মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে বিধিবদ্ধভাবে মাস্টারদের লক্ষ্মীপুজো শেষ হল। বলতে চাইছি, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা পড়ান তাঁদের আলোচনা চক্রে গুরুতর সন্দর্ভ পেশ করার যে সময়সীমা থাকে তা সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চ। কারণটা খুব সহজ। কেন্দ্রীয় সরকার বা তার ফান্ডিং এজেন্সির বর্ষশেষ ৩১ মার্চ আর তার দেয় টাকা খালাস পায় জানুয়ারির শেষে। এই দুমাসে জ্ঞানের ছড়াছড়ি। রাস্তায় হাঁটতে গেলে জ্ঞানের কলার খোসায় পা পিছলাবেই।
অবশ্য একে বিদ্যার কার্নিভালও বলা যেতে পারে। কেবল জামাইষষ্ঠী আর ভ্যালেন্টাইন তিথিতে আর আমাদের বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাইদের মন ওঠে না। এখন আমাদের বুদ্ধিজীবীদের জন্য, বিশিষ্ট ও বিদ্দ্বজ্জন নির্বিশেষে, একটি নতুন অভয়ারণ্য সংরক্ষিত হয়েছে। যার পোশাকি নাম – সেমিনার। এ এমন অভিজাত অন্তরাল, যেখানে ডক্টর অমুক অধ্যাপক তমুকের মুখ দেখেন ততক্ষণ, যতক্ষণ জীবনানন্দের ভাষায়, দেখাদেখি চলে। আগে মাস্টারি জীবনে এত ঝড় ছিল না। তারকনাথ সেন, শশিভূষণ দাশগুপ্তরা ধুতি-পাঞ্জাবি-পাদুকায় ক্লাসঘরে প্রবেশ করতেন, তাঁদের পেটে না হলেও মাথায় বিদ্যা ছিল, নির্ভুল বাংলা ও ইংরিজি বাক্যে তাঁরা কথা বলে যেতে পারতেন, ছাত্র ও কতিপয় ছাত্রী ‘নোটস’ নিত।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আজ আর তা নয়। এখনকার অধ্যাপকও তাঁর বাহুবলে সেলিব্রিটি। কর্ণের কবচ-কুণ্ডলের মত তার কিংবদন্তি প্রসিদ্ধ দারিদ্র্য এখন অস্তমিত। তিনি সন্ধেবেলায় সেজেগুজে টেলিভিশন বিতর্কের মঞ্চে হাসিমুখে উপস্থিত থাকেন। আর তাঁর ঠিকুজিতে যুক্ত হয়েছে সেমিনার; সেই সূত্রে কিছু ‘কাগজ’; সঙ্গে সম্মেলন তাড়িত ক্কচিৎ বিদেশভ্রমণ। নবীন এই ‘পত্রপাঠ’ -এর অভ্যাস আমাদের সারস্বত চর্চায় প্রায় বসন্ত সমাগম। যা নিত্যপালনীয় ছিল সেই ‘শ্রেণিসংগ্রাম’ কোনো গুরুত্বই পায় না এখন, এত তার বাহার। কোনো মাস্টারকে তাঁর পদোন্নতির জন্য শ্রেণিকক্ষের দক্ষতার প্রমাণ পেশ করতে হয় না যে!
আরো পড়ুন ন্যাক মূল্যায়ন নিয়ে আদিখ্যেতা বন্ধ করা দরকার
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার নিজেই প্রায় এক শিল্পকাঠামো! জাতীয় হলে একরকম; আন্তর্জাতিক হলে আরেকরকম। মানে টাকার ঝনৎকারই অন্যরকম। কোনোক্রমে একজন শ্বেতাঙ্গ পরিযায়ীকে পৌষ-মাঘে বা মাঘ-ফাল্গুনের দিনগুলিতে উড়িয়ে আনতে পারলেই হল (কুলীন বিদেশিরা এদেশের শীত পছন্দ করে)। আজকাল অবশ্য বিদেশ বলতে বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কাও বোঝায়। এরপর আছে ব্যাগ শিল্প। শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যাওয়ার জন্য হালকা সুটকেস হবে, না লোকশিল্পের ঝোলা – তা নিয়ে সাব-কমিটির দরদস্তুর। চায়ের কাপে ফেনা জমে ওঠে। আসলে বিদেশিরা এলে সুবিধা হয়; কারণ ফান্ডিং বেশি পাওয়া যায়; আন্তর্জাতিক হল প্রোমোশনের সুবিধা বেশি। সুতরাং জাঁকজমক তো রইলই, উপরন্তু শীতে আপনি এলে গরমে আমি যাব। দিবে আর নিবে – মিলাবে মিলিবে।
এরপরে ভোজন তালিকা। অর্থাৎ বাটার চিকেন ও আইসক্রিম বিষয়ক তুমুল কোলাহল। এছাড়া দৃশ্যবিন্যাসের খুঁটিনাটি তো অজস্র। যেমন জেরক্স, ডটপেন, ফাইল। অতিথি আপ্যায়নে গোলাপসুন্দরী, ‘গ্ল্যামার’ সম্পন্ন অন্তত দুজন বক্তা – মানে যাঁদের মিডিয়ায় তৃণমূল পর্যন্ত যোগাযোগ আছে; যাঁরা নিয়োগ কমিটির সদস্য থাকেন প্রায়ই, এমন দুজন অন্তত।
কুলীন সেমিনারের ভাষা অবশ্যই দুর্বোধ্য ইংরিজি। ফরাসী পণ্ডিত ফুকো ও লাকাঁর নাম প্রায়ই উঠে আসবে। আর সেইসব উদ্ধৃতি ‘শিকাগো’ রীতিতে ঘটবে না ‘এমএলএ’ স্টাইলে – তা নিয়ে মৃদু বাদানুবাদও হয়। এ বিষয়ে অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্ত তুলনারহিত। ‘আপনি কোটেশ্যন ভালবাসেন, না ফুটনোটে আপনার অনুরাগ? যদি কোটেশ্যন বা ফুটনোটের প্রয়োজন হয়, তবে কোন্ ভাষা হইতে দিব, তাহাও লিখিবেন। ইউরোপ এশিয়ার সকল ভাষা হইতে আমার কোটেশ্যন সংগ্রহ করা হইয়াছে – আফ্রিকা ও আমেরিকার কতকগুলি ভাষার সন্ধান পাই নাই। কিন্তু সেই সকল ভাষার কোটেশ্যন আমি অচিরাৎ প্রস্তুত করিব। আপনি চিন্তিত হইবেন না।’
আমরা আদৌ চিন্তিত নই। চুক্তিবদ্ধ টুর্নামেন্টের মতন এসে পড়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব, যেখানে তরুণ অধ্যাপক বা গবেষক দীর্ঘ মন্তব্য, অর্থাৎ গুরু ভজনা করেন। গুরু স্মিত মুখে তা উপভোগ করেন। উত্তর বাংলার চা বাগান থেকে দক্ষিণ বাংলার ভেড়ি এলাকা পর্যন্ত, শিক্ষককুলের এই সেমিনার রঙ্গে প্রবেশ না করে উপায়ও নেই। পদোন্নতি বা ভাল পড়ানো, কোনো গুণই নয় ইউজিসি নির্দেশিকায়। শিক্ষকের কৃতিত্বের মধ্যে ক্লাসরুমের ভূমিকার থেকে অনেক বড় গুরুত্বের বিষয় এই সেমিনার। কারণ, এই আলোচনা চক্রে, এই কনফারেন্সের ফলে এক সেমিনার থেকে অন্য সেমিনারের কাগজের স্তূপ জমতে থাকে; জমতেই থাকে। সেসব মৃত শব্দে মেধা আর কতটুকু? এই সমাজেরই মতন। মাছির স্তূপ।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








