দীপক গিরি

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী বন্ড সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর জানা গেছে যে ৩৫টি বৃহৎ ওষুধ কোম্পানি গত পাঁচবছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে মোট ৯৪৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে বন্ডের মাধ্যমে। অর্থাৎ বলা যায়, সময় মত ঘুষ দিয়ে যেমন খুশি ওষুধের দাম বৃদ্ধি করে নিজেদের মুনাফার পাহাড় তৈরি করেছে। সেখানে ওষুধের গুণমান কিম্বা জমি ও পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্ত বিধিনিষেধকে তারা নির্বাচনী বন্ডের জোরে দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে।

গুজরাটের কোম্পানি জাইডাসের তৈরি রেমডেসিভির ইঞ্জেকশন আর টোরেন্টের তৈরি লোসার-এইচ, ডিপ্ল্যাট১৫০ এবং তেলেঙ্গানার হেটেরোর তৈরি করা রেমডেসিভির ইঞ্জেকশনের মত শত শত নিম্নমানের ক্ষতিকারক ওষুধ খেয়ে এ পর্যন্ত কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন তার হিসাব করা অসম্ভব। এইসব রাক্ষুসে বহুজাতিক এবং তাদের তাঁবেদার সরকার নিজেদের ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি রক্ষার তাগিদে নির্দ্বিধায় ও নির্মমভাবে কোটি কোটি মুমূর্ষু ও রোগগ্রস্ত অসহায় দেশবাসীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। নির্বাচনী বন্ডকে বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক কেলেঙ্কারির আখ্যা দিয়েছেন দেশের অর্থমন্ত্রীর নির্মলা সীতারামণের স্বামী এবং অর্থনীতিবিদ ডঃ পরকলা প্রভাকর। সম্ভবত এই কেলেঙ্কারি থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতে কেন্দ্রীয় সরকার এতদিনে জারি করেছে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার আইনের নিয়মাবলী। অনেকটা সেই জেনেরিক ওষুধের মতই, শস্তা দামের সিএএতে চমক আছে, কিন্তু বাঁচার তাগিদে মানুষ নিতে গেলেই ফেঁসে যাবে। কারণ গুণ বা মান কোনোটাই নেই। ভিতরটা শুধু ফাঁপা নয়, দুটোই জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্যের পক্ষে চূড়ান্ত ক্ষতিকর।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একটা সময় ছিল (এই শতকের প্রথম দশক) যখন প্রত্যন্ত গ্রাম, দুঃস্থ এলাকায়, চা বাগানে ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে বিনামূল্যে মেডিকাল ও ত্রাণশিবির চালানোর জন্য হাসপাতাল থেকে বাক্স ভর্তি বিনামূল্যে ওষুধের নমুনা পাওয়া যেত। স্যার/ম্যাডামরা টেবিল থেকে মেডিকাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের দেওয়া নমুনাগুলো দিয়ে দিতেন। বিভাগীয় প্রধানের ঘরের আলমারি ঠাসা ওষুধের নমুনা থেকে ঝাড়াই বাছাই করে একেকটা মেডিকাল শিবিরের ওষুধের বেশিরভাগ প্রয়োজন মিটে যেত। অন্যদিকে সরকারি ব্যবস্থায় হাসপাতালের আউটডোরেও বড় বড় লাইনে দাঁড়ানো রোগীদের সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রায় ৪০-৫০ রকমের প্রয়োজনীয় বিনামূল্যে সরবরাহ করা হত। এর মাঝেই একে একে এসেছিল জনমোহিনী স্বাস্থ্য নীতি তথা গ্রামের মানুষের জন্য সাড়ে তিন বছরের ডাক্তারি কোর্স (BRSC) এবং ‘ভিশন ২০১৫’ নামক মেডিকাল শিক্ষার বেসরকারিকরণের নীল নকশা। তখন জমানা পাল্টাচ্ছে, অর্থাৎ রাজ্যে ও কেন্দ্রে একের পর এক সরকার বদল হচ্ছে। কিন্তু পূর্বের কংগ্রেস থেকে বামফ্রন্ট জমানার মতই স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো বদল হয়নি। আগের সরকারি দল যেখানে শেষ করেছে, পরবর্তী নতুন সরকার সেখান থেকেই হাল ধরেছে।

তবুও পরিবর্তনের নামে, নতুনত্বের দোহাই দিয়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে চমকপ্রদ জৌলুস ও আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে একের পর এক সরকারি পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছিল। যেমন ২০০৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের কেমিকাল অ্যান্ড ফার্টিলাইজার মন্ত্রকের অধীনস্থ ফার্মাসিউটিকাল বিভাগ দেশের দরিদ্র জনসাধারণকে স্বল্প মূল্যে জেনেরিক ওষুধ দেওয়ার প্রকল্প হিসাবে চালু করেছিল প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনৌষধি পরিযোজনা (PMBJP)। রাজস্থানের তৎকালীন সরকারকে অনুসরণ করে এ রাজ্যের পরিবর্তনের সরকার আইন করে বলল, এবার থেকে ডাক্তারবাবুদের প্রেসক্রিপশনে ব্র্যান্ডের ওষুধ লেখা বন্ধ করে জেনেরিক ওষুধের নাম লিখতে হবে। কারণ ডাক্তারদের সঙ্গে যোগসাজসে ওষুধ কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ডেড ওষুধের অসৎ ব্যবসা চালাচ্ছে। তাই বাজারে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এরই প্রতিকার হিসাবে মেডিকাল কলেজ সমেত হাসপাতালে হাসপাতালে চালু হল ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকান। গজিয়ে উঠল জেনেরিক ওষুধ তৈরির শত শত ফার্ম। ৫০%-৭০% পর্যন্ত ছাড়ে জেনেরিক ওষুধের ব্যবসা চলল। এইভাবে সেদিন মা মাটি মানুষের সরকার এবং টিভি চ্যানেলগুলোর ২৪ ঘন্টার আক্রমণে প্রায় ধ্বংস হয়েছিল ঘুষখোর ডাক্তার এবং মুনাফাখোর জাইডাসের মত দৈত্যাকৃতি ওষুধ কোম্পানিগুলোর ব্র্যান্ডেড ওষুধের প্রতারণার জাল।

আরো পড়ুন পতঞ্জলিকে লাগাম পরাতে শেষে সুপ্রিম কোর্টকে মুখ খুলতে হল

কিন্তু এর পাশাপাশি সন্তর্পণে একটা মারাত্মক ষড়যন্ত্র চলতে থাকল। একসময় একশোর বেশি প্রয়োজনীয় ওষুধ সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে আউটডোর ও ইন্ডোরে দেওয়া হত। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার জেনেরিক ওষুধ এবং ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকানের শস্তা শোরগোলের আড়ালে হাসপাতাল থেকে জনতাকে বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়ার ল্যাঠা প্রায় চুকিয়ে ফেলল। পরিণামে আজ হাসপাতালের ইন্ডোরে স্যালাইনের বোতল ছাড়া আর প্রায় কোনো ওষুধই পাওয়া যায় না। আউটডোরের শতাধিক ওষুধের তালিকা আজ সাকুল্যে ১০-১৫ রকমের ওষুধের তালিকায় এসে ঠেকেছে। হাসপাতালের ফার্মেসিতে আগের মত ওষুধ সংগ্রহের বিরাট বিরাট লাইন এখন আর নেই। মানুষ হন্যে হয়ে বড় বড় ওষুধের দোকানে ভিড় জমাতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিন আমার একজন রোগী (পেশায় দিনমজুর) বললেন, ‘প্রেসার বেশি থাকলেও ওষুধ খাওয়া শুরু করিনি। কারণ একবার শুরু করলে তো সারাজীবন খেয়ে যেতে হবে! এত টাকা ওষুধের পেছনে দিলে সংসার চলবে না ডাক্তারবাবু।’

তারপর এক, দুই করে প্রায় দশবছর অতিক্রান্ত হয়েছে। আজ তথাকথিত নিউজ চ্যানেল এবং সরকারের তাঁবেদার কর্তাব্যক্তিদের প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় – এই এক দশকে ওষুধের দাম কতটুকু কমেছে? হাসপাতাল থেকে সরকার আগের মত বিনামূল্যে ওষুধ দিচ্ছে না কেন? স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ এত দায়সারা কেন? সত্যিই কি জেনেরিক ওষুধের প্রকল্প বিরাট বিরাট ওষুধ কোম্পানিগুলোর লাগাম ছাড়া মুনাফা আটকাতে পেরেছে? অসৎ ডাক্তারদের ঘুষ নেওয়া কি আটকানো গেছে? অসৎ ডাক্তারদের ঘুষ নেওয়ার যেমন অজস্র উপায় থাকে, তেমনি সৎ ও সত্যিকারের জনদরদী ডাক্তারদের সততার অসংখ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এখন চা বাগান, দুঃস্থ এলাকা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পীড়িত এলাকায় বিনামূল্যে মেডিকাল ক্যাম্প করতে গেলে আগের মত আর বাক্স বাক্স নমুনা ওষুধ পাওয়া যায় না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরাও পাড়ায় পাড়ায় এবং স্যার/ম্যাডামদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে পরিমাণ মত ওষুধ কিনে ক্যাম্পগুলো চালাই। উপরন্তু আজ হাই ব্লাড সুগার, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের অসুখের ওষুধসহ জীবনদায়ী সমস্ত ওষুধের দাম আকাশছোঁয়া। দেখা যাচ্ছে PMBJP সহ বেশকিছু জেনেরিক ওষুধের প্রকল্পের মাধ্যমে শস্তা দরে যেমন শস্তা গুণমানের ওষুধ বাজারে এসেছে, তেমনি নামী দামী বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোও ব্র্যান্ডেড ওষুধের পাশাপাশি জেনেরিক ওষুধ তৈরি করে বর্তমানে বিশ্বের জেনেরিক ওষুধ বিক্রির বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে। এই লেখার মাধ্যমে সকলের উদ্দেশে বলতে চাই – আপনারা আজ যদি এইসব মারাত্মক কেলেঙ্কারি ও ষড়যন্ত্র জেনেও বালিতে মাথা গুঁজে থাকেন, তাহলে নিজের কবর নিজেই খোঁড়া হবে।

নিবন্ধকার পেশায় ডাক্তার। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.