লোকসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার প্রাক্কালেই ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর এল আরেকটা বড় ধাক্কা। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত বিশেষ উচ্চস্তরীয় কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দিল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে – এক দেশ এক নির্বাচনের সপক্ষে ১৮,৬২৬ পাতার দীর্ঘ রিপোর্ট। দুই ধাপে নির্বাচনের সুপারিশ করল কোবিন্দ কমিটি – প্রথম ধাপে একসঙ্গে লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন, তার ১০০ দিনের মধ্যে পৌর ও পঞ্চায়েত নির্বাচন। অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে আছে সংবিধানের বেশ কিছু অনুচ্ছেদের (৮৩, ৮৫, ১৭২, ১৭৪, ৩২৫, ৩৫৬) সংশোধন, একটি নতুন অনুচ্ছেদ (৩২৪এ) সংযোজন, অভিন্ন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা এবং নতুন ভোটার কার্ড বিতরণ।

কীভাবে প্রস্তুত হয়েছে এই রিপোর্ট? অন্যান্য দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে, নাগরিক সমীক্ষার মাধ্যমে, ৪৭টি রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে, নির্বাচন কমিশন এবং অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এখানে উল্লেখ্য, একসঙ্গে নির্বাচনের ধারণা কিন্তু ভারতে আনকোরা ব্যাপার নয়। এই রিপোর্টও সমান্তরাল নির্বাচন নতুন করে চালু করার কথা বলছে না, পুনর্বহাল করার কথা বলছে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫২, ১৯৫৭, ১৯৬২, এবং ১৯৬৭ সালের চারটি নির্বাচন এইভাবেই, অর্থাৎ লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন একসঙ্গে হয়েছিল। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্ধারিত সময়ের আগেই ভেঙে যাওয়ার ফলে কেন্দ্র এবং রাজ্যস্তরের নির্বাচন আলাদা হয়ে যায়। তারপরেও ১৯৮৩ সালে নির্বাচন কমিশন একত্র নির্বাচনের সম্ভাবনার কথা বলেছে, ১৯৯৯ সালের আইন কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ সালেও একটি সংসদীয় কমিটি একত্র নির্বাচনের ভালমন্দ নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছে, কিন্তু ওই অবধিই।

বিজেপি অনেকদিন ধরেই সেই ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কথা বলছে। তাদের ২০১৯ সালের এবং আরও আগের নির্বাচনী ইশতেহারেও এই প্রস্তাব ছিল। তাদের যুক্তি, অথবা বলা যায় এই ব্যবস্থার পক্ষে সরকারি যুক্তি, আপাতভাবে অবশ্যই অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক। সব নির্বাচন একসঙ্গে বা একই বছরে হলে বছর বছর সেই বাবদ নির্বাচনী আধিকারিক নিয়োগ করতে হবে না, কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকেও একবার জাতীয় স্তরের নির্বাচন, একবার রাজ্যস্তরের নির্বাচন, তারপর আলাদা আলাদা পৌর বা পঞ্চায়েত নির্বাচনের জন্য প্রচারে নামতে হবে না। নির্বাচন খাতের বিপুল খরচ কমিয়ে আনা যাবে। নির্বাচনী আচরণবিধি বলবৎ হওয়ায় নানারকম নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হয়, ঘনঘন নির্বাচন এড়ানো গেলে অন্যান্য সেদিক থেকে প্রশাসনিক দক্ষতাও বাড়বে। সময় এবং ঝক্কি বাঁচবে ভোটারদেরও।

কোবিন্দ কমিটির করা নাগরিক সমীক্ষাতেও নাকি ৮১% মতামত এক দেশ এক নির্বাচনের পক্ষে, যদিও এই সমীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ২১,০০০ মানুষকে নিয়ে। মোট ৬২টি রাজনৈতিক দলের মতামত চেয়েছিল এই কমিটি, যার মধ্যে ৩২টি দল এক দেশ এক নির্বাচনের পক্ষে এবং ১৫টি দল বিপক্ষে। বাকি ১৫টি দল মতদানে বিরত থেকেছে। সপক্ষে মত দেওয়া ৩২টি দলের মধ্যে দুটি মাত্র জাতীয় স্তরের দল – বিজেপি এবং এনপিপি। এই দুই দল সহ পক্ষের মোট ২৬টি দলই এনডিএর শরিক। এনডিএ-র একটি মাত্র দল – নাগা পিপলস ফ্রন্ট – সমান্তরাল নির্বাচনের বিপক্ষে মত দিয়েছে। বিপক্ষের মোট ১৫টি দলের মধ্যে রয়েছে জাতীয়স্তরের বাকি চারটি দল – কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি এবং সিপিএম। এছাড়া রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, সিপিআই, সিপিআইএমএল, এআইইউডিএফ, এআইএমআইএম ইত্যাদি। ইন্ডিয়া জোটের দশটি শরিক দলই এক দেশ এক নির্বাচনের বিপক্ষে।

বিপক্ষের যুক্তি কী কী? প্রথম কথাই হল, এরকম নির্বাচন সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী এবং কেন্দ্র-রাজ্য বিভাজনকে লঘু করে দেওয়ার অপচেষ্টা। তামিলনাড়ুর ডিএমকের মতে এটা সরাসরি অসাংবিধানিক এবং সিপিএমের মতে এটা কাঠামোগতভাবেই অগণতান্ত্রিক। আম আদমি পার্টির আশঙ্কা, এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতি শাসনের নামান্তর। সমাজবাদী পার্টির আশঙ্কা, এই ব্যবস্থা চালু হলে রাজ্যস্তরের দলগুলি কৌশল বা ব্যয় ক্ষমতা – কোনো দিক দিয়েই জাতীয় স্তরের দলগুলির সঙ্গে যুঝে উঠতে পারবে না। এছাড়া তৃণমূল কংগ্রেস বলেছে, রাজ্যস্তরের ইস্যুগুলি এতে অবহেলিত হবে।

বর্তমান ব্যবস্থা থেকে নতুন ব্যবস্থায় যাওয়ার প্রক্রিয়াও মসৃণ হবে না মোটেই। অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা এবং সিকিমে এবারেও বিধানসভা নির্বাচন লোকসভা নির্বাচনের গায়ে গায়েই হবে। একই সময়ে না হলেও, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনও এবছরেই। পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচন হয়েছে গত বছরের শেষে এবং বাদবাকি ১৯ রাজ্যের নির্বাচন আগামী চার বছরের মধ্যে (২০২৫ সালে তিনটি, ২০২৬ সালে পাঁচটি, ২০২৭ সালে সাতটি এবং ২০২৮ সালে চারটি)।

২০২৯ থেকে সমান্তরাল নির্বাচন ব্যবস্থা প্রযুক্ত হলে ২০২৬-২৮ সালে নির্বাচনে যাওয়া রাজ্যগুলির নির্বাচিত সরকার এক থেকে তিন বছরের জন্যে ক্ষমতায় থাকতে পারবে। এই ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরে কোনো বিধানসভা (বা লোকসভা) নির্ধারিত সময়ের আগে ভেঙে গেলে পুনরায় সেখানে নির্বাচন হবে, কিন্তু সেই নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মত শুধু অবশিষ্ট সময়টুকুর জন্য গঠিত হবে। এই সমস্ত কারণেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তাছাড়াও এক দেশ এক নির্বাচন চালু করলে নানারকম ব্যয় বাড়বে। যেমন নির্বাচন কমিশনের কাছে এই মুহূর্তে ১২ লক্ষের মত ইভিএম আছে। এক দেশ এক নির্বাচন করতে হলে এর দ্বিগুণ ইভিএম প্রয়োজন হবে।

বলা হয়েছে, এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে। তার মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন ইত্যাদি। প্রশ্ন হল, এর একটিও কি আকারে, জনসংখ্যায়, সামাজিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যে এবং জটিলতায় ভারতের ধারেকাছে আসে? আসে না। তাছাড়া সাধারণ নির্বাচনের জন্য পূর্বনির্দিষ্ট তারিখ বেঁধে দেওয়ার যে আইন ২০১১ সালে ব্রিটেনে পাস হয়েছিল, সাংবিধানিক জটিলতা ও সরকারি গড়িমসির কারণ দেখিয়ে ২০২২ সালে তা আবার তুলেও নেওয়া হয়।

ভারতে এক দেশ এক নির্বাচন ফের চালু করার পিছনে বর্তমান সরকারের অন্যতম যুক্তি হল, প্রতিবছরই কোনো না কোনো নির্বাচনের যে হাওয়া দেশে বইতে থাকে, তা থেকে প্রশাসন ও জনগণকে অব্যাহতি দেওয়া। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও অনেকেই নির্বাচনের সময় ছাড়া জনগণকে মুখ দেখান না। রাস্তা সারাই বা জলের কল থেকে শুরু করে কৃষকদের ঋণ মকুব, সরকারি প্রকল্পের বকেয়া টাকা ইত্যাদি নানা প্রাথমিক পরিষেবাই জোটে নির্বাচনের মুলোটি সামনে ঝোলার পরে। বিধানসভায় জিতে আসার পরেও পঞ্চায়েত, পৌর এবং সাধারণ নির্বাচনে ভাল ফল করার কথা মাথায় রেখে ক্রমাগত কাজ করতে হয় রাজ্য সরকারকে। একেবারে পাঁচবছর পর পর নির্বাচন হলে সরকারি জবাবদিহির কী হবে?

নির্বাচন লড়া হয় ইস্যুর ভিত্তিতে। লোকসভা নির্বাচন, প্রতিটি বিধানসভা নির্বাচন, প্রতিটি পঞ্চায়েত বা পৌরসভা নির্বাচনে আলাদা আলাদা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইস্যু ঘিরে লড়াই করেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। সাধারণ নির্বাচনের প্রচারের মাত্রা এতটাই উচ্চকিত, যে একই সময়ে রাজ্য স্তরের নির্বাচন হলে রাজ্যের ইস্যুগুলি মানুষের কাছে অনেক কম গুরুত্ব পাবে। যদিও ভারতীয় রাজনীতি ক্রমশই আরও বেশি কেন্দ্রীভূত, আরও আরও বেশি মুখসর্বস্ব হয়ে উঠছে, তবু ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিচিত্র জনজাতির কণ্ঠস্বর – তাদের বঞ্চনা বা কর্তৃত্বের নিজ নিজ ইতিহাস অনুসারেই – বহন করেন জনপ্রতিনিধিরা। সে কারণেই ভারতের মত বিশাল আয়তনের দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্ব অপরিসীম।

যে স্তরের নির্বাচন সেই স্তর অনুযায়ী মানুষ ভাবেনও আলাদা আলাদাভাবে। রাজ্যস্তরে নির্বাচন হচ্ছে নাকি কেন্দ্রীয় স্তরে, সেই অনুযায়ী অনেকসময়েই বদলায় পছন্দের রাজনৈতিক দলও। যে কোনো নির্বাচনেই কিছু ভোটার থাকেন যাঁরা নির্দিষ্ট একটি দলকেই ভোট দেন, আর কিছু ভোটার থাকেন ভাসমান বা দোদুল্যমান। নির্বাচনী প্রচারের প্রধান লক্ষ্য এই ভাসমান ভোটাররাই। চটকদার কোনো ইস্যুর মাধ্যমে সাময়িক আবেগের পারদ চড়িয়ে দিয়ে সহজে এই ভোট টানার চেষ্টা করবে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা দলের পক্ষে অনেক সহজ হবে কাজটা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এই মুহূর্তে সব নির্বাচন একসঙ্গে হলে রামমন্দির নিয়ে আবেগকে যেভাবে ব্যবহার করতে পারবে বিজেপি, ২০২৭-২৮ সালের নির্বাচনগুলোতে তা সম্ভব হবে না।

ঘনঘন নির্বাচন হলে নির্বাচনে জনাদেশের প্রতিফলনও অনেক বেশি হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গেই ২০১৬ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জেতার পর ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে চরম গা-জোয়ারি, কারচুপি ও গুণ্ডামির ফল তৃণমূল সরকার হাতেনাতে পেয়েছিল ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। ফলে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে তারা নিজেদের সংযত করতে বাধ্য হয়। পাঁচবছর পরপর নির্বাচন হলে এই শিক্ষা দেওয়ার উপায় জনগণের হাতে থাকবে না। আর কে না জানে, মানুষের স্মরণশক্তি সীমিত?

স্মরণশক্তি ছাড়া মানুষের তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতাও যথেষ্ট সীমিত, এবং সীমিত তার মনোযোগ। তথ্যপ্রযুক্তি ও ভুয়ো খবরের যুগে মানুষের মনোযোগ এক অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ, যার জন্য প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতায় মেতে রয়েছে বিপুল পণ্যের বাজার, অসংখ্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দল। সমান্তরাল নির্বাচন এই মনোযোগের রাজনীতিকে মূলধন করবে। কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা দল হিসাবে এর সর্বাধিক সুবিধা বিজেপিই পাবে। যে সমস্ত রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, সেখানেও সাধারণ নির্বাচনী প্রচারকে ব্যবহার করে নিজেদের ভোট তারা অনেকখানি বাড়িয়ে নিতে পারবে।

নির্বাচন সংক্রান্ত গবেষণার জন্য ইতিপূর্বেও তোপের মুখে পড়া অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বিতর্কিত অধ্যাপক সব্যসাচী দাস ইংল্যান্ডের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত দুজন ভারতীয় গবেষকের সঙ্গে একটি যৌথ গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, একত্র নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একই দলের লোকসভা ও বিধানসভায় জেতার সম্ভাবনা এক লাফে ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। এই গবেষণার জন্য ১৯৭৭-২০১৮ ভারতের অনেকগুলি নির্বাচনকে তাঁরা দুই ভাগে ভাগ করেন – ১) যেখানে সাধারণ নির্বাচন এবং রাজ্যস্তরের নির্বাচন একই দিনে হয়েছে, ২) যেখানে আলাদা দিনে কিন্তু ছয় মাসের কম সময়ের ব্যবধানে সাধারণ নির্বাচন এবং বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে।

১৯৯৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত নির্বাচন পরবর্তী সমীক্ষাগুলি বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেন যে একত্র নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া অনেক বেশি জটিল হয়ে যায়। ফলত প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক ভোটার সেখানে নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু কী তা বলতে পারেন না। দল দেখে ভোট দেওয়ার প্রবণতাও সেই নির্বাচনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

সুতরাং একত্র নির্বাচন হলে একদিকে নির্বাচনী ইস্যুর তুলনায় দল ও মুখের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে। অন্যদিকে জাতীয় স্তরের ইস্যুগুলির পিছনে ঢাকা পড়ে যাবে রাজ্যস্তরের ইস্যু ও আঞ্চলিক ইস্যু। শুধু গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোই বিপদের মুখে পড়বে না, আঞ্চলিক স্তরের সমস্যা সমাধানে জনপ্রতিনিধিদের আগ্রহও কমে যাবে স্বাভাবিকভাবেই।

আরো পড়ুন আসলে নাগরিক সমাজের জয় হল মিজোরামের নির্বাচনে

ঘটনাচক্রে কোবিন্দ কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের দিনই স্টেট ব্যাঙ্কের জমা দেওয়া নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত তথ্য তাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশ করল নির্বাচন কমিশন। আবার সেইদিনই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের নির্বাচনী প্যানেলের সুপারিশে কমিশনার হিসাবে নিযুক্ত হলেন দুই প্রাক্তন আমলা সুখবিন্দর সান্ধু ও জ্ঞানেশ কুমার। তিন সদস্যের প্যানেলে লোকসভার বিরোধী নেতা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। কমিশনারের পদের জন্য সম্ভাব্য তালিকা কীভাবে প্রস্তুত করা হল তা নিয়ে সন্দেহ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। নির্বাচনের সূচি ঘোষণার অপেক্ষা তো ছিলই। এমন ঘটনার ঘনঘটাময় দিনে কোন বিষয় থেকে চোখ ঘোরাতে কোন বিষয়ের অবতারণা – তা নিয়ে জল্পনা করতেই পারেন নিন্দুকরা। কিন্তু অপ্রিয় সত্যটা বোধহয় এই, যে এই সব শাক দিয়ে মাছ ঢাকার প্রয়োজন বিজেপির খুব আর থাকছে না। তারা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছে, নির্বাচনী বন্ডের তথ্য ভোটারদের উপর প্রভাব ফেলবে না, এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত।

এক দেশ এক নির্বাচন, এক দেশ এক আইন, এক দেশ এক ভাষা, এক দেশ এক ধর্ম, এক দেশ এক দল – স্পষ্ট অথবা অস্পষ্ট লক্ষ্য যা-ই ধরা যাক না কেন, বিজেপির নৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এজেন্ডা সম্পূর্ণ এককেন্দ্রিক লক্ষ্যে সুবিন্যস্ত। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যখন একত্র নির্বাচন চালু ছিল, তখন লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল কংগ্রেসের। প্রথম তিনবার লোকসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল তিন-চতুর্থাংশ, ১৯৬৭ সালের তা ৫৪ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৯ সালের পর লোকসভায় বিজেপির প্রতিনিধিত্ব ৫৬%। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই তারা সংবিধান বদলাতে চায় এবং একত্র নির্বাচন তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বৃদ্ধিতে আরও সহায়ক হবে। ভারতীয় গণতন্ত্র ও তার বৈচিত্র্যের ঐতিহ্যের উপর তার প্রভাব বলার অপেক্ষা রাখে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.