সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু নিয়ে আলোচনা আবার নতুন করে আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি, কারণ সিবিআই আদালতে সুশান্তের মৃত্যু সংক্রান্ত মামলাগুলো বন্ধ করার আর্জি জানিয়েছে। এই অভিনেতার আত্মহত্যা নিয়ে নানাভাবে রাজনীতি করা হয়েছিল। এই লেখায় যে কথা বলতে চাই, তা হল সংবাদমাধ্যম কতরকমভাবে আত্মহত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভুল তথ্য ক্রমাগত প্রকাশ করে সমাজের ক্ষতি করছে।

অতিমারীর সময়ে আমরা যারা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করি, তারা বুঝেছিলাম যে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রেখে আশপাশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো কতটা কঠিন কাজ হতে পারে। ঠিক সেই সময়েই সংবাদমাধ্যম সুশান্তের আত্মহত্যা নিয়ে হইচই শুরু করে। এই তরুণ অভিনেতার হাসিমুখের ছবি দিয়ে বারবার সোশাল মিডিয়া ও টেলিভিশন বারবার বলতে থাকে – যে ছেলের মুখে এত হাসি, সে অবসাদে ভুগতে পারে না। সে নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করেনি। সেসব ছবি সুশান্তের কোনো চরিত্রে অভিনয়ের ছবি, নাকি পর্দার বাইরের ছবি – তা আমার জানা নেই। আত্মহত্যা করার আগে একজন মানুষ হাসে না, হাসিমুখে ছবি তোলে না – ব্যাপারটা মোটেই এরকম নয়। অবসাদের (depression) নানা দিক থাকে। কখনো তা তীব্র হয়ে উঠতে পারে, যা আশপাশের মানুষ অনুভব করে। আবার এমনও হয় যে মানুষটাকে দেখে কিছুই বোঝা যায় না তার ভিতরে কী চলছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কিছুদিন আগে কলকাতা শহরে এক শিল্পী আত্মহত্যা করেছেন, যিনি মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে ফেসবুকে নিজের ছবি আপলোড করেছিলেন। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই যে তিনি চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেকে শেষ করে দেবেন, সেকথা কি তাঁর বন্ধুবান্ধবরা বুঝতে পেরেছিলেন? মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা সবসময় দৃশ্যমান হয় না। এই কারণে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে invisible disability বলা হয়ে থাকে।

আসলে প্রচলিত সামাজিক ধারণা হল – ছেঁড়া, নোংরা জামাকাপড় পরে যেসব মানুষ রাস্তায় ঘুরে বেড়ান, তাঁরা ‘পাগল’। তাঁদের থেকে সাধারণ মানুষের দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। এদিকে ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভে ২০১৫-১৬ অনুযায়ী, ভারতের ১০.৬% মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা আছে। বলাই বাহুল্য, করোনা অতিমারীতে এই সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, একাকিত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এখন মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়েছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভুল বার্তা প্রচার করে যাওয়া সমস্যা বাড়িয়ে তুলছে।

মাসখানেক আগেই পশ্চিমবঙ্গে পরপর কয়েকটা ঘটনায় দেখা যায়, গোটা পরিবার সদস্যরা একসঙ্গে আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশন করার কিছু নিয়মাবলী নির্ধারণ করা আছে, যার অন্যতম হল, আত্মহত্যার প্রক্রিয়ার বিবরণ দেওয়া চলবে না। তাছাড়াও এই ধরনের খবর প্রকাশ করার সময়ে শব্দচয়নের ব্যাপারে সংবেদনশীল হতে হবে, সঙ্গে সুইসাইড হেল্পলাইন নম্বরগুলো দিতে হবে ইত্যাদি। অথচ দেখলাম, বহু বাংলা সংবাদমাধ্যম এই খবরগুলো এমনভাবে পরিবেশন করল, যা পড়লে বা দেখলে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি মনস্তত্ত্ববিদকে উদ্ধৃত করে যখন লেখা হয় ‘কপিক্যাট সুইসাইডস’ সত্যিই ঘটে, তখনো কিন্তু তারা প্রতিবেদনের সঙ্গে কোনো হেল্পলাইন নম্বর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না।

এর মধ্যে বাংলা সিনেমাজগৎ আরও এক ধাপ নিচে নেমে কীভাবে অসংবেদনশীল হতে হয় তার নমুনা দেখাল। সৃজিত মুখার্জি পরিচালিত একটি ছবির ‘টিজার’ হিসাবে কলকাতার নানা জায়গায় দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগানো হয়েছে। সেই পোস্টারে লেখা ‘অসহায় বোধ করছেন? হোয়াটসঅ্যাপ করুন’। তলায় লেখা মৃত্যুঞ্জয় কর এবং একটা নম্বর। আত্মহত্যা আমাদের দেশে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক জ্বলন্ত সমস্যা। তাকে এইভাবে বিজ্ঞাপনের স্বার্থে ব্যবহার করা যে বদ রসিকতা, দেখা যাচ্ছে টলিউডের প্রথিতযশা নির্দেশক, প্রযোজকরা তা বোঝেন না।

ওদিকে এবছরের কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হওয়ার পর দেখা গেল, ভারত সরকার টেলি হেল্পলাইনের বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, গতবছরের বাজেট বরাদ্দ এই হেল্পলাইনগুলো পুরোপুরি খরচ করে উঠতে পারেনি। ভারত সরকার যে মানসিক স্বাস্থ্যের সহায়তার জন্য আলাদা করে হেল্পলাইন চালায়, সেই প্রচারটুকুও সঠিকভাবে করা হয়নি। আমরা খবরের কাগজে নানা বিষয়ে বিজ্ঞাপন দেখি। কখনো মন্ত্রীদের ছবির সঙ্গে কিছু বার্তা ছাপা হয়, কখনো বিশেষ দিন উপলক্ষে কিছু প্রকল্পের কথা ছাপা হয়। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য হেল্পলাইন বা আত্মহত্যা প্রতিরোধের যে উপায়গুলো আছে, সেগুলো নিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সরকার কোনোদিনই বোধ করে না।

আরো পড়ুন ভারতের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট বাড়িয়ে তুলেছে অতিমারী

করোনা অতিমারীর সময়ে বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য বেশকিছু কমবয়সী ছাত্রছাত্রীর নিয়মিত কাউন্সেলিং করতাম। তার মধ্যে একজন ছাত্র জানিয়েছিল, তার পরিবারের নানাবিধ সমস্যার কারণে তার হোস্টেলজীবনই ভাল লাগে। অতিমারীর কারণে হোস্টেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাকে বাড়িতে থাকতে হচ্ছিল। সেখানে সে অহরহ বাবা-মায়ের ঝগড়া দেখে বড় হয়েছে। ওই পরিবেশে ফিরতে বাধ্য হয়ে তার ভাল লাগছিল না। সেই তরুণ জানিয়েছিল, সুশান্তের ছবি বারবার টিভিতে দেখে তার খুব বেশি suicidal ideation হচ্ছে। কারণ তার মনে হচ্ছিল যে পরিবার বা বন্ধুদের কাছ থেকে যে মনোযোগ সে পায়নি, সেই মনোযোগ সুশান্তের মত করে মরলে সে পেতে পারে। মনোবিজ্ঞান নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন, তাঁরা বুঝবেন যে একই খবর বারবার দেখলে এইভাবে প্রভাবিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

সিবিআই আদালতে জানিয়েছে, তদন্তে আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা হত্যার চেষ্টার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই খবর প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে অনেকেই বলছেন, যেসব সংবাদমাধ্যম সুশান্তের বান্ধবী অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তীকে অপরাধী বলে দেগে দিয়ে হিংস্র আক্রমণ করেছিল, তাদের উচিত তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া। রিয়ার জীবনের যে ক্ষতি সংবাদমাধ্যম করেছে, তা সত্যিই কোনোদিন পূরণ হবে না। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা একজন বাঙালি নারী হিসাবে সংবাদমাধ্যমের কাছে আমার আরও একটা প্রশ্ন আছে। সুশান্তের মৃত্যু ঘিরে রাজনৈতিক কারণে আপনারা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার চালিয়েছেন, তার জন্য যে সামাজিক ক্ষতি হল, তা পরিমাপ করার ক্ষমতাটুকুও আপনাদের আছে কি?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.