নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর দিন কুড়ি কেটে গিয়েছে। ক্রমে আরও বহুদিন কেটে যাবে, তবে অদূর ভবিষ্যতে একুশ শতকীয় ভারত রাষ্ট্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস যদি লেখা হয়, সেক্ষেত্রে গ্রেগরিয় ক্যালেন্ডারের ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুন তারিখটি নিয়ে একটি গোটা অধ্যায় লেখা হলে তা আশ্চর্যের হবে না। উপমহাদেশের সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলে অতি দক্ষিণপন্থার শক্তি ক্ষয়ে আমাদের সাময়িক স্বস্তিবোধ যেমন সত্য, তেমন ঠিক সেদিনই প্রকাশিত সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-ইউজির ফলাফলে যে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার দিকে চলে গেল, সে লজ্জাও কঠিন সত্য।

শেষ খবর পাওয়া অনুযায়ী, নিট পরীক্ষার আয়োজক সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএর শীর্ষপদ থেকে সুবোধ কুমার সিংকে সরানো হয়েছে, তাঁর জায়গায় আনা হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার এবং ইন্ডিয়া ট্রেড প্রোমোশন অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান প্রদীপ সিং খারোলাকে। সিবিআই তদন্ত শুরু হয়েছে, ওদিকে বিপাকে পড়ে তড়িঘড়ি নতুন আইন প্রণয়ন হয়েছে, নাম ‘The Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Act, 2024’। এই আইনের বলে পরীক্ষা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তির সর্বোচ্চ দশ বছরের জেল এবং এক কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে। এর সঙ্গেই জানিয়ে রাখা ভাল, নিট-ইউজি’র ফলাফল নিয়ে দেশজোড়া ডামাডোলের মধ্যেই নিট-পিজি পরীক্ষার মাত্র একদিন আগে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে ‘২৩ জুন ২০২৪ তারিখে যে নিট-পিজি পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে সে পরীক্ষা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নিট-পিজি পরীক্ষার আয়োজক অবশ্য এনটিএ নয়, মেডিকাল গ্র্যাজুয়েটদের স্নাতকোত্তর স্তরে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত এই পরীক্ষার ব্যবস্থা করে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের অধীনস্থ ন্যাশনাল বোর্ড অফ এগজামিনেশন্স। সে পরীক্ষাও বাতিল হয়ে যাওয়ায় স্বভাবতই ক্ষোভে ফুঁসছেন পরীক্ষার্থীরা। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন ইতিমধ্যেই তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এই সরকারি পরিকাঠামোকে সরাসরি ‘অপদার্থ ও ভেঙে পড়া’ বলে আক্রমণ করেছেন।

তবে কেরিয়ার নিয়ে অথৈ জলে পড়া ডাক্তারির ছাত্রছাত্রীরা অন্তত একটি কথা ভেবে সংহতি অনুভব করতে পারেন, তা হল, সরকারি অযোগ্যতার শিকারের তালিকায় কেবল তাঁরা একা নন, সেখানে বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের বিভিন্ন শাখার ছাত্রছাত্রীরাও আছেন, যাঁরা ভবিষ্যতে গবেষণা করবেন ভেবে ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট (নেট) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নিট পরীক্ষা নিয়ে অশান্তির মাসেই ইউজিসি নেট এবং জয়েন্ট সিএসআইআর-ইউজিসি নেট, এই দুই পরীক্ষাও দিব্যি বাতিল হয়ে গেল। গত প্রায় এক-দেড় দশক ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরীক্ষা নিয়ে যে দুর্নীতি শুরু হয়েছিল, সে দুর্নীতি বোধহয় তুঙ্গে পৌঁছল এই অভূতপূর্ব বাতিল মিছিলে।

২০২৪ সালের জুন মাসের ইউজিসি নেট পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল গত ১৮ জুন। সিবিটি বা কম্পিউটার বেসড টেস্টিংয়ের বদলে এবছরের পরীক্ষা ছিল পিবিটি, অর্থাৎ পেপার বেসড টেস্টিং। অপটিকাল মার্ক রেকগনিশন (ওএমআর) শিটে পরীক্ষা দিয়েছিলেন ছাত্রছাত্রীরা। পরীক্ষা নেওয়ার পরদিনই অসঙ্গতি থাকার অভিযোগে তা বাতিল করে দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের তরফে কারণ হিসাবে যা জানানো হয় তা হল, “on the basis of inputs from Indian Cyber Crime Coordination Centre (I4C) under the Ministry of Home Affairs, prima-facie indicating that the integrity of the examination may have been compromised.” ইউজিসি নেটের এক সপ্তাহ পরে ২৫-২৭ জুন জয়েন্ট সিএসআইআর-ইউজিসি নেট হওয়ার কথা ছিল। নিট-পিজি পরীক্ষার ক্ষেত্রে যেমনটি করা হল, সিএসআইআর-ইউজিসি নেটেও ঠিক তাই। পরীক্ষা নেওয়ার আগেই তা স্থগিত। ২১ জুন আয়োজক সংস্থার তরফে দেওয়া সরকারি বিবৃতিতে কারণ হিসাবে দেখানো হল, ‘unavoidable circumstances as well as logistic issues’। প্রসঙ্গত, এই আয়োজক সংস্থার নাম এনটিএ।

ইউজিসি নেট এবং জয়েন্ট সিএসআইআর-ইউজিসি নেট – চলতি কথায় আমরা যাকে ‘জেনারেল লাইন’ বলি, সেই বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য শাখার বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার জন্য এবং সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য এই দুই ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট নেওয়া হয়। এছাড়াও স্নাতকোত্তর ও গবেষণা স্তরে আরও নানা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট রয়েছে, যেমন স্নাতক স্তরের পর আইআইটি, আইআইএসসি, আইআইআইটি এবং এনআইটিতে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার জন্য রয়েছে জয়েন্ট অ্যাডমিশন টেস্ট ফর এমএসসি (সংক্ষেপে জ্যাম), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার ছাত্রছাত্রীদের এমটেক, পিএইচডিতে প্রবেশের জন্য রয়েছে গ্র্যাজুয়েট অ্যাপটিটিউড টেস্ট ফর এঞ্জিনিয়ারিং (সংক্ষেপে গেট), ডাক্তারিতে গবেষণার জন্য রয়েছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ – জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ (সংক্ষেপে আইসিএমআর – জেআরএফ)। তবে নেট পরীক্ষা বলতে আমরা সাধারণভাবে ওই দুই নেট নামধারী পরীক্ষাকেই বুঝে থাকি। জ্যাম বা গেট যেমন বছরে একবারই হয়, দুই নেট পরীক্ষা হয় বছরে দুবার। একবার জুন মাসে, আরেকবার ডিসেম্বর মাসে। দুটি পরীক্ষার পার্থক্য বলে দেওয়া ভাল। বাণিজ্য, কলা, সমাজবিজ্ঞানের নানা বিষয় মিলিয়ে ইউজিসি নেটের আওতায় পড়া বিষয়ের সংখ্যা আশিরও বেশি। সেখানে কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর) ও ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের (ইউজিসি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত নেটের আওতায় পড়ে কেবল বিজ্ঞানের পাঁচটি শাখা – জীবনবিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং গণিত। নিজে এই দ্বিতীয় নেটটি বারপাঁচেক দেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই নেটে জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপের দুটি আলাদা মেধা তালিকা প্রকাশ করে সিএসআইআর এবং ইউজিসি, বৃত্তির পরিমাণ একই। যাঁরা জেআরএফের কাট অফের চেয়ে কিছু কম নম্বর পান, তাঁদের ক্ষেত্রে লেকচারারশিপ বা এলএসে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকে, কিন্তু তাঁরা কোনো গবেষণা বৃত্তি পান না। গত কয়েক বছর ধরে দুই নেটেরই আয়োজনের দায়িত্ব এনটিএকে দেওয়া হয়েছে।

পিএইচডি গবেষণার জন্য ইউজিসি বা সিএসআইআর-ইউজিসি নেটে কৃতকার্য হওয়াই যে একমাত্র পথ, তা অবশ্য নয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার ছাত্রছাত্রীরা গেট পরীক্ষায় ভালো র‍্যাঙ্ক করেও আইআইটি বা সমতুল্য কোনো কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করার সুযোগ পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁরা নেট-জেআরএফের সমান পরিমাণ বৃত্তি পেতে পারেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে, যাকে বলা হয় ইন্সটিটিউট ফেলোশিপ। এই মুহূর্তের পরিস্থিতি জানা নেই, তবে নির্দিষ্ট বিষয়ে গবেষণা প্রস্তাব (রিসার্চ প্রোপোজাল) জমা দিয়ে বৃত্তির জন্য আবেদন করার যে প্রক্রিয়া মূলত পশ্চিমি দেশগুলোতে চালু হয়েছে, সে সুবিধা এদেশেও কয়েক বছর আগে ছিল। অন্তত আমার পরিচিত কলা বিভাগের কিছু মানুষ সেভাবেই পিএইচডি করেছেন। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে পিএইচডিতে ভর্তির জন্য নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। উদাহরণস্বরূপ ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইন্সটিটিউট বা আইএসআইয়ের নাম করা যায়। কিন্তু সেক্ষেত্রেও নেট বা গেট কোনো একটি পরীক্ষায় ভালো র‍্যাঙ্ক থাকলে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়। এছাড়াও এই নেট-জেআরএফের সমপরিমাণ ইন্সটিটিউট ফেলোশিপের সুবিধা মূলত পেয়ে থাকেন কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত শিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণারত ছাত্রছাত্রীরাই। পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারি স্তরে স্টেট এলিজিবিলিটি টেস্ট বা সেট পরীক্ষা নেওয়ার প্রচলন আছে। তা দিয়েও পিএইচডি করার সুযোগ থাকে, তবে সেক্ষেত্রে সিএসআইআর বা ইউজিসির মত কোনো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান, যারা মাসে মাসে মোটা টাকা বৃত্তি দেয়, তাদের সাহায্য পাওয়া যাবে না। সেট পাশ করে ছাত্রছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বৃত্তি (যা বেশিরভাগ রাজ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই নেই, থাকলেও তার পরিমাণ অনেক কম) বা অন্যান্য উৎসের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে নেটের ভাল ফল করাই সবচেয়ে নিরাপদ। এমনকি ভবিষ্যতে অধ্যাপক হতে গেলেও নেট পরীক্ষার র‍্যাঙ্ক বাধ্যতামূলক। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের জন্য নিশ্চিত অর্থ সংস্থান এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ যদি লক্ষ্য হয়, সেক্ষেত্রে নেট পরীক্ষার বিকল্প নেই।

কিন্তু এই মুহূর্তে এই পরীক্ষার ভবিষ্যৎ কী?

৬,৩৫,৫৮৭ জন মহিলা পরীক্ষার্থী; ৪,৮৫,৫৭৯ জন পুরুষ পরীক্ষার্থী এবং ৫৯ জন তৃতীয় লিঙ্গের পরীক্ষার্থী – সব মিলিয়ে এবছরের জুন মাসের ইউজিসি নেট পরীক্ষার জন্য ফর্ম পূরণ করেছিলেন মোট ১১,২১,২২৫ জন পরীক্ষার্থী। এঁদের মধ্যে পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন ৯,০৮,৫৮০ জন। সিএসআইআর-ইউজিসি নেটে আবেদনপত্র পূরণ করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এখনো জানতে পারিনি। বিষয় সংখ্যা কম হওয়ায় ওই নেটের পরীক্ষার্থী সংখ্যা ইউজিসি নেটের তুলনায় কমই হয়ে থাকে, তবে সেটা লক্ষের নিচে নিশ্চিতভাবেই নয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই যেমন মোট ২,১৯,১৮৬ জন পরীক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন, পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন ১,৭৫,৩৫৫ জন।

যাঁরা জুন মাসের ইউজিসি নেট পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন, তাঁদের সকলের কাছেই এই পরীক্ষাটি যে জীবনমরণ সমস্যা, তা নিশ্চয়ই নয়। অনেক ছাত্রছাত্রীই থাকেন, যাঁরা নেটের উপর নির্ভরশীল নন, শুধু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে আসেন। কেউ হয়ত প্রথমবার নেট পরীক্ষা দিচ্ছেন, প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হয় তা না জেনেই এসেছেন। আমাদের সময়েও দেখেছি, এখনও খুঁজলে পাওয়া যাবে, কিছু ছাত্রছাত্রী আসেন যাঁদের কাছে নেট দেওয়া ‘জাস্ট ফর ফান’। অনেকে হয়ত আগেই জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপের কাট অফ ক্লিয়ার করেছেন, কিন্তু আবার এসেছেন নিজের মেধা আরও একটু যাচাই করে নিতে। কিন্তু এই গোত্রের ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা কতই বা? কাট অফ ক্লিয়ার করে প্রতিবার মেধা তালিকায় জায়গা পান ১,৫০০-২,০০০। ফলে সব মিলিয়ে এই সংখ্যাটা এক লক্ষ হবে কিনা সন্দেহ আছে। তবু তর্কের খাতিরে যদি এক লক্ষই ধরে নিই, পড়ে থাকে আট লক্ষেরও বেশি ছাত্রছাত্রী। এঁদের সঙ্গে যদি সিএসআইআর-ইউজিসি নেটের ওই সম্ভাব্য দেড় থেকে দু লক্ষ ছাত্রছাত্রী যোগ করা হয়, তাহলে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় দশ লক্ষের আশেপাশে। দীর্ঘ সময় ধরে এই যে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী নেটের প্রস্তুতি নিলেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই হয়ত এবছর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পেয়েছেন, এবার কোনো একটা কাজে না ঢুকলে নিতান্তই বিপাকে পড়বেন, চাকরির এমন আকালে পাঁচ বছরের গবেষণা বৃত্তির উপর যাঁরা ভরসা রেখেছিলেন, পরীক্ষা দিয়ে আসার পরদিনই বা পরীক্ষা দিতে যাওয়ার চার-পাঁচদিন আগে এমন সব সিদ্ধান্ত, পরে আবার কবে পরীক্ষা হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা – এসব তাঁদের মনের উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে সে কথাটুকু যাঁরা বুঝতে চাইলেন না, তাঁদের স্রেফ অপরাধী ছাড়া এই মুহূর্তে কিছু ভাবতে পারছি না।

ইউজিসি নেট বাতিল হওয়ার দিন থেকে সোশাল মিডিয়ায় অনেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন নেটের পুরো পরিকাঠামোটিকেই। বিশেষত, বাংলা পরীক্ষায় যে ধরনের প্রশ্ন দেওয়া হয়, তার ভিত্তিতে কীভাবে একজন গবেষক বা অধ্যাপককে নির্বাচন করা হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তাঁরা। যে ছবিটি বিশেষ ভাইরাল হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত একটি উপন্যাস থেকে একটি বাক্য তুলে দিয়ে এমসিকিউ প্রশ্নের বিকল্প দেওয়া হয়েছে। সন্দেহ নেই, গবেষক বা অধ্যাপক নির্বাচন যেখানে লক্ষ্য, সেখানে এ ধরনের প্রশ্ন দেওয়ার চিন্তা নিম্নমেধার পরিচয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরেই প্রশ্নের মানের এমন অবনতি ঘটেছে। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে এহেন নিম্নমেধার মোকাবিলা করতে শুধু উচ্চমেধা বা বিচারবুদ্ধিই আর যথেষ্ট নয়, দরকার তোতার ‘পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো কাগজ খসখস গজগজ’ করার মত কোনও টোটকা (যাকে দিব্যি প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে তুলনা করা যায়)। বহু ছাত্রছাত্রীই নেট-বিমুখ হয়েছেন, বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। তাঁরা আজ সুযোগ পেয়ে এর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন।

আরো পড়ুন কেন লাশকাটা ঘর বেছে নেয় পিএইচডি স্কলার?

এমনকি পরীক্ষা আয়োজনেও চূড়ান্ত গাফিলতির অভিযোগ এসেছে পরীক্ষার্থীদের তরফে। একে তো আবেদন করতে ভালরকম টাকা গুনতে হয় (জেনারেল পরীক্ষার্থীদের ১,১৫০ টাকা, জেনারেল-ইডব্লিউএস ও ওবিসি পরীক্ষার্থীদের ৬০০ টাকা, তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি ও বিশেষভাবে সক্ষম পরীক্ষার্থীদের ৩২৫ টাকা)। আর্থিকভাবে যাঁদের অবস্থা সচ্ছল, তাঁরা ‘এ আর এমন কী টাকা’ বলতেই পারেন, কিন্তু এই সুখের বুদবুদের বাইরে যে ভারতবর্ষ আছে, সেখানে পরীক্ষায় বসতে এতখানি টাকা দেওয়াও বিরাট অংশের মানুষের কাছে বিলাসিতা। অকৃতকার্য হলে পুরো টাকাই নষ্ট। তাছাড়া এবছর এত দূরে দূরে পরীক্ষার সিট পড়েছে যে রীতিমত ট্রেনের টিকিট কেটে, থাকার ব্যবস্থা করে পরীক্ষা দিতে যেতে হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। সঙ্গে যোগ করতে হবে, গরমের মধ্যে পরীক্ষা হয়েছে অথচ অনেক পরীক্ষা কেন্দ্রে সঠিক পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল না, ঠিকঠাক শৌচালয় ছিল না। অবশ্য এ নেহাতই আমাদের অরণ্যে রোদন। ‘ভিক্সিত ভারত’-এ এসব ছোটখাটো ব্যাপারকে অত গুরুত্ব দিলে চলে নাকি?

ব্যঙ্গ করা এখানে আমার মূল উদ্দেশ্য নয়। গবেষক ও অধ্যাপক নির্বাচনে নেটের মত একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (যার সব প্রশ্নই এমসিকিউ) অসারতা বিষয়ে যে তর্কটি উঠছে, তাতে নেট উঠে যাওয়াই ভাল, এমন একটি বক্তব্য উঠে আসছে। বিষয়টি কিন্তু এত একরৈখিক নয় বলেই আমি বিশ্বাস করি। গবেষণা এক দীর্ঘমেয়াদি কাজ। সেখানে শুধু বিষয়টি জানলেই হয় না বা পরীক্ষার খাতায় ভুরি ভুরি নম্বর পেলেই হয় না। গবেষণা দাবি করে একটি অনুসন্ধিৎসু মন, যে সর্বদা খণ্ডন করতে চাইবে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বকে। এখানেই বিজ্ঞানের গুরুত্ব। কলা বা বাণিজ্য শাখার বিষয়ে গবেষণাও এই পদ্ধতিতেই হয়। অর্থাৎ গবেষণা ব্যাপারটিই সর্বতোভাবে বৈজ্ঞানিক। সেখানে একজন ছাত্র বা ছাত্রী কতখানি যোগ্য, তা তিন ঘন্টার এমসিকিউ পরীক্ষার দ্বারা বোঝা আদপেই সম্ভব নয়। সিএসআইআর-ইউজিসি নেটের প্রশ্নের মান নিয়ে এখনো কথা ওঠেনি, কিন্তু গবেষণার মন কারোর আছে কিনা বা কারোর মধ্যে গবেষক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কতটা, তা যদি বিচার্য বিষয় হয়, তাহলে ইউজিসি এবং সিএসআইআর-ইউজিসি, দুধরনের নেটেরই অসারতা নিয়ে কথা ওঠা উচিত।

অন্নদাশঙ্কর রায় একবার লিখেছিলেন, “রুটিন ও এগজামিনের যুগল হস্তের ঘন ঘন চপেটাঘাতে কল্পনাবৃত্তি অসাড় হয়ে যায় ও পাঠ্যপুস্তকে নিবদ্ধ হয়ে পর্যবেক্ষণশক্তি হয় আড়ষ্ট।” একজন গবেষকের জন্য এই ‘কল্পনাবৃত্তি’ (কল্পনা কোনো অবাস্তব জগতের গল্পকথা নির্মাণের বিষয় নয়, কল্পনা আসলে সৃজনশীল উদ্ভাবন ক্ষমতার প্রতিশব্দ) এবং ‘পর্যবেক্ষণশক্তি’ – দুটিই সমানভাবে প্রয়োজনীয়।

গবেষণা প্রস্তাব লিখে আবেদন করা অবশ্যই একটি উত্তম বিকল্প হতে পারে, এদেশে সে সুযোগ কয়েকবছর আগেও ছিল। কিন্তু বর্তমান অবস্থা নিয়ে খুব স্পষ্ট ধারণা অধিকাংশেরই নেই।

প্রস্তাবপত্র লিখে আবেদন করার প্রক্রিয়াটি মোটামুটি এরকম – স্নাতক স্তরে তিনবছরের পড়াশোনা, তারপর স্নাতকোত্তরে দুবছর। একটি বিষয়কে জানার ক্ষেত্রে এই পাঁচবছর খুব কম সময় নয়। একজন ছাত্র বা ছাত্রী সহজেই বুঝতে পারবেন কোন নির্দিষ্ট দিকে তাঁর ঝোঁক বেশি। সেই অনুযায়ী কোনো অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলে তাঁর অধীনে গবেষণা করার জন্য একটি প্রস্তাবপত্র তিনি লিখতে পারেন। এই ধরনের প্রস্তাবপত্রে তিনটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ – গবেষণার লক্ষ্য (research objective), মূল যে প্রশ্নগুলি তিনি তাঁর গবেষণায় তুলে ধরবেন (research questions) এবং গবেষণার পদ্ধতি (research methodology)। প্রস্তাবপত্র পছন্দ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান একবার তাঁর ইন্টারভিউ নিয়ে গবেষক হিসাবে নিয়োগ করতে পারে। কিন্তু এদেশের প্রকৃত গবেষণা চিত্র যা, তার নিরিখে এমন সুষ্ঠু, বৈজ্ঞানিক নিয়োগ প্রক্রিয়া সর্বত্র চালু করার অবস্থা কি সত্যিই আমাদের আছে?

বিদেশে স্নাতক স্তর থেকেই যেসব ছাত্রছাত্রী গবেষণা করতে চান তাঁদের সেভাবে তৈরি করেন অধ্যাপকরা। নানা নেতিবাচক দিক সেখানেও আছে ঠিকই, তবে মোটের উপর এখনো গবেষণার ভবিষ্যৎ পশ্চিমি দুনিয়ায় উজ্জ্বল। এদেশে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে তেমন ব্যবস্থা থাকলেও বেশিরভাগ জায়গাতেই সেই পরিকাঠামো নেই। গবেষণাকে আমজনতা তো বটেই, এমনকি পিএইচডি প্রোগ্রামে রেজিস্ট্রেশন করা ছাত্রছাত্রীদের এক বিরাট অংশও চাকরির অস্থায়ী বিকল্প হিসাবে দেখে থাকেন। সত্যিকারের গবেষণা-নিবেদিত প্রাণ বলতে যা বোঝায়, তেমন স্কলারের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই কম।

এর কারণ গবেষণা নিয়ে এদেশের চিরকালীন উদাসীনতা – মাসের পর মাস ফেলোশিপ আটকে থাকা, কনটিনজেন্সির টাকা পেতে বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে বারবার তাগাদা দিয়ে জুতোর শুকতলা ক্ষইয়ে ফেলা, এসবই সেই উদাসীনতার জ্বলন্ত উদাহরণ। তার উপর অর্থ ও অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি এগিয়ে থাকে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ‘সরকারবিরোধী’ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা তো গত কয়েক বছর ধরেই রাজানুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার উপর রয়েছে ছোটবড় নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। প্রভাবশালী গাইডদের অসহযোগিতা, মানসিক নির্যাতন – এসব মোটামুটি সর্বত্রই চলে। কিন্তু এই আকালের দেশে কেরিয়ারের ক্ষতির ভয়ে বহু স্কলারই এই ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধে নিতান্ত বাধ্য না হলে মুখ খুলতে চান না।

এই সূত্রেই মনে করিয়ে দিতে হবে, বিজেপি সরকারের আমলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার স্বাধীনতা ক্রমশ লুপ্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম ইনডেক্সে (এএফআই) ভারত নেমে গিয়েছে সর্বনিম্ন ১০-২০% দেশের তালিকায়। ভারতের উপরে রয়েছে রোয়ান্ডা, নিচে রয়েছে দক্ষিণ সুদান। একটু বিশদে বললে হয়ত সকলের বুঝতে সুবিধা হবে। অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম ইনডেক্সে সর্বোচ্চ ১০%, সর্বোচ্চ ১০-২০%, সর্বনিম্ন ১০-২০%, সর্বনিম্ন ১০% ইত্যাদি মিলিয়ে মোট দশটি শ্রেণিবিভাগ থাকে। ভারতের স্থান ২০২৩ সালে ছিল আট নম্বর শ্রেণিতে (সর্বনিম্ন ২০-৩০%)। এবছর আরও একটু নেমে ভারত এসেছে নয় নম্বর শ্রেণিতে। সরকারবিরোধী গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেই শো কজ, চাপ সৃষ্টি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ন্যক্কারজনক প্রোপাগান্ডামূলক ছবি বানানো, আইআইটিতে বৈদিক বিজ্ঞানের কোর্স চালু করার পরিকল্পনা, ইউজিসি কর্তৃক গোবিজ্ঞানের পরীক্ষা নেওয়ার নিদান – সবই এই এক সূত্রে বাঁধা।

এসব জেনেবুঝেও যাঁরা গবেষণাকে ভালোবেসে গবেষণা করতে চেয়ে নেট দেওয়ার কথা ভাবেন এবং এই মুহূর্তে চাকরির যে হাল, তাতে ইচ্ছে না থাকলেও গবেষণা করাকেই আপাতত লক্ষ্য হিসাবে ধরে নিয়ে যাঁরা এগোচ্ছিলেন, পরীক্ষা নেওয়ার পরদিনই কর্তাব্যক্তিদের আরও একখানা ‘সতর্কতামূলক’ সিদ্ধান্তে সেই লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রীর কেরিয়ার যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল, তার দায় নেবে কে?

একের পর এক পরীক্ষা বাতিল, দীর্ঘদিন চাকরির পর একদিন আদালতের রায়ে প্যানেল বাতিল – এসবে এমন এক অভাবনীয় সংকট তৈরি হয়েছে গত কয়েক বছরে, যে যেসব চাকরি মোটামুটি জনসংযোগের জোরেই পাওয়া হয়ে যায়, সেরকম প্রায় নিশ্চিত চাকরির নিয়োগপত্র আসতে কোনো কারণে দেরি হলে চাকরিপ্রার্থীর মনে হচ্ছে, এ প্যানেলটাও বাতিল হল না তো!

এমন অবস্থায় ‘নেট পরীক্ষা ত্রুটিপূর্ণ, তাই তুলে দেওয়াই ভাল’ – এই আওয়াজ যাঁরা তুলবেন, তাঁরা আদতে দক্ষিণপন্থারই সুবিধা করে দেবেন। এই যে এসএসসি পরীক্ষা বছরের পর বছর ধরে নেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়েও তো আমরা আওয়াজ তুলছি। কোনো ব্যক্তি শিক্ষক হিসাবে যোগ্য কিনা, তাও কি ওই কয়েক ঘন্টার পরীক্ষা আর ইন্টারভিউ দিয়ে বোঝা যায়? যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রেই একথা খাটে। কিন্তু ত্রুটি থাকলেও এই মুহূর্তে একটি পরীক্ষা নেওয়া ও নিয়োগের প্রমিত পরিকাঠামো টিকিয়ে রাখার জন্য দাবি তোলা বিশেষভাবে প্রয়োজন। পরিকাঠামো টিকলে তবেই না উচ্চতর বিকল্পের কথা ভাবা যাবে!

শিক্ষাব্যবস্থা সমেত গোটা পরিকাঠামোই ধসে পড়ুক, সেক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষার চাহিদাও হয়ে দাঁড়াবে বিলাসিতা – দক্ষিণপন্থা এমনই তো চায়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.