রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁদের মধ্যে থেকে যান আসলে দুরকমের মানুষ। গান ব্যাপারটাই মূলত গুরুমুখী, রবীন্দ্রগানও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মত গান্ডা বেঁধে শিক্ষানবিশী শুরু না হলেও, রবীন্দ্রসঙ্গীত মূলত প্রশিক্ষক-নির্ভর। সেই কারণেই দেড়শো পেরনো রবীন্দ্রনাথের গানের যাপনে বিভিন্ন প্রশিক্ষকদের ঘরানার শিষ্য-শিষ্যা বা প্রশিষ্য-প্রশিষ্যাদের উপস্থিতি খেয়াল করা যায়। যদিও হিন্দুস্তানি রাগসঙ্গীতের মত তা প্রকাশ্যে বলা যায় না, কারণ সকলেই বাঙালির শ্রেষ্ঠতম সাঙ্গীতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বসত করেন, তাঁদের আলাদা আলাদা ঘর বা ঘরানা থাকা বাঞ্ছিত নয়। কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছে, আজও ঘটছে। যদিও ইদানীং ঠিকঠাক শিক্ষা নিয়েই যে গানটা গাওয়া দরকার – এই ভাবনাতেই ভাঁটার টান। রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া আর গান বলা যে দুটো আলাদা জিনিস – এই বোধটাই ডোডো পাখির মত উধাও।
রবীন্দ্রনাথের গানের প্রশিক্ষণে যাঁরা নিজেদের ‘কাল্ট’ তৈরি করেছেন, তাঁরা নিজেরাও যে সবাই পরিবেশক হিসাবে সফল তা নয়। মূলত তাঁরা শিক্ষক। নেপথ্যে থেকে গুণীকে খুঁজে নিয়ে তার চলার পথ রমণীয় করে তোলাই তাঁদের জীবনের উদ্দিষ্ট। সেদিক দিয়ে শ্রদ্ধেয়া সনজিদা খাতুনকে আমি মূলত গানের প্রশিক্ষক হিসাবেই অত্যন্ত উঁচু আসনে বসাতে চাইব। একই সঙ্গে বলতে দ্বিধা করব না, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, মায়া সেন, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায় বা সুভাষ চৌধুরীর মতো প্রশিক্ষকদের মতই ওঁর নিজের গাওয়া গান আমার নিজের কোনোদিনই তেমন ভাল লাগেনি। বিপরীত পক্ষে, সুবিনয় রায়, শান্তিদেব ঘোষ, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বা দেবব্রত বিশ্বাসরা শিক্ষক হয়েও ঈর্ষণীয় রকমের উপস্থাপক। আরেকটু পরের প্রজন্মের রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, প্রমিতা মল্লিক, স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত, অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজশ্রী ভট্টাচার্যরাও পিছিয়ে নেই। তবে এই পারা, না-পারায় কোনো হীনমন্যতার কারণ দেখি না। গান প্রধানত ‘পারফর্মিং আর্ট’। সবাই শিল্পী হতে পারেন না, তার কোনো দরকার আছে বলেও মনে হয় না। সবাই মিলে শিল্পী হতে চাইলেও সে এক বিড়ম্বনার ব্যাপার। গান গাইবার অনেক মানুষ জুটে যান, শিক্ষক সবাই হতে পারেন না। গানের উপস্থাপকের চাইতে প্রশিক্ষকের ভূমিকা অনেক বেশি বিস্তৃত।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ঘটনাচক্রে আমার অন্তত একবার সৌভাগ্য হয়েছিল সনজিদার গান কলকাতায় সামনাসামনি বসে শোনার। মন ভরেনি। ভরেনি অ্যালবাম শুনেও। কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না। অনেকে নিশ্চয়ই তাঁর গান ভালবাসেন, পছন্দ করেন, আগামীদিনেও করবেন। তবে তাঁর প্রয়াণজনিত শূন্যতার মানে আসলে ভিন্ন। তিনি এমন একটা প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন যাঁরা গানকে, বিশেষত রবীন্দ্রনাথের গানকে, পরিপূর্ণভাবে শেখার একটা বিষয় বলেই ভাবতেন। মনে করতেন তার জন্য দরকার সময়, নিষ্ঠা, একাগ্রতা এবং সবথেকে বেশি, রবীন্দ্রনাথ নামের লোকটাকে বেশি বেশি করে জানা ও বোঝা। একটা গান মঞ্চে বা রেকর্ডিংয়ে পরিবেশন করতে ৩-৪ মিনিটের বেশি লাগে না কিন্তু সেই গানকে নিজের মত করে আত্মস্থ করতে ৩-৪ বছরও লাগতে পারে। আর একটা গানকে সেইভাবে নিজের মত করে বুঝতে গেলে দরকার হতে পারে গানের স্রষ্টাকে তন্ন তন্ন করে পড়ার, খোঁজার। এই বার্তাটা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারাই একজন প্রশিক্ষকের বড় কাজ। আগে নিবিড় প্রশিক্ষণ, তারপরে মঞ্চ, প্রেক্ষাগৃহ বা রেকর্ডিং স্টুডিওর শীতল হাতছানি। সনজিদা এই মৌলিক কাজটা খুব সুচারুভাবে করে যেতে পেরেছেন তাঁর মত করে। তাঁর অ্যালবাম যে কোনো সময়ে শোনার সুযোগ থাকবে, কিন্তু শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকে তাঁর যে শিক্ষার ধারা – তা কেউ কেউ হারিয়ে ফেললেন চিরকালের মত।
অবশ্য ইউটিউবের কল্যাণে তাঁর প্রশিক্ষণের কিছু কিছু নমুনা এখনো রয়ে গেছে আমাদের নাগালে। যেহেতু তিনি আমাদের কাছে ভিনদেশের নাগরিক, তাই এপার বাংলায় তাঁর শেখানোর সুযোগ তেমন ছিল না। তবে ডিজিটাল দুনিয়ায় সঞ্চিত ওই রেকর্ডিংগুলো দেখলে বোঝা যায়, একেকটা গানকে ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কী নিপুণ প্রয়াস তিনি করতেন। গানটা ভাল করে পড়া, তার একটা অর্থের আভাস বুঝে নেওয়া, তারপর লাইনে লাইনে তাকে আরও বিছিয়ে নেওয়া এবং সুরের সংগতিতে তাকে নির্ভুলভাবে ফুটিয়ে তোলা। গান শেখার এই সহজপাঠ এড়িয়ে কোনো মেড ইজি জাতীয় প্রয়াসে তাঁর কোনোদিনই সমর্থন ছিল না। তাই তাঁর নিজের গায়ন এত সমুজ্জ্বল, ছন্দোময়, খুঁতহীন। এটা অবশ্য তাঁর শান্তিনিকেতনে শিক্ষার এক সহজ সম্প্রসারণ, যা সুদীর্ঘ ঐতিহ্যকে ধারণ করে থাকে। আর রবীন্দ্রনাথের গান শিখে বা শিখিয়েই যে তিনি সন্তুষ্ট হননি, তার প্রমাণ পাই গান নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক মননশীল গবেষণায়। বাংলা কবিতার ধ্বনি ও সঙ্গীতের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে তাঁর কাজ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় নিজেরাই প্রকাশ করে সম্মানিত করেছেন সনজিদাকে। রবীন্দ্রসঙ্গীত: মননে, লালনে গ্রন্থে তিনি লিখছেন ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো যৌগিক শিল্পের ভাবসম্পদ অনুধাবন করতে গেলে বাণী সুর ও ছন্দের ত্রয়ী ভূমিকা আলোচ্য’। গানের চর্চা, শিক্ষণ আর অনিবার মেধাবী গবেষণার ত্রিবেণী সঙ্গমে প্রোজ্জ্বল সনজিদার জীবন।
কিন্তু এইটুকুই সব নয়। রবীন্দ্রনাথের গান মানেই পেলব একটা কিছুর শৌখিন বিস্তার – এমন এক স্বতঃসিদ্ধ একটু একটু করে ছড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশে। যাঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবেন তাঁদের যেন আর কোনো কিছুতেই কোনো দায়বোধ থাকতে পারে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মানে একটা জাতির সেরা সম্পদ আর সমৃদ্ধ কোষাগার। তাঁকে আগলে রাখার দায় তবে কার? সনজিদার জীবন এই প্রশ্নের সবথেকে জোরালো উত্তর। কারণ, পুববাংলার ভাষা আন্দোলনের যে আকরসত্তা ছিল – বাংলা ভাষার নিজস্ব মর্যাদাকে রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করা – সনজিদা সেই দাবিতে সামিল হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি করে বুকে জড়িয়ে রাখবেন বলেই। সেই দাবিকে গানের ভুবনের মধ্যেই তিনি ছড়িয়ে রাখতে পারলেন আমৃত্যু। দেশের সামরিক শাসক যখন বাংলাভাষীদের মা-ভাষা, সাহিত্য আর সঙ্গীতের টুঁটি টিপে ধরেছেন, রবীন্দ্রনাথের গান না গাওয়ার ফরমান দিচ্ছেন, ঠিক তখনই সনজিদার নেতৃত্বে বৈশাখের সকালে ঢাকায় আম্রবীথির নীচে একদল অকুতোভয় তরুণ-তরুণী গলা মিলিয়ে গেয়েছেন ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। এই গান কেবল ‘মৌনী তাপস’ বৈশাখের আরতি নয়। আসলে এই আয়োজন কালবৈশাখী ঝড় নামিয়ে আনতে চায় ক্ষমতা-উদ্ধত শাসকের বিরুদ্ধে। সনজিদা, সনজিদারা, এতটাই পেরেছেন।
আরো পড়ুন শতবর্ষে কণিকা, সুচিত্রা: যে আনন্দধারা এখনো বহিছে ভুবনে
আর একাত্তরের বসন্তে, সত্যিই যেদিন পূর্ববাংলার মানুষ নিজেদের মুক্ত করার অভিযাত্রা শুরু করলেন – গায়িকা সনজিদা, প্রশিক্ষক সনজিদা আরেক চেহারায় ছুটে এলেন কলকাতা শহরে। এবার তিনি মুক্তিসেনানীদের একান্ত সহযোদ্ধা। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়তে চান তিনি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দকে মুক্তি দিতে হবে একনায়কের নিগড় থেকে। বাংলা ভাষার উপর চেপে বসা রক্তচোখকে অন্ধ করে দিতে হবে প্রতিরোধের জোরে। ইনি এক ভিন্ন মানবী, ভিন্ন সত্তা। হয়ত রবীন্দ্রনাথকে নিজের ভিতরে পেয়েছিলেন বলেই এতদূর সামর্থ্য নিয়ে বুক বেঁধে দাঁড়াতে পেরেছিলেন তিনি। আর একাত্তরের পৌষে যখন স্বাধীন বাংলাদেশ তার নতুন ফসলের ডালা নিয়ে ডাক দিল তাঁকে, তিনি বুঝলেন যে বহু মানুষের রক্তার্জিত মুক্তি বজায় রাখা আরেকটা লড়াই। সেই কঠিন সবিতাব্রতে তিনি কখনো পিছপা ছিলেন না। ছায়ানট নামক সেই কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আজ নিজের জোরেই একাকার হয়ে গেছে বাংলাদেশের সংস্কৃতির শরীরে, যার অন্যতম প্রাণমানবী ছিলেন সনজিদা। এমন নয় যে বাংলাদেশের একাত্তর পরবর্তী ইতিহাস খুব মসৃণ। স্বৈরাচারের দামামা বেজেছে অনেকবার, আজও বেজে চলেছে। তার সঙ্গে কুবাতাসের মত মিশেছে ধর্মীয় মৌলবাদের দূষণ। সে বাতাসে সাহিত্য-সঙ্গীত-সংস্কৃতির সমস্ত উত্তরাধিকার নিতান্তই ফালতু। কিন্তু সনজিদার রবীন্দ্রনাথ আসলে তাঁর মাধুকরী। তাই দিয়েই তিনি যেমন নিজের ফাল্গুনী রচনা করেন, তেমনই সমস্ত নাগিনীকে দহন করার উজ্জীবন পান। এটাই তিনি করে এসেছেন আজীবন। সুরের রবীন্দ্রনাথ, ছন্দের রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনকে যেমন আলোর ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দিয়েছেন, তেমনই কঠিন সংকল্পের সমস্ত সংকোচ থেকেও তাঁকে মুক্ত করেন রবীন্দ্রনাথই।
বিষয়টা উপেক্ষা করার নয়। রবীন্দ্রনাথের গানে স্নাত হয়ে তাঁর অপমানে সনজিদা সোচ্চার হয়েছেন বারবার। কিন্তু জরুরি অবস্থার সময়ে এই দেশে কিছু কিছু রবীন্দ্রগানের উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নামী, অনামী, বেনামী কোনো শিল্পীই টুঁ শব্দ করেননি। সনজিদা ব্যতিক্রমী পথপ্রদর্শক, সনজিদা প্রণম্য প্রশিক্ষক। মননহীন রবীন্দ্রনাথের গানের আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাঁর দীপ্ত মনন বেশিরভাগেরই কাজে লাগবে না, জানি। তবু।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








