২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর, বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে যেতে, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে দেজা ভুর মত আবার ফিরে এসেছে সিএএ, সেইসঙ্গে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলন। গত বিধানসভার পর দুবছর বিজেপি নেতারা সিএএ-র কথা খুব একটা মুখে আনেননি। ২০২৪ সালের শুরুতেও অমিত শাহ বা নরেন্দ্র মোদীর জনসভায় তেমনভাবে ভিড় জমাতে দেখা যায়নি নাগরিকত্বের মূল দাবিদার মতুয়া বা উদ্বাস্তু মানুষদের। তা সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে এবং অতি অবশ্যই নজর কেড়েছে বিজেপি নেতৃত্বের।

নমশূদ্র মতুয়া উদ্বাস্তুরা কেন নাগরিকত্ব চান? তাঁরা কি নেহাত পাগল, নাকি সত্যিই তাঁদের কিছু সমস্যা আছে – সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার বদলে উচ্চবর্ণের আধিপত্যে চালিত নাগরিক সমাজ তাঁদের নাগরিকত্বের দাবিকে উদ্ভট বলে ভাবতে বেশি ভালবাসে। কেন তাঁদের নাগরিকত্বের দাবি, সেই বিস্তারিত আলোচনায় আপাতত না গিয়ে আমরা এই বাস্তব অবস্থাটা মেনে নিয়ে আলোচনাটা শুরু করতে পারি, যে উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্বের দাবি আছে এবং বিজেপি বাদে অন্য কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দল সেই দাবিকে স্বীকার করছে না। সুতরাং বিজেপিই তাঁদের একমাত্র ভরসা এবং বিজেপিকে নিয়ে তাঁরা ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছিলেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কিন্তু প্রশ্ন হল, সিএএ ২০১৯ বা তার ২০২৪ সালে প্রকাশিত নিয়মাবলীতে কি বিজেপি আদৌ উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্বের দাবিকে স্বীকৃতি দিল? এই আইন বা নিয়মাবলীর সঙ্গে নাগরিকত্বের দাবিদার আপামর নমশূদ্র উদ্বাস্তু মানুষের সম্পর্কই বা কী? কী-ই বা সম্পর্ক ভারতের অন্যান্য অংশের মানুষের?

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলনে দুটো ধারণা প্রচলিত। অনেকসময় একই ব্যক্তি বা সংগঠন একই প্রবন্ধে বা ভাষণে দুটোই বলে থাকেন। ১) সিএএ ২০১৯ হল একটা ফাঁদ। এই আইন অনুযায়ী হিন্দুরা নাগরিকত্বের আবেদন করলেই বহিরাগত হিসাবে ধরা পড়ে যাবে এবং বেনাগরিক হবে। ২) এনআরসি হলে হিন্দু, মুসলমান সকলেই বেনাগরিক হবে। তার পর সিএএ ২০১৯-এর মাধ্যমে হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু মুসলমানরা বেনাগরিকই রয়ে যাবে। ফলত এই আইনটা মুসলমানবিরোধী।

বক্তারা খেয়াল করেন না, কথাদুটো আসলে পরস্পরবিরোধী। কিন্ত নতুন নিয়মাবলী কী জবাব দিল এই প্রশ্নগুলোর?

আইনসভায় পাস হয় আইন, সেই আইনের ভিত্তিতে তৈরি হয় নিয়মাবলী। আইন কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেটাই লেখা থাকে নিয়মাবলীতে। জনপ্রতিনিধিরা আলোচনা, বিতর্ক, ভোটাভুটির মাধ্যমে আইন তৈরি করলেও, নিয়মাবলী তৈরি করেন আমলারা। আইন তৈরির ছমাসের মধ্যে নিয়মাবলী প্রকাশ করার কথা। সেই হিসেবে সিএএ ২০১৯-এর নিয়মাবলী প্রকাশিত হওয়া উচিত ছিল ২০২০ সালের জুন মাসের মধ্যে। কিন্তু হল ৫১ মাস বা চার বছর তিন মাসের মাথায়।

২০২০ সালের জুন মাসে ছমাসের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ তিনমাস অতিরিক্ত সময় চেয়েছিলেন। সেই তিনমাসের পর আরও তিন মাস, তারপর আরও তিন মাস – এইভাবে ক্রমশ নিয়মাবলী প্রকাশ পিছিয়েছে। বিলম্বের জন্য শাহ প্রথমে করোনার বাহানা দিলেও (যদিও আমলাদের নিয়মাবলী তৈরি করার সঙ্গে করোনা ভাইরাসের কী সম্পর্ক, তা ঈশ্বর থেকে থাকলে, সেই পরম বুদ্ধিমানও ব্যাখ্যা করতে পারবেন বলে মনে হয় না), বিধানসভা নির্বাচনের পর আরও তিন বছর বিলম্বের জন্য কোনো বাহানা দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেননি। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দায়িত্বে থাকা কৈলাশ বিজয়বর্গীয় দাবি করেছিলেন ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে জানুয়ারি মাসেই নাকি সিএএ-র আওতায় নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন উদ্বাস্তুরা। যদিও ২০২১ সালের নির্বাচনের পর বিজেপিও এই আইনের কথা ভুলে যায়, হতাশ উদ্বাস্তু মতুয়ারাও বিজেপির থেকে মুখ ফেরান।

কিন্তু হঠাৎ লোকসভা নির্বাচনের কয়েকমাস আগে নিয়মাবলী প্রকাশ সেই পরিস্থিতি বদলে দিল। আহ্লাদে আটখানা মতুয়ারা। কিন্তু কী আছে এই নিয়মাবলীতে? কেনই বা যা ছমাসে প্রকাশ করা যায় তা ৫১ মাস কাটিয়ে ঠিক লোকসভা নির্বাচনের মাসখানেক আগে প্রকাশ করা হল?

নিয়মাবলী যেহেতু আইনকে অনুসরণ করতে বাধ্য, তাই দেখাযাক সিএএ ২০১৯-এর বিতর্কিত অংশটা।

আইনে যা বলা হয়েছে, সহজ ভাষায় তা এই, তিনটে দেশ থেকে আগত ইসলাম ধর্ম বাদে ছটা ধর্মের মানুষ, যাঁরা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসেছেন এবং পাসপোর্ট আইন, বিদেশি আইন থেকে ছাড় পেয়েছেন, তাঁদের আর অবৈধ অভিবাসী হিসাবে গণ্য করা হবে না। পাঠক খেয়াল করুন, এর মধ্যে কোথাও ধর্মীয় নিপীড়ন কথাটা নেই। সত্যিই কী নেই? অবশ্যই আছে। কীভাবে আছে, তা নিয়ে আমরা এবার আলোচনা করব, আপাতত জেনে রাখুন, এই বিভ্রান্তিই ভুল বোঝাবুঝির অন্যতম কারণ।

নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার যে ফর্ম তৈরি করা হয়েছে, তার সঙ্গে তিনটে নথি জমা দেওয়া আবশ্যিক, যেগুলো লেখা আছে শিডিউল ১এ, ১বি এবং ১সি-তে। এই তিনটের সবকটা না থাকলে আবেদন করা যাবে না। ১এ-র অধীনে নখানা নথির কথা বলা হয়েছে। এই নথিগুলো আবেদনকারীর পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব সম্পর্কিত। যেমন পাসপোর্ট, সেই দেশের ভোটার কার্ড ইত্যাদি। এই নথিগুলোর অন্তত একটা থাকতেই হবে, যা তার ওই তিন দেশের মধ্যে একটার নাগরিকত্ব প্রমাণ করবে। যাদের নেই, তাদের আবেদন করার সুযোগ নেই।

1B-র অধীনে কুড়িটা নথির কথা বলা হয়েছে, যা প্রমাণ করবে আবেদনকারী ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে থেকে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ধরে নেওয়া যেতে পারে, এই নথি সকলের কাছেই আছে। কিন্তু ১এ শিডিউলের নথি না থাকলে ১বি শিডিউলের নথি থেকেও কোনো লাভ নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১সি। এর অধীনে আবেদনকারীকে একটা হলফনামা জমা দিতে হবে, যেখানে তাঁকে ঘোষণা করতে হবে যে তিনি পাসপোর্ট, ভিসা ইত্যাদি আইন থেকে ছাড় পেয়েছেন। যদি পরবর্তীকালে জানা যায় যে তিনি হলফনামায় ভুল তথ্য দিয়েছেন, তবে তিনি ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন।

সুতরাং এটা বোঝা দরকার যে আবেদনকারীর কাছে যদি বাংলাদেশের বা অন্য দুই দেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ থেকেও থাকে, তবুও তিনি যদি পাসপোর্ট আইন বা বিদেশি আইন থেকে ছাড় না পেয়ে থাকেন, তবে তাঁর আবেদন করার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু এই পাসপোর্ট আইন বা বিদেশি আইন থেকে ছাড়টা ঠিক কী? মোদী সরকার ২০১৫ সালে এক আদেশ জারি করে তিন দেশ থেকে আগত ছটা অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, যাঁরা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ধর্মীয় নিপীড়ন বা নিপীড়নের আশঙ্কায় ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের পাসপোর্ট আইন আর বিদেশি আইন থেকে ছাড় দেওয়া হল বলে ঘোষণা করে। সুতরাং ওই ছাড়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ধর্মীয় নিপীড়নের কথা। তাহলে ওই যারা ছাড় পায়নি, সিএএ তাদের জন্য নয়। কারা পেয়েছে এই ছাড় এবং কীভাবে?

২০১৫ সালে উক্ত ঘোষণার পর ২০১৬ সালে মোদী সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনে লোকসভায়। সেই বিলে পাসপোর্ট আইন এবং বিদেশি আইন থেকে ছাড় পাওয়া মানুষদের উপর থেকে অবৈধ অভিবাসীর তকমা সরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তাঁরা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার যোগ্য হন। সেই যোগ্যতা ২০০৩ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার কেড়ে নিয়েছিল, যা আপাতত এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়।

২০১৬ সালের ওই বিল যৌথ সংসদীয় কমিটির নিরীক্ষণের জন্য যায়। যদিও প্রথম মোদী সরকার এই বিল লোকসভায় পাস করালেও রাজ্যসভায় পাস করাতে ব্যর্থ হয়। এর পর ২০১৯ সালের নির্বাচনে জেতার পর দ্বিতীয় মোদী সরকার পুরনো বিলের সামান্য রদবদল করে ২০১৯ সালে পাস করিয়ে নেয়। ২০১৬ সালের বিল যেহেতু যৌথ সংসদীয় কমিটিতে গিয়েছিল, তাই ২০১৯ সালের বিলকে আর যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়নি। কিন্তু যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, ২০১৬ সালের বিল নিয়ে যৌথ সংসদীয় কমিটির আলোচনায় আমরা সিএএ ২০১৯ সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর পেয়ে গেছি। সরকার উত্তরে কোনো কবিতা বলেনি, যে তার ভাবসম্প্রসারণ করে বিভিন্ন মানে হতে পারে। পাতি গদ্যে সরকার সমস্ত কিছু স্পষ্ট করেছে।

 

সরকারি ভাষ্য অনুযায়ীই, এই আইনের ফলে উপকৃত হবেন মাত্র ৩১,৩১৩ জন, যাঁদের নাম সরকারের কাছে ইতিমধ্যেই নথিভুক্ত। স্পষ্টত এই আইন তাঁদের বাইরে বা তাঁদের সন্তানদের ছাড়া অন্য কোনো মানুষের জন্য নয়।

 

ওই রিপোর্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্রতিনিধি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, যারা ভারতে ঢুকে ফরেনার্স রেজিষ্ট্রেশন অফিসে বা সরকারকে ধর্মীয় নিপীড়ন বা তার আশঙ্কায় আইনে উল্লিখিত তিনটে দেশ থেকে পালিয়ে আসার কথা জানিয়েছেন, সরকার তদন্ত করে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা দিয়েছে। সেই সংখ্যাটা মাত্র ৩১,৩১৩। এই আইন শুধু তাদেরই জন্য। ভারতে ঢোকার সময়ে যদি কেউ ধর্মীয় নিপীড়নের আশঙ্কা না প্রকাশ করে থাকেন, তাহলে এখন তা দাবি করা বা প্রমাণ করা মুশকিল। যদি তেমন দাবি কেউ করেন, তাহলে নির্দিষ্টভাবে তার তদন্ত করবে ভারতের গুপ্তচর সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র)। সেই তদন্তের ভিত্তিতে ঠিক হবে তাঁর নাগরিকত্বের দাবি গ্রহণ করা হবে কিনা। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া হয়, ভারতে ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে এক কোটি মানুষ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জানাবে, এবং র তার সমস্ত কাজ ফেলে, প্রতিদিন একটি করে কেসের সমাধান করবে, তাহলেও এক কোটি মানুষের তদন্ত শেষ করতে সময় লাগবে ২৭ হাজার বছরের কিছু বেশি সময়। সুতরাং সরকারি ভাষ্য অনুযায়ীই, এই আইনের ফলে উপকৃত হবেন মাত্র ৩১,৩১৩ জন, যাঁদের নাম সরকারের কাছে ইতিমধ্যেই নথিভুক্ত। স্পষ্টত এই আইন তাঁদের বাইরে বা তাঁদের সন্তানদের ছাড়া অন্য কোনো মানুষের জন্য নয়।

২০২০ সালে জুন মাসে যদি এই নিয়মাবলী প্রকাশিত হত, তাহলে ২০২১ সালের নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলের বাঙালি উদ্বাস্তু বা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা উদ্বাস্তুরা স্পষ্টভাবে বুঝে ফেলতেন, যে এই আইন তাঁদের জন্য নয়। তাঁদের নাগরিকত্বের স্বপ্ন অধরা থেকে গেছে। নিয়মাবলী প্রকাশ না করে সেটা আটকানো গেছিল। আবার তা প্রকাশে মাত্রাতিরিক্ত বিলম্ব হওয়ায় উদ্বাস্তু মতুয়ারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন বিজেপির থেকে। ফলত ২০২৪ সালের নির্বাচনের ঠিক মাসখানেক আগে এই নিয়মাবলী প্রকাশ করা হল। এর ফলাফল কী হল, আদৌ তাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন কিনা, তা বুঝতে বুঝতেই লোকসভা নির্বাচন পেরিয়ে যাবে। যখন বুঝবেন তখন আর কিছু করার থাকবে না।

অন্যদিকে বিরোধীদের সিএএ-কে মুসলমানবিরোধী আইন বলা বা ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব আইন বলে বিরোধিতা করা উদ্বাস্তু মানুষের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে যে এই আইন মুসলমানদের বিরোধী কিন্তু হিন্দুদের পক্ষে। সুতরাং হিন্দু উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত। উপরের আলোচনায় আমরা দেখালাম, এই ভাবনা সঠিক কিনা।

 

ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ১৯৮৬ এবং ২০০৩ সালের সংশোধনী অনুযায়ীই দেশের বহু মানুষ নাগরিকত্বের অধিকার হারিয়েছেন। তাঁদের হয়রান হতে হয়নি বলে সচেতন নন। নমশূদ্র, উদ্বাস্তু বা মতুয়ারা হয়রানির শিকার, তাই তাঁরা নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে নাগরিকত্বের দাবি জানান।

 

কিছু কথা স্পষ্ট করে বোঝা দরকার। প্রথমত, সিএএ ২০১৯-এ কোথাও এনআরসি/এনআরআইসি/এনপিআর-এর কথা নেই। সেকথা আগেকার ভারতের নাগরিকত্ব আইনে উপস্থিত ছিল। ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব আইনে তা যুক্ত করা হয়। সেই নাগরিকত্ব আইনের ১৪এ ধারায় বলা হয় নাগরিক, বেনাগরিক বাছাই করে নাগরিকদের পরিচয়পত্র দিতে হবে। সেই আইনের নিয়মাবলীই হল এনপিআর। সুতরাং সিএএ ২০১৯ বাতিল হলেও এনআরআইসি হতেই পারে। সেই প্রক্রিয়ায় মানুষ নাগরিকত্ব হারাতে পারেন, সিএএ ২০১৯-এর জন্য নয়। যদি না কেউ ১সি-র অধীনে মিথ্যা হলফনামা জমা দিয়ে কুড়ুলে নিজের পা মারেন। সুতরাং এই নতুন আইনের জন্য কেউ নাগরিকত্ব হারাচ্ছেন না। হারানোর সম্ভাবনা থাকছে এনপিআর প্রক্রিয়া শেষ হলে।

দ্বিতীয়ত, এনআরআইসি প্রক্রিয়ায় আইনিভাবে বাঙালি উদ্বাস্তু বা বাঙালরা মূলত আক্রান্ত হলেও, ভুলভ্রান্তির কারণে বা পক্ষপাতিত্বের জন্য মুসলিম, দলিত সহ অন্যান্য অংশের মানুষও আক্রান্ত হবেন ধরে নেওয়া যায়। অর্থাৎ সিএএ কোনোভাবেই অমুসলমানদের রক্ষাকবচ দিচ্ছে না। সুতরাং এনআরআইসি ধর্ম নির্বিশেষে সবার নাগরিকত্ব কাড়তে পারে, অথচ সিএএ কাউকেই রক্ষাকবচ দিচ্ছে না।

তৃতীয়ত, ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ১৯৮৬ এবং ২০০৩ সালের সংশোধনী অনুযায়ীই দেশের বহু মানুষ নাগরিকত্বের অধিকার হারিয়েছেন। তাঁদের হয়রান হতে হয়নি বলে সচেতন নন। নমশূদ্র, উদ্বাস্তু বা মতুয়ারা হয়রানির শিকার, তাই তাঁরা নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে নাগরিকত্বের দাবি জানান।

চতুর্থত, ভারতের নাগরিকত্ব সমস্যার সমাধানে নতুন আইনের দাবি না করে, সিএএ-র বিরোধিতা করার অর্থ হল ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আক্রান্ত উদ্বাস্তুদের বলা, আমরা তোমাদের সমস্যা নিয়ে চিন্তিত নই এবং এটা ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদান। মুসলমানরা নাগরিকত্ব হারাচ্ছে, হিন্দুরা নাগরিকত্ব পাচ্ছে। তাই আমরা এই আইনের বিরোধিতা করছি।

আরো পড়ুন মিঞা মিউজিয়াম বন্ধ: কোথায় শুরু, কোথায় শেষ?

যদিও ঘটনা একেবারে তা নয়। তবুও এই আইন বোঝার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিভ্রান্তি নির্বাচনের আগের বিজেপিকে ধর্মীয় মেরুকরণে সাহায্য করবে বলা বাহুল্য। একদিকে সিএএ-র জন্য নাগরিকত্বের দাবিদার কোটি খানেক মানুষের ভোট গোছানো গেল, অন্যদিকে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের জন্য বিরোধীদের নিপীড়িত হিন্দুদের বিরোধী এবং মুসলিম তোষণকারী তকমা দিয়ে আরেক দফা মেরুকরণ করা গেল। এই ৭৯% হিন্দুর দেশে এই মেরুকরণের ফায়দা কে তুলবে তা নতুন করা বলার দরকার নেই।

অথচ ২০১৪ সাল বা অন্য কোনো ভিত্তি বর্ষ ধরে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসরত সকলকে নাগরিক ঘোষণা এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে আনার দাবিতে যদি জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলা যেত, তবে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে হিন্দু মুসলমান, এদেশি, ওদেশি – সবার নাগরিকত্ব সুনিশ্চিত করা যেত এবং জনতা মোদী সরকারের সামনে একটা ইস্যু হাজির করতে পারত, যাতে বিজেপিকে বলতে হত ‘মানছি না, মানব না।’

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.