খটকাটা তখনই লেগেছিল যখন সহকর্মীরা হোয়াটস্যাপে বার্তা দিলেন, মিজোরামের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনা একদিন পিছিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। না, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কথা শুনে নয়। মিজোরামের এনজিওগুলোর কোঅর্ডিনেশন কমিটির দাবি মেনেই এই সিদ্ধান্ত। তখনই বোঝা গিয়েছিল মিজোরামের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে।

খ্রিস্টানপ্রধান রাজ্য মিজোরামে রবিবার গির্জায় যাওয়ার দিন। তাঁরা এটাকে পবিত্র দিন হিসাবে মানেন। সেদিন কেউ ভোটের গণনাকেন্দ্রে যাবেন না, কাজেই ভোটগণনার দিন বদল হোক। এমন একটা দাবি তোলে এই কোঅর্ডিনেশন কমিটি। এমন একটা অরাজনৈতিক সংগঠনের দাবি এবং নির্বাচন কমিশনের সেই দাবি মেনে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মিজোরামের রাজনীতির ছবিটা। এবারের ভোটে যে জোরাম পিপলস মুভমেন্ট বা জেডপিএম জয়ী হয়েছে এবং কংগ্রেস ও মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের (এমএনএফ) দ্বিমুখী রাজনীতি ভেঙে দিয়েছে, তার পিছনে বড় ভূমিকা নিয়েছে নাগরিক সমাজ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে ৪০ আসনের বিধানসভায় জেডপিএম পেয়েছে ২৭টা আসন, বিদায়ী শাসক দল এমএনএফ পেয়েছে দশটা আসন, কংগ্রেস একটা আর বিজেপি দুটো।

যে রাজ্যে গির্জাগুলোর সংগঠন রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণবিধি ঠিক করে দেয়, নাগরিক সমাজ ঠিক করে দেয় দুয়ারে দুয়ারে রাজনৈতিক প্রচার বা বড় সভা করা চলবে না, করতে হবে স্ট্রিট কর্নার বা পাড়ায় পাড়ায় ছোট সভা, নিজেরাই সব দলের প্রার্থীদের এনে এক মঞ্চে বিতর্কসভার আয়োজন করে, সেই রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের থেকেও যে নাগরিক সমাজ বেশি শক্তিশালী হবে, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে?

১৯৮৭ থেকে কংগ্রেস বা এমএনপিই উত্তর-পূর্বের এই ছোট রাজ্যে (জনসংখ্যা মাত্র ন লাখের কাছাকাছি) দফায় দফায় একে অন্যকে হারিয়ে সরকার চালিয়ে আসছিল। এবার জেডপিএম সেই প্রথা ভেঙে পরিবর্তন আনল মিজোরামের রাজনীতিতে।

জেডপিএমের সঙ্গে নাগরিক সমাজের সম্পর্ক নিবিড়। এটা আসলে ছ-সাতটা সংগঠনের একটা ছাতা। এর মধ্যে রয়েছে মিজোরাম পিপলস কনফারেন্স, জোরাম এক্সোডাস মুভমেন্ট, জোরাম ডিসেন্ট্রালাইজেশন ফ্রন্ট, জোরাম রিফর্মেশন ফ্রন্ট, মিজোরাম পিপলস পার্টি, এনসিপির মত গণসংগঠন ও রাজনৈতিক দল। জেডপিএমের সভাপতি প্রাক্তন পুলিশ কর্তা লালডুহোমা (যিনি একসময় ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলেছেন এবং কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন ১৯৮৪ সালে) নিজে প্রায় ৭৫ ছুঁইছুঁই হলেও তাঁর বিগ্রেড নবীন রক্তে পরিপূর্ণ। শিক্ষিত যুবক, যুবতী এবং নাগরিক সমাজের লোকজন লালডুহোমাকে বরাবর সমর্থন জানিয়ে গেছেন।

ভোটের ফল থেকেই পরিষ্কার, আসলে পরিবর্তন চাইছিলেন মিজোরামের জনগণ। দুর্নীতিমুক্ত এবং কাজের সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েই নির্বাচনে জিতেছে লালডুহোমার দল। নির্বাচনের বেশ কয়েক মাস আগেই নিজেদের পরিকল্পনার কথা রাজ্যবাসীকে জানিয়েছেন তিনি, ঘোষণা করে দিয়েছেন প্রার্থীদের নাম। নাগরিক সমাজ সেই পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়েছে।

এমনিতে মিজোরামে জাতিসত্তার রাজনীতি হয়েছে বরাবর। এবারের নির্বাচনে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা (যিনি একসময় গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন এবং ভারত সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে মূলধারার রাজনীতিতে আসেন) মিজোদের পরিচয়ের রাজনীতিকেই সামনে রেখেছিলেন। সঙ্গে মণিপুর থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা কুকি-জো জনগণের প্রতি সমর্থনও জানিয়েছিলেন। মায়ানমার থেকে উৎখাত হয়ে আসা প্রায় ৪৫ হাজার উদ্বাস্তুকে রক্ষার জন্যও তাঁর দল এবং সরকার কাজ করেছিল। এই কারণে বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) শরিক দল হয়েও ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞা মানতে নারাজ ছিলেন তিনি।

আরো পড়ুন স্রেফ বলপ্রয়োগে মণিপুর সমস্যা আরো বাড়বে

উল্টোদিকে ২০১৮ সালে এমএনএফের কাছে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া কংগ্রেস ভোটারদের বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিল, কোনো আঞ্চলিক দলকে জেতানো মানেই আসলে বিজেপিকে জেতানো। খ্রিস্টান-অধ্যুষিত মিজোরামে আঞ্চলিক দলের সেই জয় কতটা বিপজ্জনক হতে পারে তাই ছিল রাহুল গান্ধীর দলের প্রচারের মূল সুর। তার কারণও ছিল।

কারণ এমএনএফের জোরামথাঙ্গা এনডিএর একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। বিজেপির নর্থ ইস্ট ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সেরও শরিক এমএনএফ। যদিও এবারের মিজোরাম বিধানসভা নির্বাচনে তারা বিজেপির সঙ্গে জোট করেনি। কিন্তু জোরামথাঙ্গার বিজেপির সঙ্গে সখ্য এমনই যে হেরে যাওয়ার পরেও এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে রাজি নন তিনি।

অন্যদিকে, জেডপিএম এক নতুন ধরনের রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয় করেছে। একদিকে তারা কুকি উদ্বাস্তুদের প্রতি সমর্থনের কথা বলেছে, অন্যদিকে জোরামথাঙ্গা সরকারের দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়েছে। তাদের লক্ষ্য রাজ্যের জনগণকে নগদ টাকা দেওয়ার বা আর্থিক সাহায্যের বন্দোবস্ত পাল্টে দেওয়া। কারণ নির্বাচনী প্রচারে বারবার উঠে এসেছে, যে এই ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারি টাকা রাজ্য স্তরে দুর্নীতি চলে।

লালডুহোমার ফ্রন্ট বরং আদা, হলুদ, লঙ্কা ও ঝাঁটা তৈরির গাছের কৃষকদের কৃষিপণ্যের ন্যূনতম দাম বেঁধে দেওয়ার কথা বলেছে। কৃষকদের থেকে সরাসরি পণ্য কেনার কথা ঘোষণা করেছে। কৃষি থেকে রাজ্যের অর্থনীতিকে এবার পর্যটননির্ভর করার কথা উঠে এসেছে নির্বাচনী প্রচারে। কেরালার পরেই মিজোরামের সাক্ষরতার হার সবচেয়ে বেশি। এখানকার শিক্ষিত যুবক, যুবতীদের জন্য কাজ এবং উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো তৈরি করতে তৎপর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন লালডুহোমা।

কিন্তু একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন থেকে যাচ্ছে। সত্যিই কি কংগ্রেসের দাবি ঠিক প্রমাণ করে লালডুহোমাও তাঁর পূর্বসূরীর মত বিজেপির হাত ধরবেন? গেরুয়া শিবিরের খুব ইচ্ছা ছিল ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হোক। তেমন হলে তাঁরা ছড়ি ঘোরাতে পারতেন সরকার গঠন করার ক্ষেত্রে। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে গেছে। বিজেপি মাত্র ৫% ভোট পেয়ে দুটো আসন জিতলেও (কংগ্রেস যেখানে ২০% ভোট পেয়ে একটা আসন পেয়েছে) লালডুহোমার জেডপিএম প্রায় ৩৮% ভোট পেয়ে ২৭টা আসন জিতেছে (বিদায়ী শাসক দল এমএনএফ পেয়েছে ৩৫% ভোট এবং দশটা আসন)।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে জেডপিএমের সরকার চালাতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যেহেতু রাজ্যের রাজস্ব আদায় কম, তাই কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সাহায্যের উপর ভরসা করতে হয় উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যকে। কেন্দ্রের শাসক দলকে চটিয়ে, তাদের সরকারে না নিয়ে বা তাদের শরিক না হয়ে কি লালডুহোমা চলতে পারবেন?

ইতিমধ্যেই তিনি ঘোষণা করেছেন যে জোরামথাঙ্গা সরকারের সব দুর্নীতির তদন্ত নতুন সরকার করবে। এমনকী সিবিআইয়ের হাতে তদন্তভার তুলে দিতেও তাঁরা পিছপা হবেন না। কিন্তু নাগরিক সমাজের বড় সমর্থন পেলেও, টাকা বড় হয়ে উঠবে না তো লালডুহোমার কাছে? কেন্দ্রের শাসক দলের ঘনিষ্ঠ হওয়ার যে প্রবণতা উত্তর-পূর্ব ভারতের ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে, তার পরিবর্তন কি ঘটাতে পারবেন লালডুহোমা? কড়া নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.