গতবছরের ৯ মার্চ থেকে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান আইনের (এমজিএনআরইজিএ বা মনরেগা) ধারা ২৭ অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে এই তহবিলের টাকা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। এর কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস সরকার নাকি কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য করেছে এবং ব্যয়ের পুরো হিসাব জমা দেয়নি। তহবিলের টাকা অন্য খাতে বরাদ্দ করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। একথার বারবার পুনরাবৃত্তি করে থাকেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা এবং ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির নেতারা। লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনে এক প্রশ্নের উত্তরে ওই কথাই আরও একবার বলেন গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী সাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতি।

ওদিকে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস এই অভিযোগকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কারণে টাকা আটকে রাখার পাল্টা অভিযোগ করে থাকে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পালা সংসদ ভবনে, দিল্লির রাস্তায়, মন্ত্রকের দপ্তরে – নানা জায়গায় নানা রূপে দেখা গিয়েছে। মৌখিক প্রতিবাদ, পথসভা থেকে মন্ত্রকের দফতর ঘেরাও, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ইত্যাদি অনেক কাণ্ডই ঘটেছে রাজধানীর বুকে। কিন্তু ফয়সালা আজও হয়নি। গতমাসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাজ্যকে বকেয়া কেন্দ্রীয় তহবিলের টাকা দেওয়ার আর্জি জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নাকি সমস্যা সমাধানের জন্য রাজ্য ও কেন্দ্রীয় আধিকারিকদের নিয়ে যৌথ বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কেন্দ্রের তহবিলে বরাদ্দ অর্থ রাজ্যকে দেওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু অনেকসময় দুই সরকারের সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ না মানার কারণে যেমন পশ্চিমবঙ্গের বরাদ্দ অর্থ বন্ধ করা হয়েছে, একই কারণ দেখিয়ে কেরালাকে সতর্ক করা হয়েছে যে রাজ্য যদি এই প্রকল্পে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারির আদেশ মেনে চলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের অর্থও আটকানো হতে পারে।

গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের মতে, মনরেগা প্রকল্প ‘চাহিদা অনুযায়ী মজুরি’ কর্মসংস্থানের কর্মসূচি এবং রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে ধারাবাহিকভাবে কাজের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ কেন্দ্র বরাদ্দ করে থাকে। মন্ত্রক থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হয় শ্রম বাজেট সম্মত হওয়া, শুরুর ব্যালেন্স, পূর্ববর্তী বছরের বকেয়া/দায়বদ্ধতা, সামগ্রিক কার্যক্ষমতা ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে। গত ২০ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে ‘গ্রামীণ উন্নয়নে সাফল্যের ৯ বছর’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণ উন্নয়ন ও পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রী গিরিরাজ সিং আশ্বস্ত করেন যে এই প্রকল্পের তহবিলে অর্থের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেছিলেন, এই প্রকল্পের অধীনে অতিরিক্ত তহবিলের জন্য অর্থ মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং তা শীঘ্রই অনুমোদিত হবে।

কিন্তু সিপিএমের পলিট ব্যুরো সদস্য বৃন্দা কারাত দাবি করেন যে এই প্রকল্পের বাজেট “হতাশাজনক” এবং মোদী সরকার যেন অর্থ বরাদ্দ কমানোকে “আইন দ্বারা প্রদত্ত অধিকারগুলো মুছে ফেলার হাতিয়ার” করে তুলছে। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান কর্মদিবস গড়ে “গ্যারান্টির ৫০ শতাংশেরও কম”। আসলে মনরেগা একটা চাহিদাভিত্তিক প্রকল্প, যা প্রত্যেক গ্রামীণ পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী বছরে ১০০ দিনের “অদক্ষ কাজের” গ্যারান্টি দেয়। গত ৩০ আগস্ট বৃন্দা গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে লিখেছেন যে তিনি এই আইন সংক্রান্ত এবং শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কিত ধারাগুলো চূড়ান্ত করার কাজে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তাই তিনি মনে করেন এটা “গভীর উদ্বেগের যে শ্রমিকদের চাহিদাভিত্তিক কাজের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে”। জুন মাসের এক সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি উদ্ধৃত করে বৃন্দা লেখেন, সেখানে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে মন্ত্রক আধার কার্ড ভিত্তিক বেতন ব্যবস্থার উপর জোর দেবে না, বরং আরও নমনীয়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বৃন্দা দাবি করেন যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে যা দেখা যাচ্ছে তা বিপরীত ইঙ্গিত দেয়।

বৃন্দা
বৃন্দা কারাত। ছবি পিনটারেস্ট থেকে

বৃন্দা লিখেছেন, ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট দ্য হিন্দু কাগজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একটা সংস্থার সমীক্ষার কথা বলা হয়, যেখানে দেখা গেছে যে মোট ২৬ কোটি শ্রমিকের মধ্যে ৪১.১% এখনো আধার ভিত্তিক পদ্ধতিতে (এবিপিএস) বেতন পাওয়ার যোগ্য নন। যে পাঁচটা রাজ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় শ্রমিক রয়েছেন, সেখানে ১.২ কোটি শ্রমিক এবিপিএস অ্যাকাউন্ট না থাকায় বেতন পাওয়ার যোগ্য নন। বৃন্দা লিখছেন “সরকারের কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে রেকর্ড করা তথ্যের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে যে অর্থ প্রদানের জন্য যে পরিমাণ সময় নেওয়া হয় তাতে, বা প্রত্যাখ্যানের শতাংশের ক্ষেত্রে, এবিপিএস এবং সাধারণ অ্যাকাউন্ট লেনদেনের মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে খুব কম পার্থক্য রয়েছে। অন্য কথায়, যেখানে এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য সুবিধা নেই, সেখানে উল্টে শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতির প্রমাণ রয়েছে।” তিনি দাবি করেন যে বিভিন্ন এলাকায় এই প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন যে বিশেষত মহিলা শ্রমিকরা – যাঁরা অনেক রাজ্যে মনরেগা শ্রমিকদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ – এতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

আরো পড়ুন একশো দিনের কাজ: কেন্দ্রের বঞ্চনা, রাজ্যের দুর্নীতির যুগলবন্দী

ওদিকে নরেগা সংঘর্ষ মোর্চার নিখিল দে-ও কেন্দ্রের বরাদ্দকে “অন্যায্য” বলে দাবি করেছেন। একে “গ্রামীণ শ্রমিকদের অধিকারের উপর আক্রমণ” এবং “কর্মসূচিকে হত্যা করার দিকে একটি পদক্ষেপ” বলে অভিহিত করে শ্রমিকদের উপস্থিতি নথিবদ্ধ করার জন্য জাতীয় মোবাইল মনিটরিং সিস্টেম অ্যাপ্লিকেশনটিকে “শ্রমিকবিরোধী হস্তক্ষেপ” বলে অভিহিত করেছেন। এই অ্যাপভিত্তিক উপস্থিতি নথিবদ্ধ করার ব্যবস্থা আবার আধারভিত্তিক বেতন ব্যবস্থার মাধ্যমে মজুরি প্রদানের সঙ্গেও যুক্ত। এটা আবার ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

গত ৬ অক্টোবর দ্য হিন্দু এক প্রতিবেদনে লিখেছে, আর্থিক বছরের ছয় মাসের মাথায় মনরেগার তহবিল খালি হয়ে গেছে এবং মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬,১৪৬.৯৩ কোটি টাকার ঘাটতি রয়ে গেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরে এই প্রকল্পের জন্য নাকি ৬০,০০০ কোটি টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে, যা ৭৩,০০০ কোটি টাকার বাজেট অনুমানের চেয়ে ১৮% কম এবং ২০২২-২৩ আর্থিক বছরে সংশোধিত ৮৯,০০০ কোটি টাকার চেয়ে ৩৩% কম। নভেম্বরের শুরুতে দেখা যায় যে মনরেগার আওতায় অপ্রত্যাশিত বর্ধিত ব্যয় মেটাতে জরুরি সহায়তা হিসাবে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রক। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে দি ইকনমিক টাইমস জানিয়েছে, সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে অনুদানের জন্য দেয় টাকার পরবর্তী কিস্তি অনুমোদিত না হওয়া পর্যন্ত এমনটাই চলবে।

গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক কিন্তু এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রতিবেদনকে “সত্য থেকে অনেক দূরে” বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এক বিবৃতিতে আবার উল্লেখ করা হয়েছে যে মনরেগা একটা “চাহিদাভিত্তিক” প্রকল্প। আরও বলা হয়েছে “যে কোনো পরিবার কর্মসংস্থানের দাবি জানালে সেখানে প্রকল্প অনুসারে আর্থিক বছরে কমপক্ষে ১০০ দিনের অদক্ষ কায়িক শ্রমের ব্যবস্থা করা হবে”। জোর দিয়ে দাবি করা হয়েছে “যদি এই প্রকল্পের অধীনে কর্মসংস্থানের জন্য আবেদনকারীকে প্রাপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে এই জাতীয় কর্মসংস্থান সরবরাহ না করা হয়, তবে তিনি দৈনিক বেকার ভাতা পাওয়ার অধিকারী হবেন”।

তা সত্ত্বেও দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় সংবাদ ওয়েবসাইট দ্যনিউজমিনিট লিখেছে, দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে সক্রিয় প্রায় ৩.৫৭ কোটি নরেগা কর্মীর মধ্যে ৩.৩৬ কোটি মানুষ এই (আধারভিত্তিক বেতন) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন, প্রায় ২০.৮ লক্ষ শ্রমিক বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট, পর্যন্ত তা করতে পারেননি এবং মজুরি পাওয়ার অযোগ্য হয়ে রয়েছেন। সরকারি নথি উদ্ধৃত করে ওই ওয়েবসাইট জানিয়েছে যে ত্রিপুরাসহ এবিপিএসের যোগ্যতা অর্জনকারী শ্রমিকের হারের প্রথম ছটা রাজ্যের মধ্যে দক্ষিণের পাঁচটা রাজ্য রয়েছে। এদিকে গোটা ভারতে ১৪.৪ কোটিরও বেশি সক্রিয় শ্রমিকের মধ্যে ২.৮৯ কোটি ১৭ আগস্ট পর্যন্ত নতুন ব্যবস্থার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নতুন বছর থেকে মনরেগা প্রকল্পের অধীনে সমস্ত মজুরি এবিপিএসের মাধ্যমেই দিতে হবে, যার জন্য শ্রমিকদের আধারের তথ্য তাঁদের জব কার্ডের সঙ্গে সংযুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.