সিকিমের বাঁধ ভাঙা জলে ভাসল উত্তরবঙ্গের একাংশ। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (ডিভিসি) জল ছাড়ায় জলমগ্ন দক্ষিণবঙ্গের বেশ কয়েকটা জেলা। এসব খবর অচেনা নয়। যেমন চেনা সুন্দরবনে ষাঁড়াষাঁড়ির বানে নদী পাড়ের বাঁধ ভাঙার খবর। ঘটনা ফিরে ফিরে আসে। কয়েকদিন এসব নিয়ে রাজনীতির আসর জমে ওঠে, চলে পারস্পরিক দোষারোপের পালা। তারপর সব চলে আগের নিয়মেই – বড় বড় বাঁধ নির্মাণসহ নদীর উপর নানা অত্যাচার আর পরিণামে প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশের বিপর্যয় থেকেও শিক্ষা নেয়নি তথাকথিত উন্নয়নের ঠিকাদাররা। সিকিম, দার্জিলিংয়ে একের পর এক নদীবাঁধ তৈরি, রেলপথ, নির্মাণ কাজে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন অনেকে। শিলিগুড়িতে এমনই কয়েকটা পরিবেশ সংগঠনের পক্ষ থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে অভিযোগ জানানো হয়েছে, এই বিপর্যয় মানুষের তৈরি। সৃষ্টিকর্তারা যে সে মানুষ নন, রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। বছরের পর বছর ডিভিসি বা ফরাক্কা ব্যারেজের ছাড়া জলে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভেসে যায়। মানুষ মারা যান, বাস্তুচ্যুত হন। ফসল নষ্টে কৃষকের ক্ষতি বাড়ে। পাল্লা দিয়ে বাড়ে জিনিসের দাম।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে আবার তারই পুনরাবৃত্তি হল। যথারীতি কন্ট্রোল রুম খোলা নিয়ে মন্ত্রীমশাইদের বিবৃতি, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর দৌড়ঝাঁপ – সবই চলছে নিয়ম মেনে। রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই। রোগ হলে চিকিৎসা নিয়ে প্রচারের শেষ নেই। এবছর আগেই উত্তরবঙ্গের একাংশে বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়ে গেছে। উত্তরবঙ্গে যখন বন্যা, তখন অনাবৃষ্টির শিকার হয়েছিল দক্ষিণবঙ্গ। বর্ষার মরসুমে জলাভাবের প্রভাব পড়েছে চাষে। এখন আবার অনেক জায়গাতেই ফসল জলের তলায়। এত উন্নয়নের গপ্পের পরেও কৃষি এখনো প্রকৃতিনির্ভর। সেই উন্নয়নের ঠ্যালায় বিপন্ন পরিবেশ।

আরো পড়ুন যোশীমঠ বিপর্যয় কেবল পরিবেশ সংকট নয়

বন্যা হলে তবু সেটা চোখে পড়ে, উন্নয়নে মোহাবিষ্ট নাগরিক সমাজ নড়েচড়ে বসে। ত্রাণ দিয়ে কেউ কেউ সামাজিক কর্তব্য পালন করেন, আত্মশ্লাঘাও কম হয় না। নদীবাঁধ, নদী সংস্কার – এসব নিয়ে কিছুদিন আলোচনা হয়। আবার সবাই সব ভুলে যান।

কিন্তু অনাবৃষ্টিতে চাষের ক্ষতি বোঝেন একমাত্র কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষ। বাজারে দাম বাড়লে আঁচটা আমাদের গায়ে লাগে। নীতি নির্ধারক আর অর্থনীতির পণ্ডিতরা ফসলের উৎপাদন কমায় মুদ্রাস্ফীতির হার কত হবে, জিডিপিতে তার কী প্রভাব পড়বে তা নিয়ে অঙ্ক কষেন। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, দুর্যোগে চাষের ক্ষতি বেড়েই চলে। প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় কৃষি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনাই সরকারের নেই।

২০২১ সালে এই অক্টোবর মাসেই বন্যার কবলে পড়েছিল নিম্ন দামোদর অববাহিকার বেশ কয়েকটা জেলা। তার মাস দুই-তিন আগেও একই ঘটনা ঘটেছিল। সেবছর নিম্ন দামোদর উপত্যকার অনেক অঞ্চলে দুবারেরও বেশি বন্যা হয়েছিল। তারপর ডিসেম্বর মাসে জাওয়াদের জন্য অতিবৃষ্টি। বহু কৃষকের একাধিক ফসল নষ্ট হয়েছিল। বেশ কয়েকজন কৃষক দেনার দায়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরের দুটো বছর বর্ষার সময়ে বৃষ্টি কম হয়েছে। অতিবৃষ্টি আর অনাবৃষ্টির জাঁতাকলে নাজেহাল কৃষক। ভেঙে পড়ছে কৃষি অর্থনীতি।

বন্যা
নদীই। অনাবৃষ্টির কালে। ছবি লেখকের
বন্যা
সেই নদী এখন। ছবি লেখকের

চলতি বছরে দক্ষিণবঙ্গে বর্ষাকালে ঠিকমত বৃষ্টি না হওয়ায় সেচের খরচ বেড়েছে অনেক। ধান রোয়ার সময়ে পর্যাপ্ত জল প্রকৃতি দেয়নি। তাই ভূ-গর্ভস্থ জলের উপরেই ভরসা। বেড়েছে সেচের খরচ, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আনুষঙ্গিক খরচ। ফসল ঠিক সময়ে চাই, ফলন কম হলেও ক্ষতি। তাই ব্যবহার করো আরও রাসায়নিক সার। আবহাওয়া বিরূপ হলে বাড়বে পোকা, তার জন্য চাই আরও কীটনাশক। অনেক কোম্পানি একেই ওষুধ বলে চালায়। ওষুধ বলে চালানো এসব বিষ শুধু পোকাই মারে না, ক্ষতি করে মানুষ সমেত তামাম জীবজগতের স্বাস্থ্যের।

চাষের খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতিও বাড়ছে। সেচের জন্য মাটির তলা থেকে যত জল নেওয়া হবে, তত জলস্তর নিচে নামবে। অবশ্যম্ভাবী ফল আরও জলের সঙ্কট এবং জলদূষণ। তার উপরে এখন অনেক কৃষকের নদীর বা বৃষ্টির জলে ধান গাছ নষ্ট হওয়া বা ধানের ফলন কমার আশঙ্কা।

পাটের ক্ষেত্রেও এবছর একই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। পাট পচানোর প্রয়োজনীয় জল ছিল না। পাটের মান খারাপ হওয়ার অজুহাতে খোলা বাজারে দাম কমে গিয়েছে। এবছর পাট চাষে খরচ হয়েছিল বিঘে প্রতি গড়ে ১৭-১৮ হাজার টাকা। গড়ে বিঘে প্রতি ফলন চার থেকে সাড়ে চার কুইন্টাল ধরলে, কুইন্টাল প্রতি খরচ ৪,৫০০ টাকার কাছাকাছি। অনেকের ফলন হয়েছে বিঘে প্রতি চার কুইন্টালের কাছাকাছি। পাটের দাম কৃষকরা পেয়েছেন কুইন্টালে ৪,০০০-৪,৫০০ টাকা। অনেকে তারও কম। ভাগ, চুক্তি বা অন্যের জমি নির্দিষ্ট মেয়াদে ভাড়া নিয়ে চাষ করা কৃষকের খরচ তার চেয়ে বেশি। এর উপর আছে ধারের সুদ। প্রকৃত কৃষকের জন্য সরকারি কৃষি ঋণের সুযোগ আর কতটুকু? জমির নথি না থাকলে হবে না। তাই চড়া সুদে মাইক্রোফিন্যান্স কোম্পানি বা মহাজনী ঋণই ভরসা।

সরকার ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আছে। সেই দামে জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার পাট কেনার কথা। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ এই সংস্থা পাট কেনা প্রায় তুলেই দিয়েছে। বেশির ভাগ চাষি পাট বেচেন ব্যবসায়ীদের কাছে, দাম নিয়ন্ত্রিত হয় বাজার অর্থনীতির নিয়মে। এতদিন পর গত ৫ অক্টোবর জুট কমিশনার কাঁচা পাটের ন্যূনতম দাম কুইন্টাল প্রতি ৫,০৫০ টাকা ঘোষণা করেছে। যখন অনেক পাটচাষি লোকসানে কাঁচা পাট বিক্রি করলেন, তখন এদের টনক নড়ল না। এখন এই ন্যূনতম দামে সেই ব্যবাসায়ীদেরই সুবিধা হবে, যাঁরা অনেক কম দামে কৃষকদের থেকে পাট কিনেছেন। যে কৃষকরা এখনো পাট বিক্রি করেননি, তাঁদের কতজন এই দামে বাস্তবে বিক্রি করতে পারবেন? এবছর এমনভাবেই আলুর ন্যূনতম মূল্য অনেক পরে ঘোষণা করেছিল রাজ্য সরকার। ফসল কেনার দায় ছেড়ে দিয়েছিল ব্যবসায়ীদের মহানুভবতার ওপর। সরকারপক্ষের নীতিগুলো এমনই ভুলে ভরা। ভুল করে সব জেনে। লাভের মুখ তো দূরের কথা, এ মরসুমে অধিকাংশেরই পাট চাষে ক্ষতি হয়েছে। কৃষক জলবায়ু এবং বাজারে ফসলের দামের ওঠানামার উপর নির্ভরশীল।

ধান রুইতে যখন কৃষকের নাভিশ্বাস উঠছিল, তখনই হঠাৎ করে বাজারে দাম বেড়ে গেল আনাজের। আলু, পেঁয়াজ, লঙ্কা থেকে শুরু করে সবেরই দাম হয়েছিল আকাশছোঁয়া। অথচ কৃষকের বিশেষ লাভ হয়নি। কেন দাম অমনভাবে লাফ দিয়ে বেড়েছিল, আবার আস্তে আস্তে অনেকটা কমল, তার হাল হকিকত না জানেন কৃষক, না খদ্দের। কৃত্রিম অভাব সৃষ্টির ক্ষমতাটা এখন অনেকটাই বড় বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। শপিং মলে, অনলাইনে আনাজ বিক্রি, ব্র‍্যান্ডেড রেস্টুরেন্টের ঝাঁ চকচকে উন্নয়নে যা আড়াল হয়ে যায়।

চলতি দুর্যোগের ফলে আবার আনাজের দাম বাড়তে পারে। বড়সড় বন্যা হওয়ার হাত থেকে হয়ত বা এবারের মত রক্ষা পাওয়া গেল, নতুন করে অতিবৃষ্টি না হলে আশঙ্কা কম। তবুও নদী ও বৃষ্টির জলে ফসলের ক্ষতি হল। নিচু জমির ধানের ক্ষতির আশঙ্কা, নষ্ট হয়েছে আনাজও। এই ক্ষতির ফল ভুগতে হবে কৃষককে। দাম বাড়ার ফল ভুগবেন ক্রেতা, ছোট ব্যবসায়ীরা। কিন্তু কৃষিজাত দ্রব্যের ব্যবসায় নামা বড় বড় কোম্পানির ক্ষতি নেই। বরং দুর্দিনে তারা কৃষিক্ষেত্রে আরও জাঁকিয়ে বসবে। কৃষকের সর্বনাশে ওদের পৌষ মাস। আর পৌষ মাস ঋণের কারবারীদের।

দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ, তেমন হলে কৃষি ঋণ মকুবের রাজনৈতিক দাবি ওঠে। কখনো কখনো সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে এসবের ঘোষণাও করে। কিন্তু সেখানেও জমির নথির খেলায় অনেক প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের উপকার হয় না। সরকারি কৃষি ঋণ যিনি পান না, ঋণ মকুবে তাঁর কিছু যায় আসে না। আবার ক্ষতিপূরণের জন্য চাই জমির দাগ, খতিয়ান নম্বর। তার জন্য নির্ভর করতে হয় জমির মালিক এবং পঞ্চায়েতের মাতব্বরদের উপর। কে কার জমিতে চাষ করেছেন, তা এঁরাই ঠিক করে দেবেন। বর্গায় নাম বা জমির পাট্টা না থাকলে অন্যের জমিতে ভাগ, চুক্তি বা নির্দিষ্ট সময় মেয়াদে চাষ করা কিংবা খাস জমির কৃষক কোনো সুযোগই পান না। আবার পঞ্চায়েতের শাসক দলের মাতব্বর আর তাদের ঘনিষ্ঠরা অনেক সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও ক্ষতিপূরণ পেয়ে যান।

ঋণ মকুবই হোক বা ক্ষতিপূরণ – কারা ক্ষতিগ্রস্ত তা নির্ধারণের সরকারি নিয়মটাও ভুল। একটা গ্রাম বা পঞ্চায়েতের কতটা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত সেই মাপকাঠিতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঠিক করে। হয়ত একটা গ্রামের ৬০% ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে ঠিক করল। কিন্তু ২০% হলে দেবে না। এখন ২০% ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামটার মধ্যে যাদের ক্ষতি হল, তাঁরা ক্ষতিপূরণ পাবেন না। আবার অন্য গ্রামে কারোর ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতি না হলেও ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। অনেক সময়ে শাসক দল ও পঞ্চায়েতের মাতব্বররাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসব ঠিক করে দেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ থেকে ক্ষতিপূরণ – সবেতেই এইসব মাতব্বরেরও পৌষ মাস।

ফসল নষ্ট হলে, উৎপাদন কমলে তবেই সরকারের কাছে সেটা ক্ষতি। তার হিসাব হয় আগের মরসুমের ফসল উৎপাদনের মাপকাঠিতে। বিমা কোম্পানি বিগত কয়েক বছরের ফসল উৎপাদনের ভিত্তিতে ‘ক্রপ হেলথ ফ্যাক্টর’ নির্ধারণ করে। সেই নিরীখে ক্ষতির পরিমাপ হয়। এখন জলবায়ু পরিবর্তনে ঘনঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে পারে। সেক্ষেত্রে ফসল উৎপাদন কম হলে, সেটাই একসময় স্বাভাবিক বলে স্বীকৃতি পেয়ে যাবে। তখন ক্ষতির কথা সরকার স্বীকারও করবে না।

ক্ষতির আর্থিক মূল্য নির্ধারণে চাষের খরচের একটা হিসাব অনুমান করে নেওয়া হয়। সেই অনুমানের সঙ্গে বাস্তবের ফারাক অনেকটাই। যেমন বীজ, সার এসবের দাম। কালোবাজারে কৃষক এসব কিনতে বাধ্য হন। সরকারের হিসাবে সেই বাড়তি দাম ধরা থাকে না। বেসরকারি কোম্পানি বা মহাজনী ঋণের উচ্চ সুদের হার হিসাবে আসে না। ক্ষতিপূরণ যদি হয় ঋণ মকুব বা ছাড়, তাহলে তো অধিকাংশের তা পাওয়ার সুযোগই থাকে না।

২০২১ সালে জাওয়াদের ক্ষতিতে রাজ্য সরকার ক্ষতিপূরণ দেয়নি। দ্বিতীয়বার যাঁরা আলু গাছ বসিয়েছিলেন তাঁদের ফসলের উপর বিমা করা হয়েছিল। গত বছর তাঁদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হয়েছিল সরকারি ঋণে ছাড় দিয়ে। অনেক প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকই সেই সুযোগ পাননি। ক্ষোভ আছড়ে পড়েছিল বিভিন্ন গ্রামীণ সমবায় ব্যাঙ্কে। ক্ষতিপূরণ নিয়ে ঘোষণা শুনতে ভাল, সরকারি হিসাবে উপকৃতের সংখ্যাও অনেক হয়। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কারা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত এবং কৃষক সেই হিসাবটাতেই থাকে জল।

অল্প বন্যা হোক – এমনটা অবশ্য অনেক কৃষকও চাইছেন। কারণ বর্ষা কম হওয়ায় নদীতে জল কম, মাটির তলার জলস্তরও অনেকখানি নেমে গেছে। তাই বন্যায় সাময়িক ক্ষতি হলেও, দীর্ঘ মেয়াদে ভালো হবে। এমনটাই অনেকের ধারণা। বন্যা অল্প হবে না বেশি হবে তা হলফ করে বলা যায় না। আপাতত যদি বিপদ কাটেও, তাহলে এই মরসুমেই যে আবার বন্যা হবে না তারও নিশ্চয়তা নেই। এখনো অনেক জায়গায় জল নামেনি, নদী বিপদসীমায় রয়েছে। নদী বাঁচাতে, মাটির তলার জলস্তর বাড়াতে অনেককেই বন্যা কামনা করতে হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া পথ নেই। বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথ রুদ্ধ করার পরিণাম এখন টের পাওয়া যাচ্ছে। নদীর পাড়ে, নদীর বুকেই চলছে নির্মাণ কাজ। খালবিল ধ্বংস করে বাড়ি, দোকান, বাজার, হোটেল। নদীতে জল না থাকলে পারাপারের জন্য নদীপথেই তৈরি হচ্ছে স্থায়ী বা অস্থায়ী সেতু, সাঁকো। জলাভূমির উপর এই অত্যাচারের মাসুল গুনছে কৃষি।

উন্নয়নের নামে গ্রামের রাস্তা ঢালাই হচ্ছে, বৃষ্টির জল চুঁইয়ে ক্ষেতকে উর্বর করা বা ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বাড়ানোর পথ অনেকখানি রুদ্ধ। আলোয় মুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের পথঘাট। দৃশ্যদূষণে জীবজগতের ক্ষতির প্রভাব ঘুরিয়ে পড়ছে চাষের উপর। উন্নয়নের এই মডেলকে প্রশ্ন করার রাজনীতি সাধারণভাবে মূল স্রোতের রাজনৈতিক দলগুলো করে না। কারণ এই উন্নয়ন মডেলকে আদর্শ করেই চলা হয় এবং সাধারণ মানুষকে গেলানো হয়।

যেমনভাবে গেলানো হয়েছে ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর নামে বড় বড় কোম্পানির ঠিক করে দেওয়া কৃষিব্যবস্থাকে। কৃষক দেশি বীজের ব্যবহার বা বীজ সংরক্ষণের অভ্যাস হারিয়েছেন। উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহারে হারিয়েছে ফসলের বৈচিত্র্য। পরিবেশ, জলবায়ু, মাটির সঙ্গে নাড়ির টান থাকা বীজের বদলে এখন মাত্র কয়েকটা বীজের উপরেই কৃষককে নির্ভরশীল থাকতে হয়। তারই সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারে হাজির হয়েছে নানা কীটনাশক, আগাছানাশকের কোম্পানি। একই কোম্পানির নানা ব্র‍্যান্ডের প্রোডাক্ট।

এইসব ব্যবহারে জমির উৎপাদনশীলতা কমছে, ক্ষতি হচ্ছে বাস্তুতন্ত্রের। কৃষক পরিবারগুলো যে এসব বুঝছে না তা নয়। মোক্ষম জবাব দিয়েছিলেন চাষবাসে যুক্ত একজন মহিলা, যখন তাঁকে বলেছিলাম গ্রামের মানুষ টাটকা আনাজ পান। শহরে এত টাটকা মেলে না। চটজলদি তিনি জবাব দিয়েছিলেন, টাটকা আনাজের সঙ্গে বিষটাও টাটকা মেলে। যে কীটনাশক তিনি স্প্রে করেন, তার ক্ষতি বুঝেছেন অভিজ্ঞতা দিয়ে। তবুও বেশি করে ব্যবহার করা সার, কীটনাশকে হৃষ্টপুষ্ট, চকচকে আনাজের কদরই বাজারে বেশি। আমরা তথাকথিত শিক্ষিতরা সেটাই বেশি দামে কিনি। চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া উন্নয়নের মোহ আমাদের বিচারবোধ, সচেতনতা সবকিছু গ্রাস করেছে।

কৃষককে চলতে হয় বাজারের নিয়মে। ঠিক সময়ে বেশি ফলন চাই। আলু ক্ষেতে হয় বেতো শাক। আলু গাছের ক্ষতি করে বলে তুলে দিতে হয়। শহরের বাজারে এই শাকের চাহিদা আছে। কিন্তু তাড়াতাড়ির জন্য এখন অনেকেই আগাছানাশক দিয়ে এই শাক নষ্ট করে দেন। এইভাবেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শাক, জলজ প্রাণী। এইসব খেয়ে বা বিক্রি করে দিন গুজরান করা অসংখ্য মানুষ তাই বিপদে। ফোনে কথা হচ্ছিল জলমগ্ন এক গ্রামের পরিচিত একজনের সঙ্গে। অনুষ্ঠান বাড়িতে ঠিকে কাজ, ক্ষেতমজুরি করে দিন গুজরান করা বিবর্ণ ভারতের বাসিন্দা তিনি। তাঁর মাটির বাড়ির দুয়ারে নদীর জল এসেছে। হেসে হেসে বললেন, মাছ ধরছেন। বিপদ যতই আসুক, বন্যা ঘরবাড়ি ভাসাক, হাসতে এঁরা ভোলেন না। বন্যা হলে অন্য রুজিতে টান, মাছ মিললে তবুও ভাল। এই মাছ ধরা জিডিপি বাড়ায় না। তাই এইসব মানুষকে নিয়ে রাষ্ট্রের বিশেষ ভাবনাও থাকে না। জলদূষণে মাছও কমছে। আবার দুদিন পর নদীটাই চলে যেতে পারে কোনো কর্পোরেটের মালিকানায়। নদীর মাছ তখন আর সমাজের সম্পদ থাকবে না। সামাজিক বা সমষ্টিগত সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করাই এই উন্নয়নের পরিকল্পনা।

পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে উন্নয়নের এই দিশা থেকে বেরোতে না পারলে সংকট আরও বাড়বে। কৃষি, গ্রামোন্নয়নে চাই বিকল্প উন্নয়ন পরিকল্পনা। দুর্যোগে ঋণ মকুব, ক্ষতিপূরণ অবশ্যই দরকার। তা যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই ঠিকমত পান, তার জন্য সরকারি নীতি পরিবর্তনের দাবিও তোলা দরকার। কিন্তু সেসবই সাময়িক উপশম। সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার রাজনৈতিক দাবিও উঠে আসা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনে শিয়রে শমন।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.