শ্রীমু

চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কাজ না হলেও অতি উত্তম হয়।

আদিতে এটা গেয়ে রাখা প্রয়োজন যে বর্তমান নিবন্ধটি পরিচালক সৃজিত মুখুজ্জের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র অতি উত্তমের সমালোচনা নয়। তার কারণ এই ছায়াছবিটিকে আদৌ চলচ্চিত্র বা সিনেমা বলা যায় কিনা সে সম্পর্কে ঘোর সন্দেহের অবকাশ রয়েছে এবং সেই সন্দেহ নিয়ে দু-চার কথা বলার জন্য এই লেখার অবতারণা। এত অবধি পড়ে যাঁরা ভুরু কোঁচকাচ্ছেন তাঁদের জন্য কতকটা খোলসা করে বলি। কাহিনীনির্ভর সিনেমা বা চলচ্চিত্রের প্রাক শর্ত হল গল্প ফেঁদে অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিয়ে চিত্রগ্রহণ, অর্থাৎ কলাকুশলীদের ভাড়া করে এনে, অভিনেতাদের পার্ট পড়িয়ে, আলো জ্বালিয়ে, রীতিমত অ্যাকশন-কাট বলে কিছু বিশেষ চলমান মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রধান অভিনেতা, মানে নাম ভূমিকায় যাঁর পার্ট করার কথা তিনি অনুপস্থিত; সহ-অভিনেতারা সেটে হাজির, ওদিকে বেলা বয়ে যায়। অতঃ কিম?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তখন একটি চলনসই মাপের মানুষকে ধরে বেঁধে রাজি করিয়ে তাকে আপাদমস্তক সবুজ কাপড়ে মুড়ে প্রধান অভিনেতাটির বদলে মাথা নাড়া পুতুলের মত দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল, প্রয়োজনে ঘাড় ঘোরাতে বলা হল, দরকারে বসতে, হাঁটতে চলতে, মেট্রোয় উঠতে, এমনকি কয়েকবার নায়িকার বিছানায় সটান শুয়ে পড়তেও বলা হল। ভেবে দেখলে এটা একরকম ‘জুতো হাঁটছে পা রয়েছে স্থির’ গোছের ব্যাপার। বলা বাহুল্য, সে বড় সুখের দৃশ্য নয়।

 

মধুকবি যদি মেঘনাদবধ লেখার মাঝখানে রণে ভঙ্গ দিয়ে ভাবতেন যে আর লিখে কাজ নেই, এইবার কৃত্তিবাস থেকে কিছুটা ‘কোট’ করে দিলেই হয়, তাহলে অমিত্রাক্ষরে পয়ার ঢুকত। আর কী হত? উঠে দাঁড়াত যেমন দাঁড়ায় চেনা কবিতায় অচেনা শব্দ।

 

এখন প্রশ্ন হল এই দুঃসাহসিক কাজটি পরিচালক কার ভরসায় করলেন? সেই ভোজবাজিটির নাম প্রযুক্তি। যার ডানায় ভর দিয়ে তিনি অকুতোভয়ে ওই সবুজ মানুষটিকে ভিএফএক্সের টেবিলে ছেঁটে ফেলে তার পরিবর্তে প্রধান অভিনেতাটির পুরনো ছবিগুলো থেকে পছন্দসই দৃশ্যাংশ, তাঁর ছায়াছবি, অবয়ব মাপ মত কেটে নিয়ে জুড়ে দিয়েছেন। এ অনেকটা পুরনো খবরের কাগজ বা ম্যাগাজিন থেকে মেসি আর মারাদোনার ছবি কেটে কেটে পাশাপাশি জুড়ে স্ক্র্যাপবুকে গ্রাফিক নভেল তৈরি করার মতন। সেক্ষেত্রে অবশ্য কিছু কাল্পনিক কথোপকথন লেখার দায় থেকে যায় স্রষ্টার, এক্ষেত্রে সেটাও নামমাত্র করলেই চলে। মানে একটা পাতি প্রেমের গল্পের খসড়া, সহ-অভিনেতাদের সংলাপ আর বাকিটা ‘গুরু’-র ভরসায় ছেড়ে দিলেই হল। তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী তো সত্যজিৎ রায়, তপন সিংহ, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, বিধায়ক ভট্টাচার্য ইত্যাদিরা লিখেই গেছেন। কিছু পাওনা গণ্ডা চুকিয়ে ইচ্ছে মত নিয়ে নিলেই হল। শ্রেষ্ঠাংশে ঘটা করে উত্তমকুমার লেখা হল বটে, কিন্তু চিত্রনাট্যকার বা নিদেনপক্ষে সংলাপ লিখিয়ে হিসাবে ওই মানুষগুলির প্রাপ্য সম্মানটুকু কিন্তু দেওয়া হল না।

 

একটি চলনসই মাপের মানুষকে ধরে বেঁধে রাজি করিয়ে তাকে আপাদমস্তক সবুজ কাপড়ে মুড়ে প্রধান অভিনেতাটির বদলে মাথা নাড়া পুতুলের মত দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল, প্রয়োজনে ঘাড় ঘোরাতে বলা হল, দরকারে বসতে, হাঁটতে চলতে, মেট্রোয় উঠতে, এমনকি কয়েকবার নায়িকার বিছানায় সটান শুয়ে পড়তেও বলা হল।

 

সৃজিতভক্তরা বলতেই পারেন, বেশ করেছে। ছেলের এলেম আছে তাই করেছে। এরকম ‘ইনোভেটিভ’ কাজ বাংলায় কেন, ভূভারতে আর একটি নেই। আর গোদার তো বলেছেন যে কোথা থেকে কী নিচ্ছ সেটা বড় কথা নয়, সেটা কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেটাই মূল বিবেচ্য।

হক কথা।

এই ভক্তকুলের সমীপে বিনীত অনুরোধ, দয়া করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটির প্রথম চারটি লাইন পড়ে দেখুন

ধরা দিয়েছি গো আমি ক্ষণিক লীলায়,
নয়নে দেখেছি কে জানে কাহার হাসি।
আমার পরাণ দোলে গহন মায়ায়,
এবার মিলনলগনে বাজুক বাঁশি।।

এবারে গীতবিতান খুলে দেখুন এই গানটি খুঁজে পান কিনা। ‘ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশের পাখি’ বলে একটি গান পাবেন, যেটি প্রেম পর্যায়ের ৫৪ নম্বর গান। কিন্তু ‘ধরা দিয়েছি গো আমি ক্ষণিক লীলায়’ গানটি গীতবিতানের কোনো ছাপা সংস্করণে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তার কারণ গানটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, আবার লেখেননিও বটে। এই পরস্পরবিরোধী বাক্যটির অন্তর্নিহিত গূঢ় সত্যটি হল, উপরের গানটি রবিঠাকুরের প্রেম পর্যায়ের বিভিন্ন গানের কথার টুকরো নিয়ে জুড়ে জুড়ে রচিত একটি আস্ত নতুন গান। এবারে প্রশ্ন হল, এই গানটির রচয়িতা কে? রবিঠাকুর না জনৈক ফচকে গীতিকার? আরও বড় প্রশ্ন হল, এটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে রবীন্দ্র ঘরানায় সুরারোপিত করলে সেটি কি একটি মৌলিক গান হিসাবে বিবেচিত হবে?

পন্থাটি যে ‘ইনোভেটিভ’ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু কতখানি সৃজনশীল তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। চলা উচিত। এখন তর্কের খাতিরে যদি মেনে নেওয়া হয় যে অতি উত্তম একটি মোক্ষম সৃজিত চাল, তাহলেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। সেগুলো একান্তভাবে কাহিনী নির্ভর চলচ্চিত্রের ভিত্তিপ্রস্তর সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন। যার একটি হল ‘কন্টিনিউয়িটি’।

টুকরো টুকরো শট জুড়ে দৃশ্য, আর কিছু দৃশ্য জুড়ে সিনেমা।একটি দৃশ্যকে যখন বিশেষ স্থান ও কালের নিরিখে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, তখন সিনেমা দাবি করে যে চরিত্ররাও কিছু নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় সেই দৃশ্যে চলাফেরা করবে, কথাবার্তা বলবে। অর্থাৎ একই ঘরে যখন একই সময়ে দুটি চরিত্র পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছে এবং শট রিভার্স শটে সেই কথোপকথন যখন চিত্রায়িত হচ্ছে, তখন উপর্যুপরি শটে একটি চরিত্রের গায়ে কখনো রাজপোশাক আর তারপরেই কালো কোট থাকার কথা নয়। উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে যেমন খুশি তেমন আপনি/তুমি/তুই বলে সম্বোধন করা চলে না। এছাড়া অনেক কিছুই হবার কথা নয় যা সবই লঙ্ঘিত হয়েছে অতি উত্তমে গুরুকৃপায়। এবং এমন যে হবে তা ছবির শুরুতেই ঘটা করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে অবান্তর প্রশ্ন থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। মুশকিল হল শিল্পমাধ্যম ও তার অভিব্যক্তি যতই দরাজ হোক, ন্যূনতম কয়েকটি শর্ত না মানলে রসভঙ্গ হয় এবং ব্যাপারটা মোটের উপর দাঁড়ায় না। মানে ধরুন, মধুকবি যদি মেঘনাদবধ লেখার মাঝখানে রণে ভঙ্গ দিয়ে ভাবতেন যে আর লিখে কাজ নেই, এইবার কৃত্তিবাস থেকে কিছুটা ‘কোট’ করে দিলেই হয়, তাহলে অমিত্রাক্ষরে পয়ার ঢুকত। আর কী হত? উঠে দাঁড়াত যেমন দাঁড়ায় চেনা কবিতায় অচেনা শব্দ। আবেগের সত্যি কোনো অভিধান নেই এবং রসিক পাঠক বেদম ঠকতেন। যেমন ঠকছেন আপামর বাঙালী দর্শক অতি উত্তমে।

আরো পড়ুন টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

অতি উত্তম কিন্তু একটি চমৎকার মেটাসিনেমা হতে পারত। মানে হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। মেটাসিনেমা, অর্থাৎ যে সিনেমার বিষয়বস্তুই হল সিনেমা। যা নানাভাবে দর্শকদের জানান দেয় যে তারা কিন্তু বাস্তব নয়, সিনেমাই দেখছে এবং তার ফলে দর্শকের মনে এক ধরনের সক্রিয়, আত্মপ্রতিফলনের সুযোগ হয়। এই ধরনের সিনেমায় ইচ্ছে করে সিনেমা ও সিনেমা বানানোর প্রক্রিয়াকে মিলিয়ে দেওয়া হয়, গল্প এবং গল্পের নির্মাণ পদ্ধতিকে একইসঙ্গে তুলে ধরা হয়, কখনো চরিত্র এবং চরিত্রের অন্তরালে যে অভিনেতা তাদের মুখোমুখি বসিয়ে দেওয়া হয়। হরেকরকম তাজ্জব জিনিস ঘটিয়ে সিনেমা মাধ্যমটিকে দর্শকমানসের কষ্টিপাথরে যাচাই করে একটি আত্মসচেতন, আধুনিকোত্তর, প্রাজ্ঞ শিল্পের আঙিনায় এনে দাঁড় করানো হয়। এর উদাহরণ শুধুমাত্র ইউরোপিয় আর্ট ফিলিমে নয়, মূলধারার হলিউডেও ঠাসা।

হালের ছবিগুলির মধ্যে রায়ান রেনল্ডস অভিনীত মার্ভেল ফ্র্যাঞ্চাইজের ডেডপুল ছবির কথাই ধরা যাক। এই ছবির সুপারহিরো ডেডপুল সুপারহিরো ঘরানার ছবি নিয়ে নানা ধরনের (অনেকসময়েই আপত্তিকর) মস্করা করে, ঘটনা প্রবাহ থামিয়ে দর্শকের সঙ্গে আড্ডা দেয়, ছবির নেপথ্যের কলাকুশলীদের নিয়ে কূটকচালি করে, এমনকি বেশ কিছু মেটা ঠাট্টা করে, যা শুনে হাসতে হলে মার্ভেলের বাকি ছবিগুলি দেখা আবশ্যিক। ডেডপুল কিন্তু সুপারহিট ছবি, যা বর্তমানে কাল্ট স্ট্যাটাস পেয়ে গেছে।

বলিউডে মেটা সিনেমার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল একে ভার্সাস একে। সেখানে ফ্লপ নির্দেশক অনুরাগ কশ্যপ (একে) বলিউডি পরিবারতন্ত্রের কুলপতি অনিল কাপুর (একে)-এর মেয়েকে অপহরণ করলে এক অত্যাশ্চর্য সিনেমার মুখোমুখি হই আমরা, যেখানে চলচ্চিত্র আর বাস্তব গুলিয়ে যায় এবং মোটের উপর ভারতবাসীর বাড়াবাড়ি রকমের তারকাপ্রীতির অভ্যাসকে ব্যঙ্গ করা হয়।

অতি উত্তম ঠিক এভাবেই হয়ত বাংলা চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ ম্যাটিনি আইডল উত্তমকুমারকে ফিরিয়ে এনে বাংলা সিনেমার উজ্জ্বল ঐতিহাসিকতা ও তার বর্তমান মালিন্যের ছবি জনমুকুরে তুলে ধরতে পারত, রোম্যান্টিক বাংলা সিনেমা তথা বাঙালির রোম্যান্সের অপ্রতিরোধ্য অধোগতি রসেবশে দেখাতে পারত। কিন্তু তার পরিবর্তে এটি একটি মেটা উত্তম হয়েই রয়ে গেল। আশঙ্কার দিক হল, উত্তর প্রজন্ম এই ছবির টুকরো টুকরো উত্তম, তাঁর চালচলন, পোশাক, মেকআপ, কথা বলার ধরন দেখে যারপরনাই আশাহত হতে পারে, এমনকি উত্তমবিমুখও হয়ে যেতে পারে। আসলে উত্তমকুমারকে তাঁর সময়কাল থেকে ছেঁটে ফেলে সটান ২০২৪ সালে এনে ফেললে হিতে যা বিপরীত হবার, এক্ষেত্রে তাই হয়েছে।

এখন ভাববার বিষয় হল, অতি উত্তমের মত আত্মহননের প্রচেষ্টা সৃজিতবাবু কেন করলেন। এর উত্তর সিনেমায় নয়, ভীমরতিপ্রাপ্ত বাঙালির স্মৃতিরোমন্থনপ্রিয়তায় খোঁজা উচিত। রবিবারের প্রায় পূর্ণ ম্যাটিনি শোয়ের দর্শকাসনে বসে কানে আসছিল কুইজপ্রিয় প্রৌঢ় বাঙালির অনন্ত ফিসফাস, ‘এই এটা ঝিন্দের বন্দি’, ‘এটা অগ্নীশ্বর’, ‘নায়ক’, ‘দেয়া নেয়া’…

বুঝতে অসুবিধে হয় না যে (সাংস্কৃতিক) জীবন যখন শুকায়ে যায় তখন করুণাধারায় ফেলুদা, ব্যোমকেশ, অতি উত্তম আসে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.