অর্ক মুখার্জি
লোকসভা ভোটের দামামা বেজে উঠেছে, দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস সব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে, বিজেপিও ইতিমধ্যে ৩৯ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। তুলনায় একটু পিছিয়ে বাম-কংগ্রেস। জোট জটিলতা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগছে। এখন পর্যন্ত ৩১ জন প্রার্থীর নাম বামফ্রন্টের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের একটা বড় অংশ গ্রামীণ ভোটার। আগেরবার, অর্থাৎ ২০১৯ সালে, এই গ্রামীণ ভোটের অমুসলিম ভোট অনেকটাই পেয়েছিল বিজেপি। তৃণমূল সরকার পরবর্তী সময়ে প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শে বিভিন্ন প্রকল্প চালু করেছে এবং এই ভোটেও তাঁরা আশাবাদী যে গ্রামের মানুষের সমর্থন তাঁদের দিকেই থাকবে। এর মধ্যে ক্ষীণ স্বর হিসাবে অবস্থান করছে বামেরা, বিশেষ করে সিপিএম। বহু গ্রামীণ এলাকায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিপিএম সমর্থকরা দলে দলে তৃণমূল, হাল আমলে বিজেপি এবং কিছু কিছু জায়গায় ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) দিকে ঝুঁকেছেন। অর্থাৎ সিপিএমের গ্রামীণ সমর্থকদের বড় অংশ হয় বসে গিয়েছেন বা রাজনৈতিক রং পরিবর্তন করেছেন। কিছু কিছু পকেটে হয়ত জনসমর্থন আছে, কিন্তু লোকসভা ভোটে লড়াই দেওয়ার মত জায়গায় সিপিএম বা বামেরা এখন পশ্চিমবঙ্গে নেই।
তৃণমূল সরকার যে প্রকল্পগুলো চালু করেছে গ্রামবাংলার মন পেতে, তার অন্যতম হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। কোভিড অতিমারীর সময়ে বা পরবর্তীকালে বহু অর্থনীতিবিদই সওয়াল করেছেন সরাসরি নগদ টাকা সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এরকম একটি সরাসরি হাতে টাকা দেওয়ার প্রকল্প যেখানে মহিলারা প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি, উপজাতির মহিলারা ১,২০০ টাকা পাবেন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। এছাড়া কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, রূপশ্রী, স্বাস্থ্য সাথী, যুবশ্রী, জয় বাংলা, বাংলা যুবশক্তি, বিশ্ববাংলা, শিক্ষাশ্রী, গতিধারা, উৎকর্ষ বাংলা, গীতাঞ্জলি, খাদ্য সাথী, সবুজশ্রী, মানবিক, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যোগ্য শ্রী, স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড এবং বিভিন্ন পেনশন প্রকল্প বিধবা ও বয়স্ক মানুষদের জন্য চালু হয়েছে। কৃষকদের ফসল সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন বিমা প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ এইসব প্রকল্প ঘোষণার মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের আর্থসামাজিক দিকটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প আছে, তৃণমূল সুপ্রিমো থেকে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা তাঁদের বক্তব্য রাখার সময়ে এই প্রকল্পগুলোর কথা তুলে ধরেন। কিন্তু গ্রামবাংলায় একটা কথা চালু আছে ‘দূর থেকে মনে হয় সরষে বাড়ি ঘন’। বিভিন্ন প্রকল্পের ট্যাবলো দিয়ে প্রচার তো দেখা যায়, কিন্তু প্রান্তিক মানুষের কাছে তা কতটা পৌঁছচ্ছে?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বহু ক্ষেত্রে দেখা যায় এইসব সুযোগসুবিধা সম্পর্কে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত যত সচেতন, অতিদরিদ্র বা একেবারে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ ততটা সচেতন নন। গ্রামবাংলায় এরকম বহু উদাহরণ আছে, যে কেউ প্রান্তিক হওয়া সত্ত্বেও অনেক প্রকল্প থেকে বঞ্চিত, আবার অনেকে তুলনামূলক ভাল অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন রকম প্রকল্পের সুযোগসুবিধা ‘ম্যানেজ’ করে নিয়ে নিয়েছেন। গ্রাম্য রাজনীতিতে শাসক দলের প্রভাবশালী নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থেকে বা দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই ‘ম্যানেজ’ ব্যাপারটা পাকা করা যায়। অনেকসময় এই কাজে সরকারি কর্মচারীদের এজেন্ট হিসাবে অনেকে কাজ করে থাকেন। সেখানেই আর্থিক লেনদেন ব্যাপারটা প্রকট। বিভিন্ন অফিসের সামনে বসে যাঁরা ফর্ম ফিল আপ করে দেন বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য, তাঁদের অনেকে আবার এরকম ‘ম্যানেজ ডিল’ করতে সিদ্ধহস্ত।
আমফানে দরমার বেড়া দেওয়া মাটির বাড়ির চাল উড়ে গিয়েছিল তাহের আলি মোল্লার। এবার আবাস যোজনার চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে, কিন্তু এখনো টাকা মেলেনি। এরই মধ্যে বৃষ্টিতে ঘর আবার জলমগ্ন। তাহেরের কথায়, ‘পঞ্চায়েতে গেলে বলছে, কেন্দ্র টাকা দিচ্ছে না। আমরা গরিব মানুষ, এত বুঝি না। টাকা না পেলে এবারও সমস্যায় পড়তে হবে।’
আরো পড়ুন মনরেগা প্রকল্পে বঞ্চনা শুধু বিজেপি-তৃণমূল আকচা আকচির ব্যাপার নয়
ভাঙড়ের তাহের থেকে শালবনির করুণা ভুঁইয়া – গল্পটা একইরকম। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার দ্বিতীয় দফা আবাস প্লাস নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে রাজ্যজুড়ে। পরিদর্শনে এসেছে কেন্দ্রীয় দল, সংযোজন বিয়োজন হয়েছে তালিকায়। তারপরেও অ্যাকাউন্টে এখনো টাকা আসেনি বলে অভিযোগ বহু উপভোক্তার। অ্যাকাউন্টে টাকা আসবে, দীর্ঘ অপেক্ষায় রয়েছেন একশো দিনের প্রকল্পের অনেক শ্রমিকও। মজুরি বকেয়া থাকায় বছরখানেক ধরে কার্যত বন্ধ সে প্রকল্প। গ্রামীণ এলাকায় সরকারি প্রকল্প চলছে এমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই।
গ্রামীণ এলাকায় রাস্তার হাল ফেরাতে পথশ্রী (রাজ্য বাজেটে যার নাম ছিল রাস্তাশ্রী) প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এই প্রকল্পে প্রায় ১২,০০০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করার কথা। কিন্তু কিছু জেলা প্রশাসন সূত্রের খবর, এই কাজের জন্য উপযুক্ত ঠিকাদার পাওয়া মুশকিল হচ্ছে। কারণ এক সঙ্গে অনেকগুলো রাস্তার কাজে বিনিয়োগ করার মত ঠিকাদার পঞ্চায়েত স্তরে পাওয়া সমস্যার। কাজ করে টাকা কবে মিলবে তা নিয়েও সন্দিহান ঠিকাদারদের একাংশ। তাই কবে এইসব রাস্তার কাজ শেষ হবে তা অনিশ্চিত বলে কটাক্ষ করছেন বিরোধীরা।
গ্রামীণ এলাকায় বিতর্ক তুঙ্গে আবাস যোজনা নিয়ে। আবাস প্লাসের তালিকা প্রকাশ্যে আসা শুরু হতেই তাতে তৃণমূলের নেতা নেত্রী ও তাঁদের পরিজনদের নাম থাকা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু হয়। চারতলা বাড়ি থাকা সত্ত্বেও নেতার পরিজনের নাম রয়েছে তালিকায় – এমন উদাহরণও সামনে এসেছে। আবাস যোজনার বাড়িতে নীল-সাদা রং করে রাজনৈতিক কার্যালয় চলার ছবিও ধরা পড়েছে। এসব নিয়ে হইচই শুরু হলে কেন্দ্রীয় দলও এসেছে পর্যবেক্ষণে। তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে বহু নাম। যেমন পশ্চিম মেদিনীপুরে তালিকার প্রায় ৪,২৫,০০০ জনের মধ্যে যাচাই পর্বে প্রায় ৯০,০০০ নাম বাদ পড়ে। নদিয়ায় প্রায় তিন লক্ষ নামের মধ্যে ১,২৮,০০০ বাদ যায়। আবার উত্তর দিনাজপুরে অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা প্রায় ৪৮,৫০০ নামের মধ্যে হাজার তিনেক উপভোক্তার খোঁজ নেই প্রশাসনের কাছেই। সরকারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আছে বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে। যেমন সবুজ সাথী, খাদ্য সাথী ,স্বাস্থ্য সাথী, আবাস যোজনা, এসজেডিএ, ক্লাবগুলোকে অনুদান, বার্ষিক বাণিজ্য সম্মেলন ইত্যাদির কোনো অডিট নেই।
গীতাঞ্জলি হাউসিং প্রোগ্রামে ২০১১-১৬ ২,১৮,৭০৯টি বাড়ি তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিল। অথচ ওই সময়কালে তৈরি হয়েছে ১,৮১,৮২৬টি বাড়ি। প্রকল্প রূপায়ণের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ বিস্তর। পাকা বাড়ির মালিকরাই বাড়ি পেয়েছেন প্রভাব খাটিয়ে। বাড়ির কার্পেট এলাকা নির্দিষ্ট ২৫ বর্গমিটারের চেয়ে কম। এই ধরনের ৬০% বাড়িতে শৌচাগার নেই। সবুজ সাথীর সাইকেলের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। স্বাস্থ্য সাথীর ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠছে প্রয়োজন না হলেও বেশি টাকার ওষুধের বিল দেখানোর। অনেকসময় অপারেশন করে দেওয়া হচ্ছে তেমন প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও।
বাংলা জুড়ে মানুষের সুযোগসুবিধার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প যেমন রয়েছে, তেমনই প্রকল্প ঘিরে বঞ্চনার অভিযোগ বিস্তর। প্রকৃত চাষি অনেকসময় প্রকল্পের সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মাছ চাষিদের বদলে ব্লক থেকে মাছের খাবার ইত্যাদি পাচ্ছে অন্য লোক। গ্রামীণ অংশকে লক্ষ করে যেমন সরকার চাইবে এইসব প্রকল্পকে সামনে রেখে প্রচার, বিরোধীরা চাইবে প্রকল্পে বঞ্চনার কথা তুলে ধরে মানুষের মনে যে ক্ষোভ রয়েছে তাকে নিজেদের ভোটে রূপান্তরিত করতে। যদিও সরকার এক্ষেত্রে সুবিধাজনক জায়গায়, কারণ সুবিধাভোগীদের সংখ্যা অনেক। হয়ত সুবিধা আদায় করতে গিয়ে তাঁদের অন্যায় আর্থিক লেনদেন করতে হয়েছে, কিন্তু তাঁরা তালিকাভুক্ত সুবিধাভোগী তো বটে।
অন্যদিকে বিজেপিকে বিঁধছে একশো দিনের কাজের টাকা আটকে রাখা। মনে রাখতে হবে চৈত্র, বৈশাখ মাসে গ্রামবাংলার বিভিন্ন জায়গায় গাজন উৎসব ও চড়কের মেলা হয়। প্রান্তিক মানুষের জীবন উপভোগ করার এটাই মরশুম। একশো দিনের টাকা আটকে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বহু মানুষ সেইভাবে এবার উপভোগ করতে পারবেন না। এ নিয়ে বিজেপিবিরোধী শক্তিগুলো প্রচার করলে ভাল ফল পেতে পারে। বাম, কংগ্রেস বা আইএসএফের কাছে গ্রামের মানুষের বঞ্চনা তুলে ধরাই প্রচারের সেরা পথ। তাই সরকারি প্রকল্পের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার শাসক ও বিরোধীদের প্রচারের নীল নকশা হতে চলেছে – এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে প্রান্তিক জনতা কতটা প্রভাবিত হবে তা নির্ভর করবে প্রচার উপস্থাপনা, প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন এবং প্রচারের তীব্রতার উপর।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







