নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এবারের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল যদি পর্যালোচনা করা যায়, তা যথেষ্ট হতাশাব্যঞ্জক। যদিও বিজেপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বিভিন্ন অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষ আনন্দিত, নারীবাদী আন্দোলনও কি সেভাবেই দেখবে এই ফলাফলকে? নারী আন্দোলনের কর্মী হিসাবে মনে করি, এই ফলাফলের আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ দরকার।
নরেন্দ্র মোদী তৃতীয়বারের জন্য শপথ গ্রহণ করার আগে আমরা বিভিন্ন ডিজিটাল মিডিয়ায় কারা কারা তাঁর সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন, কারা মন্ত্রী হবেন সেইসব ছবি দেখতে পাচ্ছিলাম। সেই বহু প্রদর্শিত ছবিগুলোতে মহিলা খুঁজতে গিয়ে সত্যি সত্যি আতসকাচের দরকার পড়ল। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এবারের লোকসভা নির্বাচনে এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো মাত্র নয় ৯.৫% মহিলা প্রার্থী দিতে পেরেছে। সফল প্রার্থীদের মধ্যে আছেন মাত্র ১৩.৬% মহিলা এবং নতুন মন্ত্রিসভায় মহিলা দশ শতাংশেরও কম। যে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫০% মহিলা, সে দেশে এই পরিসংখ্যানে খুশি হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। অথচ নির্বাচন কমিশন থেকে সংবাদমাধ্যম – সবাই মহিলা ভোটারের সংখ্যা কত বেড়েছে সে খবর, তার সঙ্গে মহিলা ভোটারদের ছবি ইত্যাদি বারবার আমাদের দেখিয়েছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মনে পড়ে, দেশের সমস্ত আইনসভায় ৩৩% আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে – এই আইন পাস হওয়ার পর একটি সচেতনতা তৈরির সভায় এক কলেজ পড়ুয়া তরুণ উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন বলেছিলেন ‘সংরক্ষণ তাদের দরকার হয় যারা সংখ্যায় কম। দেশে নারীর সংখ্যা তো কম নয়, তাই এই সংরক্ষণের কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’ এরপর একটু ব্যঙ্গের সুরে যোগ করেন ‘আমার ধারণা এই ধরনের দাবি শুধু নারীবাদীরাই করেন।’ প্রসঙ্গত, যে তরুণটি এই কথাগুলি বলেন তিনি নিজে দৃষ্টিহীন, দরিদ্র পরিবারের সন্তান। প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণের সুবিধা না থাকলে কলকাতার নামি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা সুযোগ থেকে হয়ত বঞ্চিতই হতেন। বোঝা যায়, নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা চারপাশে এত বেশি শুনেছেন যে নিজে প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষ হয়েও নারীদের জন্য সংরক্ষণের প্রয়োজন বুঝে উঠতে পারছেন না। আবার এক শহুরে, শিক্ষিত চাকুরিরতা তরুণীর কাছে শুনি, এই সংরক্ষণ নাকি হঠাৎ করে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই তরুণীর কোনো ধারণাই নেই, যে এই আইন পাস করানোর জন্য কত বছর ধরে আন্দোলন করা হয়েছে।
আরো পড়ুন ভুল করেছেন সাক্ষী মালিক
তাহলে কি ধরে নিতে হবে, সাধারণভাবে দেশের সাধারণ মানুষ মহিলাদের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার প্রয়োজন বোধ করেন না? তারই কি প্রতিফলন এবারের নির্বাচনের ফল? আরেকটু বিশ্লেষণ করে দেখি।
কর্ণাটকের প্রোজ্জ্বল রেবন্নার পরাজয় খুব একটা খুশি হওয়ার মত কিছু নয়। যে মানুষের বিরুদ্ধে হাজারের বেশি মহিলাকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা কিন্তু খুব কম নয়। অবশ্য তার কীর্তি সর্বসমক্ষে এসেছে হাসান কেন্দ্রে ভোটদান হয়ে যাওয়ার পরে। কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতনের কথা এলাকার মানুষ জানতেন না? তা সত্ত্বেও এই নারী নির্যাতনকারী প্রার্থী ছয় লক্ষের বেশি ভোট পেয়েছে এবং হেরেছে ৪২,৬৪৯ ভোটে। এই সংখ্যাগুলো যথেষ্ট চিন্তাজনক।
উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যাঁরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, তাঁরা কেন জানি না, ব্রিজভূষণ সিংয়ের পুত্র করণ সিংয়ের জয়ের কথা বলছেন না। একথা আমরা এখন সকলেই জানি যে কুস্তিগীরদের যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত হওয়ায় ব্রিজভূষণকে প্রার্থী না করে তার ছেলেকে বিজেপি তার কেন্দ্রে প্রার্থী করেছিল। ব্রিজভূষণ কিন্তু সদর্পে জানিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে যৌন অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে বলেই তার ছেলে জিতবে। ভোটের ফল বেরোবার পর দেখা গেল ওই আত্মবিশ্বাস মোটেই অকারণ ছিল না। পুত্র করণ সিং জিতেছেন ১,৪৮,৮৪৩ ভোটে। আজ তাই সাক্ষী মালিকের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে করে ‘দেশ কি বিটিয়া হার গয়ি।’
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।





