২০১৮ সালে মধ্যপ্রদেশে ক্ষমতায় এসেছিল কংগ্রেস। যদিও কিছুদিন পরেই কংগ্রেসের বিধায়কদের ভাঙিয়ে ক্ষমতা দখল করে বিজেপি। ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজস্থান এবং ছত্তিসগড়ের মতোই মধ্যপ্রদেশেও বিজেপি লড়েছিল মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার কোনো মুখ ছাড়াই। অন্যদিকে কংগ্রেসের লড়াই ছিল মূলত কমলনাথকে কেন্দ্র করে। বাস্তবে দেখা গেল, বিজেপির বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই পারলেন না এই প্রবীণ কংগ্রেস নেতা। কেন হারল কংগ্রেস? তলিয়ে দেখা যাক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কমলনাথের একাই ছড়ি ঘোরানোর ব্যর্থতা

মধ্যপ্রদেশ নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রধান মুখ ছিলেন কমলনাথ। অনেকটা রাজস্থানের অশোক গেহলতের মতই কমলনাথেরও ছিল ‘ওয়ান ম্যান শো’। নির্বাচনের ফলাফল বলছে, তাঁর শো মুখ থুবড়ে পড়েছে। কর্ণাটক বা হিমাচল প্রদেশে কংগ্রেস যেমন স্থানীয় ইস্যু নিয়ে প্রচারে ঝড় তুলতে পেরেছিল, মধ্যপ্রদেশে কমলনাথ তা পারেননি। বস্তুত, দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হলেও কমলনাথের না আছে কোনো শক্তিশালী জাতভিত্তিক ভোট ব্যাঙ্ক, না আছে কোনো বড় অঞ্চলের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। ছিন্দওয়াড়া তাঁর খাসতালুক। এখান থেকেই হনুমানভক্ত কমলনাথ বহুবার সাংসদ হয়েছেন। কিন্তু তার বাইরে তাঁর প্রভাব সীমিত।

নির্বাচনী প্রচারেও অন্য নেতাদের জায়গা দেননি কমলনাথ। এমনকি কর্ণাটকে কংগ্রেসের জয়ে যিনি স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তেলেঙ্গানাতেও কংগ্রেসের প্রধান স্ট্র্যাটেজিস্ট ছিলেন, সেই সুনীল কানুগোলুর উপরেও ভরসা করেননি কমলনাথ। কংগ্রেস জিতলে সব কৃতিত্ব যেমন তাঁর হত, পরাজয়ের প্রধান দায়ও কমলনাথেরই। রাহুল গান্ধী নয়, এই হার মূলত কমলনাথের

প্রতিযোগিতামূলক হিন্দুত্বের কৌশল ব্যুমেরাং

বিজেপিকে হারাতে রীতিমত উচ্চকিত হিন্দুত্বের পথে হেঁটেছিল কংগ্রেস। অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির ঘটনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন কমলনাথ। নিজেকে বার বার বজরংবলীর ভক্ত হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। রাহুল যেভাবে বিজেপির দুর্নীতি, আদানির মত শিল্পপতিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলছেন, কমলনাথ সে পথে হাঁটেননি। তাঁর তাস ছিল নরম হিন্দুত্ব।

বস্তুত এই রাজ্যে কংগ্রেস যতখানি খোলাখুলি হিন্দুত্বের পথে হেঁটেছে, তা কার্যত নজিরবিহীন। নির্বাচনের কয়েকমাস আগে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরং সেনার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এই বজরং সেনা আগে বিজেপির হয়ে প্রচার করেছে। পুরোহিতদের জন্যও উদারহস্ত ছিল কংগ্রেস। কমলনাথ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলন তাঁদের জন্য জমি বরাদ্দ করা হবে। মধ্যপ্রদেশে রাজ্য কংগ্রেস তৈরি করেছিল ‘মন্দির পূজারী প্রকোষ্ঠ’, যার উদ্দেশ্য মন্দিরগুলির স্বাধিকার নিশ্চিত করা। আসলে কংগ্রেস পূজারী গোষ্ঠীর মত বিজেপির সাবেকি ভোটব্যাঙ্ক দখল করতে চেয়েছিল।

বলা বাহুল্য, কংগ্রেসের এই বিজেপির চেয়েও বেশি হিন্দু হয়ে ওঠার প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। দেওয়ানের মত জায়গায়, যেখানে কংগ্রেস পূজারীদের পাশে পেতে সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছিল, সেখানে বিজেপি জিতেছে ২৫ হাজারেরও বেশি ভোটে।

আরো পড়ুন ২০২৪: আসনভিত্তিক পরিকল্পনা করুক কংগ্রেস

জাতপাতের সমীকরণেও কংগ্রেসের সুবিধা হয়নি। রাহুল বর্ণশুমারির কথা বললেও মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের প্রধান নেতা কমলনাথ উচ্চবর্ণ, দিগ্বিজয় সিংও তাই। অন্যদিকে শিবরাজ ওবিসি।

জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার প্রস্থান

জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার দলত্যাগ নিঃসন্দেহে কংগ্রেসের ক্ষতি করেছে। গোয়ালিয়র-চম্বল অঞ্চল মধ্যপ্রদেশের নির্বাচনী সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওই এলাকায় কংগ্রেস একেবারেই সুবিধা করতে পারেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ওই অঞ্চলের ৩৪টি আসনের মধ্যে ২৬টি কংগ্রেস দখল করেছিল। তখন সিন্ধিয়া কংগ্রেসে ছিলেন। ২০২০ সালে ২২ জন বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। নির্বাচনের ফল প্রমাণ করল, এই ধাক্কা হাত শিবির সামলে উঠতে পারেনি। কেবল নিজের খাসতালুকই নয়, রাজ্যের অন্যত্রও প্রভাব রয়েছে জোতিরাদিত্যের।

মহিলা ভোট

ভোটগ্রহণের পরে শিবরাজ একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মিডিয়া বলছে ‘কাঁটে কি টক্কর’। মধ্যপ্রদেশের মেয়েরা সব কাঁটা উপড়ে ফেলবে।

ভোটের মাত্র ছমাস আগে লাডলী বেহনা প্রকল্প চালু করেছিল বিজেপি সরকার। বছরে আড়াই লক্ষ টাকার কম আয়ের পরিবারের ২১ থেকে ৬০ বছর বয়সী মহিলাদের মাসে ১,২৫০ টাকা দেওয়ার প্রকল্প নিঃসন্দেহে অনেকখানি অক্সিজেন জুগিয়েছে বিজেপিকে। মধ্যপ্রদেশের মোট ২.৩ কোটি মহিলা ভোটারের মধ্যে ১.৩ কোটি এই প্রকল্পে উপকৃত। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি ঘোষণা করেছিল, তারা সরকারে এলে মহিলাদের মাসে ১,৫০০ টাকা করে দেবে। সঙ্গে সঙ্গে শিবরাজ সিং চৌহান ঘোষণা করেন, তিনি ফের ক্ষমতায় এলেন দেবেন মাসে তিন হাজার টাকা। বরং কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবে। সেই প্রচার যে সফল, ভোটের ফলই তার প্রমাণ।

২০১৮ সালে মধ্যপ্রদেশে ৭৪% মহিলা ভোট দিয়েছিলেন। এবার ভোট দিয়েছেন ৭৬%। এমন ৩৪টি আসন আছে যেখানে মহিলাদের ভোটদানের হার পুরুষদের চেয়ে বেশি। রাজ্যের পূর্বাংশে সিধি, রেওয়া, সাতনা, শাদোলের একাংশ; সিংরাউলি, আনুপ্পুর, বালাঘাটের মত জেলায় মহিলা ভোটদাতার সংখ্যা ছিল পুরুষদের চেয়ে বেশি। গোটা অঞ্চলে বিজেপির জয়জয়কার।

মোদী ও রামমন্দির

মধ্যপ্রদেশে বিজেপি লড়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখকে সামনে রেখে। শিবরাজের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ছিল, দুর্নীতির অভিযোগও ছিল। কিন্তু মোদীর জনপ্রিয়তার কাছে সেসব ম্লান হয়ে গিয়েছে। মোদী ১৪টি জনসভা করেছেন মধ্যপ্রদেশে। স্লোগান ছিল – মোদীর মনে এমপি, এমপির মনে মোদী। সেই স্লোগান ভোটারদের প্রভাবিত করেছে।

অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ এবং উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে হিন্দু আবেগও উস্কে দিয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে কংগ্রেসের নরম হিন্দুত্ব তাদের নিজেদের ভোটারদেরই বিভ্রান্ত করেছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.