আর কদিন পরই লোকসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে যাবে। সাত দফায় ভোট নেওয়ার পর ৪ জুন হবে ফল ঘোষণা। যে দলই জিতুক না কেন, প্রায়শই নেতাদের বলতে শোনা যায় – এবং হয়ত আবার শুনতে পাওয়া যাবে – যে দেশের জনগণই নাকি তাঁদের সরকার বানানোর জন্য মত দিয়েছে। কারণ তাঁরা সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী হয়েছেন। অথবা দাবি উঠবে যে দেশের ১৪০ কোটি মানুষই নাকি তাঁদের পিছনে আছেন। কিন্তু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, দেশের ঠিক কতজন নাগরিক তাঁদের পক্ষে মত দিয়েছেন আর কতজনই বা বিপক্ষে রয়েছেন। অঙ্কটা তাহলে কী?
নির্বাচন কমিশনের ১ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখের তথ্য অনুযায়ী, গোটা দেশের মোট ভোটার সংখ্যা কিন্তু ৯৭ কোটিরও কম, যা ২০১৯ সালের গুনতিতে ছিল সর্বসাকুল্যে ৯০ কোটির কাছাকাছি। এর মধ্যে আবার ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ভোট দেন (পোস্টাল ব্যালট বাদ দিয়ে) ৬৭% ভোটার, অর্থাৎ ৬১ কোটির মত মানুষ। বিজয়ী দল বিজেপি সেবার পায় প্রায় ২৩ কোটি ভোট, যা মোট ভোটার সংখ্যার মাত্র ২৫% আর ভোটে অংশগ্রহণকারী মানুষের ৩৭ শতাংশের কিছু বেশি। এই বিজেপি আবার ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে বৈধ ব্যালটের মাত্র ৩১ শতাংশের মত ভোট পেয়েছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অবশ্য সেবার নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত ছখানা জাতীয় দল সর্বসাকুল্যে পায় বৈধ ভোটের প্রায় ৬১%। অর্থাৎ সেবার দলগুলোর মধ্যে ৫০ শতাংশের মত ভোট যায় বিজেপির ঝুলিতে। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২৮২ আসনে জয়লাভ করে নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বে কেন্দ্রে সরকার গঠন করে। ২০১৯ নির্বাচনে ৩০৩ আসনে জয়লাভ করার ফলে তাদের অবস্থান আরও জোরদার হয়।
এ কথা তো সর্বজনবিদিত যে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের মাথাব্যথা ভোটার সংখ্যা বা ভোটের শতাংশের থেকে বেশি আসন সংখ্যা নিয়ে। কারণ ভারতবর্ষে নির্বাচনে হার-জিত নির্ভর করে আসন সংখ্যার উপরে।
এ তো গেল অঙ্ক। এবার এ বিষয়ে প্রবীণ সাংবাদিক ও লেখক অনিল মাহেশ্বরী তাঁর দ্য পাওয়ার অফ দ্য ব্যালট: ট্রেভেইল এন্ড ট্রায়াম্ফ ইন দি ইলেকশনস বইটিতে লিখছেন যে (মোটামুটি অনুবাদ), ‘২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি ৩১% ভোট পেয়েছিল, (আর তা ছিল) স্বাধীনতার পর ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার গঠনকারী কোনো দলের পক্ষে সর্বনিম্ন।’ তিনি আরও লিখেছেন যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সেবার পায় ৩৮% ভোট। আসন সংখ্যার হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে তারাই সরকার গঠন করে – শুরু হয় দেশের ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়।
সহলেখক বিপুল মাহেশ্বরীর সঙ্গে লেখা এই বইতে তিনি আরও লিখেছেন যে ভারতীয় গণতন্ত্র ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণ করে, তাই ভোটের শতাংশ নিয়ে মোদী সরকারের কোনো সমালোচনা কিন্তু করা যায় না। বটেই তো! এখানে কে বেশি আসন জিতল সেটাই শেষ কথা।
তাঁদের লেখায় একটা মজার ব্যাপার জানা যাচ্ছে। তাতে দেশে এখন পর্যন্ত যে ১৭ বার সাধারণ (লোকসভা) নির্বাচন হয়েছে (বইটা লেখার সময় পর্যন্ত), তাতে কোনো শাসক দলই কিন্তু কখনো ৫০% ভোট পায়নি। লেখকরা বলছেন, ১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে নিহত হওয়ার পর যে সহানুভূতির ঢেউ ওঠে, তার ফলে ইন্দিরা-পুত্র রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ৪৯.১০% ভোট পায়। সেটাই সর্বোচ্চ কিন্তু সেবারও জয়ী দল ৫০ ছুঁতে পারেনি।
কাজেই, দেশের সমস্ত জনগণ তো দূর অস্ত – যাঁরা ভোট দিচ্ছেন তাঁদের ৫০ শতাংশও দেশের রাজনৈতিক ভাগ্যবিধাতা নন। তাহলে কি বলা চলে যে গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের কোনো ভূমিকাই নেই? হয়তো বা। কারণ কিছু আসনে দেখা যায়, অনেক রাজনৈতিক দলের লক্ষ লক্ষ ভোটার থাকা সত্ত্বেও তাঁরা ভোটকেন্দ্রে না আসার ফলে ওই এলাকাগুলো সেই দলের হাত থেকে ফসকে যায় এবং তারা সংসদে প্রতিনিধি পাঠিয়ে উঠতে পারে না। অন্যদিকে অনেক বিজয়ী প্রার্থী নিজের নির্বাচনী এলাকায় ২৫, ৩০ বা ৩৫ শতাংশের বেশি ভোট না পেয়েও জিতে যান।
সংখ্যা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায়, এই নজির আবার বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবসময় খাটে না। আবার যা দুক্ষেত্রেই দেখা যায়, তা হল ভোট বেশি পেলেই যে সেই দলের আসন সংখ্যা সমানুপাতে বাড়ে তা নয়।
প্রথমে দেখা যাক কবার এই ৫০ শতাংশের লক্ষ্মণরেখা পেরনো গেছে বিধানসভার ক্ষেত্রে।
যেমন ২০২২ সালের গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যের ১৮২ বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৫৬ আসন জিতে ক্ষমতায় ফিরে আসে। এটা গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের পাওয়া সর্বোচ্চ আসন। বাহান্ন শতাংশের উপর ভোট যায় বিজেপির পক্ষে। আবার ২০১৫ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টি মোট ভোটের ৫৪ শতাংশের মত ভোট পেয়ে জয়ী হয়।
এখানে উল্লেখ্য, ২০২২ সালের গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যে সবথেকে বেশি আসন পেলেও ভোট শতাংশ কিন্তু সর্বোচ্চ ছিল না। তার আগে ১৯৮৫ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট। তারপর ২০২২ সাল পর্যন্ত বিধানসভা নির্বাচনগুলোর মধ্যে একটা দল ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে বেশ কয়েকবার। গুজরাটে বিজেপি আর দিল্লিতে আপ ছাড়াও এর মধ্যে কংগ্রেস ৩০ বার, সিকিম ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট চারবার ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছে। তাছাড়া আছে সিকিম সংগ্রাম পরিষদ (২), ন্যাশনাল কনফারেন্স (১), জনতা পার্টি (১), তেলুগু দেশম পার্টি (১ বার)।
কাজেই যা লোকসভা নির্বাচনে খাটে তা বিধানসভার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এমনটা নয়। আবার এমনটা যে হামেশাই বিধানসভার ক্ষেত্রে ঘটে, তাও নয়। যেমন ১৯৮৭ সালের জুন মাসে হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনে, দেবী লালের লোকদলের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতাসীন কংগ্রেসকে পরাজিত করে। সেবার কংগ্রেস বিধানসভায় মাত্র পাঁচটা আসন পায় এবং ৮৫টা আসন যায় দেবী লালের জোটের হাতে। সেখানে০ ৬০টা আসন পায় লোকদল। এদিকে কংগ্রেস সেবার প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৩০% পেয়েছিল (তুলনায় ১৯৮২ সালের নির্বাচনে তারা প্রায় ৩৬% ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে)। দেবী লাল ৬০টা আসন দখল করেন মাত্র ৩৩% ভোট পেয়ে। সেবার নির্বাচনে হরিয়ানার ৮৬,০০,৫৮৫ জন ভোটারের মাত্র ৬৯% ভোট দিতে গিয়েছিলেন।
আরো পড়ুন এক দেশ এক নির্বাচন এবং মনোযোগের রাজনীতি
তেমনই ২০১৪ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে পাঁচ দফা বিধানসভা নির্বাচনে সরকারিভাবে বলা হয় ভোট পড়েছে ৬৫ শতাংশের বেশি। খবরে তা ফলাও করে প্রচারিত হয়, কারণ অন্যান্য রাজ্যের স্বাভাবিক ভোটদানের চেয়ে এই হার বেশি। সেই নির্বাচনে পিডিপি ২২.৭ শতাংশের মতো ভোট পেয়ে জেতে ২৮টা আসন; বিজেপি ২৩% ভোট পেয়েও দখল করে ২৫টা আসন। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান পায় জম্মু ও কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স (প্রায় ২১% ভোট, ১৫ আসন) এবং কংগ্রেস (১৮% ভোট, ১৭ আসন)। আবার পশ্চিমবাংলায় ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৪৮% ভোট পেয়ে জেতে ২১৫ আসন; সেখানে মাত্র বিজেপি ১০% কম ভোট পেলেও মাত্র ৭৭টা আসন জেতে।
তাই ভোটের এই অংশীদারির অঙ্ক মেলানো খুবই কঠিন। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেই যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের সমর্থন শাসক দলের বা জোটের পক্ষে আছে তাও বলা চলে না। কখনো বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ভোট দিতেই যান না। প্রত্যেক নির্বাচনেই গড়ে প্রায় ৩০%-৪০% বৈধ ভোটার ভোট দিতেই যান না। তাই আক্ষরিক অর্থে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অধিকাংশ নির্বাচনেই মরীচিকা।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








