বাংলার মুখ্যমন্ত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে রাজ্যের প্রাপ্য একশো দিনের কাজের টাকা মিটিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। প্রায় ৬,৫০০ কোটি টাকা এই মূহুর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে রাজ্য সরকারের প্রাপ্য। এই টাকা না দিলে যাঁরা এতদিন এই প্রকল্পে কাজ করেছেন, তাঁদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। গত চার মাস ধরে বহু মানুষের বেতন হয়নি, ফলে বেশকিছু মানুষ অসুবিধায় পড়েছেন। চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী যেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবিলম্বে এ বিষয়ে নির্দেশ দেন। এই নিয়ে আগামীদিনে নীচের তলা থেকে আন্দোলনের প্রক্রিয়াও শুরু হতে চলেছে তৃণমূল নেত্রীর নির্দেশে। যদিও লোকাল এবং ব্লক স্তরে যে মিছিল হবে, তার তারিখ নির্বাচন নিয়ে নীচুতলার কর্মীদের মধ্যে দোলাচল আছে। একে গরমের ছুটি চলছে, তার উপর জামাই ষষ্ঠী। কত মানুষ এই কেন্দ্রীয় সরকারবিরোধী মিছিলে নামবেন তা নিয়ে সংশয় আছে। তবু দলের সর্বময় নেত্রী যখন বলেছেন, তখন নামতেই হবে।

মানতেই হবে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অবশ্যই এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে আসা জরুরি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের টাকায় রাজ্য সরকারের অধীনে চলা একশো দিনের কাজের প্রকল্পের টাকা কেন্দ্রীয় সরকার দিতে চাইছে না-ই বা কেন? আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে মাঝেমধ্যেই এ বিষয়ে অস্বচ্ছতার নানান অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই কারণেই হয়ত তারা ধীরে চলো নীতি নিয়েছে। কেন্দ্রের তরফ থেকে আগামীদিনে বায়োমেট্রিক হাজিরার মাধ্যমে এই কাজ করানোর নির্দেশ আসা শুরু হয়েছে। যদিও বায়োমেট্রিক হাজিরা দিয়ে এইসব কাজে দুর্নীতি আটকানো সম্ভব কিনা তা আলাদা তর্কের বিষয়। কারণ ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশসহ বেশ কিছু রাজ্যে বায়োমেট্রিক নকল করার খবর পাওয়া গেছে। তা সত্ত্বেও আপাতত বাংলার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি চালু করার কথা হচ্ছে। সেখানে কীভাবে কোন দুর্নীতি হতে পারে তা পরে দেখা যাবে, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে অন্য অনেক রাজ্যের মত পশ্চিমবঙ্গেও একশো দিনের কাজ এই প্রক্রিয়াতেই চলবে হয়ত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তবে ব্যাপারটা শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জমা পড়া অভিযোগের নয়, সম্প্রতি হয়ে যাওয়া একটি বামপন্থী দলের রাজ্য সম্মেলনে আগত প্রতিনিধিদের মুখেও একশো দিনের কাজে দুর্নীতির অভিযোগ শোনা গেল। বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিরা জানালেন কীভাবে একশো দিনের কাজে স্বজনপোষণ চলছে। কিভাবে তৃণমূলের ছত্রছায়ায় থাকা মানুষজনই একমাত্র এই প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন, কীভাবে সেই প্রকল্পের টাকায় দুর্নীতি চলছে, কীভাবে ফুলে ফেঁপে উঠছে এক শ্রেণির তৃণমুল আশ্রিত দুষ্কৃতি।

নদীয়া জেলার ধুবুলিয়ার নপাড়া ২ নং পঞ্চায়েতের বাসিন্দা ফতেমা বিবি বলছিলেন, কীভাবে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে, শুধুমাত্র শাসক দলের কাছাকাছি থাকা মানুষজনকেই একশো দিনের কাজে নিযুক্ত করা হচ্ছে। যখনই তাঁরা পঞ্চায়েতকে প্রশ্ন করছেন, কেন তাঁদের কাজ দেওয়া হচ্ছে না – সেখান থেকে বলা হচ্ছে বিডিও অফিসে গিয়ে ৪(ক) ফর্ম পূরণ করে অভিযোগ করতে বলা হচ্ছে। বিডিও অফিস থেকে পঞ্চায়েতে নির্দেশ এলে কখনো কখনো হয়তো পাঁচ-ছ দিনের কাজ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তা-ও অনিয়মিত। বহু জায়গায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার জোগাড়। যতটুকু কাজ হচ্ছে তা চলছে হয় শাসক দলের অফিস থেকে, নয় পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি থেকে।

অনেক সমস্যার সমাধান হলেও ‘দুয়ারে সরকার’ কর্মসূচি পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে। একমাত্র শাসক দলের কাছের মানুষই লাভবান হচ্ছেন বলে অভিযোগ। তাঁদের নাম দিয়েই একশো দিনের কাজের মাস্টার রোল সম্পূর্ণ করা হচ্ছে। সেই মাস্টার রোল অনুযায়ী হিসাবপত্র হচ্ছে, ওই রোলে যাদের নাম আছে তাদের ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টেই সরাসরি টাকা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারি নিয়মনীতি মেনে। সেই টাকার একটা অংশ শাসক দলের নেতাদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। তালিকায় থাকা মানুষ টাকার সামান্য অংশ পাচ্ছেন, কিন্তু ভীত সন্ত্রস্ত থাকার কারণে কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে পারছে না।

আরো পড়ুন নিয়োগ দুর্নীতি: চাকরি নয়, প্রার্থীদের জন্য বরাদ্দ শুধু হতাশা

একেকজন মানুষের একশো দিনের কাজ বাবদ যদি ন্যূনতম মজুরি অনুযায়ী দৈনিক দুশো টাকা প্রাপ্য হয়, তাহলে এই দুর্নীতি মোট কত টাকার তা সহজেই অনুমেয়। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে বা সোশাল মিডিয়ায় শাসক দলের ঘনিষ্ঠ বেশকিছু লোকের প্রাসাদোপম বাড়ির ছবি চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। সেসব বাড়ি তৈরির টাকা কোথা থেকে আসছে তার একটা আঁচ হয়ত এখান থেকে পাওয়া সম্ভব। কিছুদিন আগে যখন রামপুরহাটের বগটুইয়ের ঘটনায় ভাদু শেখদের ফুলে ফেঁপে ওঠার খবর প্রকাশ্যে আসা শুরু হয়; বিভিন্ন জেলা, বিভিন্ন গ্রাম থেকে এই রকম বহু ভাদু শেখের অট্টালিকার ছবি বেরিয়ে আসে, তখন সেই ক্ষোভ চাপা দিতে মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছিলেন তিনি আবার ‘দিদিকে বলো’ গোছের কর্মসূচি চালাতে চান। তাতে মানুষ সরাসরি তাঁদের ক্ষোভের কথা মুখ্যমন্ত্রীকে জানাতে পারবেন। এই কথা শুনে ফতেমা বললেন, মুখ্যমন্ত্রী কি জানেন না তাঁর গুণধর ভাইদের কীর্তি? তাহলে নতুন করে তাঁর কাছে অভিযোগ জানিয়ে কী হবে? এগুলো স্রেফ ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা। যদি তাঁর কাছে উপযুক্ত তথ্য না-ই থেকে থাকে, তিনি কী করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি লিখে একশো দিনের কাজের বকেয়া টাকার জন্য দরবার করছেন? বকেয়া সাড়ে ছ হাজার কোটি টাকার কতটা সাধারণ মানুষ পাবেন, আর কতটা শাসক দলের স্থানীয় নেতাদের পকেটে ঢুকবে তা কি বলে দিতে হবে? ফতেমা বিবিকে মনে করাতে হয় না লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কথা। তিনি নিজে থেকেই বলেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে বছরে যে ছ হাজার টাকা তিনি পান তার বদলে একশো দিনের কাজ দিলে ভাল হয়। সেই দাবিতে তাঁরা আন্দোলন করতে রাজি।

ফতেমা বিবিরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারেন কোন ইস্যু নিয়ে, কী পদ্ধতিতে আন্দোলন করতে হবে। জিজ্ঞেস না করতেই তিনি বললেন, বিজেপির হয়ে যাঁরা এই বিষয়ে কথা বলতে আসছেন, তাঁরা তো কিছুদিন আগেও তৃণমূলের এই দুর্নীতির সঙ্গী ছিলেন। বখরার হিসাবে গোলমাল হওয়াতে তাঁরা এখন বিজেপি করছেন। তাঁদের কি ভরসা করা যায়? তাঁরা যে আবার কিছুদিন পরে তৃণমূলে যোগ দেবেন না তা কি জোর দিয়ে বলা যায়? আমাদের নিজেদের লড়াই নিজেদেরই করতে হবে, আমরা সংগঠিত হচ্ছি। ফতেমার কিছু সঙ্গী বললেন, আচ্ছা, বলুন তো, তৃণমূল তো মানুষের থেকে চাঁদা তোলে না। তাহলে পঞ্চায়েতসহ বিভিন্ন নির্বাচনে এত টাকা খরচ করে কি করে? কোথা থেকে প্রশান্ত কিশোরের মত ভোটকুশলীদের বিপুল পারিশ্রমিক জোগানো হয়?

আমরা ভাবছি এবং বলছি বটে যে তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত দল, দুর্নীতির উৎস কোথায় তা কিন্তু সম্যক জানেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। তাঁরা লড়াইয়ের রাস্তাও বাতলে দিতে প্রস্তুত। ফতেমারা বলছেন, আমরা একশো দিনের কাজ চাই এবং ভবিষ্যতে যাতে তা দুশো দিনে রূপান্তরিত করতে পারি, সেই লড়াই লড়তে চাই। সে দাবি তো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে, সুতরাং আশা করা যায় তৃণমূল এই দাবি আদায়ের লড়াইয়ের বিরোধিতা করবে না।

প্রধানমন্ত্রীকে লেখা মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি সম্পর্কেও ফতেমারা বিশেষ উৎসাহী নন। তৃণমূল এ নিয়ে আন্দোলনে নামবে শুনে পরিষ্কার বললেন, যদি আমাদের ন্যায্য টাকা বকেয়া থাকত, আমরা কি সেই নিয়ে কথা বলতাম না? নিশ্চয়ই কারো কারো টাকা বকেয়া আছে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী যে চিঠি লিখেছেন তা কতটা তাদের জন্য, আর কতটা তাঁর দল পরিচালনার স্বার্থে তা ভেবে দেখতে হবে। উনি দলের দুর্নীতিকে আড়াল করতে লড়াইটাকে কেন্দ্র বনাম রাজ্য করে তুলতে চাইছেন বলে ফতেমাদের অভিমত। অবশ্যই কেন্দ্র কেন টাকা দিচ্ছে না, তা নিয়ে কথা বলা দরকার, কিন্তু নিজের দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কী করে লড়বেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেটাও তাঁকেই বলতে হবে।

অবাক হতে হয়। ইতিহাসের নানা সন্ধিক্ষণে, সাধারণ মানুষই লড়াই করার রাস্তা দেখিয়েছেন। নকশালবাড়িতে সাতজন কৃষক রমণী রাষ্ট্রের গুলিতে প্রাণ দিয়ে রাস্তা দেখিয়েছিলেন। সে রাস্তা ঠিক না ভুল তা অন্য বিতর্কের বিষয়, কিন্তু আজও নদীয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের ‘বাংলার মেয়ে’ বলছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং শাসক দলের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই রাস্তাতেই হবে। শুধুমাত্র সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বা সোশাল মিডিয়ায় এক বাম দল অন্য দলকে কটাক্ষ করে এ লড়াই জিততে পারবে না। একশো দিনের কাজের দাবির আন্দোলন নিয়ে কীভাবে কেন্দ্র, রাজ্য দুই সরকারের দিকেই আঙুল তোলা যায় তা-ও দেখিয়ে দিলেন। আসলে রাস্তার লড়াইতে থাকা মানুষজন রাজনীতি কিছু কম বোঝেন না। তাঁদের বলার ভাষা তত পালিশ করা নয়, এই যা।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.