগড়ে বিজেপির সঙ্গমলাল গুপ্তা হারলেন ৬৬,০০০-এরও বেশি ভোটে সেই এসপিরই শিবপাল সিং প্যাটেলের কাছে। বিধির বিধান না রাজার হাত তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে।
অন্যদিকে অখিলেশ এক নতুন অঙ্ক কষেছেন। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং অখিলেশের বাবা মুলায়ম সিং যাদব তাঁর দলের প্রধান ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেন M-Y এর ভিত্তিতে, অর্থাৎ সমর্থকদের মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে রয়েছে মুসলমান ও যাদব সম্প্রদায়। আবার বিএসপির প্রতিপত্তি কমে যাওয়ায় দলিতদের সমর্থনও পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। গত লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের পর কিছু বিশ্লেষক হিসাব করে দেখিয়েছিলেন যে যাদব আর দলিত ভোট হয়ত ভাগ হয়ে যাচ্ছে। মুলায়ম-পুত্র অখিলেশ এবার এই এম-ওয়াই বা মুসলিম-যাদব ভোটব্যাঙ্ককে বড় করতে তৈরি করেন নতুন সমীকরণ – PDA, অর্থাৎ পিছড়ে (পিছিয়ে পড়া শ্রেণি বা ওবিসি), দলিত, সংখ্যালঘু। আজ নয়, গতবছর উত্তরপ্রদেশের ঘোসি বিধানসভা উপনির্বাচনেই অখিলেশ স্লোগান দিয়েছিলেন ‘অব কি বার পিছড়ে, দলিত, অল্পসংখ্যক (PDA) সরকার।’ দলে ক্রমশ এই ধারণা দানা বাঁধে যে বেশিরভাগ পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষ, দলিত ও সংখ্যালঘুরা ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজবাদী পার্টির PDA স্লোগানকে সমর্থন করবেন আর তার ফলে বিজেপির রাজনৈতিক সমীকরণ এবং আগেকার ফর্মুলা ব্যর্থ হবে।
তার উপর অখিলেশ এবার খুব সাবধানে প্রার্থী বেছেছিলেন। এসপি প্রার্থী ছিল ৬২ আসনে। সেখানে যাদব সম্প্রদায় থেকে মাত্র পাঁচজন প্রার্থী দাঁড় করানো হয়েছে। তাঁরা সবাই আবার মুলায়মের পরিবারের সদস্য। অখিলেশ নিজে কনৌজ কেন্দ্রে ১,৭০,০০০-এর বেশি ভোটে হারিয়েছেন বিজেপির সেই সুব্রত পাঠককে, যিনি ২০১৯ সালে অখিলেশের স্ত্রী ডিম্পল যাদবকে প্রায় ১২,০০০ ভোটে হারিয়েছিলেন। আবার এই কেন্দ্রেই মুলায়ম জিতেছিলেন ১৯৯৯ সালে, প্রায় ৮০,০০০ ভোটের ব্যবধানে। ডিম্পল ওদিকে আরেক পারিবারিক কেন্দ্র মৈনপুরী থেকে জিতেছেন। সেখানেই ২০১৯ সালে মুলায়ম জিতেছিলেন। তাঁর অবর্তমানে পুত্রবধূ ডিম্পল ২০২২ উপনির্বাচনে জিতেছিলেন, ২০২৪ সালে আবার জিতলেন।
২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টি ৭৮টা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, তার মধ্যে ১২ জন যাদব প্রার্থী ছিলেন। এঁদের মধ্যে মুলায়ম পরিবারের সদস্য ছিলেন চারজন। এরপর ২০১৯ সালে সমাজবাদী পার্টির ৩৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন ছিলেন যাদব সম্প্রদায়ভুক্ত। এবার ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হন পাঁচজন যাদব, ২৭ জন ওবিসি, ১১ জন উচ্চবর্ণ (চারজন ব্রাহ্মণ, দুজন ঠাকুর, দুজন বৈশ্য এবং একজন ক্ষত্রি) এবং চারজন মুসলমান। তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোতে ১৫ জন দলিত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
অখিলেশ নিজেই সোশাল মিডিয়ায় এক পোস্টে লেখেন ‘PDA-তে বিশ্বাসীদের সমীক্ষা: সামগ্রিকভাবে ৯০% বলেছেন – ৪৯% পিছিয়ে পড়া মানুষের PDA-তে বিশ্বাস রয়েছে, ১৬% দলিতদের PDA-তে বিশ্বাস রয়েছে, ২১% সংখ্যালঘু (মুসলিম+শিখ+বৌদ্ধ+খ্রিস্টান+জৈন এবং অন্যান্য+উপজাতি) PDA-তে বিশ্বাস করে, উচ্চবর্ণের ৪% PDA-তে আস্থা রাখে। (উপরের সবগুলোতেই ‘আধি আবাদী’ অর্থাৎ নারীরা অন্তর্ভুক্ত)। এই ৯০ শতাংশের অধিকাংশই এবার ঐক্যবদ্ধভাবে PDA কেই ভোট দেবেন।’
অখিলেশের এই ফর্মুলায় এতটাই বিশ্বাস ছিল যে তিনি স্লোগান তোলেন: ‘PDA নে লি অঙ্গড়ায়ি, ভাজপা কি শামত আয়ি।’ অর্থাৎ PDA ইস্যু তোলার ফলে বিজেপি এবার কোণঠাসা। ফলাফলও প্রায় সেটাই প্রমাণ করছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








