আগে শিক্ষিত বাঙালি মাত্রেরই কতকগুলো ঝোঁক সাধারণভাবে দেখা যেত। সাহিত্যচর্চা, রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা, নাট্যচর্চা বা চলচ্চিত্র চর্চা আর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতচর্চা। আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চাকে যে বাকি সঙ্গীতচর্চার থেকে আলাদা করছি, তার কারণ রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর গানকে একটি বৈপ্লবিক সৃষ্টি বলে মনে করতেন। তাঁর রচিত গানের সুর প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য বা লোকগানের কোনো একটি ধারার মত তো নয়ই, বরং তা নিজেই একটি বিশেষ ধারা হয়ে উঠেছে। ইদানীং আমরা মুড়ি, মিছরি সব এক করে ফেলেছি। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্তও রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি বিশেষ স্বাদ আমরা পেতাম, তার সুবাস যে আলাদা সেকথা বুঝতাম। এই যে আলাদা করার প্রক্রিয়া, তা শান্তিনিকেতনের অনেক শিক্ষক, যাঁরা খোদ রবীন্দ্রনাথের কাছে গান শিখেছিলেন, তাঁদের হাত দিয়েই শুরু হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ এবং শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। রবীন্দ্রসঙ্গীত যে একটি বিশেষ জনরা (genre) হিসেবে ক্রমবিকশিত হয়েছে তার পিছনে এঁদের ভূমিকা অপরিসীম। স্বাধীনোত্তর যুগে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে মূলত শিক্ষিত জনমানসে একটি বিশেষ ধারার সঙ্গীত হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এঁদেরই দুই প্রতিভাবান ছাত্রী, রবিগানের সাধিকা, শিক্ষিকা ও সর্বোপরি শিল্পী – সুচিত্রা মিত্রকণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ তাঁদের জন্মশতবর্ষে এসে বাঙালি যদি রবীন্দ্রনাথের গানের প্রকাশ ভঙ্গিমা বা গায়কির দিকে ‘ফিরে না চায়’ তাহলে আমরা এই সঙ্গীতধারাটিকে ক্রমেই বিস্মৃত হব এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে যেমন বলা হয়, এক্ষেত্রেও আমরা সেই আত্মঘাতী বাঙালি হিসাবেই চিহ্নিত হব। এদিক থেকে বিচার করলে সুচিত্রা আর কণিকা সমস্ত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। গান পাঠ শুধু টেক্সটটুকুতেই শেষ হয় না, স্বরলিপির স্বরগুলোতে শিল্পী কীভাবে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং কীভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা অনুযায়ী, গান রচয়িতা এবং গায়ক বা গায়িকা দুজনে মিলে (কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনজনে মিলেও) একটি গানকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন – তার পাঠও প্রয়োজন।

সুচিত্রা এবং কণিকা যে আজীবন শুধুই রবি ঠাকুরের গান গেয়ে গেলেন (সুচিত্রা ব্যতিক্রম হিসাবে সলিল চৌধুরীর কিছু গান গেয়েছিলেন, দুজনেই কিছু অতুলপ্রসাদ সেনের গানও গেয়েছেন)। কিন্তু সে কি শুধুই রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি মুগ্ধতা? বোধহয় তা নয়। এই দুই সঙ্গীতশিল্পীরই মনোজগৎ তৈরি হয় শান্তিনিকেতনে, তৈরি হয় তাঁদের নান্দনিকতার বোধও। কণিকার ক্ষেত্রে আবার খোদ রবীন্দ্রনাথের স্নেহচ্ছায়ায়। সুচিত্রার বাবা সৌরীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় পেশায় পুলিস কোর্টের উকিল হলেও নেশায় ছিলেন সাহিত্যিক। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তাঁর যাতায়াত ছিল। অবনীন্দ্রনাথের জামাই মণিলাল নাগ ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁরা একত্রে ভারতী পত্রিকার সম্পাদনা করেন (১৩২২-১৩৩০)। সাহিত্যের সব শাখাতেই ছিল সৌরীন্দ্রনাথের অবাধ গতি। ফলে সাহিত্যরস, রবীন্দ্রনাথের জীবনবোধ, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া, প্রেম এবং আধ্যাত্মিকতা যেভাবে কণিকা ও সুচিত্রার মনের গভীরে প্রভাব বিস্তার করেছিল তার ছাপ আমরা এঁদের গায়নে পাই। সুচিত্রা মিত্রের গায়কিতে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন পর্যায়ের গানের বিচিত্র ভাবের অনবদ্য প্রকাশ ঘটে কী অনায়াসেই! আমরা শুনতে থাকি: ‘তবু মনে রেখো’, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ বা ‘যতখন তুমি আমায়’। আশ্চর্য লাগে গানবিশেষে গায়কির নিখুঁত বদলে। আবার আমরা যখন শুনি

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যদি    আলো না ধরে,   ওরে ওরে ও অভাগা,
যদি    ঝড়-বাদলে আঁধার রাতে   দুয়ার দেয় ঘরে –
তবে    বজ্রানলে
আপন    বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে    একলা জ্বলো রে।।

তখন এই গানের প্রতিটা শব্দ আমাদের বুকে এসে বেঁধে, আমাদের তাড়িত করে। এই গান এই অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে যখন আবার শুনলাম, সুচিত্রার বলিষ্ঠ স্পষ্ট উচ্চারণ একবারও মনে হতে দিল না যে এটা বঙ্গভঙ্গের সময়ে লেখা গান, প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি আগে রচিত। এটাই বোধহয় রচয়িতার মনের অভিপ্রায় ছিল। তাঁর গান চিরন্তন হয়ে থাকুক, শ্রোতাদের মনে বেজে চলুক।

উল্টোদিকে কণিকার গায়কিতে রবীন্দ্রনাথের ঢালা গানের যে অনুপম চেহারা ফুটে ওঠে, তা অনির্বচনীয়। রূপসাগরে ডুব দেয় মন। মনে পড়ে যায় একে একে ‘বাজে করুণ সুরে’, ‘তুমি কিছু দিয়ে যাও’ বা ‘বড় বিস্ময় লাগে’-র মত গানের কথা।

আরো পড়ুন বাঙালির রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা: অনুভবের ছবি

কী অপূর্ব সুরেলা, কী নিখুঁত টপ্পার দানা তাঁর মায়াভরা কণ্ঠে। তাঁর গানের আনন্দধারা আজও বেজে চলেছে, আজও তাঁরই গায়কির ছায়া পাই রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কণ্ঠে, মনীষা মুরলী নায়ারের কণ্ঠে। যদিও আমরা ক্রমশই ভুলে যাচ্ছি রবীন্দ্রনাথের গানের বিশেষত্ব তাঁর গানের গঠনে, সুরারোপে এবং গানের ভাষার গভীরতায়। সুভাষ চৌধুরীকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের গান সাধারণের গান নয়। এই গান শিক্ষিত সমঝদার শ্রোতার গান। এ যেন রবীন্দ্রনাথের নিজেরই কথা – “শুনিবারও প্রতিভা থাকা চাই, কেবল শুনাইবার নয়।” এই কথাগুলোই বারবার মনে করিয়ে দেয় সুচিত্রা আর কণিকার রবিগান। একইসঙ্গে আমাদের দায়িত্বও: ‘আমি শুনব ধ্বনি কানে, আমি ভরব ধ্বনি প্রাণে/সেই ধ্বনিতে চিত্তবীণায় তার বাঁধিব বারে বারে।’

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.