লাদাখের রাজধানী লে। সাড়ে তিন হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই শহরে তাপমাত্রা এখনও শূন্যের নিচে। সেই শীতের মধ্যেই এই অঞ্চলের মূলত পাহাড়ি উপজাতির একদল মানুষ একমাসের উপর অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন দুটি বিষয়ে সরকারি দৃষ্টি আকর্ষণ করার তাগিদে। এই দুটি বিষয় হল – জাতীয় নিরাপত্তা এবং সরকারি প্রতিশ্রুতি রক্ষা।

ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে লোকসভা নির্বাচনের প্রচার। লাদাখে নির্বাচন একেবারে প্রথম দফাতেই, অর্থাৎ ১৯ এপ্রিল। এই মুহূর্তে ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি সম্ভবত টানা তৃতীয়বারের জন্য নির্বাচিত হতে চলেছে। বিজেপির নির্বাচনী স্লোগান ‘মোদীর গ্যারান্টি মানে সব প্রতিশ্রুতিই পালন করা হবে।’ অন্যদিকে বিজেপির কথা দিয়ে কথা না রাখা নিয়েই প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন লে শহরের আবালবৃদ্ধবণিতা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচন এবং ২০২০ সালে লাদাখের স্থানীয় নির্বাচনের আগে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী লাদাখকে স্বায়ত্তশাসিত উপজাতি অধ্যুষিত এলাকার মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। এতে করে এই অঞ্চলের জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর স্থানীয় উপজাতির অধিকার প্রাধান্য পেতে পারত। কিন্তু এরপর ২০১৯ সালের অগাস্ট মাসে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করা হয় এবং এবছরের ৪ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লাদাখের এক প্রতিনিধি দলকে জানান যে ষষ্ঠ তফসিলের পরিবর্তে অন্য কিছু ব্যবস্থার কথা লাদাখের জন্য বিবেচনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার।

কেন্দ্রের এই প্রতারণামূলক আচরণের বিরুদ্ধে ২১ দিনের অনশন আন্দোলনে বসেন লাদাখের বিখ্যাত শিক্ষা ও পরিবেশকর্মী, ম্যাগসাসে পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুক। তিনি অনশন ভাঙার পরপরই স্থানীয় মহিলারা শুরু করেন এপ্রিলের ৬ তারিখ পর্যন্ত আরও দশদিনের লাগাতার অনশন। প্রতিদিন ৩০০-৪০০ মানুষ বসে থাকছেন প্রতিবাদ মঞ্চ ঘিরে। রাত্রিবেলা তাপমাত্রা যখন নেমে যায় শূন্যের চেয়ে ১২ ডিগ্রি নিচ পর্যন্ত, তখনো তাঁরা প্রতিবাদ মঞ্চ ছেড়ে নড়ছেন না।

বরং আন্দোলন আরও জোরালো হচ্ছে। আজ চীন সীমান্তবর্তী চ্যাংথাং অঞ্চলের উদ্দেশে একটি মিছিলের পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। ভারতীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলির অনিয়ন্ত্রিত উদ্যোগ এবং চৈনিক আগ্রাসনের সাঁড়াশি চাপে লাদাখ কীভাবে একরের পর একর পশুচারণভূমি হারাচ্ছে সেই বিষয়ে দেশের বৃহত্তর জনগণ ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই এই মিছিলের উদ্দেশ্য। আন্দোলনকারীদের আশা এর ফলে চাপ বাড়বে মোদী সরকারের উপর। এদিকে সরকার লাদাখে ১৪৪ ধারা জারি করেছে এই মিছিল আটকাতে। অগত্যা মিছিল প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় শনিবার।

চৈনিক আগ্রাসন

পশ্চিমে পাকিস্তান এবং উত্তর ও পূর্বে চীন সীমান্ত থাকায় লাদাখ জায়গাটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। চ্যাংথাং ভারতের উচ্চতম মালভূমি অঞ্চল এবং অনেকটাই সীমান্তবর্তী তিব্বতের মত। জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি স্পর্শকাতর, কারণ বিজেপি ক্রমাগত কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলকে এ বিষয়ে দোষ দিয়েছে এবং নরেন্দ্র মোদীর আমলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়ে ওঠার দাবি করে এসেছে। চ্যাংথাং অঞ্চলের চ্যাংপা উপজাতির মানুষ জগদ্বিখ্যাত কাশ্মীরি পশম উৎপাদন করে থাকেন। তিন হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এই উপজাতির মানুষ পশুপালন ও যাযাবর বৃত্তি অবলম্বন করে রয়েছেন।

হাজার হাজার একর পশুচারণক্ষেত্র দখল হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় পশুপালকরা তাঁদের ছাগল ও চমরি গাই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন ওয়াংচুক। একটি ভিডিও মেসেজে ওয়াংচুক জানিয়েছেন যে সরকার তাঁদের চ্যাংথাং ও চীন সীমান্তে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা। তিনি বলেন ‘সরকারের যদি কোনো গোপন অভিসন্ধি না থাকে তাহলে তারা আমাদের আটকাবে না। আর যদি আমাদের আটকানো হয়, তাহলে বুঝতে হবে সরকার কিছু আড়াল করতে চাইছে।’

চীনের সঙ্গে প্রকৌশলগত দুর্বলতা ও বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে আঁতাতের বিষয় দুটি নিয়ে বিজেপি সরকারকে বিঁধেছে মূল বিরোধী শক্তি কংগ্রেস। দলের প্রচারমূলক ভিডিও বার্তায় রাহুল গান্ধী বলেছেন ‘লাদাখকে তার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। কেন জানেন? কারণ সেখানে রয়েছে হাজার কোটি টাকার সৌরশক্তি প্রকল্পের সম্ভাবনা, কাজেই ভারতের বৃহৎ বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলির নজর রয়েছে সেখানে।’ চৈনিক আগ্রাসনের বিষয়টি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই ভিডিও বার্তায়।

কথা না রাখা

২০১৯ সালের অগাস্ট পর্যন্ত লাদাখ জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। অগাস্টে অর্থাৎ কেন্দ্রে দ্বিতীয়বারের জন্য মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার তিনমাস পর, জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দিয়ে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ – এই দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরী করা হয়। এর মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরের একটি স্বতন্ত্র আইনসভা আছে কিন্তু লাদাখ সে সুবিধা পাচ্ছে না।

লাদাখের ৪৬.৪% অধিবাসী মুসলমান ধর্মাবলম্বী, ৩৯.৬% বৌদ্ধ এবং ১২.১% হিন্দু ধর্মাবলম্বী। লাদাখের বৌদ্ধ সম্প্রদায়, যাঁদের বড় অংশ লে জেলায় বসবাস করেন, প্রথম দিকে রাজ্য ভেঙে যাওয়া এবং লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে মুসলমান-প্রধান কার্গিল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। কিন্তু গত কয়েকমাসে লে অঞ্চলের বাসিন্দাদের মনোভাবও ক্রমশ পাল্টেছে। কেডিএ নেতা সাজ্জাদ কার্গিলির মতে ‘লে অঞ্চলের জনগণও এখন বুঝতে পেরেছেন যে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদার কারণে যেটুকু যা অধিকার তাঁরা পেতেন, এখন সেটুকুও গিয়েছে।’ ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার প্রতিনিধিকে তিনি জানিয়েছেন ‘লে এবং কার্গিলের জনতা একত্রে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে নিজস্ব আইনসভা সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।… ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় থাকলে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো জমি বা প্রাকৃতিক সম্পদ অধিগ্রহণ করা যাবে না।’

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় তফসিলি উপজাতি কমিশন (ন্যাশনাল কমিশন ফর শিডিউলড ট্রাইবস, বা এনসিএসটি) মোদী সরকারকে লাদাখকে ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেয়। বিজেপিও সেইসময় এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২০২০ সালের অক্টোবরেও বিজেপির লাদাখ শাখা ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে সম্পূর্ণ সাংবিধানিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাদাখে উন্নয়নশীল কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকেই একটু একটু করে বিজেপি তার স্পষ্ট অবস্থান থেকে সরতে শুরু করে। ২০২১ সালে স্থানীয় বিজেপি সাংসদ যামিয়াং সেরিং নামগিয়াল ষষ্ঠ তফসিলের অনুসরণে লাদাখে সাংবিধানিক নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করেন মাত্র। এবছর ৪ মার্চের বৈঠকে অমিত শাহ জানান কী উপায়ে লাদাখকে সাংবিধানিক নিরাপত্তা দেওয়া যায় তা একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ষষ্ঠ তফসিল বা পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার কোনো উল্লেখ তাঁর কথায় ছিল না। এই পরিবর্তিত অবস্থানের পিছনে কোনো কারণও তিনি ব্যাখ্যা করেননি বলে জানা যায়।

জলবায়ু পরিবর্তন

লাদাখের মানুষের ষষ্ঠ তফসিলের দাবির পিছনে একটি অন্যতম কারণ হল কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নের মডেল। ওয়াংচুকের মতে এই মডেল হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের একেবারেই অনুপযোগী। ২০২৩ সালে ভারতের সৌরশক্তি পরিষদ (সোলার এনার্জি কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া বা এসইসিআই) লাদাখে ১৩ গিগাওয়াটের একটি পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনকেন্দ্র তৈরির উদ্দেশ্যে সেখানকার মাটি পরীক্ষার জন্য বরাত দেয়। অন্তত ২০,০০০ একর জমি এজন্য চিহ্নিত করা হয়। সরকারি মতে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা নেই বলা হলেও, এবিএল এবং কেডিএ, উভয়ই জানাচ্ছে যে লাদাখের স্থানীয় যাযাবর উপজাতিগুলি কয়েক শতক ধরে এই সব জমিতে পশু চরিয়ে আসছে। ওই এলাকায় বেশকিছু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকল্পনাও রয়েছে।

আরো পড়ুন নদীর উপর অত্যাচারের ফলে বন্যা, খরা বুকে বাঁচছে কৃষক

পালজোর এবং কার্গিলি, উভয়েই বলছেন যে লাদাখের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর সরকারি মদতপুষ্ট আগ্রাসনই স্থানীয় সব সম্প্রদায়গুলিকে একজোট হতে বাধ্য করেছে। ২০২৩ সালে লাদাখে শিল্প গড়ার জন্য জমি বরাদ্দ করার লক্ষ্যে যে নীতি আনা হয়েছে, এবিএল এবং কেডিএ একজোট হয়ে তারও বিরোধিতা করেছে। এই নীতির মাধ্যমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এড়িয়েই জমি অধিগ্রহণ সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা ঝুঁকি লাদাখে এমনিতেই রয়েছে। যেমন হিমবাহ গলে যাওয়া বা বিভিন্ন ঋতুতে বৃষ্টিপাতের বন্টন পাল্টে যাওয়া। পর্বতের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ার কারণে লাদাখে ইতিমধ্যেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণেই এখানকার স্থানীয় জনগণের মতামতকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

পরিবেশ আন্দোলন ভারতে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে কোনোদিনই তেমন সক্ষম নয়। কিন্তু লাদাখের সমস্যা সত্যিই কেবলমাত্র শাসনব্যবস্থার সমস্যা নয়। প্রথমত, ‘জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের শিশুরা আজ আর কোনও ইতিহাসের বোঝা মাথায় নিয়ে জন্মায় না’ এবং ‘স্বপ্নভঙ্গ, নৈরাশ্য ও হতাশার পরিবর্তে এখানে এসেছে উন্নয়ন, গণতন্ত্র আর মর্যাদা’ – এসব বলে দেশবাসীর কানের কাছে ক্রমাগত যে ঢাক পিটিয়ে চলেছে মোদী সরকার, তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে লাদাখবাসীর এই সম্মিলিত প্রতিবাদ আন্দোলন। দ্বিতীয়ত, এই আন্দোলন আবার নতুন করে সামনে এনেছে চৈনিক আগ্রাসনের বিষয়টি, যা নিয়ে আলোচনাও মোদী সরকারের বিলকুল না-পসন্দ। তাই নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বে এই আন্দোলন বিশেষ মনোযোগ দাবি করে।

দ্য ডিপ্লোম্যাট পত্রিকায় প্রকাশিত মূল প্রতিবেদন থেকে লেখকের অনুমতিক্রমে ভাষান্তরিত। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.