ডাঃ অপূর্ব মণ্ডল

গত ৪ জুন নির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষায় যখন ফোনে ইন্টারনেট ঘাঁটছি, তখন হঠাৎ রিংটোন বেজে উঠল। কোনো রোগীর নম্বর হতে পারে ভেবে অজানা নম্বরের ফোন হলেও তুললাম। হ্যাঁ, ঠিক তাই। গলা শুনেই বুঝলাম কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা শারীরিক নয়, মানসিক। শুনে যা বুঝলাম, গত বছর উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করেছিল। একবছর ড্রপ দিয়ে কোচিং নিয়েছে ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি অ্যান্ড এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট-ইউজি) পরীক্ষার জন্য। এবছর পরীক্ষায় যা নম্বর পেয়েছে তাতে কলকাতার কোনো ভাল মেডিকাল কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তার র‍্যাঙ্ক অনেক পিছনে চলে গেছে। ছেলেটি বলল, ‘স্যার, এখন আমি কী করব?’ ডাক্তার হিসাবে এই সমস্যার সমাধান আমার কাছে ছিল না। সেই মুহূর্তে উত্তর দিতে না পেরে, সমস্ত খবর নিয়ে পরে জানাব বলে ফোন রেখে দিলাম। ভুক্তভোগী ওই ছেলেটির সামনে পরাজয়ের দোষ মাখা এক দীর্ঘ কালো রাত্রি। তার বাবাও ঠিক বুঝতে পারছেন না ছেলের ভবিষ্যৎ কী হবে?

এরপর নির্বাচনের ফলাফলের দিকে আর মন গেল না। খোঁজ নেওয়া শুরু করলাম। যা জানলাম তাতে বুঝলাম, ভারতবর্ষের সবথেকে বড় শিক্ষা কেলেঙ্কারিগুলোর অন্যতম ঘটে গিয়েছে। গরমিলগুলো দেখলে সকলেরই চক্ষু চড়কগাছ হবে। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) হল সরকার দ্বারা গঠিত একটি সংস্থা, যার দায়িত্ব নিট-ইউজি, জেইই-মেন, সিম্যাট, জিপ্যাট ইত্যাদি পরীক্ষা চালানো। এই সংস্থা সরকার দ্বারা গঠিত হলেও এটি সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০ অনুযায়ী নথিভুক্ত একটি সংস্থা। এনটিএ-র উপর বিভিন্ন পরীক্ষার দায়িত্ব দিয়ে সরকার নিজের দায় ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছে। সে যাই হোক, নিট-ইউজিতে গন্ডগোল কোথায় হল? ফলাফলে দেখা গেল ১০০% নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে ৬৭ জন। ৭০০ পেয়েছে ২,০০০ জনের বেশি। যারা ৭২০ নম্বরের পরীক্ষায় ৬১০ পেয়েছে, তাদেরও র‍্যাঙ্ক ৬৪ হাজারে!

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠল এরকম এক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এতজন এত নম্বর পেল কী করে? এবছর ছাত্রছাত্রীদের গড় নম্বর গত বছরের তুলনায় ৪৪ বেড়ে গেছে, যা অতীতে কখনো হয়নি। তাহলে নিশ্চয়ই প্রশ্নের মান নেমে গেছে? কিন্তু ২০১৩ সালের আগে রাজ্যে রাজ্যে যখন জয়েন্ট এন্ট্রান্স বোর্ডের মাধ্যমে ডাক্তারি শিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষা হত, তখন কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি ছিল, প্রশ্নের মান গোটা দেশে একইরকম করতে হবে এবং উন্নত করতে হবে। বোঝাই যাচ্ছে, এক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা ঘটেছে। আরও দেখা গেল, কিছু পরীক্ষার্থী ৭১৯, ৭১৮ কিম্বা ৭১৭ নম্বর পেয়েছে। যা আদতে সম্ভব নয়। কেন?

নিট পরীক্ষার পূর্ণমান ৭২০ এবং সময় তিন ঘন্টা। মোট ১৮০টি প্রশ্ন চারটি বিষয় থেকে আসে। প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন। চারটি অংশের প্রতিটিতে এ ও বি – দুটি করে আলাদা সেট তৈরি করা হয়। এ সেটে আবশ্যিক ৩৫টি প্রশ্ন এবং বি সেটে ১৫টি প্রশ্ন থাকে, যার মধ্যে দশটির উত্তর দিতে হয়। প্রতিটি প্রশ্নের মান চার। সঠিক উত্তর দিলে +৪, উত্তর না দিলে শূন্য, ভুল উত্তর দিলে -১ পাওয়া যায়। অর্থাৎ সমস্ত প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলে ১৮০×৪=৭২০ নম্বর পাবে। একটি উত্তর না দিলে ৭১৬, একটি ভুল করলে ৭১৫। তাই কেউ ৭১৯ নম্বর পেল কী করে, এ প্রশ্নও উঠছে। এনটিএ ৫ জুন জবাব দিল, কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্নপত্র দিতে কিছু সমস্যা হয়েছিল, ফলে ছাত্রছাত্রীদের সময় নষ্ট হয়েছে। তাই সুপ্রিম কোর্টের ১৩ জুন ২০১৮ তারিখের রায়ের ভিত্তিতে কিছু পরীক্ষার্থীকে গ্রেস মার্ক দেওয়া হয়েছে। কিছু পরীক্ষার্থী মানে কতজন? ৬ জুন তারা বলে সংখ্যাটা ১,৫৬৩। ইন্টারনেটে খুঁজে দেখলাম, গ্রেস মার্ক দেওয়ার রায় কিন্তু মেডিকাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যে পরীক্ষা নিয়ে মামলায় ওই রায় দেওয়া হয়, তা ছিল একটি অনলাইন পরীক্ষা এবং পরীক্ষার্থী ছিল ৬০,০০০-৭০,০০০। নিট-ইউজি একটি অফলাইন পরীক্ষা এবং পরীক্ষার্থী ২,৩০০,০০০। তাই প্রশ্ন রয়েই গেল।

এই অস্পষ্টতার কারণে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবকদের প্রশ্নবাণ এনটিএ বিদ্ধ করেই চলেছে। বিভিন্ন শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, ছাত্র সংগঠন এর প্রতিবাদে সরব হল। সময়ের পরিবর্তে উচিত ছিল সময় দেওয়া, সময়ের পরিবর্তে গ্রেস মার্ক কেন? নাকি গ্রেস মার্ক দেওয়ার জন্যই কিছু ছাত্রছাত্রী সময় কম পেল? ৬ জুন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এনটিএ যা বলল, তাতে বোঝা গেল তারা কী বলছে নিজেরাও জানে না। প্রথমে বলেছে উত্তর দেওয়ার দক্ষতার ভিত্তিতে গ্রেস মার্ক দেওয়া হয়েছে। তারপরে বলেছে যাদের গ্রেস মার্ক দেওয়া হয়েছে তারা (-) ২০ থেকে ৭২০ পর্যন্ত পেয়েছে। গ্রেস মার্ক পেয়েও যারা (-) ২০ পেয়েছে তাদের কীভাবে এনটিএ দক্ষ বলছে, আমি অন্তত বুঝতে পারিনি। এরকম একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ছজন গ্রেস মার্ক পেয়ে ৭২০ পেয়েছে! প্রশ্ন উঠল, কারা দক্ষ তুমি বুঝলে কী করে? এনটিএ বলেছে রেকর্ডেড ভিডিও থেকে দেখা হয়েছে, কোথায় কোথায় সময়ে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়নি। অথচ পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে এনটিএ জানিয়েছিল, একটি কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোথাও প্রশ্নপত্র দেওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, ছত্তিসগড়ের কিছু পরীক্ষার্থী হাইকোর্ট যাওয়ার পর এনটিএ বুঝতে পারল, ওই চারটি রাজ্যেও কিছু কেন্দ্রে সময় নষ্ট হয়েছে। ৬ জুন সে কথা প্রকাশ্যে মানল। অথচ এনটিএ-র বক্তব্য ছিল, তারা তাদের কন্ট্রোল অফিস থেকে সমস্ত কেন্দ্রের লাইভ সিসিটিভি দেখবে। এ নিয়ে তাদের গর্বেরও অন্ত ছিল না। অথচ তাদের কথাতেই কিন্তু প্রমাণ হচ্ছে, তাদের পরিকাঠামো দুর্বল।

এনটিএ গর্ব করে জানিয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হল নিট-ইউজি, যাতে ২৩ লক্ষ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দেয়। আমি বলব, কে বলেছিল তোমাদের এত বড় পরীক্ষা নিতে? প্রত্যেক রাজ্যে রাজ্যে যখন পরীক্ষা হত, তখন তো অনেক কম ছাত্রের মূল্যায়ন করতে হত। ব্যাটারি ডেড হওয়া আইফোনের থেকে ছোট কিপ্যাড ফোন অনেক কাজের নয় কি? তাই এনটিএ-র ‘দম্ভ নাহি সাজে’। তাই তুমি ‘মৌন হয়ে সসংকোচে লাজে’ থাকো। আর কে বলেছিল এত তাড়াহুড়ো করে ফল বার করতে? ছাত্রছাত্রীরা জানত ৩০ দিনের মধ্যে রেজাল্ট বেরোবে। পনেরো দিন আগেই নির্বাচনের ফলাফলের দিন নিট-ইউজি ফল প্রকাশ করতে হল কেন? এতে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে আমারও সন্দেহ আরও পাকাপোক্ত হয়েছে, যে এই বিশাল কেলেঙ্কারি লুকনোর উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত। সংবাদমাধ্যম সহ সব মানুষ ব্যস্ত থাকবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে। ফলে সহজেই চোখ এড়ানো যাবে। বিশেষ করে যখন উচ্চমাধ্যমিকে বিফল হওয়া ছাত্রও নিট-ইউজি-র মত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ৭০০ নাম্বার পেয়ে যায়, একের পর এক দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে থাকে, তখন এছাড়া আর কী-ই বা ভাবা যায়?

এক নম্বর র‍্যাঙ্ক পাওয়া ৬২ থেকে ৬৭ সিরিয়াল নম্বরের ছাত্রছাত্রীদের এনরোলমেন্ট নম্বর দেখে বোঝা যাচ্ছে, তারা একই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছে। জানা গেছে সেটি হরিয়ানার একটি কেন্দ্র। অর্থাৎ একই কেন্দ্রের ছজন ১০০% নম্বর পেয়েছে। এমনটি দুর্নীতি না হলে কী করে সম্ভব? আরও একটি ব্যাপার নিট-ইউজি পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরপরই পত্রপত্রিকায় দেখা গিয়েছিল। ৫ মে একটি এজেন্সি পাটনা পুলিশকে জানায় প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কথা। এফআইআর হয় এবং ১৩ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তারপরেও এনটিএ প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা অস্বীকার করে।

২০১৩ সালে দুর্নীতি রুখতে এবং দেশের সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নের গুণমান একই রাখতে, এমনকি গুণমান বৃদ্ধি করতে রাজ্যভিত্তিক প্রবেশিকা পরীক্ষা বন্ধ করে শিক্ষাবিদ, ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের তোয়াক্কা না করে গায়ের জোরে নিট পরীক্ষা চালু করা হয়। সেবছর নিট পরীক্ষা হলেও, প্রতিবাদ তীব্র হওয়ার ফলে তারপর তিনবছর এই কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। আমরা যারা ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট এন্ট্রান্স একজামিনেশন দিয়ে মেডিকাল বা ডেন্টাল পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম, তারা সেদিন প্রশ্ন তুলেছিলাম। বলেছিলাম, কেন্দ্রীয় পরীক্ষা হলে আরও বড় দুর্নীতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। তা আজ প্রমাণিত। তাই দাবি ওঠা উচিত, এনটিএ দিয়ে নয়, মেডিকাল প্রবেশিকা পরীক্ষা রাজ্যে রাজ্যে একটি নির্বাচিত স্বশাসিত সংস্থার মাধ্যমে নিতে হবে।

কিন্তু এবছর যে কেলেঙ্কারি হল, তার কী হবে? সুপ্রিম কোর্টে এনটিএ মেনে নিয়েছে যে ১,৫৬৩ জনের গ্রেস মার্ক দেওয়ার মধ্যে অসঙ্গতি আছে। তাদের আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে। আসলে অনেক বড় দুর্নীতিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এই আত্মপক্ষ সমর্থন। কিন্তু নিট-ইউজি পরীক্ষা কেলেঙ্কারির বিচারবিভাগীয় তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার কথা এলই না। স্বভাবতই কাউন্সেলিং স্থগিত থাকছে না। সুপ্রিম কোর্টে সে দাবি না উঠলেও রাজপথে ওঠা উচিত। এখন এমনও শোনা যাচ্ছে, বহু জায়গায় ভুয়ো পরীক্ষার্থীকে দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়েছে। বিষয় পিছু ১৫ – ২০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে উত্তরপত্র দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এনটিএ-কে এরপরেও মেনে নেওয়া যায়?

আরো পড়ুন ডাক্তারি পাস করতে নেক্সট পরীক্ষা: পরিকল্পিত বিপর্যয়

সবথেকে বড় কথা, সারা ভারতবর্ষে এখন প্রতিবছর প্রায় এক লক্ষ ডাক্তার পাস করে বেরোয়, যার মধ্যে ৬০,০০০ ডাক্তার প্রাইভেট কলেজ থেকে পাস করে। এই কলেজগুলোর ফিজ পাঁচ বছরে এক কোটি টাকারও বেশি। সরকারি কলেজে পড়ার সুযোগ পায় মাত্র ৪০,০০০ ছাত্রছাত্রী। এইরকম কেলেঙ্কারির ফলে মেধাবী ছাত্রদের বদলে সরকারি কলেজগুলোতে ঢুকবে টাকাওয়ালা কিছু দুর্নীতিবাজ। আজ যারা বেপথে ডাক্তার হতে এসেছে, বড় বড় ঘরের ছেলেমেয়েরা, যাদের জীববিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণাতেই গোলমাল, তারা ডাক্তার হয়ে রক্তমাংসের মানুষের চিকিৎসা কীভাবে করবে, ভাবলে ভয়ে বুক কাঁপে। এই মহান পেশার সাদা অ্যাপ্রন কালো দাগে ভরে উঠবে। মানুষ অসুস্থ হলে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে ডাক্তারের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। ভেবে দেখুন, কাদের উপর আমরা ভরসা রাখব। মেডিকাল কলেজগুলোর পাঠক্রম, পঠনপাঠন, পরীক্ষা পদ্ধতি এমনিতেই ছাত্রছাত্রীদের ভাল ডাক্তার হওয়ার অন্তরায়। কলেজ এবং হোস্টেলের পরিবেশ, র‍্যাগিং, মেডিকাল নৈতিকতাকে পদদলিত করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করে যায় সরকারি দলের পেটোয়া ছাত্র সংগঠনগুলো। এখানে যখন টাকার বিনিময়ে আসন কিনে কেউ এই পরিবেশে ঢুকবে, তখন সে একটি নীতিবর্জিত দুশ্চরিত্র ডাক্তার তৈরি হবে।

তাই এই কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুধু নিট পরীক্ষার্থীদের বা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নয়; এ আন্দোলন আপামর মানুষের। তাঁরা এই দুর্নীতির কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই শিউরে উঠছেন। একদিকে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা চলছে, অন্যদিকে জনসাধারণের চিকিৎসা নিয়ে। এবারের ২৪ লক্ষ পরীক্ষার্থীর মধ্যে সৎ মানসিকতা নিয়ে, নিতান্তই মানুষের সেবা করার ইচ্ছায় জীবনের অনেকগুলো দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে শুধু সরকারি মেডিকাল কলেজে একটা আসন পাওয়ার আশায়, এমন পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। তারা ব্যর্থ হলে সমাজের লাঞ্ছনার চাপে বেছে নিতে পারে আত্মহত্যার পথ।

দেশের শিক্ষার হাল এমন, যে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে চাইলেও পরীক্ষার কোনো নিয়ম নেই, ফলাফলের কোনো স্বচ্ছতা নেই, ভর্তির কোনো নির্দেশিকা নেই, নেই শিক্ষক নিয়োগ, নেই চাকরি, নেই অন্নের সংস্থান। নিজে একজন ডাক্তার হয়ে আজকের ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা় দেখে নিঃসন্দেহে বলতে পারি, গত কয়েক বছরে সরকার মুখে যা-ই বলে থাক, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে কিন্তু শিক্ষার স্বাস্থ্য ক্রমশ বেহাল হয়েছে। অতীতে ডাক্তারি পরীক্ষার বিভিন্ন দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলেই শুধু পরীক্ষক পরিবর্তন করা হয়েছে। এক দেশ এক পরীক্ষার নামে আসলে আরও বড় দুর্নীতিগ্রস্ত পরীক্ষা নিয়ামক বা এজেন্সিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার প্রমাণ এবছরের নিট কেলেঙ্কারি। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ কিংবা ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের পরিকল্পনাও তাই।

আরেকটি কথা বলা বিশেষ দরকার। ছেলেমেয়েদের মেধার মূল্যায়ন করতে গিয়ে আসলে নিলামে নেমেছে বড় বড় কোচিং মাফিয়ারা। কে কত দামে কিনতে পারে পরীক্ষার্থীর স্বপ্নকে, কে কতটা যান্ত্রিক করে তুলতে পারে সৃজনশীল ছাত্রছাত্রীদের – চলছে সেই প্রতিযোগিতা। কোটার কোচিং স্কুলগুলোর ফি বার্ষিক প্রায় দেড় লাখ টাকা। ফলে অনেক অভিভাবককে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে ঘটি বাটি বিক্রি করতে হয়। কোচিং সংস্কৃতি এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যায়তনিক, পারিবারিক ও সামাজিক চাপ তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্তও করে। সেই রাজস্থানের কোটাকে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতের ‘শিক্ষার কাশী’, ‘পবিত্র শহর’ বলে ঘোষণা করেছেন। যারা বছরের পর বছর কোচিংয়ে টাকা খরচ করে, দিনরাত এক করে এবছর ভালো নম্বর পেল কিন্তু র‍্যাঙ্ক পেল না, তাদের মানসিক অবস্থা নিঃসন্দেহে খুব খারাপ। সাধারণ ঘরের মানুষই যেখানে দেশের সিংহভাগ, সেখানে ডাক্তারির একমাত্র প্রবেশিকা পরীক্ষায় এমন ভয়ঙ্কর দুর্নীতি কালিমালিপ্ত করে চিকিৎসার পেশাকে। আমি আমার সেই নিট-ইউজি পরীক্ষার্থী রোগীকে ডেকে, কথা বলে রাস্তায় স্বাক্ষর সংগ্রহ ও বিক্ষোভে সামিল হয়েছি। আপনারাও সামিল হবেন আশা রাখি।

নিবন্ধকার পেশায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্য আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.