দিব্যেন্দু হাজরা

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত— ক্লান্ত করে;
লাসকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই…

(‘আট বছর আগের একদিন’, জীবনানন্দ দাশ)

মাথা পিছু আয়ের বিচারে আমরা এখনো গরিব দেশ। তবু আমাদের দেশে বেশ কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে যাদের পরিকাঠামো, বলা চলে, বিশ্বমানের। আমাদের দেশে আছেন নামকরা অধ্যাপক বা পিএইচডি সুপারভাইজার, যাঁরা দিবারাত্র পরিশ্রম করে, দেশের গবেষণার মান বৃদ্ধি করা থেকে ভবিষ্যতের জন্য উন্নতমানের গবেষক তৈরি করার কাজে নিজেদের মগ্ন রাখেন। পিএইচডি ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তাদের সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন, তাদের সাথে বন্ধুর মত আচরণ করেন; সুখদুঃখ, সাফল্য ব্যর্থতার সাথি হন। এমন অনেক অধ্যাপক বা সুপারভাইজার আছেন, যাঁরা প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে, দিবারাত্র এক করে, দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় প্রোজেক্ট লিখে গবেষণাগার নির্মাণ করেছেন এবং ছাত্রছাত্রীদের শিখিয়েছেন। এই কারণেই বহু ছাত্রছাত্রী আশায় বুক বেঁধে, দেশে পিএইচডি প্রোগ্রামে যোগ দেয়। অনেকে সফল হয়। পরবর্তীকালে তারা অধ্যাপক হয়, দেশের গবেষণা ক্ষেত্রের শ্রীবৃদ্ধির কাজে নিজেদের নিয়োগ করে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এটা যদি আলোর দিক হয়, তাহলে বলা ভাল, আমাদের দেশে পিএইচডি যজ্ঞের একটা অন্ধকার দিকও আছে। সম্ভবত এই অন্ধকার দিকটার পাল্লা আলোর দিকের চেয়ে বেশ খানিকটা ভারি। কিছুদিন আগে এক তরুণ পিএইচডি গবেষকের আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের সকলকে ব্যথিত ও শঙ্কিত করেছে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনেকের আশঙ্কা এমন ঘটনা আগামীদিনে আরো ঘটবে। নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার তদন্ত করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং আমাদের দেশে পিএইচডি গবেষণা এবং গবেষকদের যাত্রাপথের অন্ধকার দিকটাতে কিছুটা আলোকপাত করাই এ লেখার মূল উদ্দেশ্য। সামগ্রিক ব্যবস্থার উন্নতিসাধন বা আমাদের দেশের পিএইচডি প্রোগ্রামের ভূত ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্য কোনো লেখায় পরে আলোচনা করা যেতে পারে।

সাধারণভাবে পিএইচডি এক দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যাত্রা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করার চাপ তো আছেই, তা ছাড়া এসে পড়ে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ। সামাজিক চাপের বড় কারণ হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে, এমনকি উচ্চ শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও, পিএইচডি সম্বন্ধে সাধারণত কোনো স্বচ্ছ ধারণা থাকে না। সেটা অবশ্যই দোষের নয়। মানুষ তার কাজকর্ম, রুজি রোজগার বন্ধ রেখে, পিএইচডির পি আর এইচ, মানে দর্শন, বুঝতে বসবে — এমনটা আশা করা ঠিক নয়। কিন্তু এর ফলে অনেকসময় অনেক অযাচিত চাপ এসে যায় পিএইচডি স্কলারদের উপর। আত্মীয়স্বজন ভাবতে থাকেন নিউটন কি আইনস্টাইন না হোক, এপিজে আব্দুল কালাম বা অমর্ত্য সেনের মত তাদের বাড়ি স্কলারটির কথাও খবরের কাগজে লেখা হবে, ছবিও চাপা হবে। অথবা পিএইচডি শেষ করে পোস্ট ডক করা অবস্থায় যখন মরিয়া হয়ে, বিশেষ করে বিদেশ থেকে, চাকরি খোঁজে কেউ, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব মনে করতে থাকে এ চাইলেই দেশের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ পেতে পারে, ইচ্ছা করে বিদেশে পড়ে আছে। এছাড়া মাসের পর মাস স্কলারশিপের টাকা না পাওয়া, গবেষণার উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব, সুপারভাইজারের সাথে খিটিমিটি — এসব তো লেগেই থাকে।

আমাদের দেশে যতজন পিএইচডি তৈরি হয় তার চেয়ে তরুণ অধ্যাপকের পদ খালি হয় অনেক কম। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের উপযুক্ত অন্য অনেক কাজের সুযোগ থাকে। আমাদের দেশে সেগুলোও বেশ কম। ফলে অনেক পিএইচডিই নিজের যোগ্যতার চেয়ে অনেক কম যোগ্যতার কাজ বেছে নিতে বাধ্য হয়। তাই বিদেশে কাজ পেলে অনেকেই সেখানে থেকে যায়। অনেক হতভাগ্য পিএইচডি ডিগ্রিধারীকে অনেক সময় দীর্ঘকাল বা অল্প সময় বেকারত্বের জ্বালা ভোগ করতে হয়।

অথচ এমনটা হবার কথা নয়। নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। সালটা সম্ভবত ২০০২ বা ২০০৩ হবে। তখন ফিজিক্স অনার্স নিয়ে বেলুড় বিদ্যামন্দিরে পড়ি। এক সন্ধ্যায় এক বিশেষ অতিথি এসে ছোট করে একটা অণুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা দিলেন। অনেক কথার মাঝে একটা কথা উনি বলেছিলেন যা আজও কানে বাজে। উনি বললেন “দেখো, আগে সরস্বতী আর লক্ষ্মীর বিরোধ ছিল, কিন্তু এখন সময় বদলেছে। এখন সরস্বতী এলে, লক্ষী আপনা আপনিই এসে পড়বে।” বক্তার নাম সিএনআর রাও। আধুনিক যুগে শিক্ষার সাথে অৰ্থ বা কেরিয়ার কেমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা উনি বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন। উচ্চতর গবেষণা এবং তার সাথে দেশনির্মাণের সম্বন্ধ এবং যারা এই সম্বন্ধ স্থাপন করবে, যারা মাঝখানে আছে, মানে তরুণ গবেষকদের ভূমিকা ও প্রাপ্তি নিয়েও উনি অনেক সদর্থক কথা বলেছিলেন। কেন আমাদের দেশে আরও অনেক পিএইচডি করা তরুণ তরুণী দরকার, তা নিয়েও উনি বিস্তর বোঝাবার এবং আমাদের অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন। আমি আজও মনে করি, নীতিগতভাবে কথাগুলো ঠিক। কিন্তু…। এই ‘কিন্তু’ নিয়েই আজকের লেখা। কথা দিচ্ছি, সংখ্যা, পরিসংখ্যান আর এদেশ ওদেশের তুলনায় লেখাটা ভরিয়ে দেব না।

পিএইচডি — এই শব্দাবলী দিয়েই শুরু করি। না, আমি এর অন্তর্নিহিত অর্থে যাচ্ছি না, এর ব্যবহারিক দিকের কথাই বলছি। এটা একটা ডিগ্রির নাম। মোটামুটিভাবে বলা যায়, এর উপরে আর ডিগ্রি হয় না। পিএইচডির বিভিন্ন স্তর নিয়ে আলোচনার আগে একটা কথা বলা দরকার। পিএইচডি একটা ডিগ্রিবিশেষ হলেও, অন্যান্য ডিগ্রির তুলনায় এর ধরনধারণ একটু অন্যরকম। এই কথাটা বিশেষ করে আমাদের দেশিয় শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রযোজ্য। সেই ছেলেবেলা থেকে শুরু করে মাস্টার ডিগ্রি অবধি যে পড়াশোনা আমাদের দেশে করা হয়, সেখানে সামগ্রিকভাবে কাঠামোটা তৈরি করাই থাকে। মানে প্রশ্নাবলি আগে থেকেই মোটামুটি ঠিক করা থাকে। সারা বছর ধরে পড়াশোনা করে ছাত্রছাত্রীরা সেই প্রশ্নাবলির উত্তর তৈরি করে। তারপর একদিন পরীক্ষা দিয়ে, প্রশ্ন এবং উত্তর মিলিয়ে নম্বর দিয়ে পাশ, ফেল, ডিভিশন ইত্যাদি স্থির করা হয়। সামগ্রিকভাবে ভাবনা চিন্তা করা, প্রশ্ন করা, বিশেষ করে প্রশ্ন করতে পারাটা যে উত্তর জানার মতই বা অনেক ক্ষেত্রে উত্তর জানার থেকেও বড় গুণ, সেই বোধ তৈরি করা বা আত্তীকরণের সুযোগ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ কম।

পিএইচডি বা যে কোনো গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল একটা জবরদস্ত প্রশ্ন খুঁজে বের করা। তাই মাধ্যমিকের পরে যেমন উচ্চমাধ্যমিক বা বিএসসির পরে এমএসসি, তফাত শুধু সিলেবাসে আর বিষয়বস্তুতে, খেলার নিয়মে নয়, পিএইচডি কিন্তু তেমন নয়। এমএসসির পরে হলেও পিএইচডি করতে ঢুকে মনে হয়, খেলাটা একেবারেই অজানা। এ যেন বিরাট কোহলিকে টেনিস খেলতে বলা হচ্ছে। এই নতুন খেলাটা শিখতে হলে খেলোয়াড়কে যেমন ভাল (পড়ুন মনোযোগী, পরিশ্রমী ইত্যাদি ইত্যাদি বা এসবের মিশ্রণ) হতে হবে, তেমনি যে বা যারা খেলাটা শেখাবে বা গাইড করবে, তাদেরও ভাল (পড়ুন জ্ঞানী, সহনশীল, পরিশ্রমী ইত্যাদি ইত্যাদি বা এসবের মিশ্রণ) হতে হবে। আর যে মাঠে খেলাটা হবে সেখানকার পরিকাঠামো, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদিও ভাল হওয়া চাই।

উন্নত দেশগুলোতে ব্যাচেলর এবং মাস্টার ডিগ্রির সময় থেকেই নানা প্রোজেক্ট এবং থিসিস ওয়ার্কের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রীদের উন্নত গবেষণার উপযোগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা হয়ে থাকে। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় হাতে গোনা কিছু এলিট প্রতিষ্ঠান ছাড়া এরকম সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা এবং তার রূপায়ণের লক্ষ্যে সদর্থক পদক্ষেপ নিতে এখন পর্যন্ত খুব একটা দেখা যায় না। তাই আমাদের শুরুটাই হয় বেশ অপ্রস্তুত অবস্থা থেকে।

সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশে পিএইচডি ডিগ্রি লাভের পদ্ধতিটা মোটামুটি এরকম (প্রতিষ্ঠান এবং বিষয়ভেদে কমবেশি হেরফের হতে পারে): প্রথমে মাস্টার ডিগ্রি পেতে হবে। অনেকসময় স্রেফ পাস করা যথেষ্ট নয়, একটা ন্যূনতম নম্বর পেতে হয়। তারপর পিএইচডিতে ভর্তির যে নানারকম পরীক্ষা আছে তার অন্তত একটাতে উত্তীর্ণ হতে হবে। পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার পর কোন বিষয়ে গবেষণা করা হবে তা ঠিক করতে হবে; সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হবে সুপারভাইজার। আগে সুপারভাইজার, পরে গবেষণার বিষয়ও ঠিক হতে পারে। গবেষণা শেষ হলে গবেষণার বিষয় ও প্রাপ্ত ফল নিয়ে একটা থিসিস জমা দিতে হবে। এই থিসিসের মূল্যায়ন করে ঠিক করা হবে সেটা পিএইচডি ডিগ্রির উপযুক্ত কিনা। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বা মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্কলারশিপ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিএইচডি ছাত্রছাত্রীদের একটা মাসিক স্ককলারশিপ দেওয়া হয়ে থাকে।

এই পদ্ধতির আলোকে এবার দেখা যাক আমরা মোটের উপর কী অবস্থায় আছি।

যারা পিএইচডির প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হল না, তাদের তো ল্যাঠা চুকেই গেল। যারা উত্তীর্ণ হয়ে কোথাও না কোথাও ভর্তি হল, তাদের নিয়ে আলোচনা করা যাক। আগেই বলেছি, পিএইচডি প্রোগ্রামে ঢোকার আগে অব্দি গবেষণা নিয়ে ন্যূনতম ধারণা অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর থাকে না। এটা তাদের দোষ নয়, শিক্ষাব্যবস্থার দোষ। তদুপরি, অপ্রিয় হলেও সত্য, যে মাস্টার ডিগ্রির পরে দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাদের একটা বড় অংশ বিদেশে পাড়ি দেয়। যারা এ দেশে থেকে যায় নানা কারণে, তারা দেশের হাতে গোনা নামী প্রতিষ্ঠানে, যেখানে গবেষণা করার মোটামুটি ভাল বা উন্নত পরিকাঠামো আছে, সেখানে ঢুকে পড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যারা এ দেশে থেকে যায়, তারা মধ্য মেধার। এখানে বলা ভাল, মধ্য মেধা মানে এই নয়, যে তারা পিএইচডি বা গবেষণার অনুপযুক্ত। বরং বলা ভাল, নিজেদের প্রচেষ্টা এবং উপযুক্ত সহযোগিতা পেলে মধ্যমেধার গবেষকই উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠতে পারে। এমন উদাহরণও নেহাত কম নয়। এখানেই সুপারভাইজার এবং প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা।

একজন ভালো সুপারভাইজার যেমন একজন মধ্যম মেধার ছাত্র বা ছাত্রীকে চরম উৎকর্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারেন, তেমনি একজন অযোগ্য সুপারভাইজার, একজন অত্যুজ্জ্বল এবং সম্ভাবনাময় পিএইচডি স্কলারের মনোবল ভেঙে দিয়ে তাকে গভীর নরকে পৌঁছে দিতে পারে। সুপারভাইজ বা গাইড করার কাজটাও খুব সূক্ষ্ম। এর নির্দিষ্ট কোনো রীতিনীতি নেই। একজন স্কলারের ভবিষ্যৎ যেমন একজন সুপারভাইজারের উপর নির্ভর করে, তেমনি একজন সুপারভাইজারের পদোন্নতিও অনেকাংশে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের দক্ষতার উপর নির্ভর করে। কিন্তু দুটোর মধ্যে বিস্তর তফাত। ক্ষমতার কাঠামোয় ছাত্রছাত্রীদের উপর সুপারভাইজারের ক্ষমতা ফলানোর অসীম অবকাশ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সেটা শোষণ, নিপীড়নের জায়গায় পৌঁছে যায়। ছাত্রছাত্রীরা সুপারভাইজারের বাড়ির কাজ করে দিচ্ছে, এমন দৃষ্টান্তও আছে। একইভাবে একজন সুপারভাইজারের অসহযোগিতায় একজন ছাত্রছাত্রীর গবেষণা থেমে যেতে পারে। তাকে মাঝপথে পিএইচডি থামিয়ে অন্য রাস্তা দেখতে হতে পারে। সুপারভাইজারদের হাতও লম্বা। পিএইচডি ডিগ্রি শেষ করার পরেও চাকরি পেতে তাঁদের রেকমেন্ডেশন লেটার লাগে প্রায় সর্বত্র।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি ছাত্রছাত্রীদের দক্ষতার উপর সুপারভাইজারের পদোন্নতি নির্ভর করে, তাহলে তিনি খারাপ ব্যবহার বা অসহযোগিতা করবেন কেন? এর উত্তরটা খুব সরল নয়। ব্যাপারটা অনেক কারণে ঘটতে পারে। যেমন ১) ছাত্রছাত্রীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবহার বা কাজকর্ম যা এমনকি একজন তরুণ গবেষকের কাছেও প্রত্যাশিত নয়। অনেকেই পিএইচডি করতে আসে অন্য কোনো কাজ বা চাকরি না পেয়ে। গবেষণার কাজে এদের সাধারণত কোনো আগ্রহ থাকে না। কিছুদিন পরেই সুপারভাইজার বুঝতে পারেন, এদের পিছনে সময় ব্যয় করা বৃথা। ২) সুপারভাইজারের নিজের জ্ঞানের অভাব। যে বিষয়ে তিনি সুপারভাইজ করছেন, নিজেই সে বিষয়ে নিজেকে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল করে তোলেননি। তাই নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার না করে, ছাত্রছাত্রীদের ঘাড়ে সবটা চাপিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত। ৩) নিজের জীবনের সামগ্রিক ব্যর্থতাবোধ থেকে তিনি ক্লান্ত এবং প্রায় সব বিষয়েই উদাসীন। ৪) নানারকম কাজের চাপে তিনি আর ছাত্রছাত্রীদের সময় দেন না। ধরে নেন, ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাই নিজেদের কাজ যেমন তেমন করে সামলে নেবে। ৫) তাঁর বিশ্ববীক্ষা। জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কারণে তিনি মনে করেন অত্যাচার না করলে ছাত্রছাত্রীরা ঠিক ‘তাঁর মত’ মানুষ হবে না।

এবার দেখা যাক, এই সুপারভাইজার বা গাইড কারা? এঁরা সাধারণত কোনো অধ্যাপক বা পূর্ণ সময়ের গবেষক। এই প্রবন্ধে আমরা অধ্যাপক এবং সুপারভাইসার — এই দুটো শব্দ একই অর্থে ব্যবহার করব। পিএইচডি শিক্ষার্থীদের গাইড করা ছাড়াও এঁদের সাধারণত অনেক কাজ থাকে। যেমন ক্লাস নেওয়া এবং নানা ধরণের প্রশাসনিক কাজ। আর গবেষণার ব্যাপারেও বলা ভাল, যে এঁদের অনেক ছাত্রছাত্রী থাকতে পারে। মানে অনেককে গাইড করতে হতে পারে। একজন গাইড আর তাঁর ছাত্রছাত্রী মিলে একটা দল। সাধারণত তিন-চারজনের একটা দল হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এই দলের কলেবর বিশ-পঁচিশজনের বা আরও অনেক বড় হতে পারে। আর সুপারভাইজার হলেন সেই দলের সর্দার।

এখন প্রশ্ন, সুপারভাইজার হওয়া যায় কী করে? প্রতিষ্ঠান ও বিষয়ভেদে এর জন্য ন্যূনতম যোগ্যতামান বেঁধে দেওয়া আছে। আজকের দিনে প্রায় সব জায়গায় ন্যূনতম যোগ্যতা হচ্ছে পিএইচডি ডিগ্রি। তবে বেশিরভাগ বড় প্রতিষ্ঠানে পিএইচডির পরেও, কয়েক বছরের পোস্টডক করা আছে বলে আশা করা হয়। বলাই বাহুল্য, এই সব ন্যূনতম যোগ্যতার চেয়ে কারোর যোগ্যতা অনেক গুণ বেশি হলেই যে সে অধ্যাপনার চাকরি পাবে তা নয়। কারণ একটা পদের দাবিদার ক্ষেত্রবিশেষে কয়েকশো জনও হতে পারে।

সে যা-ই হোক, একজন তরুণ অধ্যাপক নতুন চাকরিতে বহাল হবার সাথে সাথে তাকেও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জায়গা করে নেওয়ার লড়াই শুরু করতে হয়। নিজের অফিস, গবেষণাগারের জায়গা, গবেষণার খরচ জোগানোর বন্দোবস্ত করা, সঙ্গে সঙ্গে পিএইচডি স্কলার জোগাড় করার লড়াই। এর সঙ্গে ক্লাসে পড়ানো এবং অন্যান্য দায়িত্ব তো আছেই। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিকাঠামোই যদি নড়বড়ে হয়, তাহলে বলাই বাহুল্য তরুণ অধ্যাপকের শুরুটাই খুব একটা মধুর হয় না। আর এটাও বলা দরকার, যে আমাদের দেশের কিছু এলিট প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কোথাও গবেষণার উপযুক্ত পরিকাঠামো নেই।

যেসব জায়গায় সঠিক পরিকাঠামো রয়েছে বা শুরুতে তরুণ অধ্যাপকদের যথেষ্ট সাহায্য করা হয়, সেখানেও নানারকম সমস্যা তৈরি হতে পারে। যেমন ১) অধ্যাপক যদি অযোগ্য হন, যদি কাজটা স্রেফ যথাস্থানে তৈল মর্দন করে পেয়ে থাকেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই চাকরিতে বহাল হয়েই তিনি সুযোগ খোঁজেন, কীভাবে তৈল মর্দন করেই, কম পরিশ্রমে পদোন্নতি করা যায়। ২) অধ্যাপক যদি নিজের যোগ্যতাতেও কাজ পেয়ে থাকেন, তাহলেও এতদিনের লড়াইয়ে তিনি জীবন সম্বন্ধে এতই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়তে পারেন, যে কোনোমতে নমো নমো করে, দায়সারাভাবে ছাত্রছাত্রীদের উপর গবেষণার কাজ ছেড়ে দিয়ে বিশ্রাম করা পছন্দ করেন। ৩) তরুণ অধ্যাপক শুরুতে প্রচুর উৎসাহ নিয়ে কাজ করলেন। তারপর যখন যথেষ্ট পদোন্নতি হয়ে গেল, তখন ছাত্রছাত্রীদের উপর গবেষণার সমস্ত ভার চাপিয়ে দিয়ে লম্বা বিশ্রামে চলে গেলেন।

তখন সুপারভাইজারের অযোগ্যতা বা প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থার প্রত্যক্ষ শিকার হয় পিএইচডি স্কলাররা। এর সঙ্গে যোগ হয় সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের চাপ। অনেকে এতকিছুর সাথে লড়াই করে টিকে থাকে, কেউ কেউ মাঝপথে রণে ভঙ্গ দেয়। যারা একেবারেই পেরে ওঠে না, তারাই হয়ত বেছে নিতে বাধ্য হয় লাশকাটা ঘর।

লেখক কানপুর আইআইটি থেকে পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি সম্পূর্ণ করেছেন ২০১২ সালে। বর্তমানে ফিনল্যান্ডের ভিটিটিতে রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কর্মর

আরো পড়ুন

ইউজিসি প্রস্তাবিত ব্লেন্ডেড মোড: ভারতের উচ্চশিক্ষার কফিনে শেষ পেরেক?

1 মন্তব্য

  1. তবে লাসকাটা ঘরই বা বেছে নেবেন কেন? PhD করতে না পারলেই কি জীবন একেবারে শেষ হয়ে যায়? …… Humanity এবং Social Science -এর ছাএদের কাছে জীবনের অর্থ অনেকটাই ভিন্ন।

Leave a Reply